কলা বা টিস্যু কী? উদ্ভিদ ও প্রাণী কলার প্রকারভেদ ও কাজ

কলা বা টিস্যু কী?


প্রতিটি জীবদেহ এক বা একাধিক কোষ দ্বারা গঠিত। আর একই ধরনের কয়েকটি কোষ একত্রিত হয়ে যখন নির্দিষ্ট কোনো কাজ সম্পন্ন করে তখন সেই কোষ গুচ্ছকে বলা হয় কলা বা টিস্যু।


​সহজভাষায়, আমাদের শরীরে কোষগুলো শুধুমাত্র ইটের মতো সাজানো থাকে না, বরং নির্দিষ্ট কাজের জন্য তারা একেকটি টিম বা গোষ্ঠী তৈরি করে। এই গোষ্ঠীগুলোই হলো কলা।


tissues-all-information


কলার প্রকারভেদ

​কলাকে প্রধানত দুটি ভাগে ভাগ করা হয়ে থেকে, যথা:

​উদ্ভিদকলা এবং ​প্রাণীকলা

কলার শ্রেণীবিভাগের সম্পুর্ন চার্টটি নিচে দেওয়া হল:

classification-of-tissue

উদ্ভিদকলা

​উদ্ভিদের বৃদ্ধি এবং গঠনের ওপর ভিত্তি করে উদ্ভিদ কলাকে দুই ভাগে ভাগ করা যায়, যথা: ভাজক কলা স্থায়ী কলা


​1) ভাজক কলা

সংজ্ঞা: ​যে কলার কোষগুলি পাতলা কোষপ্রাচীর বিশিষ্ট এবং বিভাজন ক্ষমতাসম্পন্ন, অর্থাৎ যারা বিভাজিত হয়ে নতুন অপত্য কোষ সৃষ্টি করতে পারে, তাদের ভাজক কলা বলে।


vajok-kola


​◼ ভাজক কলার বৈশিষ্ট্য

  • আকৃতি: এই কলার কোষগুলো সাধারণত আকারে ছোট এবং দৈর্ঘ্যে ও প্রস্থে প্রায় সমান হয়। আর আকৃতিগত ভাবে এরা গোলাকার, ডিম্বাকার বা বহুভুজাকার হয়।
  • কোষ প্রাচীর: এদের কোষ প্রাচীর খুব পাতলা এবং মূলত সেলুলোজ দিয়ে গঠিত।
  • নিউক্লিয়াস: ভাজক কলার প্রতিটি কোষে একটি বড় এবং সুস্পষ্ট নিউক্লিয়াস থাকে।
  • সাইটোপ্লাজম: এদের কোষগুলো ঘন ও দানাদার সাইটোপ্লাজমে পূর্ণ থাকে।
  • কোষান্তর রন্ধ্র: কোষগুলো খুব ঘনভাবে সাজানো থাকে, তাই এদের মাঝখানে কোনো ফাঁকা জায়গা বা কোষান্তর রন্ধ্র থাকে না।
  • কোষগহ্বর: সাধারণত এই কোষে কোনো কোষগহ্বর বা ভ্যাকুওল থাকে না, থাকলেও তা আকারে খুব ছোট হয়।
  • বিপাকীয় হার: এই কলার কোষগুলো খুব দ্রুত বিভাজিত হয় বলে এদের বিপাকীয় হার অত্যন্ত বেশি।

​◼ ভাজক কলার প্রকারভেদ

অবস্থান অনুযায়ী ​ভাজক কলাকে মূলত তিনটি ভাগে ভাগ করা যায়:

​i) অগ্রস্থ ভাজক কলা: এই কলা মূল, কাণ্ড এবং শাখার একেবারে অগ্রভাগে থাকে। এটি উদ্ভিদকে লম্বায় বৃদ্ধি পেতে সাহায্য করে।

ii) নিবেশিত ভাজক কলা: দুটি স্থায়ী কলার মাঝখানে বা পাতার গোড়ায় ও পর্বমধ্য অংশে এই কলা থাকে। এটি মূলত পর্বমধ্যের দৈর্ঘ্য বাড়ায় (যেমন- ঘাস, বাঁশ ইত্যাদি উদ্ভিদের)।

iii) পার্শ্বস্থ ভাজক কলা: এই কলা কাণ্ড ও মূলের পার্শ্বদেশে লম্বালম্বিভাবে থাকে। এটি উদ্ভিদের পরিধি বা প্রস্থ বাড়াতে সাহায্য করে (যেমন- ক্যাম্বিয়াম)।


​◼ ভাজক কলার কাজ

  • বৃদ্ধি: উদ্ভিদের দৈর্ঘ্য ও প্রস্থের বৃদ্ধি ঘটানোই ভাজক কলার প্রধান কাজ।
  • নতুন অঙ্গ সৃষ্টি: এই কলা উদ্ভিদদেহের নতুন অঙ্গ অর্থাৎ পাতা, ফুল ও শাখা-প্রশাখা সৃষ্টিতে বিশেষ ভূমিকা রাখে।
  • স্থায়ী কলা গঠন: ভাজক কলার কোষগুলো বিভাজিত ও রূপান্তরিত হয়েই স্থায়ী কলা (যেমন- প্যারেনকাইমা ও জাইলেম) গঠন করে।
  • ক্ষত নিরাময়: গাছের কোনো অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হলে ভাজক কলা দ্রুত বিভাজিত হয়ে সেই ক্ষতস্থান পূরণ করে।

2) স্থায়ী কলা 

ভাজক কলা থেকে উৎপন্ন হওয়ার পর যে সব কলা আর বিভাজিত হতে পারে না এবং একটি নির্দিষ্ট আকার ও কাজ গ্রহণ করে, সেই সমস্ত পরিণত কলাকে স্থায়ী কলা বলা হয়। উদ্ভিদের অধিকাংশ অংশই এই কলা দিয়ে গঠিত।

​◼ স্থায়ী কলার প্রধান বৈশিষ্ট্য

  • বিভাজন ক্ষমতা: এই কলার কোষগুলো সাধারণত বিভাজিত হতে পারে না ।
  • কোষের অবস্থা: স্থায়ী কলার কোষগুলো সজীব বা মৃত দুই-ই হতে পারে।
  • কোষ প্রাচীর: কোষ প্রাচীর পাতলা বা লিগনিন যুক্ত হয়ে বেশ পুরু ও শক্ত হতে পারে।
  • সাইটোপ্লাজম ও নিউক্লিয়াস: সজীব কোষে সাইটোপ্লাজম পরিধির দিকে থাকে এবং একটি বড় কেন্দ্রীয় কোষগহ্বর থাকে। এক্ষেত্রে নিউক্লিয়াস সাধারণত ছোট হয়।
  • কোষান্তর রন্ধ্র: স্থায়ী কলার কোষগুলোর মধ্যে মাঝে মাঝে ফাঁকা জায়গা বা কোষান্তর রন্ধ্র দেখা যায়।


​◼ স্থায়ী কলার প্রকারভেদ

​স্থায়ী কলাকে মূলত তিনটি ভাগে ভাগ করা যায়, যথা- সরল স্থায়ী কলা, জটিল স্থায়ী কলা এবং বিশেষ বা ক্ষরণকারী কলা। 


​i) সরল স্থায়ী কলা

​যে স্থায়ী কলার সমস্ত কোষগুলি আকার ও গঠনগত দিক থেকে একই রকমের হয়, তাদের সরল স্থায়ী কলা বলে। এটি তিন প্রকার:


​● প্যারেনকাইমা:

​এটি উদ্ভিদের সর্বাপেক্ষা সাধারণ কলা। এই প্রকার কলার কোষগুলো সজীব এবং পাতলা প্রাচীরযুক্ত হয়।

parenchyma-tissue

  • কাজ: এই কলার প্রধান কাজ হল খাদ্য প্রস্তুত করা, খাদ্য সঞ্চয় করা এবং জল পরিবহণ করা। এছাড়াও এর অন্তর্গত অ্যারেনকাইমা নামক কলা জলজ উদ্ভিদদের ভাসতে সাহায্য করে।

​● কোলেনকাইমা:

​এই কোষগুলো সজীব কিন্তু এদের কোণগুলো সেলুলোজ ও পেকটিন জমা হয়ে পুরু হয়।

collenchyma-tissue

  • কাজ: এটি উদ্ভিদকে যান্ত্রিক দৃঢ়তা প্রদান করে এবং অঙ্গের নমনীয়তা বজায় রাখে (যেমন- পত্রের বোঁটা)।


​● স্ক্লেরেনকাইমা:

​এই কোষগুলো মৃত এবং লিগনিন যুক্ত হওয়ার ফলে অত্যন্ত শক্ত ও পুরু হয়।

sclerenchyma

  • কাজ: উদ্ভিদকে যান্ত্রিক শক্তি ও কাঠামোগত দৃঢ়তা প্রদান করা হল এর প্রধান কাজ। যেমন, পাটের আঁশ বা নারকেলের ছোবড়া।


ii) জটিল স্থায়ী কলা

​একাধিক প্রকারের কোষ মিলে যখন একটি নির্দিষ্ট কাজ সম্পন্ন করে, তখন তাকে জটিল স্থায়ী কলা বলে। এটিকে সংবহন কলাও বলা হয়। এটি দুই প্রকার:


● ​জাইলেম:

এটি ​প্রধানত মৃত কোষ দিয়ে গঠিত। এর উপাদানগুলি হলো: ট্রাকিড, ট্রাকিয়া, জাইলেম তন্তু এবং সজীব জাইলেম প্যারেনকাইমা।

  • কাজ: মূল থেকে জল ও খনিজ লবণ পাতায় পৌঁছানো, অর্থাৎ ঊর্ধ্বমুখী পরিবহণ হল এর প্রধান কাজ।

ফ্লোয়েম:

এটি ​প্রধানত সজীব কোষ দিয়ে গঠিত। এর উপাদানগুলি হলো: চালনি নল, সঙ্গী কোষ, ফ্লোয়েম প্যারেনকাইমা এবং মৃত ফ্লোয়েম তন্তু।

  • কাজ: পাতায় তৈরি খাদ্য সারা উদ্ভিদের শরীরে ছড়িয়ে দেওয়া অর্থাৎ উভয়মুখী পরিবহণ হল এর প্রধান কাজ।


​iii) বিশেষ বা ক্ষরণকারী কলা

​সরল ও জটিল স্থায়ী কলা বাদে কিছু উদ্ভিদের দেহে আরও একপ্রকার কলা থাকে, যা বিশেষ কিছু রাসায়নিক পদার্থ নিঃসরণ করে। এটি হলো বিশেষ বা ক্ষরণকারী কলা। এটি দুই প্রকার:

ক্ষরণকারী গ্রন্থি: যেমন- লেবুর তেলের গ্রন্থি বা মধু গ্রন্থি।

● তরুক্ষীর কলা: যেমন- বট বা রবার গাছের সাদা আঠালো কষ।


​◼ স্থায়ী কলার কাজ

  • সুরক্ষা: স্থায়ী কলা উদ্ভিদের বাইরের স্তর অর্থাৎ এপিডার্মিস তৈরি করে ভেতরের অংশকে রক্ষা করে।
  • খাদ্য উৎপাদন ও সঞ্চয়: ক্লোরোফিলযুক্ত প্যারেনকাইমা কলা খাদ্য তৈরি করে এবং বাকি কোষ খাদ্য জমা রাখে।
  • পরিবহণ: জটিল স্থায়ী কলা জাইলেম ও ফ্লোয়েম উদ্ভিদের দেহে জল ও খাদ্যের সংবহন ঘটায়।
  • দৃঢ়তা প্রদান: স্ক্লেরেনকাইমা ও কোলেনকাইমা উদ্ভিদকে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে সাহায্য করে।


প্রাণী কলা 


প্রাণীদের জটিল শারীরিক গঠন ও জীবনধারণের নানাবিধ প্রক্রিয়ার জন্য বিভিন্ন ধরনের কলা একত্রে কাজ করে।

​গঠন এবং কাজের ভিত্তিতে প্রাণী কলাকে প্রধানত চারটি ভাগে ভাগ করা যায়, যথা: 1) ​আবরণী কলা, 2) যোগ কলা, 3) পেশি কলা এবং 4) স্নায়ু কলা


​1) আবরণী কলা

প্রাণীদেহে যে কলা কোনো অঙ্গের উন্মুক্ত তলে বা ভেতরের গহ্বরের আবরণে অবস্থান করে এবং একটি বিশেষ ভিত্তি পর্দার  ওপর সাজানো থাকে, তাকে আবরণী কলা বলে। এটি মূলত দেহের বর্ম বা প্রোটেক্টিভ লেয়ার হিসেবে কাজ করে।

aboronai-kola

​◼ আবরণী কলার বৈশিষ্ট্য

আবরণী কলার বৈশিষ্ট্য গুলি হল:

  • কোষের বিন্যাস: এই কলার কোষগুলো একটির গায়ে অন্যটি খুব ঘনভাবে লেগে থাকে, ফলে এদের মধ্যে আন্তঃকোষীয় স্থান বা ধাত্র খুব কম থাকে।
  • ভিত্তি পর্দা: এই কলার কোষগুলো সবসময় একটি পাতলা ও স্থিতিস্থাপক ভিত্তি পর্দার ওপর সাজানো থাকে।
  • রক্তনালীর অনুপস্থিতি: এই কলায় সাধারণত সরাসরি কোনো রক্তনালী থাকে না। এক্ষেত্রে কোষগুলো ভিত্তি পর্দার নিচে থাকা যোগ কলা থেকে পুষ্টি সংগ্রহ করে।


​◼ আবরণী কলার কাজ

আবরণী কলার কাজগুলি হলো:

  • সুরক্ষা প্রদান: আবরণী কলা দেহাভ্যন্তরের কোমল অঙ্গগুলোকে বাইরের আঘাত, ঘর্ষণ এবং রোগজীবাণু থেকে রক্ষা করে।
  • শোষণ: অন্ত্রের আবরণী কলা খাদ্যসার শোষণ করতে সাহায্য করে।
  • নিঃরণ বা ক্ষরণ: আবরণী কলা বিভিন্ন গ্রন্থি (যেমন: ঘাম গ্রন্থি, লালা গ্রন্থি) থেকে প্রয়োজনীয় রস নিঃসরণ করে।
  • সংবেদন গ্রহণ: বিশেষ প্রকারের কিছু আবরণী কোষ স্বাদ, গন্ধ বা স্পর্শের অনুভূতি গ্রহণে সাহায্য করে।

2) যোগ কলা 


যোগ কলা হলো প্রাণীদেহের এমন এক বিশেষ ধরনের কলা, যা দেহের বিভিন্ন অঙ্গ ও অন্যান্য কলার মধ্যে সংযোগ স্থাপন করে এবং দেহকে একটি নির্দিষ্ট কাঠামো প্রদান করে। ভ্রূণীয় মেসোডার্ম থেকে এই কলার উৎপত্তি হয়।


jog-kola-ba-jojok-kola


​◼ যোগ কলার বৈশিষ্ট্য

যোগ কলার বৈশিষ্ট্য গুলি হল:

  • ভ্রূণীয় উৎপত্তি: এই কলা ভ্রূণের মেসোডার্ম স্তর থেকে উৎপন্ন হয়।
  • অধিক ধাত্র: যোগ কলায় কোষের সংখ্যার তুলনায় আন্তঃকোষীয় ধাত্র বা ম্যাট্রিক্সের পরিমাণ অনেক বেশি থাকে।
  • ভিত্তিপর্দা অনুপস্থিত: যোগ কলায় আবরণী কলার মতো কোনো ভিত্তি পর্দা থাকে না।
  • কোষের বিন্যাস: কোষগুলো একে অপরের থেকে দূরে দূরে ছড়ানো থাকে।
  • তন্তুর উপস্থিতি: ধাত্রের মধ্যে বিভিন্ন ধরনের তন্তু (যেমন: কোলাজেন বা ইলাস্টিন) থাকতে পারে, যা কলাকে দৃঢ়তা বা স্থিতিস্থাপকতা প্রদান করে।
  • রক্ত সরবরাহ: অধিকাংশ যোগ কলায় প্রচুর পরিমাণে রক্তনালী থাকে।

​◼ যোগ কলার প্রকারভেদ

​গঠন এবং ধাত্রের প্রকৃতির ওপর ভিত্তি করে যোগ কলাকে প্রধানত তিনটি ভাগে ভাগ করা যায়:


​i) কঠিন যোগকলা

​এটি দেহের অভ্যন্তরীণ কাঠামো তৈরি করে এবং ভার বহন করে। যেমন:

  • অস্থি: এটি হল ক্যালসিয়াম ও ফসফরাস সমৃদ্ধ এবং অত্যন্ত শক্ত ও দৃঢ় প্রকৃতির। এর কোষগুলোকে অস্টিওব্লাস্ট বলে। এই প্রকার কলা দ্বারা বহুকোষী প্রাণীদের দেহের প্রধান অভ্যন্তরীণ কাঠামো তৈরি হয়।
  • তরুণাস্থি: এটি অস্থির তুলনায় অপেক্ষাকৃত নরম ও স্থিতিস্থাপক। এটি প্রধানত ঘর্ষণ রোধে সাহায্য করে। কানের লতি, নাকের ডগা, এবং শ্বাসনালীতে এই প্রকারের কলা থাকে।


​ii) তরল যোগ কলা

​এটি প্রাণীদের সারাদেহে বিভিন্ন উপাদান পরিবহনে সহায়তা করে। যেমন:

  • রক্ত: আমাদের দেহের রক্ত হল এক প্রকারের তরল যোগ কলা। রক্ত লোহিত রক্তকণিকা, শ্বেত রক্তকণিকা ও অণুচক্রিকা নিয়ে গঠিত। এর ধাত্রকে প্লাজমা বা রক্তরস বলে।
  • লসিকা: এটি হলো রক্তের কৈশিক নালি থেকে বের হওয়া একটি  পরিশ্রুত ও স্বচ্ছ তরল, যা কোষে পুষ্টি পৌঁছাতে এবং বর্জ্য পদার্থ গুলি সরাতে সাহায্য করে।


iii) তন্তুযুক্ত যোগ কলা

  • টেনডন: এটি হলো অত্যন্ত শক্ত ও তন্তুময় যোগ কলা। এগুলি পেশিকে অস্থি বা হাড়ের সাথে যুক্ত রাখে। এগুলি সাধারণত কোলাজেন ফাইবার দ্বারা গঠিত এবং দেখতে অনেকটা দড়ির মত।
  • লিগামেন্ট: একটি অস্থির সাথে অন্য অস্থিকে সংযোগকারী অত্যন্ত শক্ত ও স্থিতিস্থাপক তন্তুযুক্ত যোগ কলাকে লিগামেন্ট বলে। এগুলির মাধ্যমেই প্রাণীদেহে একটি হার অন্য হাড়ের সাথে যুক্ত থাকে। লিগামেন্ট গুলি দেহের জয়েন্ট বা অস্থিসন্ধিগুলিতে হাড়ের স্থানচুতি রোধ করে সেগুলিকে একটি নির্দিষ্ট জায়গার মধ্যে নড়াচড়া করতে সাহায্য করে।


​◼ যোগ কলার কাজ

  • সংযোগ রক্ষা: প্রাণীদেহে যোগ কলা পেশির সাথে অস্থির বা অস্থির সাথে অস্থির সংযোগ ঘটায়।
  • কাঠামো প্রদান: কঠিন যোগ কলা কঙ্কালতন্ত্রের মাধ্যমে দেহকে একটি সুনির্দিষ্ট আকার প্রদান করে।
  • পরিবহন: তরল যোগ কলা অর্থাৎ রক্ত ও লসিকা প্রাণীদেহে অক্সিজেন, পুষ্টি এবং বর্জ্য পদার্থ পরিবহন করে।
  • প্রতিরক্ষা: যোগ কলা শ্বেত রক্তকণিকার মাধ্যমে বিভিন্ন রোগজীবাণু ধ্বংস করে দেহকে রক্ষা করে।
  • সঞ্চয়: মেদকলা বা অ্যাডিপোজ যোগ কলা দেহে চর্বি বা শক্তি সঞ্চয় করে রাখে।


3) পেশী কলা 


প্রাণীদেহের যে কলা ভ্রূণীয় মেসোডার্ম থেকে উৎপন্ন হয় এবং সংকোচন-প্রসারণের মাধ্যমে দেহের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ সঞ্চালন ও চলনে সাহায্য করে, তাকে পেশি কলা বলে।

​পেশি কলার কোষগুলো সাধারণত লম্বাটে ধরনের হয়, তাই এদের পেশিতন্তুও বলা হয়। এই তন্তুর ভেতরে এক ধরনের সংকোচনশীল প্রোটিন থাকে, যা পেশিকে ছোট বা বড় হতে সাহায্য করে।

peshi-kola


​◼ পেশি কলার বৈশিষ্ট্য

  • সংকোচনশীলতা: উদ্দীপনার ফলে পেশি কলাগুলি সংকুচিত ও প্রসারিত হতে পারে।
  • সার্কোলেমা: পেশি কলার কোষে একপ্রকার আবরণী থাকে, যাকে বলা হয় সার্কোলেমা
  • সার্কোপ্লাজম: পেশি কোষের সাইটোপ্লাজমকে বলা হয় সার্কোপ্লাজম
  • মায়োফাইব্রিল: পেশি তন্তুর ভেতরে সমান্তরালভাবে থাকা সূক্ষ্ম তন্তুগুলোকে মায়োফাইব্রিল বলে, যা প্রধানত অ্যাকটিন ও মায়োসিন প্রোটিন দিয়ে তৈরি।

​◼ পেশি কলার প্রকারভেদ

​গঠন ও কাজের ওপর ভিত্তি করে পেশি কলাকে প্রধানত তিনটি ভাগে ভাগ করা যায়:


ঐচ্ছিক পেশি

​এই পেশিগুলো হাড় বা অস্থির সাথে লেগে থাকে এবং আমরা আমাদের ইচ্ছামতো এগুলো নাড়াচাড়া করতে পারি।

  • গঠন: ঐচ্ছিক পেশীর তন্তুগুলো লম্বা, নলাকার এবং বহু নিউক্লিয়াসযুক্ত হয়। এদের গায়ে আড়াআড়ি রেখা বা দাগ থাকে তাই, এগুলিকে সরেখ পেশিও বলে।
  • কাজ: এই পেশি গুলি হাত-পা নাড়াতে, হাঁটাচলা করতে এবং দৌড়াতে সাহায্য করা।
  • অবস্থান: হাত, পা, ঘাড় ও চোয়ালে ঐচ্ছিক বেশি অবস্থান করে।


অনৈচ্ছিক পেশি

​এই পেশিগুলো আমাদের ইচ্ছাধীন নয়, অর্থাৎ এদের সংকোচন-প্রসারণ স্বয়ংক্রিয়ভাবে ঘটে।

  • গঠন: অনৈচ্ছিক পেশির কোষগুলোর দুই প্রান্ত সরু এবং মাঝখানটা মোটা হয়। এদের গায়ে কোনো আড়াআড়ি রেখা থাকে না, তাই এগুলিকে অরেখ পেশিও বলে। এদের একটি মাত্র নিউক্লিয়াস থাকে।
  • কাজ: অনৈতিক পেশির প্রধান কাজ হল অভ্যন্তরীণ অঙ্গের কার্য পরিচালনা করা। যেমন: খাদ্যনালীতে খাদ্যের চলন।
  • অবস্থান: পাকস্থলী, অন্ত্র, রক্তনালী এবং মূত্রথলির প্রাচীরে এই প্রকারের বেশি অবস্থান করে।


হৃদপেশি

​এটি একটি বিশেষ ধরনের অনৈচ্ছিক পেশি যা কেবল হৃদপিণ্ডে অবস্থান করে। এটি প্রাণীদেহে সারাজীবন অবিরাম ছন্দময়ভাবে কাজ করে চলে।

  • গঠন: এই পেশির কোষগুলো নলাকার এবং শাখাযুক্ত হয়। এদের মধ্যে বিশেষ এক ধরনের সংযোগস্থল থাকে যাকে ইন্টারক্যালেটেড ডিস্ক বলে।
  • কাজ: হৃদপেশির প্রধান কাজ হল হৃদপিণ্ডের সংকোচন ও প্রসারণের মাধ্যমে সারাদেহে রক্ত পাম্প করা।
  • অবস্থান: এটি শুধুমাত্র হৃদপিণ্ডের প্রাচীরে অবস্থান করে।


4) স্নায়ু কলা 


প্রাণীদেহের যে বিশেষ কলা উদ্দীপনা গ্রহণ করে এবং সেই উদ্দীপনাকে তড়িৎ-রাসায়নিক সংকেতের মাধ্যমে দেহের এক স্থান থেকে খুব দ্রুত অন্য স্থানে পরিবাহিত করে সঠিক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে, তাকে স্নায়ু কলা বলা হয়।

​আমাদের শরীরের সমস্ত কাজের মধ্যে সমন্বয় রক্ষা করা এবং বাইরের জগতের সাথে যোগাযোগ স্থাপন করাই স্নায়ু কলার প্রধান কাজ।

snayu-kola-neuron


​◼ স্নায়ু কলার গঠন

​স্নায়ু কলা প্রধানত দুটি উপাদান নিয়ে গঠিত:

  • নিউরন: এটি স্নায়ুতন্ত্রের গঠনগত ও কার্যগত একক। এটিই মূলত সংকেত বহন করে।
  • নিউরোগ্লিয়া: এগুলো হল স্নায়ু কলার ধারক কোষ। এরা নিউরনকে পুষ্টি ও সুরক্ষা দেয় এবং মেরামত করতে সাহায্য করে। এরা কোনো সংকেত বহন করে না।


​◼ নিউরনের প্রধান অংশসমূহ

​একটি আদর্শ নিউরন বা স্নায়ুকোষের তিনটি প্রধান অংশ থাকে:

  • কোষদেহ: এটি নিউরনের প্রধান অংশ, যার ভেতরে নিউক্লিয়াস এবং সাইটোপ্লাজম থাকে। এটিতে 'নিসল দানা' থাকে যা প্রোটিন সংশ্লেষ করে।
  • ডেনড্রন: এগুলি হলো কোষদেহ থেকে নির্গত ছোট ছোট শাখা। এদের কাজ হলো অন্য নিউরন থেকে উদ্দীপনা গ্রহণ করা।
  • অ্যাক্সন: এটি হলো কোষদেহ থেকে নির্গত দীর্ঘতম তন্তু। এটি উদ্দীপনাকে কোষদেহ থেকে পরবর্তী নিউরন বা পেশিতে নিয়ে যায়। অ্যাক্সনের ওপর অনেক সময় মায়েলিন সিথ নামক একটি চর্বির আবরণ থাকে যা দ্রুত সংকেত পাঠাতে সাহায্য করে।


​◼ স্নায়ু কলার কিছু বিশেষ বৈশিষ্ট্য

  • বিভাজন ক্ষমতা: প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের স্নায়ুকোষ বা নিউরন সাধারণত বিভাজিত হতে পারে না। কারণ, এদের সেন্ট্রোজোম নিষ্ক্রিয় থাকে। তাই স্নায়ু একবার মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হলে তা আর ঠিক হয় না।
  • দ্রুততা: একটি স্নায়ুর মধ্যে সংকেত ঘণ্টায় প্রায় 250 মাইল বেগে ভ্রমণ করতে পারে!


​◼ স্নায়ু কলার কাজ

​স্নায়ু কলার কাজ গুলি হল: 

  • উদ্দীপনা গ্রহণ: পরিবেশের বিভিন্ন পরিবর্তন যেমন, তাপ, শব্দ, আলো ইত্যাদি স্নায়ু কলার মাধ্যমে গৃহীত হয়।
  • পরিবহন: স্নায়ু কলা উদ্দীপনাকে অত্যন্ত দ্রুত গতিতে মস্তিষ্কে বা সুষুম্নাকাণ্ডে পৌঁছে দেয়।
  • প্রতিক্রিয়া: স্নায়ু কলা মস্তিষ্ক থেকে আসা নির্দেশ পেশি বা গ্রন্থিতে পৌঁছে দেয়, যার ফলে আমরা অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ সঞ্চালন, হাঁটাচলা ও কথা বলার মতো কাজগুলি করতে পারি।
  • সমন্বয়: শরীরের বিভিন্ন অঙ্গের কাজের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করাও স্নায়ু কলার অন্যতম প্রধান কাজ।

প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্নাবলী (FAQ)


1. ভাজক কলা ও স্থায়ী কলার প্রধান পার্থক্য কী?

উত্তর: ভাজক কলার কোষগুলো বিভাজনে সক্ষম এবং উদ্ভিদদেহে নতুন অঙ্গ সৃষ্টিতে বিশেষ ভূমিকা রাখে।

​আর, স্থায়ী কলার কোষগুলো বিভাজনে অক্ষম এবং এগুলি উদ্ভিদদেহে নির্দিষ্ট শরীরবৃত্তীয় কাজ সম্পন্ন করে।


2. জাইলেম ও ফ্লোয়েমের মধ্যে প্রধান পার্থক্য কী?

উত্তর: জাইলেম মূল থেকে জল ও খনিজ লবণ পাতায় পরিবহন করে।

আর, ফ্লোয়েম পাতায় তৈরি খাদ্য উদ্ভিদের বিভিন্ন অংশে পৌঁছে দেয়।


3. লিগামেন্ট ও টেনডন-এর মধ্যে পার্থক্য কী?

উত্তর: লিগামেন্ট একটি অস্থির সাথে অন্য একটি অস্থিকে যুক্ত করে।

আর, টেনডন পেশির সাথে অস্থিকে যুক্ত করে।


3. রক্তকে কেন 'তরল যোগ কলা' বলা হয়?

উত্তর: রক্তের ধাত্র বা ম্যাট্রিক্স তরল এবং এটি ভ্রূণীয় মেসোডার্ম থেকে উৎপন্ন হয়ে শরীরের বিভিন্ন অঙ্গের মধ্যে সংযোগ রক্ষা করে ও পুষ্টি পরিবহন করে, তাই একে তরল যোগ কলা বলে।


​5. হৃদপেশি কেন বিশেষ ধরনের অনৈচ্ছিক পেশি?

উত্তর: হৃদপেশি দেখতে অনেকটা সরেখ বা ঐচ্ছিক পেশির মতো হলেও এটি আমাদের ইচ্ছাধীন নয়। এটি ক্লান্ত না হয়ে সারাজীবন ছন্দময়ভাবে সংকুচিত ও প্রসারিত হয়, যা অন্য কোনো পেশি পারে না। তাই হৃদপেশি হল এক প্রকার বিশেষ ধরনের অনৈচ্ছিক পেশি।


6. নিউরনের কোন অংশ উদ্দীপনা গ্রহণ করে এবং কোনটি পরিবহন করে?

উত্তর: নিউরনের ডেনড্রন উদ্দীপনা গ্রহণ করে এবং অ্যাক্সন সেই উদ্দীপনা পরবর্তী নিউরন বা পেশিতে পরিবহন করে।


7. আমাদের শরীরে ফ্যাট বা চর্বি কোন কলায় সঞ্চিত থাকে?

উত্তর: অ্যাডিপোজ কলা নামক এক ধরণের যোগ কলায় ফ্যাট সঞ্চিত থাকে। এটি শরীরকে উষ্ণ রাখতেও সাহায্য করে।

*

Post a Comment (0)
Previous Post Next Post