ফল ও বীজের বিভিন্ন অংশ এবং বীজের অঙ্কুরোদ্গম চিত্রসহ ব্যাখ্যা

উদ্ভিদদের নিষেকের পর ফুলের মধ্যে যে আমূল পরিবর্তন ঘটে, তার চূড়ান্ত ফল হলো ফল ও বীজ। নিষেকের ফলে গর্ভাশয়ের ভেতরে থাকা ডিম্বকগুলো বীজে পরিণত হয় এবং গর্ভাশয়টি একটি রসালো বা শুষ্ক আবরণে রূপান্তরিত হয়। ফলের প্রধান কাজ হলো বীজকে সুরক্ষা দেওয়া এবং বীজের প্রধান কাজ হলো নতুন প্রজন্মের উদ্ভিদ সৃষ্টি করা। ​নিচে ফল ও বীজ সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:


​ফল


নিষেক প্রক্রিয়ার পর উদ্ভিদের পরিপক্ক ও রূপান্তরিত গর্ভাশয়কে  ফল বলে। ​একটি আদর্শ ফলের প্রধানত দুটি অংশ থাকে, যথা - ফলত্বকবীজ। নিচে প্রতিটি অংশের বর্ণনা দেওয়া হল:


ফলত্বক


​নিষেকের পর গর্ভাশয়ের প্রাচীর থেকে ফলের যে অংশটি তৈরি হয়, তাকে ফলত্বক বলে। এটি বীজকে আবৃত করে রাখে এবং ফলের বাহ্যিক রূপ দান করে। নিচে ফলত্বকের গঠন ও কাজ সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:


​◼ ফলত্বকের স্তরবিন্যাস

একটি আদর্শ ফলের (আমের) গঠন

একটি আদর্শ রসালো ফলের ক্ষেত্রে ফলত্বকটি তিনটি সুনির্দিষ্ট স্তরে বিভক্ত থাকে। এগুলি হল:


​1. বহিঃত্বক:

​ফলের একেবারে বাইরের স্তরটিকে বলে বহিঃত্বক। এটিকে আমরা সাধারণত 'খোসা' হিসেবে চিনি।

  • গঠন: এটি সাধারণত কিউটিকলযুক্ত একস্তর কোষ দিয়ে গঠিত। এটি ফলের বাহ্যিক রঙ নির্ধারণ করে।
  • কাজ: এটি ভেতরের নরম অংশকে ধুলোবালি, কীটপতঙ্গ এবং প্রতিকূল আবহাওয়া থেকে রক্ষা করে।
  • উদাহরণ: আমের পাতলা চামড়া বা লেবুর ওপরের রঙিন অংশ।


​2. মধ্যত্বক:

​বহিঃত্বক এবং অন্তঃত্বকের মধ্যবর্তী স্তরটিই হলো মধ্যত্বক।

  • গঠন: রসালো ফলের ক্ষেত্রে এই স্তরটি প্রচুর পরিমাণে প্যারেনকাইমা কোষ নিয়ে গঠিত। এই অংশটি বেশ রসালো, নরম ও পুরু হয়। তবে কিছু ফলে এটি তন্তুময় হতে পারে।
  • কাজ: এটি মূলত খাদ্য ও জল সঞ্চয় করে রাখে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে এটিই ফলের ভক্ষণযোগ্য অংশ অর্থাৎ খাওয়া যায়।
  • উদাহরণ: আমের রসালো শাঁস।


​3. অন্তঃত্বক:

​ফলত্বকের সবচেয়ে ভেতরের যে স্তরটি সরাসরি বীজের সংস্পর্শে থাকে, তাকে অন্তঃত্বক বলে।

  • গঠন: এটি ফলের প্রকৃতি অনুযায়ী নরম, পাতলা বা পাথরের মতো শক্ত হতে পারে।
  • কাজ: এর প্রধান কাজ হলো বীজের সুরক্ষা নিশ্চিত করা।
  • উদাহরণ: আমের শক্ত আঁটি, যা বীজকে ঢেকে রাখে।


​◼ ফলত্বকের গুরুত্ব

বীজ সুরক্ষা: ফলত্বকের প্রধান উদ্দেশ্য হলো যতক্ষণ না বীজ অঙ্কুরোদ্গমের জন্য প্রস্তুত হয় ততক্ষণ সেটিকে সুরক্ষিত রাখা।

বীজ বিস্তার: ফলের বহিঃত্বকের উজ্জ্বল বর্ণ এবং মধ্যত্বকের সুস্বাদু শাঁস পশু-পাখিদের আকৃষ্ট করে। এর ফলে পশু পাখিদের মাধ্যমে বীজের বিস্তার ঘটে।

পুষ্টি সরবরাহ: ফলত্বকের সঞ্চিত শর্করা, খনিজ অন্যান্য পুষ্টি উপাদান প্রাণিজগতের খাদ্যের একটি বড় উৎস।


​ফলের প্রকারভেদ

ফলের প্রকারভেদ

উদ্ভিদের ফুলের গঠন, গর্ভাশয়ের সংখ্যা এবং উৎপত্তিগত বৈশিষ্ট্যের ওপর ভিত্তি করে ফলকে প্রধানত তিনটি ভাগে ভাগ করা যায়। ভাগগুলি নিচে আলোচনা করা হল:


1. সরল ফল

যখন একটি ফুলের একটিমাত্র গর্ভাশয় থেকে একটিই ফল উৎপন্ন হয়, তখন তাকে সরল ফল বলে। এটি সপুষ্পক উদ্ভিদের সবচেয়ে সাধারণ ফলের রূপ। সরল ফল আবার দুই প্রকারের হতে পারে, যেমন:


​i) সরস বা রসালো ফল:

যে ফলের ফলত্বক পুরু এবং রসালো হয়, তাকে সরস বা রসালো ফল বলে। পরিপক্ক অবস্থায় এদের খোসা, শাঁস ও আঁটি আলাদা করা যায়।

  • উদাহরণ: আম, জাম, লিচু ইত্যাদি।


​ii) নীরস বা শুষ্ক ফল:

​যে ফলের ফলত্বক পাতলা এবং পরিপক্ক হলে শুকিয়ে শক্ত হয়ে যায়, তাকে নীরস বা শুষ্ক ফল বলে। এদের ত্বককে আলাদা স্তরে ভাগ করা যায় না।

  • উদাহরণ: ধান, মটরশুঁটি, সরিষা, গম ইত্যাদি।


​2. গুচ্ছিত ফল

যখন একটিমাত্র ফুলে অনেকগুলো মুক্ত বা পৃথক গর্ভাশয় থাকে এবং নিষেকের পর প্রতিটি গর্ভাশয় ছোট ছোট ফলে পরিণত হয়ে একটি বোঁটার ওপর গুচ্ছাকারে অবস্থান করে, তখন তাকে গুচ্ছিত ফল বলে।

  • বৈশিষ্ট্য: এক্ষেত্রে ফুল একটিই থাকে, কিন্তু তার ভেতরের পুংকেশর ও গর্ভকেশর চক্রের মধ্যে একাধিক মুক্ত গর্ভপত্র একসঙ্গে জোট বাঁধে।
  • উদাহরণ: আতা, নয়নতারা, স্ট্রবেরি ইত্যাদি।


​3. যৌগিক ফল

যখন একটি সম্পূর্ণ পুষ্পমঞ্জরী অর্থাৎ একটি অক্ষের ওপর থাকা একগুচ্ছ ফুল একত্রে মিলিত হয়ে একটি মাত্র বড় ফল গঠিত হয়, তখন তাকে যৌগিক ফল বলা হয়।

  • বৈশিষ্ট্য: এখানে কোনো একটি নির্দিষ্ট ফুল থেকে ফল হয় না, বরং পুরো মঞ্জরীর ফুলগুলো এবং তাদের বৃতি বা পুষ্পাক্ষ একসঙ্গে জুড়ে গিয়ে একটি ফলের আকার নেয়।
  • উদাহরণ: কাঁঠাল, আনারস, ডুমুর, ইত্যাদি।

বীজ


​নিষেকের পর গর্ভাশয়ের অভ্যন্তরে থাকা ডিম্বক পরিপক্ক হয়ে বীজে পরিণত হয়। অর্থাৎ, সপুষ্পক উদ্ভিদের নিষেকের পর পরিপক্ক ও রূপান্তরিত ডিম্বককেই বীজ বলা হয়। বীজের ভেতরেই নতুন উদ্ভিদের প্রাথমিক রূপ বা ভ্রূণ সুরক্ষিত থাকে।


বীজের গঠন

বীজের বিভিন্ন অংশ বা বীজের গঠন
একটি আদর্শ দ্বিবীজপত্রী বীজের গঠনকে প্রধানত তিনটি অংশে ভাগ করা যায়। যথা: বীজত্বক, ভ্রূণ এবং শস্য বা এন্ডোস্পার্ম। নিচে প্রতিটি ভাগের বিস্তারিত বিবরণ দেওয়া হলো:


​1. বীজত্বক


​বীজের বাইরের অংশে যে শক্ত ও প্রতিরক্ষামূলক আবরণ থাকে, তাকে বীজত্বক বলে। এটি ডিম্বকের আবরণ থেকে তৈরি হয়। বীজত্বকের আবার দুটি সুনির্দিষ্ট স্তর থাকে। এগুলি হল:


​i) টেস্টা: বীজত্বকের বাইরের পুরু, শক্ত এবং সাধারণত রঙিন স্তরটিকে বলা হয় টেস্টা। এটি বীজকে বাহ্যিক আঘাত ও রোগজীবাণু থেকে রক্ষা করে।


​ii) টেগমেন: টেস্টা-র ঠিক ভেতরের পাতলা, সাদাটে এবং ঝিল্লির মতো নরম স্তরটিকে বলা হয় টেগমেন।


​● বীজত্বকের কিছু বিশেষ অংশ:


i) ডিম্বক রন্ধ্র বা মাইক্রোপাইল: বীজের গায়ে একটি অতি ক্ষুদ্র ছিদ্র থাকে, এটিকে ডিম্বক রন্ধ্র বলে। অঙ্কুরোদ্গমের সময় এই ছিদ্র দিয়েই বীজ জল এবং অক্সিজেন গ্রহণ করে।


ii)ডিম্বক নাভি বা হাইলাম: বীজের যে জায়গাটি ফলের বোঁটা বা ফলত্বকের সাথে যুক্ত ছিল, সেখানে একটি প্রায় ডিম্বাকার দাগ দেখা যায়, এটিকে ডিম্বক নাভি বলে।


​2. ভ্রূণ বা অন্তর্বীজ 


বীজত্বকটি সরিয়ে ফেললে ভেতরে যে নরম, জীবন্ত অংশটি দেখা যায়, তা-ই হলো ভ্রূণ। এটিই মূলত ভবিষ্যৎ উদ্ভিদ। ভ্রূণকে আবার দুটি প্রধান অংশে ভাগ করা যায়, এগুলি হল:


​i) বীজপত্র: ভ্রূণের সাথে যুক্ত পাতার মতো অংশকে বীজপত্র বলে। ছোলার মতো দ্বিবীজপত্রী উদ্ভিদে দুটি বড় ও মাংসল বীজপত্র থাকে।

  • কাজ: বীজপত্র দুটি অঙ্কুরোদ্গমের পূর্বে ভ্রূণের জন্য খাদ্য সঞ্চয় করে রাখে। এর ফলে চারা গাছটি নিজে খাদ্য তৈরি করার আগে পর্যন্ত পুষ্টি পেতে পারে।


​ii) ভ্রূণাক্ষ: দুইটি বীজপত্রের সংযোগস্থলে যে অক্ষ বা দণ্ডাকার অংশটি থাকে, তাকে ভ্রূণাক্ষ বলে। এর আবার দুটি অংশ থাকে, সেগুলি হল:

  • ভ্রূণমুকুল: ভ্রূণাক্ষের ওপরের সুচালো অংশকে ভ্রূণমুকুল বলে। এটি অঙ্কুরোদ্গমের পর মাটির ওপরে উঠে আসে এবং উদ্ভিদের কাণ্ড, শাখা-প্রশাখা ও পাতায় পরিণত হয়।
  • ভ্রূণমূল: ভ্রূণাক্ষের নিচের দিকের অংশকে ভ্রূণমূল বলে। এটি মাটির নিচে প্রবেশ করে উদ্ভিদের প্রধান মূলে পরিণত হয়।


​3. সস্য

নিষেধ প্রক্রিয়ার সময় ট্রিপল ফিউশন বা ত্রিমিলনের মাধ্যমে সস্য বা এন্ডোস্পার্ম গঠিত হয়। এটি হল মূলত একটি পুষ্টি কলা।

  • কাজ: এটি ভ্রূণের বৃদ্ধির জন্য প্রয়োজনীয় পুষ্টি সরবরাহ করে।
  • * ​ভিন্নতা: কিছু কিছু বীজে পরিপক্ক অবস্থায় প্রচুর সস্য বা এন্ডোস্পার্ম থাকে, যেমন- ধান, গম, ভুট্টা, ইত্যাদি। এদের স্যল বীজ বলে। আবার কিছু কিছু বীজে ভ্রূণের বৃদ্ধির সময় সস্য পুরোপুরি শেষ হয়ে যায় এবং খাদ্য বীজপত্রে সঞ্চিত হয়, যেমন- ছোলা। এদের অসস্যল বীজ বলে।

বীজের প্রধান কাজ


উদ্ভিদের জীবনচক্রে বীজের ভূমিকা অপরিসীম। একটি ক্ষুদ্র বীজের মধ্যেই লুকিয়ে থাকে একটি বিশাল উদ্ভিদের ভবিষ্যৎ। সপুষ্পক উদ্ভিদের বংশবিস্তার, প্রজাতি রক্ষা এবং টিকে থাকার পেছনে বীজ প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করে। ​নিচে বীজের প্রধান কাজগুলো সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:


​1. নতুন উদ্ভিদের সৃষ্টি ও বংশবিস্তার:

​বীজের সবচেয়ে প্রধান ও মৌলিক কাজ হলো নতুন উদ্ভিদের জন্ম দেওয়া। বীজের ভেতরে থাকা ভ্রূণটি অনুকূল পরিবেশ  পেলে সুপ্ত দশা থেকে জেগে ওঠে এবং অঙ্কুরোদ্গমের মাধ্যমে একটি পূর্ণাঙ্গ চারা গাছে পরিণত হয়। এভাবে উদ্ভিদ এক প্রজন্ম থেকে পরবর্তী প্রজন্মে নিজের বংশধারা টিকিয়ে রাখে।


​2. ভ্রূণের সুরক্ষা:

​বীজের ভেতরে থাকা ভ্রূণটি অত্যন্ত নরম ও সংবেদনশীল হয়। বীজের বাইরের কঠিন আবরণ বা বীজত্বক এই অভ্যন্তরীণ ভ্রূণকে অতিরিক্ত খরা বা তীব্র ঠান্ডা, ব্যাকটেরিয়া বা ছত্রাকের আক্রমণ ছোটখাটো যান্ত্রিক আঘাত ইত্যাদি বিভিন্ন রকমের প্রতিকূলতা থেকে রক্ষা করে।


​3. পুষ্টি ও খাদ্য সরবরাহ:

​অঙ্কুরোদ্গমের প্রাথমিক পর্যায়ে চারা গাছের কোনো মূল বা পাতা থাকে না, যার ফলে সে নিজে মাটি থেকে জল বা আলো দিয়ে খাদ্য তৈরি করতে পারে না। এই সময়ে বীজের বীজপত্র বা শস্যল অংশে সঞ্চিত খাদ্য ভ্রূণের বৃদ্ধির জন্য প্রয়োজনীয় পুষ্টি সরবরাহ করে। যতদিন চারা গাছটি নিজের পাতা দিয়ে সালোকসংশ্লেষণ প্রক্রিয়ায় খাদ্য তৈরিতে সক্ষম না হয়, ততদিন পর্যন্ত বীজই তার খাদ্যের প্রধান উৎস।


​4. প্রজাতির দূর-দূরান্তে বিস্তার:

​উদ্ভিদ নিজে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে চলাচল করতে পারে না। তবে বীজের বিশেষ গঠনের কারণে বাতাস, জল, পাখি বা বিভিন্ন প্রাণীর মাধ্যমে বীজ মাতৃ-উদ্ভিদ থেকে অনেক দূরে ছড়িয়ে পড়ে। এর ফলে এক জায়গাতেই সব গাছ জন্মিয়ে খাদ্যের অভাব বা আলোর প্রতিযোগিতা তৈরি হয় না। তাছাড়া এর মাধ্যমেই নতুন নতুন অঞ্চলে ওই উদ্ভিদের বিস্তার ঘটে।


​5. সুপ্তাবস্থা এবং প্রতিকূল আবহাওয়া মোকাবেলা:

​বীজের একটি অনন্য বৈশিষ্ট্য হলো 'সুপ্তাবস্থা'। অনেক সময় বীজ পরিপক্ক হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে উপযুক্ত পরিবেশ পায় না। বীজ তখন নিজের ভেতরের বিপাকীয় ক্রিয়া ধীর করে দিয়ে বছরের পর বছর নিষ্ক্রিয় অবস্থায় বেঁচে থাকতে পারে। পরিবেশ অনুকূল হলে তবেই এটি অঙ্কুরিত হয়। এর মাধ্যমে উদ্ভিদের টিকে থাকার সম্ভাবনা বহুগুণ বেড়ে যায়।


​6. জেনেটিক বৈচিত্র্য রক্ষা:

​যেহেতু বীজ তৈরি হয় যৌন জনন বা নিষেকের মাধ্যমে, তাই বীজের মধ্যে পুরুষ ও স্ত্রী উভয় উদ্ভিদের বৈশিষ্ট্যের মিশ্রণ ঘটে। এই জিনগত পরিবর্তনের ফলে উদ্ভিদের মধ্যে নতুন বৈশিষ্ট্যের সৃষ্টি হয়, যা তাকে পরিবর্তিত পরিবেশের সাথে খাপ খাইয়ে নিতে বা অভিযোজনে সাহায্য করে।


​বীজের অঙ্কুরোদ্গম


উদ্ভিদের যে শারীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বীজের ভেতরে সুপ্ত অবস্থায় থাকা ভ্রূণটি জেগে ওঠে এবং বৃদ্ধি পেয়ে চারা গাছে পরিণত হয়, তাকে বীজের অঙ্কুরোদ্গম বলে। এটি উদ্ভিদের জীবনচক্রের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। ​নিচে বীজের অঙ্কুরোদ্গমের শর্ত, পর্যায় এবং প্রকারভেদ সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:


​◼ অঙ্কুরোদ্গমের অপরিহার্য শর্তাবলী

একটি বীজের সুপ্ত অবস্থা ভেঙে অঙ্কুরোদ্গম প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার জন্য প্রধানত তিনটি বাহ্যিক উপাদানের প্রয়োজন হয়। এগুলি হল:


​1. জল: অঙ্কুরোদ্গমের প্রথম ও প্রধান শর্ত হলো জল। জল শোষণ করে বীজত্বক নরম ও স্ফীত হয় এবং সেটি ফেটে গিয়ে অঙ্কুরোদগম শুরু হয়। এছাড়া জলের উপস্থিতিতে বীজের ভেতরের সুপ্ত এনজাইম বা উৎসেচকগুলো সক্রিয় হয়ে ওঠে। এর ফলে সঞ্চিত খাদ্যকে ভ্রূণের গ্রহণোপযোগী করে তোলে।


​2. অক্সিজেন: অঙ্কুরোদ্গমের সময় ভ্রূণের কোষ বিভাজনের জন্য প্রচুর শক্তির প্রয়োজন হয়। এই শক্তি উৎপাদনের জন্য বীজ বায়ু বা মাটির কণার ফাঁক থেকে অক্সিজেন গ্রহণ করে তীব্র শ্বসন  প্রক্রিয়া চালায়।


​3. অনুকূল তাপমাত্রা: বীজ ভেদে অঙ্কুরোদ্গমের জন্য নির্দিষ্ট তাপমাত্রার প্রয়োজন হয়। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এই তাপমাত্রা সাধারণত ২৫°C থেকে ৩০°C হয়ে থাকে। সঠিক তাপমাত্রা উদ্ভিদের ভেতরের রাসায়নিক ও বিপাকীয় বিক্রিয়াগুলোকে সচল রাখে।


​◼ অঙ্কুরোদ্গমের বিভিন্ন পর্যায়


বীজের ​অঙ্কুরোদ্গম প্রক্রিয়াটি বেশ কয়েকটি ধাপে সম্পন্ন হয়। ধাপগুলি হল:


​1. জল শোষণ: সর্বপ্রথম সুপ্ত অবস্থায় থাকা শুষ্ক বীজটি মাটি থেকে ডিম্বক রন্ধ্র দিয়ে জল শোষণ করে ফুলে ওঠে।


2. এনজাইমের সক্রিয়তা: জল পাওয়ার পর বীজের ভেতরের হরমোন গুলি সক্রিয় হয়ে ওঠে এবং জটিল খাদ্যকে ভেঙে সরল খাদ্যে রূপান্তর করে।


3. ভ্রূণমূলের নির্গমন: পরবর্তী ধাপে বীজত্বক ফেটে প্রথমে ভ্রূণমূল বাইরে বেরিয়ে আসে এবং অভিকর্ষের টানে সেটি মাটির নিচে প্রবেশ করে প্রাথমিক মূল গঠন করে।


4. ভ্রূণমুকুলের বিকাশ: এরপর ভ্রূণমুকুলটি মাটির ওপর আলোর দিকে বৃদ্ধি পেতে শুরু করে এবং তারপর সেটি কাণ্ড ও পাতায় রূপান্তরিত হয়।


​◼ অঙ্কুরোদ্গমের প্রকারভেদ


বীজের ​বীজপত্রটির মাটিতে অবস্থানের ভিত্তিতে অঙ্কুরোদ্গমকে প্রধানত দুই ভাগে ভাগ করা হয়। ভাগগুলি হল:


1. মৃদভেদী অঙ্কুরোদ্গম:

মৃদভেদী অঙ্কুরোদ্গম


যে অঙ্কুরোদগম প্রক্রিয়ায় বীজপত্রটি বীজত্বক ফাটিয়ে মাটির ওপরে ওঠে যায়, তাকে মৃদভেদী অঙ্কুরোদগম বলে।

  • প্রক্রিয়া: বীজ অঙ্কুরিত হওয়ার সময় ভ্রূণাক্ষের নিচের অংশ অর্থাৎ বীজপত্রাধিকাণ্ড খুব দ্রুত বৃদ্ধি পায়। এর ফলে বীজপত্রটি মাটির ওপরের স্তর ভেদ করে বাইরে বেরিয়ে আসে।
  • বৈশিষ্ট্য: মাটির ওপরে আসার পর বীজপত্রগুলো সবুজ রঙের হয় এবং সাময়িকভাবে পাতার মতো কাজ করে। অর্থাৎ এটি তখন সালোকসংশ্লেষ করতে পারে। পরবর্তীতে প্রকৃত পাতা গজালে এগুলো শুকিয়ে ঝরে যায়।
  • উদাহরণ: তেঁতুল, কুমড়ো, শসা, ইত্যাদি উদ্ভিদ।


​2. মৃদগত অঙ্কুরোদ্গম:

মৃদগত অঙ্কুরোদ্গম

যে অঙ্কুরোদগম প্রক্রিয়ায় বীজপত্রটি বীজত্বক ফাটিয়ে কখনোই মাটির ওপরে উঠে আসে না, তাকে মৃদগত অঙ্কুরোদগম বলে।

  • প্রক্রিয়া: এখানে ভ্রূণাক্ষের ওপরের অংশ অর্থাৎ বীজপত্রাবকাণ্ড দ্রুত বৃদ্ধি পায়। এর ফলে ভ্রূণমুকুলটি মাটির ওপরে চলে আসে এবং কাণ্ড ও পাতা তৈরি করে। তবে বীজপত্রটি কিন্তু মাটির ভেতরেই রয়ে যায়।
  • বৈশিষ্ট্য: বীজপত্রটি মাটির নিচে থেকে ভ্রূণের বৃদ্ধির জন্য প্রয়োজনীয় পুষ্টি সরবরাহ করতে থাকে। এরপর একসময় মাটির ভেতরেই নষ্ট হয়ে যায়।
  • উদাহরণ: ছোলা, মটর, আম, ধান, গম, ভুট্টা ইত্যাদি উদ্ভিদ।


​3. জরায়ুজ অঙ্কুরোদ্গম:


যে অঙ্কুরোদগম প্রক্রিয়ায় ফল গাছের শাখায় থাকা অবস্থায় বীজের অঙ্কুরোদগম প্রক্রিয়া ঘটে যায়, তাকে জরায়ুজ অঙ্কুরোদগম বলে। এই বিশেষ ধরনের অঙ্কুরোদগম সাধারণত লবণাক্ত মাটির উদ্ভিদের ক্ষেত্রে বেশি দেখা যায়।

  • প্রক্রিয়া: এই ক্ষেত্রে ফল যখন গাছের শাখায় যুক্ত থাকে, সেই অবস্থাতেই ফলের অভ্যন্তরে বীজের অঙ্কুরোদগম ঘটে। মাটির লবণাক্ততা ও অক্সিজেনের অভাবের কারণে কিছু উদ্ভিদের বীজ মাটিতে পড়ার আগেই গাছ থেকেই অঙ্কুরিত হওয়া শুরু করে।
  • বৈশিষ্ট্য: এই অঙ্কুরোদগমের ফলে ভ্রূণাক্ষটি দীর্ঘ, ভারী ও বল্লমের মতো আকৃতি ধারণ করে। একসময় এই চারাগাছটি ভারী হয়ে মূল উদ্ভিদ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে সোজা নিচের নরম কাদায় এসে বিধে যায় এবং দ্রুত মূল বিস্তার করে নতুন উদ্ভিদ হিসেবে বেড়ে ওঠে।
  • উদাহরণ: সুন্দরী, গরান, গেঁওয়া প্রভৃতি ম্যানগ্রোভ উদ্ভিদ।

*

Post a Comment (0)
Previous Post Next Post