কুষাণ সাম্রাজ্যের ইতিহাস: উত্থান থেকে পতনের সম্পূর্ণ বিবরণ

প্রাচীন ভারতের ইতিহাসে কুষাণ সাম্রাজ্য ছিল এক স্বর্ণোজ্জ্বল অধ্যায়। কুষাণরা ছিল মূলত মধ্য এশিয়ার ইউয়ে ঝি বা তোচারিয়ান জাতির শাখা। তাদের হাত ধরে শুরু হওয়া এই সাম্রাজ্য একসময় ভারতের উত্তর-পশ্চিম থেকে শুরু করে উত্তর ও মধ্য ভারতের এক বিশাল অংশ জুড়ে বিস্তৃত ছিল। এটি কেবল একটি রাজনৈতিক শক্তিই ছিল না, বরং এটি ছিল প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের সংস্কৃতি এবং বাণিজ্যের মেলবন্ধনের একটি প্রধান কেন্দ্র।


kushan-empire-full-history
প্রতীকী ছবি  (চিত্র- কাল্পনিক)


কুষাণ সাম্রাজ্যের উত্থান

কুষাণ সাম্রাজ্যের উত্থানের ইতিহাস বেশ কয়েকটি ধাপে বিভক্ত:


◼ আদি পরিচয়

​কুষাণদের আদি বাসস্থান ছিল উত্তর-পশ্চিম চীনের কানসু  প্রদেশ। তারা মূলত ইউয়ে-ঝি (Yuezhi) নামক একটি যাযাবর গোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত ছিল। আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব 165 অব্দ নাগাদ হিউং-নু নামক অপর এক শক্তিশালী গোষ্ঠীর কাছে পরাজিত হয়ে তারা তাদের বাসস্থান ত্যাগ করতে বাধ্য হয়। এরপর আদি বাসস্থান ত্যাগ করে তারা পশ্চিম দিকে অগ্রসর হয়।


ব্যাকট্রিয়া দখল ও বসতি স্থাপন

​পশ্চিম দিকে অগ্রসর হওয়ার পথে শক উপজাতির সঙ্গে তাদের সংঘর্ষ হয়। সেই সংঘর্ষে তারা শক উপজাতিকে পরাজিত করে এবং শেষ পর্যন্ত ব্যাকট্রিয়া বা আমু দরিয়া উপত্যকায় স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করে। তারপর সেখানে ইউয়ে-ঝি গোষ্ঠী পাঁচটি পৃথক শাখায় বিভক্ত হয়ে পড়ে। এই পাঁচটি শাখার মধ্যেই একটি ছিল 'কুই-শুয়াং' (Kuei-shuang)। তারাই পরবর্তীতে 'কুষাণ' নামে পরিচিত হয়।


কুজুল কদফিসিস: সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা

​খ্রিস্টীয় প্রথম শতকের শুরুর দিকে অর্থাৎ আনুমানিক 15-65 খ্রিষ্টাব্দ নাগাদ কুষাণ বংশের প্রথম শক্তিশালী নেতা কুজুল কদফিসিসের আবির্ভাব ঘটে। তিনি ইউয়ে-ঝি গোষ্ঠীর বাকি চারটি শাখাকে পরাজিত করেন এবং কুষাণদের ঐক্যবদ্ধ করেন। তারপর তিনি অভিযান চালিয়ে কাবুল, কান্দাহার এবং দক্ষিণ আফগানিস্তানের কিছু অংশ দখল করেন। কুজুল কদফিসেস গ্রিক ও রোমান মুদ্রার অনুকরণে একটি মুদ্রা প্রচলন করেছিলেন, যা থেকে কুষাণদের স্বাধীন অস্তিত্বের প্রমাণ পাওয়া যায়।


◼ ​বিম কদফিসিস: ভারতের অভ্যন্তরে প্রসার

​কুজুল কদফিসিসের পর তার পুত্র বিম কদফিসিস আনুমানিক 65-78 খ্রিষ্টাব্দ নাগাদ কুষাণ শক্তির প্রকৃত বিস্তার ঘটান। তিনি খাইবার পাস অতিক্রম করে ভারতের মূল ভূখণ্ডে প্রবেশ করেন এবং পাঞ্জাব, সিন্ধু নদ অববাহিকা ও মথুরা পর্যন্ত এলাকা জয় করেন। ভারতে তিনিই সর্বপ্রথম রাজকীয়ভাবে স্বর্ণমুদ্রা প্রচলন করেন। মুদ্রার এক পিঠে শিবের মূর্তি ও ত্রিশূলের চিত্র থেকে বোঝা যায় যে তিনি শৈব ধর্মের অনুরাগী ছিলেন।


সম্রাট কণিষ্ক


বিম কদফিসিসের পর 78 খ্রিষ্টাব্দে কণিষ্ক সিংহাসনে বসেন। তাঁর রাজ্যাভিষেকের বছরটিকে স্মরণীয় করে রাখতে তিনি 78 খ্রিষ্টাব্দে 'শকাব্দ' প্রচলন করেন। এটি আজও ভারতের জাতীয় ক্যালেন্ডার বা সরকারি বর্ষপঞ্জি হিসেবে ব্যবহৃত হয়। কণিষ্কের শাসনকালে কুষাণ সাম্রাজ্য শ্রেষ্ঠত্বে পৌঁছায়। তিনি কুষাণদের একটি আঞ্চলিক শক্তি থেকে বিশ্বশক্তিতে রূপান্তর করেন।


◼ সাম্রাজ্য বিস্তার 

​সিংহাসন আরোহণের পরপরই কণিষ্ক প্রথমে ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজ্যগুলো জয়ের দিকে মনোযোগ দেন। এবং পরবর্তীতে মধ্য এশিয়ায় আধিপত্য বিস্তারের উদ্যেশ্যে অভিযান চালান।


​● পাঞ্জাব ও সিন্ধু প্রদেশ জয়: তিনি বর্তমান পাকিস্তানের পাঞ্জাব প্রদেশ ও সিন্ধু নদ অববাহিকা পুরোপুরি নিজের নিয়ন্ত্রণে আনেন।


​● কাশ্মীর বিজয়: কাশ্মীর জয় করে সেখানে তিনি 'কণিষ্কপুর' নামে একটি শহর স্থাপন করেন এবং অসংখ্য বৌদ্ধ স্তূপ নির্মাণ করেন। এটি ছিল তাঁর সাম্রাজ্যের অন্যতম জনপ্রিয় একটি অঞ্চল।


​● গাঙ্গেয় উপত্যকা: পূর্ব দিকে অগ্রসর হয়ে সাকেত এবং পাটলিপুত্র পর্যন্ত অঞ্চলে তিনি আক্রমণ চালিয়েছিলেন। ঐতিহাসিকদের মতে, পাটলিপুত্র জয়ের পর তিনি সেখানে  বিখ্যাত বৌদ্ধ পণ্ডিত অশ্বঘোষের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। 


​● সিল্ক রোড দখল: কণিষ্কের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য ছিল রেশম পথের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা। সেই উদ্যেশ্যে তিনি পামির মালভূমি অতিক্রম করে মধ্য এশিয়ার গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য কেন্দ্র কাশগড়, খোটান ও ইয়ারখন্দ জয় করেন।


​● চীনের সাথে সংঘর্ষ: চীনা পর্যটক হিউ এন সাঙ -এর বিবরণ থেকে জানা যায়, কণিষ্ক চীনের হান রাজবংশের বিখ্যাত সেনাপতি প্যান-চাওয়ের সাথে সংঘর্ষে লিপ্ত হন। প্রথম দিকে ব্যর্থ হলেও পরবর্তীতে তিনি প্যান-চাওকে পরাজিত করে চীনের কিছু অংশে নিজ আধিপত্য বিস্তার করেন। এর ফলে ভারত থেকে চীন ও রোমের বাণিজ্য পথ সম্পূর্ণ তাঁর অধীনে চলে আসে।


​● শক ক্ষত্রপদের দমন: কণিষ্ক পশ্চিম ভারতের শক ক্ষত্রপ শাসকদেরকে কুষাণদের বশ্যতা স্বীকার করতে বাধ্য করেছিল। এরফলে মালব ও উজ্জয়িনী পর্যন্ত অঞ্চলে তাঁর প্রভাব বিস্তৃত হয়েছিল।


​● ​আফগানিস্তান ও ব্যাকট্রিয়া: বর্তমান আফগানিস্তানের কাবুল, কান্দাহার এবং বলখ অঞ্চল ছিল কনিষ্কের সাম্রাজ্যের মূল ভিত্তি। এখান থেকেই তিনি ভারতের মূল ভূখণ্ডে অভিযান পরিচালনা করতেন।


সাম্রাজ্যের সীমানা

​কণিষ্কের সময় কুষাণ সাম্রাজ্যের বিস্তৃতি ছিল অবিশ্বাস্য। অধিকাংশ ঐতিহাসিকদের মতে কণিষ্কের সময় কুষাণ সাম্রাজ্যের সীমানা ছিল নিম্নরূপ:


​● উত্তরে: মধ্য এশিয়ার ইয়ারখন্দ ও খোটান (এটি বর্তমানে চীনের অংশ)।


​● দক্ষিণে: বিন্ধ্য পর্বতমালা এবং উত্তর কোঙ্কন।


​● পূর্বে: মগধ বা পাটলিপুত্র (এটি বর্তমানে বিহারে অবস্থিত)।


​● পশ্চিমে: আফগানিস্তানের হিন্দুকুশ পর্বতমালা ও পারস্যের সীমান্ত।


◼ রাজধানী

কণিষ্ক তার ​বিশাল সাম্রাজ্য পরিচালনার সুবিধার্থে দুটি প্রধান প্রশাসনিক কেন্দ্র বা রাজধানী ব্যবহার করতেন।


​● ​পুরুষপুর (পেশোয়ার): কণিষ্কের মূল রাজধানী ছিল পুরুষপুর। এটি মধ্য এশিয়া ও ভারতের সংযোগস্থলে অবস্থিত ছিল।


​● ​মথুরা: উত্তর ভারতের দ্বিতীয় রাজধানী ছিল মথুরা। এটি শিল্পকলা ও শাসনের প্রধান কেন্দ্র হয়ে উঠেছিল।


কুষাণ যুগের অর্থনীতি


প্রাচীন ভারতের ইতিহাসে কুষাণ যুগের অর্থনীতি এক অভূতপূর্ব সমৃদ্ধি লাভ করে। এই সমৃদ্ধির মূলে ছিল ভারতের ভৌগোলিক অবস্থান এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ওপর কুষাণদের অপ্রতিহত নিয়ন্ত্রণ। কুষাণ আমলেই ভারত প্রথমবার বিশ্ব অর্থনীতির একটি প্রধান কেন্দ্রে পরিণত হয়।


আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও সিল্ক রোড

কুষাণ অর্থনীতির মেরুদণ্ড ছিল বিখ্যাত রেশম পথ বা সিল্ক রোড। এই পথটি চীন থেকে শুরু হয়ে মধ্য এশিয়া ও পারস্যের মধ্য দিয়ে রোমান সাম্রাজ্য পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। সম্রাট কণিষ্ক ও তাঁর উত্তরসূরিরা এই পথের একটি বিশাল অংশ দখল করে রেখেছিলেন। এই পথ দিয়ে যাতায়াতকারী বণিকদের কাছ থেকে কুষাণরা প্রচুর পরিমাণে শুল্ক আদায় করত, যা সাম্রাজ্যের কোষাগারকে সমৃদ্ধ করেছিল। ভারত থেকে মশলা, রেশম, মসলিন কাপড়, মুক্তো এবং হাতির দাঁতের জিনিস ইত্যাদি এই পথের মাধ্যমে রোমান সাম্রাজ্যে রপ্তানি হতো। বিনিময়ে রোম থেকে প্রচুর পরিমাণে সোনা ভারতে আসত।


মুদ্রা ব্যবস্থা

কুষাণরাই ভারতে প্রথম ব্যাপকভাবে উচ্চমানের স্বর্ণমুদ্রা প্রচলন করেছিলেন। বিম কদফিসিস প্রথম স্বর্ণমুদ্রা চালু করেন। এই মুদ্রাগুলো রোমান 'অরিয়াস'-এর সমমানের ছিল। এটি আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে কুষাণদের শক্তিশালী অবস্থানের প্রমাণ দেয়। সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন লেনদেনের জন্য কুষাণরা প্রচুর পরিমাণে তাম্র মুদ্রাও প্রচলন করেছিলেন। এর থেকে জানা যায় যে তৎকালীন সময়ে গ্রামীণ অর্থনীতিতেও ব্যাপক মুদ্রার প্রচলন ছিল।


কৃষি ও সেচ ব্যবস্থা

বাণিজ্যিক সমৃদ্ধি থাকলেও কুষাণ অর্থনীতির ভিত্তি ছিল কৃষি। কুষাণ শাসকরা কৃষির উন্নতির জন্য সেচ ব্যবস্থার ওপর বিশেষ জোর দিয়েছিলেন। তারা আফগানিস্তান ও উত্তর-পশ্চিম ভারতের শুষ্ক অঞ্চলে জলসেচের জন্য খাল ও কূপ খনন করেছিল। এই যুগে ধান, গম, যব এবং আখের পাশাপাশি তুলোর চাষ ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পায়। তুলো রপ্তানি ছিল কুষাণ অর্থনীতির অন্যতম একটি লাভজনক দিক।


কুষাণ যুগের ধর্মীয় প্রেক্ষাপট

কুষাণ যুগের ধর্মীয় প্রেক্ষাপট ছিল অত্যন্ত বৈচিত্র্যময় এবং বিবর্তনমূলক। এই সময়টি ভারতীয় ধর্মবিশ্বাসের ইতিহাসে একটি 'ক্রান্তিকাল' হিসেবে পরিচিত। এই যুগে একদিকে যেমন বৌদ্ধধর্মের আমূল পরিবর্তন ঘটেছিল, অন্যদিকে বৈদিক ধর্মও নতুন রূপ নিতে শুরু করেছিল।

​কুষাণ যুগের ধর্মীয় প্রেক্ষাপটের প্রধান দিকগুলো নিচে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:


​● চতুর্থ বৌদ্ধ সংগীতি: সম্রাট কণিষ্কের উদ্যোগে কাশ্মীরের কুণ্ডলবনে (মতান্তরে জলন্ধরে) চতুর্থ বৌদ্ধ সংগীতি অনুষ্ঠিত হয়। ​এই সংগীতিতে 500 জন বৌদ্ধ পণ্ডিত অংশগ্রহণ করেছিলেন। এর সভাপতি ছিলেন বসুমিত্র এবং সহ-সভাপতি ছিলেন অশ্বঘোষ। ​এখানেই বৌদ্ধ শাস্ত্রের জটিল বিষয়গুলো ব্যাখ্যা করে 'মহাবিভাষা' নামে এক বিশাল গ্রন্থ সংকলিত হয়। এটি বৌদ্ধধর্মের 'বিশ্বকোষ' হিসেবে পরিচিত।


​● মহাযান পন্থার উত্থান: কুষাণ যুগ বৌদ্ধধর্মের ইতিহাসে এক বিশাল পরিবর্তনের সাক্ষী। এই সময় বৌদ্ধধর্ম হীনযান ও মহাযান নামে দুটি শাখায় বিভক্ত হয়ে যায়। কণিষ্ক নিজে 'মহাযান' মতাদর্শের অনুসারী ছিলেন।


​● মূর্তিপূজার সূচনা: হীনযান পন্থায় বুদ্ধকে প্রতীকের মাধ্যমে অর্থাৎ পদচিহ্ন বা ধর্মচক্র হিসেবে স্মরণ করা হতো। কিন্তু কুষাণ যুগে মহাযান পন্থার প্রভাবে বুদ্ধকে 'ঈশ্বর' হিসেবে কল্পনা করা হয় এবং তাঁর মানবাকৃতি মূর্তি নির্মাণ করে পূজা করার প্রথা শুরু হয়।


​● বোধিসত্ত্ব ধারণা: এই যুগে বিশ্বাস করা হত, কেবল নিজের মুক্তি নয়, বরং সকল জীবের মুক্তির জন্য 'বোধিসত্ত্ব'রা কাজ করেন। এই উদার মতবাদ সাধারণ মানুষের কাছে বৌদ্ধধর্মকে আরও জনপ্রিয় করে তোলে।


​● সংস্কৃতের ব্যবহার: আগে বৌদ্ধ ধর্মগ্রন্থগুলো প্রধানত পালি ভাষায় লেখা হতো। তবে কুষাণ যুগে তা সংস্কৃত ভাষাতেও লেখা ও সংকলন করা শুরু হয়।


​● শৈব ধর্মের প্রভাব: কণিষ্কের পূর্বসূরি বিম কদফিসিস শিবের একনিষ্ঠ ভক্ত ছিলেন। তিনি নিজেকে 'মহেশ্বর' উপাধিতে ভূষিত করেছিলেন। তাঁর মুদ্রায় শিব ও ত্রিশূলের চিত্র লক্ষ্য করা যায়।


​● ব্রাহ্মণ্য বা হিন্দু ধর্মের বিবর্তন: কুষাণ যুগে বৌদ্ধধর্মের প্রাধান্য থাকলেও এই সময়ই বৈদিক বা ব্রাহ্মণ্য ধর্মের পুনরুত্থানের বীজ বপন হয়েছিল। ​এই সময়ে বিষ্ণু এবং শিবের উপাসনা প্রজাদের মধ্যে জনপ্রিয়তা পেতে শুরু করে। ​ভাগবত ধর্মের প্রসার ঘটে এবং বাসুদেব কৃষ্ণের পূজা বিস্তার লাভ করে। কুষাণদের শেষ শক্তিশালী রাজা বাসুদেবের নাম থেকে অনুমান করা হয় যে তখন বৈষ্ণব ধর্ম সম্ভবত রাজপরিবারেও প্রভাব বিস্তার করেছিল।


কুষাণ যুগের শিল্পকলা ও স্থাপত্য 

কুষাণ যুগের শিল্পকলা ও স্থাপত্য ভারতীয় ইতিহাসের এক বৈপ্লবিক অধ্যায়। এই যুগে ভাস্কর্য নির্মাণের ক্ষেত্রে দুটি ভিন্নধর্মী ধারার উদ্ভব ঘটেছিল, যা ভারতীয় মূর্তিশিল্পকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যায়। মূলত সম্রাট কণিষ্কের পৃষ্ঠপোষকতায় এই শিল্পের জয়যাত্রা শুরু হয়। ​কুষাণ আমলে প্রধানত যে দুটি শিল্পরীতির বিকাশ ঘটেছিল টা হল গান্ধার শিল্প এবং মথুরা শিল্প

গান্ধার শিল্প

এটি ছিল ভারতীয় আধ্যাত্মিকতা এবং গ্রিক-রোমান শিল্পরীতির এক অপূর্ব সংমিশ্রণ। এই কারণে একে 'ইন্দো-গ্রিক' শিল্পও বলা হয় থাকে। উত্তর-পশ্চিম ভারতের গান্ধার, তক্ষশীলা ও পেশোয়ার অঞ্চল গুলি ছিল এই শিল্পরীতির প্রধান কেন্দ্র। এই শিল্পে প্রধানত নীলাভ-ধূসর পাথর ব্যবহার করা হতো। বুদ্ধের মূর্তিতে গ্রিক দেবতা অ্যাপোলোর প্রভাব লক্ষ্য করা যায়। ঢেউ খেলানো কোঁকড়ানো চুল, সুঠাম ও পেশিবহুল শরীর এবং স্বচ্ছ কাপড়ের সূক্ষ্ম ভাঁজ ছিল এই শিল্পের প্রধান বৈশিষ্ট্য।


মথুরা শিল্প

গান্ধার শিল্পের বিপরীতে মথুরা শিল্প ছিল সম্পূর্ণভাবে ভারতীয় ঘরানার শিল্প। উত্তর প্রদেশের মথুরা ছিল এই শিল্পরিতির প্রধান কেন্দ্র। এই শিল্পরীতিতে লাল বেলেপাথর ব্যবহার করা হতো। এই ঘরানায় বুদ্ধের পাশাপাশি জৈন তীর্থঙ্কর এবং হিন্দু দেবদেবীর মূর্তিও তৈরি হতো। মূর্তির শরীরে বলিষ্ঠতা এবং মুখে আধ্যাত্মিক প্রসন্নতা ফুটিয়ে তোলা হতো।


কণিষ্ক চৈত্য

কণিষ্ক তাঁর রাজধানী পুরুষপুরে প্রায় 400 ফুট উঁচু একটি কাঠের বিশাল স্তূপ নির্মাণ করেছিলেন। এটি তৎকালীন বিশ্বের অন্যতম বিস্ময়কর স্থাপত্য হিসেবে পরিচিত ছিল।


কণিষ্কপুর ও সিরকাপ

কণিষ্ক কাশ্মীরে 'কণিষ্কপুর' নামে একটি শহর প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। এছাড়াও তক্ষশীলার সিরকাপ অঞ্চলে তার স্থাপত্যের চমৎকার নিদর্শন পাওয়া গেছে।


পেশোয়ার ও তক্ষশীলার বিহার

কুষাণ যুগে বৌদ্ধ ভিক্ষুদের বসবাসের জন্য পাথর খোদাই করে অনেক বিহার ও মঠ তৈরি করা হয়েছিল। তক্ষশীলার 'ধর্মরাজিকা স্তূপ' এই সময়ের এক শ্রেষ্ঠ স্থাপত্য।


কণিষ্কের ​মস্তকহীন মূর্তি

মথুরায় সম্রাট কণিষ্কের একটি বিশাল মস্তকহীন মূর্তি পাওয়া যায়, যা এই যুগের এক বিশেষ নিদর্শন। এতে সম্রাটের রাজকীয় পোশাক, দীর্ঘ কোট এবং ভারী বুট জুতো অত্যন্ত নিখুঁতভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।


মুদ্রা শিল্প

কুষাণদের মুদ্রাগুলোও ছিল শিল্পের অন্যতম গুরুত্বপুর্ণ একটি  অংশ। স্বর্ণ ও তাম্র মুদ্রায় সম্রাটদের প্রতিকৃতি এবং দেবদেবীর চিত্রগুলো অত্যন্ত উন্নত মানের খোদাই পদ্ধতিতে তৈরি করা হয়েছিল।


কুষাণ যুগের সাহিত্য ও বিজ্ঞান

শুধুমাত্র সাম্রাজ্য বিস্তার কিংবা শিল্পকলায় নয়, জ্ঞান-বিজ্ঞান এবং সাহিত্যের চরম উৎকর্ষের জন্যও কুষাণ যুগ ভারতের ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে আছে। সম্রাট কণিষ্কের রাজসভা ছিল তৎকালীন বিশ্বের শ্রেষ্ঠ পণ্ডিত ও বিজ্ঞানীদের মিলনস্থল।


​● অশ্বঘোষ: কণিষ্কের রাজসভার সর্বশ্রেষ্ঠ রত্ন ছিলেন অশ্বঘোষ। অনেকে তাঁকে ভারতের প্রথম সংস্কৃত নাট্যকার বলে থাকেন। বুদ্ধদেবের জীবনী নিয়ে তিনি 'বুদ্ধচরিত' নামে একটি মহাকাব্য রচনা করেন। এটি সংস্কৃত সাহিত্যের এক অমূল্য সম্পদ। বুদ্ধের অনুজ সুন্দরের বৌদ্ধধর্ম গ্রহণের কাহিনী নিয়ে তিনি রচনা করেন সৌন্দরানন্দ কাব্য। এছাড়াও, ​সারিপুত্র প্রকরণ নামে একটি বিখ্যাত সংস্কৃত নাটকও তিনি রচনা করেছিলেন।


​● বসুমিত্র: তিনি ছিলেন চতুর্থ বৌদ্ধ সংগীতির সভাপতি। তাঁর তত্ত্বাবধানে 'মহাবিভাষা' বা 'বিভাষা শাস্ত্র' সংকলিত হয়। ইতিহাসবিদদের অনেকে এটিকে বৌদ্ধধর্মের বিশ্বকোষ বলে থাকেন। এটি মূলত সংস্কৃত ভাষায় রচিত।


​● অন্যান্য পণ্ডিত: কণিষ্কের সভায় পার্শ্ব এবং অন্যান্য বৌদ্ধ দার্শনিকদের উপস্থিতি সাহিত্যের চর্চাকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিল।


​● চিকিৎসা বিজ্ঞান ও চরক: কুষাণ যুগকে ​ভারতীয় চিকিৎসা শাস্ত্র বা আয়ুর্বেদের ইতিহাসের এক স্বর্ণযুগ বলা যেতে পারে। কণিষ্কের রাজদরবারে বিখ্যাত চিকিৎসক ছিলেন চরক। তিনি 'চরক সংহিতা' গ্রন্থ রচনা করেছিলেন। এটি প্রাচীন ভারতের চিকিৎসা বিজ্ঞানের প্রধান আকর গ্রন্থ। ​তিনি অভ্যন্তরীণ রোগতত্ত্ব নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন।


​● নাগার্জুন: ​নাগার্জুন ছিলেন কুষাণ যুগের প্রখ্যাত দার্শনিক ও বিজ্ঞানী। ​'মাধ্যমিক কারিকা' নামক গ্রন্থে তিনি তাঁর বিখ্যাত 'শূন্যবাদ' তত্ত্ব প্রচার করেন। তিনি বিশ্বের বস্তুসমূহের আপেক্ষিকতা নিয়েও আলোচনা করেছিলেন। এর সাথে আধুনিক বিজ্ঞানের কিছু ধারণার মিল পাওয়া যায়। এছাড়া, ঐতিহাসিকদের অনেকে মনে করেন ​তিনি রসায়ন শাস্ত্র এবং ধাতু বিদ্যাতেও যথেষ্ট পারদর্শী ছিলেন।


​● জ্যোতির্বিদ্যা ও গণিত: ​কুষাণ আমলে সিল্ক রোডের মাধ্যমে গ্রিক ও রোমানদের সাথে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ থাকায় ভারতের জ্যোতির্বিদ্যায় বৈপ্লবিক পরিবর্তন আসে। ​এই যুগে ভারতীয় জ্যোতির্বিদরা গ্রিকদের থেকে রাশিচক্র ও গ্রহের অবস্থান নির্ণয়ের নতুন কৌশল রপ্ত করেন। ​পরবর্তীকালে গুপ্ত যুগে বরাহমিহির যে জ্যোতির্বিজ্ঞানের ভিত গড়েছিলেন, তার সূচনা হয়েছিল এই কুষাণ যুগেই।


কুষাণ সাম্রাজ্যের পতন

কুষাণ সাম্রাজ্যের পতন কোনো একটি নির্দিষ্ট কারণে ঘটেনি। অভ্যন্তরীণ দুর্বলতা এবং বহিঃশক্তির ক্রমাগত আক্রমণের ফলে এই বিশাল সাম্রাজ্য ধীরে ধীরে পতনের দিকে অগ্রসর হয়। সম্রাট কণিষ্কের পরবর্তী শাসকরা সাম্রাজ্যের সংহতি বজায় রাখতে ব্যর্থ হন। কুষাণ সাম্রাজ্যের পতনের প্রধান কারণগুলো নিচে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:


​দুর্বল উত্তরাধিকারী: ​কণিষ্কের মৃত্যুর পর আনুমানিক 125 খ্রিস্টাব্দের পরবর্তী সময়ে পরপর কুষাণ সিংহাসনে বসেন বাসিষ্ক, হুবিষ্ক এবং দ্বিতীয় কণিষ্ক। হুবিষ্ক ছিলেন একজন দক্ষ ও শক্তিশালী শাসক। কিন্তু তাঁর পরবর্তী শাসকরা ছিলেন তুলনামূলকভাবে দুর্বল। বিশাল এই সাম্রাজ্য পরিচালনার জন্য যে সামরিক ও প্রশাসনিক দক্ষতার প্রয়োজন ছিল, তাঁদের মধ্যে তা কিন্তু অনেকাংশেই ছিল না।


সাম্রাজ্যের বিশালতা ও প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণ: ​কুষাণ সাম্রাজ্য মধ্য এশিয়া থেকে উত্তর ভারত পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। দূরবর্তী অঞ্চলগুলোতে কেন্দ্রীয় শাসন শিথিল হয়ে পড়লে স্থানীয় গভর্নর বা 'ক্ষত্রপ'-রা নিজেদের স্বাধীন বলে ঘোষণা করতে শুরু করে। বিশেষ করে সর্বপ্রথম উত্তর-পশ্চিম সীমান্তে কুষাণদের নিয়ন্ত্রণ দুর্বল হয়ে পরে।


বহিঃশক্তির আক্রমণ: পারস্যে শক্তিশালী সাসানীয় বংশের উত্থান ঘটে। রাজা প্রথম অর্দশির এবং প্রথম শাপুর কুষাণদের পশ্চিম অংশ আক্রমণ করেন এবং ব্যাকট্রিয়া ও উত্তর-পশ্চিম ভারত দখল করে নেন। এর ফলে কুষাণরা তাদের আদি শক্তিকেন্দ্র হাতছাড়া করে। অন্যদিকে উত্তর ও মধ্য ভারতে শ্রীগুপ্তের হাত ধরে গুপ্ত বংশের যে ভিত্তি স্থাপিত হয়। সমুদ্রগুপ্তের আমলে তা বিশাল রূপ নেয়। গুপ্ত সম্রাটরা গাঙ্গেয় উপত্যকা থেকে কুষাণদের আধিপত্য সম্পূর্ণভাবে নির্মূল করে দেন।


অভ্যন্তরীণ বিদ্রোহ ও স্থানীয় শক্তির উত্থান: ​কুষাণদের দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে ভারতের অভ্যন্তরে বেশ কিছু স্থানীয় গোষ্ঠী ও রাজবংশ নিজেদের শক্তি বৃদ্ধি করতে সফল হয়। পাঞ্জাব ও রাজস্থানের যৌধেয় ও মালব যোদ্ধা গোষ্ঠীগুলো কুষাণদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করে এবং তাদের এলাকা থেকে বিতাড়িত করে। আবার মধ্য ভারতে নাগ রাজবংশও কুষাণদের পরাজিত করে নিজেদের প্রভাব বিস্তার করে।


অর্থনৈতিক বিপর্যয়: ​কুষাণ অর্থনীতির মূল ভিত্তি ছিল সিল্ক রোড বা রেশম পথের নিয়ন্ত্রণ। সাসানীয়দের আক্রমণের ফলে পশ্চিমের বাণিজ্য পথগুলো তাদের হাতছাড়া হয়ে যায়। ফলে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য থমকে দাঁড়ায় এবং স্বর্ণমুদ্রার মান ও সংখ্যা কমে যেতে থাকে। এই অর্থনৈতিক সংকট কুষাণদের সামরিক শক্তিকে দুর্বল করে দিয়েছিল।


শেষ কুষাণ শাসক: ​কুষাণ বংশের শেষ শক্তিশালী রাজা ছিলেন দ্বিতীয় বাসুদেব। তাঁর মৃত্যুর পর কুষাণ সাম্রাজ্য কতগুলো ছোট ছোট খণ্ডে বিভক্ত হয়ে যায়। এই ক্ষুদ্র কুষাণ শাখাগুলো কিছুকাল পাঞ্জাব ও আফগানিস্তানে কোনোরকমে নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রেখেছিল। তবে শেষ পর্যন্ত পঞ্চম শতাব্দীতে হুন আক্রমণের ফলে তাদের অস্তিত্ব চিরতরে মুছে যায়।

*

Post a Comment (0)
Previous Post Next Post