আদর্শ ফুলের গঠন, পরাগমিলন ও নিষেক চিত্রসহ বর্ণনা

ফুল হলো উদ্ভিদের অত্যন্ত আকর্ষণীয় এবং গুরুত্বপূর্ণ একটি অঙ্গ। এটি মূলত উদ্ভিদের বংশবৃদ্ধির জন্য একটি বিশেষ ধরনের রূপান্তরিত বিটপ। ফুলের মাধ্যমেই উদ্ভিদের প্রজনন প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয় এবং পরবর্তী বংশধর তৈরির জন্য ফল ও বীজ উৎপন্ন হয়। নিচে একটি আদর্শ ফুল সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:


​আদর্শ ফুলের বিভিন্ন অংশ

আদর্শ ফুলের বিভিন্ন অংশ

ফুলের বোঁটা বা পুষ্পবৃন্তের ঠিক উপরে অবস্থিত যে স্ফীত বা চওড়া অংশটি গোটা ফুলটিকে ধরে রাখে, সেটিকে বলা হয় পুষ্পাক্ষএকটি আদর্শ ফুলের এই পুষ্পাক্ষের ওপরেই সাজানো থাকে ফুলের প্রধান চারটি স্তবক অর্থাৎ বৃতি, দলমণ্ডল, পুংস্তবক ও স্ত্রীস্তবক। নিচে চারটি স্তবকের বিস্তারিত বিবরণ দেওয়া হল:


1. বৃতি:


ফুলের একেবারে বাইরে থাকা সবুজ রঙের যে স্তবকটি ফুলের কুঁড়ি অবস্থায় ফুলকে সুরক্ষা প্রদান করে, তাকে বৃতি বলে। বৃতির প্রতিটি পৃথক অংশকে বলা হয় বৃত্যাংশ


● বৃতির প্রকারভেদ: ​বৃত্যাংশগুলো একে অপরের সাথে কীভাবে যুক্ত আছে, তার ওপর ভিত্তি করে বৃতিকে দুই ভাগে ভাগ করা যায়। যেমন:

  • যুক্তবৃতি: যখন বৃত্যাংশগুলো একে অপরের সাথে জোড়া লাগানো বা যুক্ত থাকে, তখন তাকে যুক্তবৃতি বলে। উদাহরণ: জবা, ধুতুরা ইত্যাদি।
  • বিযুক্তবৃতি : যখন বৃত্যাংশগুলো একে অপরের থেকে আলাদা বা বিচ্ছিন্ন থাকে, তখন তাকে বিযুক্তবৃতি বলে। উদাহরণ: সরষে, মুলা ইত্যাদি।

● বৃতির কাজ: i) ফুল যখন কুঁড়ি অবস্থায় থাকে, তখন রোদ, বৃষ্টি, কুয়াশা এবং পোকামাকড়ের আক্রমণ থেকে ফুলের ভেতরের নরম অংশগুলোকে ঢেকে রেখে রক্ষা করে। ii) যেহেতু বৃতি সাধারণত সবুজ রঙের হয়, তাই এতে ক্লোরোফিল যুক্ত হওয়ায় এটি সালোকসংশ্লেষণ প্রক্রিয়ায় খাদ্যও তৈরি করতে পারে।


2. দলমণ্ডল:


বৃতির ঠিক ভেতরে এবং পুংস্তবকের বাইরের দিকে অবস্থিত ফুলের দ্বিতীয় যে স্তবকটি সবচেয়ে আকর্ষণীয় এবং রঙিন প্রকৃতির হয়, তাকে দলমণ্ডল বলে। দলমণ্ডলের প্রতিটি পৃথক অংশকে দল বা পাপড়ি বলে।


● দলমণ্ডলের প্রকারভেদ:

​পাপড়িগুলোর গঠন ও সজ্জার ওপর ভিত্তি করে দলমণ্ডলকে প্রধানত দুই ভাগে ভাগ করা যায়। ভাগগুলি হল:

  • i) ​যুক্তদল: যখন পাপড়িগুলো একে অপরের সাথে আংশিক বা সম্পূর্ণভাবে জোড়া লাগানো থাকে, তখন তাকে যুক্তদল বলে। এদের আকৃতি অনেকটা চোঙ বা ঘণ্টার মতো হয়। যেমন: ধুতুরা।
  • ii) ​বিযুক্তদল: যখন পাপড়িগুলো একে অপরের থেকে সম্পূর্ণ আলাদা বা বিচ্ছিন্ন থাকে, তখন তাকে, বিযুক্তদল বলে। যেমন: জবা, গোলাপ ইত্যাদি।


● দলমণ্ডলের কাজ: i) দলমণ্ডল বা পাপড়িগুলো উজ্জ্বল রঙের ও সুগন্ধযুক্ত হওয়ায় কীটপতঙ্গকে পরাগসংযোগের জন্য আকৃষ্ট করে। ii) এটি ফুলের ভেতরের অত্যন্ত স্পর্শকাতর অংশ অর্থাৎ পুংস্তবক ও স্ত্রীস্তবককে রোদ, বৃষ্টি ও বাইরের আঘাত থেকে সুরক্ষা প্রদান করে।


3. পুংস্তবক

একটি আদর্শ ফুলের যে স্তবকটি সরাসরি প্রজনন প্রক্রিয়ায় অংশ নেয় এবং পরাগরেণু তৈরির মাধ্যমে বংশবৃদ্ধিতে মুখ্য ভূমিকা পালন করে, তাকে পুংস্তবক বলে। এটি হল উদ্ভিদের পুরুষ প্রজনন অঙ্গ। পুংস্তবকের প্রতিটি সদস্যকে বলা হয় পুংকেশর। একটি ফুলে এক বা একাধিক পুংকেশর থাকতে পারে। একটি ফুলে যতগুলো পুংকেশর থাকে, তাদের সমষ্টিকেই একত্রে পুংকেশর চক্র বলা হয়।


● পুংকেশরের বিভিন্ন অংশ:

প্রতিটি পুংকেশরের তিনটি করে অংশ থাকে। এগুলি হল:

  • i) পুংদণ্ড: আদর্শ ফুলের যে সরু সুতোর মতো অংশটি পরাধানীকে পুষ্পাক্ষের সাথে ধরে রাখে, তাকে পুংদণ্ড বলে।
  • ii)পরাধানী: পুংদণ্ডের মাথায় থলির মতো যে অংশ থাকে, তাকে পরাধানী বলে। এর ভেতরেই উদ্ভিদের পুং গ্যামেট বা পরাগরেণু উৎপন্ন হয়।
  • iii)যোজনী: পরাধানীর দুই খণ্ড যে টিস্যুর মাধ্যমে যুক্ত থাকে, তাকে যোজনী বলে।
  • *পরাগরেণু: পরাধানীর ভেতরে হলুদ রঙের যে অসংখ্য ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র দানা থাকে, সেগুলিকে পরাগরেণু বলে।


● পুংস্তবকের কাজ: i) ফুলের এই অংশটি প্রধান পুং প্রজনন কোষ বা পরাগরেণু তৈরি করে। ii)পরাগরেণু স্ত্রীস্তবকের গর্ভমুণ্ডে স্থানান্তরিত হয়ে নিষেক প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে, যা থেকে পরে বীজ তৈরি হয়।


4.স্ত্রীস্তবক 


একটি আদর্শ ফুলের একেবারে কেন্দ্রের যে স্তবকটি উদ্ভিদের প্রজনন প্রক্রিয়ায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে এবং নিষেকের পর ফল ও বীজে রূপান্তরিত হয়, তাকে স্ত্রীস্তবক বলে। এটি উদ্ভিদের স্ত্রী প্রজনন অঙ্গ। স্ত্রীস্তবকের প্রতিটি সদস্যকে বলা হয় গর্ভপত্র। একটি স্ত্রীস্তবক এক বা একাধিক গর্ভপত্র নিয়ে গঠিত হতে পারে।


● গর্ভপত্রের বিভিন্ন অংশ:

প্রতিটি গর্ভপত্রের প্রধানত তিনটি অংশ থাকে:

  • i)গর্ভমুন্ড: গর্ভপত্রের একেবারে মাথায় যে আঠালো বা লোমশ অংশ থাকে, তাকে গর্ভমুন্ড বলে। পরাগমিলনের সময় এই অংশটিতেই পরাগরেণু এসে পড়ে।
  • ii)গর্ভদন্ড: গর্ভমুন্ডের নিচে অবস্থিত যে সরু দণ্ডের মতো অংশটি গর্ভমুন্ডকে গর্ভাশয়ের সাথে যুক্ত রাখে, তাকে গর্ভদন্ড বলে।
  • iii)গর্ভাশয়: গর্ভপত্রের একেবারে গোড়ায় যে স্ফীত বা ফোলা অংশ থাকে, তাকে গর্ভাশয় বলে। এর ভেতরে এক বা একাধিক ডিম্বক থাকে।
  • * ডিম্বক: গর্ভাশয়ের ভিতরে অবস্থিত যে অংশটি ডিম্বাণু ধারণ করে এবং নিষেকের পর বীজে পরিণত হয়, তাকে ডিম্বক বলে।


স্ত্রীস্তবকের কাজ: i) গর্ভাশয়ের ভেতরে থাকা ডিম্বকে স্ত্রী প্রজনন কোষ বা ডিম্বাণু উৎপন্ন হয়। ii) গর্ভমুণ্ড পরাগায়নের সময় পরাগরেণু গ্রহণ করে এবং তাকে অঙ্কুরোদগমে সাহায্য করে। iii) নিষেকের পর গর্ভাশয়টি ফলে এবং ডিম্বকগুলো বীজে রূপান্তরিত হয়।


​ফুলের প্রকারভেদ


গঠন ও প্রজনন অঙ্গের ভিত্তিতে বিভিন্ন প্রকার ফুলকে দুই রকম ভাবে শ্রেণীবদ্ধ করা হয়েছে।

◼ গঠনগত সম্পূর্ণতার ভিত্তিতে:


গঠনগত সম্পূর্ণতার ওপর ভিত্তি করে ফুলকে প্রধানত দুই ভাগে ভাগ করা হয়। এগুলি হল:


1. সম্পূর্ণ ফুল:


​যে সকল ফুলে একটি আদর্শ ফুলের পাঁচটি স্তবকই অর্থাৎ পুষ্পাক্ষ, বৃতি, দলমণ্ডল, পুংস্তবক ও স্ত্রীস্তবক সুশৃঙ্খলভাবে উপস্থিত থাকে, তাদের সম্পূর্ণ ফুল বলা হয়।


বৈশিষ্ট্য: i) ​এতে একটি আদর্শ ফুলের পাঁচটি স্তবকই দেখতে পাওয়া যায়। ii) ​এরা সাধারণত উভলিঙ্গ হয়, অর্থাৎ একই ফুলে পুরুষ ও স্ত্রী প্রজনন অঙ্গ থাকে। iii) ​এরা বংশবৃদ্ধিতে অত্যন্ত কার্যকর।


উদাহরণ: জবা, ধুতুরা, মটর, সরষে, অপরাজিতা ইত্যাদি।


2.অসম্পূর্ণ ফুল:

যে সকল একটি আদর্শ ফুলের প্রধান পাঁচটি স্তবকের মধ্যে যেকোনো এক বা একাধিক স্তবক অনুপস্থিত থাকে, তাদের অসম্পূর্ণ ফুল বলা হয়।


বৈশিষ্ট্য: i) ​এদের গঠন একটি আদর্শ ফুলের মতো পূর্ণাঙ্গ নয়। ii) ​অধিকাংশ একলিঙ্গ ফুলই অসম্পূর্ণ ফুলের অন্তর্ভুক্ত। iii) ​কখনও কখনও পাপড়ি বা বৃতি না থাকলেও তাকে অসম্পূর্ণ ফুল বলা হয়।


উদাহরণ: লাউ, কুমড়ো, পেঁপে, শসা, ঝিঙে ইত্যাদি।


◼ লিঙ্গ বা প্রজনন অঙ্গের ভিত্তিতে:


লিঙ্গ বা প্রজনন অঙ্গের উপস্থিতি এবং বিন্যাসের ওপর ভিত্তি করে ফুলকে সাধারণত দুই ভাগে ভাগ করা যায়। ভাগগুলি হল:


1. উভলিঙ্গ ফুল:

​যে সকল ফুলে পুং প্রজনন অঙ্গ বা পুংস্তবক এবং স্ত্রী প্রজনন অঙ্গ বা স্ত্রীস্তবক উভয়ই উপস্থিত থাকে, তাদের উভলিঙ্গ ফুল বলে।


বৈশিষ্ট্য: এরা একই ফুলের মধ্যে পরাগমিলন অর্থাৎ স্ব-পরাগযোগ ঘটাতে সক্ষম। অধিকাংশ আদর্শ ফুলই সাধারণত উভলিঙ্গ হয়।


উদাহরণ: জবা, ধুতুরা, সরষে, মটর, বেগুন ইত্যাদি।


​2. একলিঙ্গ ফুল:

যে সকল ফুলে পুংস্তবক এবং স্ত্রীস্তবকের মধ্যে যেকোনো একটি মাত্র স্তবক উপস্থিত থাকে, তাদের একলিঙ্গ ফুল বলে।


বৈশিষ্ট্য: প্রজননের জন্য এদের ইতরপরাগযোগের ওপর নির্ভর করতে হয়। অর্থাৎ, পরাগযোগের ক্ষেত্রে একই গাছের বা ভিন্ন গাছের অন্য ফুলের সাহায্য লাগে।


উদাহরণ: লাউ, কুমড়ো, পেঁপে, শসা, ঝিঙে ইত্যাদি।


​পরাগমিলন


একটি ফুলের পরাধানী থেকে পরাগরেণু একই ফুলের বা একই প্রজাতির অন্য কোনো ফুলের গর্ভমুণ্ডে স্থানান্তরিত হওয়ার পদ্ধতিকেই পরাগমিলন বলা হয়। নিচে পরাগযোগ সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:


পরাগযোগের প্রকারভেদ

পরাগযোগ প্রধানত দুই প্রকারের হয়ে থাকে।


​1. স্ব-পরাগযোগ:

স্ব-পরাগযোগ

​যখন কোনো ফুলের পরাগরেণু সেই একই ফুলে অথবা একই গাছের অন্য কোনো ফুলের গর্ভমুণ্ডে প্রবেশ করে, তখন তাকে স্ব-পরাগযোগ বলে।


বৈশিষ্ট্য: i) এক্ষেত্রে কোনো বাহকের খুব একটা প্রয়োজন হয় না। ii) এতে প্রজাতির বিশুদ্ধতা বজায় থাকে।


উদাহরণ: সরষে, ধুতুরা, টমেটো ইত্যাদি।


2. ইতরপরাগযোগ:

ইতরপরাগযোগ

যখন কোনো ফুলের পরাগরেণু একই প্রজাতির অন্য একটি গাছের ফুলের গর্ভমুণ্ডে স্থানান্তরিত হয়, তখন তাকে ইতরপরাগযোগ বলে।


বৈশিষ্ট্য: i) এক্ষেত্রে বাহকের উপস্থিতি আবশ্যিক। ii) এর ফলে নতুন বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন উদ্ভিদের জন্ম হয় এবং অভিযোজন ক্ষমতা বাড়ে।


উদাহরণ: পেঁপে, তাল, লাউ, কুমড়ো ইত্যাদি।


◼ পরাগযোগের মাধ্যম বা বাহক


​পরাগরেণু সাধারণত নিজে থেকে চলাচল করতে পারে না। তাই পরাগরেণু গুলি এক ফুল থেকে অন্য ফুলে যাওয়ার জন্য বিভিন্ন মাধ্যমের সাহায্য নেয়। নিচে মাধ্যমগুলি সম্পর্কে আলোচনা করা হল:


​1. পতঙ্গপরাগী: মৌমাছি, প্রজাপতি ইত্যাদি কিছু পতঙ্গরা মধুর লোভে ফুলে বসলে পরাগরেণু তাদের গায়ে লেগে যায়। তারপর যখন তারা অন্য কোনো ফুলে গিয়ে বসে, তখন সেই পরাগরেণু ওই ফুলের গর্ভমুন্ডে প্রবেশ করে। এই ফুলগুলো রঙিন ও সুগন্ধযুক্ত হয়। যেমন: জবা, আম ইত্যাদি।


2. বায়ুপরাগী: কিছু উদ্ভিদের ক্ষেত্রে পরাগরেণু বাতাসের সাহায্যে ভেসে গিয়ে অন্য কোনো ফুলের গর্ভমুণ্ডে পড়ে। এই ফুলগুলো সাধারণত ছোট এবং গন্ধহীন হয়। যেমন: ধান, ভুট্টা ইত্যাদি।


3. জলপরাগী: কিছু জলজ উদ্ভিদের ক্ষেত্রে পরাগরেণু জলের স্রোতে ভেসে গিয়ে অন্য ফুলে পৌঁছায় এবং পরাগসংযোগ ঘটে। যেমন: পাতাশ্যাওলা।


4. প্রাণীপরাগী: পাখি বা বাদুড়েরা যখন গাছের ডালে বসে তখন তাদের মাধ্যমেও পরাগরেণু এক ফুল থেকে অন্য এক ফুলে স্থানান্তরিত হয় এবং পরাগমিলন ঘটে। যেমন: শিমুল, কদম ইত্যাদি।


◼ পরাগযোগের গুরুত্ব


​1. ফল ও বীজ উৎপাদন: পরাগযোগ না হলে উদ্ভিদের নিষেক প্রক্রিয়া সম্ভব হতো না, ফলে ফল বা বীজ তৈরি হতো না।


​2. বংশরক্ষা: উদ্ভিদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার জন্য এটি একমাত্র প্রাকৃতিক উপায়।


​3. নতুন বৈচিত্র্য: ইতরপরাগযোগের ফলে উদ্ভিদের মধ্যে নতুন নতুন গুণাগুণ তৈরি হয় যা তাদের প্রতিকূল পরিবেশে টিকে থাকতে সাহায্য করে।


​4. খাদ্য নিরাপত্তা: আমাদের প্রয়োজনীয় অধিকাংশ দানাশস্য ও ফলমূল এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই উৎপন্ন হয়।


ফুলের নিষেক প্রক্রিয়া


পরাগমিলনের পর পরবর্তী ধাপ হল নিষেক। যে জৈবিক প্রক্রিয়ায় পুং-জনন কোষ এবং স্ত্রী-জনন কোষ মিলিত হয়ে একটি জাইগোট বা ভ্রূণাণু তৈরি করে, তাকে নিষেক বলে। এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই মূলত ফুল থেকে ফল এবং বীজ সৃষ্টি হয়। নিচে উদ্ভিদের নিষেক প্রক্রিয়ার বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:


◼ ​নিষেকের পর্যায়সমূহ


​1) পরাগরেণুর অঙ্কুরোদগম ও পরাগনালি গঠন:

প্রথমে ​গর্ভমুণ্ড থেকে নিঃসৃত এক প্রকার মিষ্টি রস শোষণ করে পরাগরেণু স্ফীত হয় এবং এর অন্তস্ত্বক বৃদ্ধি পেয়ে একটি লম্বা নল গঠিত হয়। এটিকে পরাগনালি বলে। এই নলের ভেতরে থাকে দুটি পুং-জনন কোষ।


​2) পরাগনালির গর্ভাশয় অভিমুখী যাত্রা:

এরপর ​পরাগনালিটি গর্ভদণ্ডের ভেতর দিয়ে ধীরে ধীরে নিচের দিকে অর্থাৎ গর্ভাশয়ের দিকে অগ্রসর হয়। পরাগনালির অগ্রভাগে থাকা নালিকা নিউক্লিয়াসটি এই পথ প্রদর্শনে সাহায্য করে।


​3) ডিম্বকের ভেতরে প্রবেশ:

এরপর ​পরাগনালিটি ডিম্বকের কাছে পৌঁছে সাধারণত ডিম্বকরন্ধ্র দিয়ে ভেতরে প্রবেশ করে। আর তারপর পরাগনালির মুখটি ফেটে গিয়ে পুং-জনন কোষ দুটি ভ্রূণস্থলীর ভেতরে প্রবেশ করে।


দ্বিনিষেক


​সপুষ্পক উদ্ভিদের ক্ষেত্রে এখানে দুটি পুং-জনন কোষ ভিন্ন ভিন্ন ভাবে মিলিত হওয়ার বিশেষ ঘটনাকে দ্বিনিষেক বলে। যেমন-


​2. প্রথম মিলন: একটি পুং-জনন কোষ ডিম্বাণুর সাথে মিলিত হয়ে জাইগোট তৈরি করে। এটি পরে চারাগাছ বা ভ্রূণে পরিণত হয়।


2. দ্বিতীয় মিলন: অন্য পুং-জনন কোষটি ভ্রূণস্থলীর ভেতরে থাকা নির্ণীত নিউক্লিয়াস বা সেকেন্ডারি নিউক্লিয়াসের সাথে মিলিত হয় এবং শস্য তৈরি করে। এই শস্য পরবর্তীতে নতুন  চারাগাছকে খাদ্য সরবরাহ করে।


◼ নিষেকের পরবর্তী পরিবর্তন


​নিষেক সম্পন্ন হওয়ার পর ফুলের বিভিন্ন অংশে ব্যাপক পরিবর্তন ঘটে। পরিবর্তন গুলি হল:

ফুলের অংশ
নিষেকের পর রূপান্তর
গর্ভাশয়
ফলে পরিণত হয়
ডিম্বক
বীজে পরিণত হয়
ডিম্বাণু
ভ্রূণে পরিণত হয়
বৃতি, দলমন্ডল ও পুংস্তবক
সাধারণত শুকিয়ে ঝরে যায় (কিছু ক্ষেত্রে বৃতি ফলে লেগে থাকে)
গর্ভমুন্ড ও গর্ভদন্ড
শুকিয়ে যায়

◼ নিষেকের গুরুত্ব


1. বংশবৃদ্ধি: নিষেকের মাধ্যমেই নতুন ভ্রূণের সৃষ্টি হয়, যা উদ্ভিদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখে।


2. খাদ্য উৎপাদন: ধান, গম, আম ইত্যাদি আমাদের প্রয়োজনীয় ফল ও দানাশস্য গুলি নিষেকের মাধ্যমেই তৈরি হয়।


​3. জেনেটিক বৈচিত্র্য: নিষেকের ফলে উদ্ভিদের বৈশিষ্ট্যের সংমিশ্রণ ঘটে, যা উদ্ভিদকে আরও শক্তিশালী করে তোলে এবং প্রতিকূল পরিবেশে টিকে থাকতে সাহায্য করে।


​ফুলের প্রধান কাজ


​উদ্ভিদের অস্তিত্ব রক্ষায় ফুলের ভূমিকা অপরিসীম। নিচে ফুলের প্রধান কাজগুলি বিস্তারিত আলোচনা করা হল:


​1. প্রজনন ও বংশবৃদ্ধি:

উদ্ভিদের ​ফুলের প্রধান এবং প্রাথমিক কাজ হলো বীজ উৎপাদন করা। ফুলের মাধ্যমেই উদ্ভিদের যৌন জনন সম্পন্ন হয়। ফুলের পুংকেশর বা পুং জনন অঙ্গ এবং গর্ভাশয় বা স্ত্রী জনন অঙ্গ মিলে নিষেক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নতুন ভ্রূণ বা বীজের জন্ম দেয়।


​2. পরাগমিলনে সহায়তা:

​ফুলের রঙ, সুগন্ধ এবং মধু কীটপতঙ্গ, পাখি এবং অন্যান্য প্রাণীদেরকে আকৃষ্ট করে। তারা যখন ফুলের ওপর বসে, তখন পরাগরেণু তাদের গায়ে লেগে যায় এবং এক ফুল থেকে অন্য ফুলে স্থানান্তরিত হয়। এই পরাগমিলন ছাড়া ফল বা বীজ সৃষ্টি হওয়া সম্ভব নয়।


​3. ফল ও বীজ গঠন:

​নিষেকের পর ফুলের গর্ভাশয়টি পরিবর্তিত হয়ে ফলে পরিণত হয় এবং ডিম্বকগুলো বীজে রূপান্তরিত হয়। ফল বীজের সুরক্ষা প্রদান করে এবং বীজের বিস্তারে সাহায্য করে।


​4. খাদ্য ও শক্তির উৎস:

​ফুল অনেক প্রাণীর জন্য খাদ্যের প্রধান উৎস। মৌমাছি ও প্রজাপতি ফুলের মধু পান করে বেঁচে থাকে। আবার বকফুল, সজনে ফুল ইত্যাদি মানুষ খাদ্য হিসেবেও গ্রহণ করে।


​5. প্রজাতির বৈচিত্র্য রক্ষা:

​যৌন জননের মাধ্যমে ফুলের পরাগমিলন ঘটলে নতুন নতুন বৈশিষ্ট্যের উদ্ভিদ জন্ম নিতে পারে। এটি উদ্ভিদকে বিবর্তনে এবং পরিবেশের সাথে খাপ খাইয়ে নিতে সাহায্য করে।

*

Post a Comment (0)
Previous Post Next Post