ভারতের জলবায়ু হল মূলত ক্রান্তীয় মৌসুমী প্রকৃতির। তবে বিশাল ভৌগোলিক আয়তন, বৈচিত্র্যময় ভূ-প্রকৃতি এবং সমুদ্রের নৈকট্যের কারণে স্থানভেদে এবং ঋতুভেদে ভারতের জলবায়ুর চরিত্রে চরম বৈচিত্র্য লক্ষ্য করা যায়। এই বৈচিত্র্যই ভারতকে বিশ্বের অন্যতম আকর্ষণীয় জলবায়ু অঞ্চল হিসাবে প্রতিষ্ঠা করেছে। নিচে ভারতের জলবায়ু সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:
আবহাওয়া ও জলবায়ুর প্রাথমিক ধারণা
ভারতের জলবায়ুর আলোচনায় যাওয়ার আগে আমাদের অবশ্যই আবহাওয়া ও জলবায়ু সম্পর্কে প্রাথমিক ধারণা থাকা প্রয়োজন।
● আবহাওয়া:
কোনো নির্দিষ্ট স্থানের বায়ুমণ্ডলের বিভিন্ন উপাদানের স্বল্প সময়ের বা দৈনন্দিন অবস্থা অর্থাৎ, তাপমাত্রা, বায়ুরচাপ, আর্দ্রতা, বৃষ্টিপাত ও বায়ুপ্রবাহের সমষ্টিকে আবহাওয়া বলে। আবহাওয়া খুব দ্রুত পরিবর্তিত হতে পারে। যেমন, কোনো স্থানে সকালে রোদ ঝলমলে আবহাওয়া থাকলেও বিকেলে হঠাৎ ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি নামতে পারে।
● জলবায়ু:
কোনো একটি বিশাল অঞ্চলের কমপক্ষে 30 থেকে 35 বছরের আবহাওয়ার গড় অবস্থাকে জলবায়ু বলে। এটি আবহাওয়ার মত দ্রুত পরিবর্তিত হয় না। যেমন, আমরা বলি ভারতের জলবায়ু ক্রান্তীয় মৌসুমি প্রকৃতির। এক্ষেত্রে কিন্তু একদিনের বৃষ্টি বা বায়ুপ্রবাহের ওপর ভিত্তি করে জলবায়ু প্রকৃতি নির্ধারণ করা হয় না।
ভারতের জলবায়ুর নিয়ন্ত্রকসমূহ
ভারতের জলবায়ু মূলত ক্রান্তীয় মৌসুমী প্রকৃতির হলেও এর বিশাল ভৌগোলিক বৈচিত্র্য এবং অবস্থানগত কারণে একাধিক উপাদান এই জলবায়ুকে বিশেষভাবে নিয়ন্ত্রণ করে। এদের মধ্যে প্রধান নিয়ন্ত্রকগুলি নিম্নরূপ:
1. অক্ষাংশগত অবস্থান:
ভারত 8°4'N থেকে 37°6'N অক্ষাংশের মধ্যে অবস্থিত। 23.5°N অক্ষাংশে অবস্থিত কর্কটক্রান্তি রেখাটি দেশের প্রায় মাঝখান দিয়ে গিয়েছে। এর ফলে ভারতের দক্ষিণাংশ ক্রান্তীয় মণ্ডলের অন্তর্ভুক্ত হওয়ায় সারা বছর উষ্ণ তাপমাত্রা থাকে। অন্যদিকে, উত্তরাংশ উপ-ক্রান্তীয় মণ্ডলের অন্তর্ভুক্ত হওয়ায় সেখানে তীব্র গ্রীষ্ম ও শীত অনুভূত হয়। এই কারণে ভারতের জলবায়ুর প্রকৃতি মূলত ক্রান্তীয় ও উপ-ক্রান্তীয় জলবায়ুর সংমিশ্রণ।
2. হিমালয় পর্বতমালা:
হিমালয় পর্বতমালাকে ভারতের জলবায়ুর সর্বশ্রেষ্ঠ নিয়ন্ত্রক বলা হয়। এর প্রভাব ভারতের জলবায়ুতে মূলত দু'ভাবে পরিলক্ষিত হয়। প্রথমত, হিমালয়ের কারণে শীতকালে উত্তর দিক থেকে আসা সাইবেরিয়ার তীব্র শীতল বায়ু ভারতে প্রবেশ করতে পারে না। এর ফলে উত্তর ভারত ইউরোপের মতো তীব্র শৈত্যপ্রবাহ থেকে রক্ষা পায় এবং জলবায়ু অপেক্ষাকৃত উষ্ণ থাকে। দ্বিতীয়ত, হিমালয় পর্বতমালা গ্রীষ্মকালে দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমী বায়ুকে বাধা দেওয়ায় তা সারা ভারতে বৃষ্টিপাত ঘটায়। যদি হিমালয় না থাকত, তবে এই বায়ু ভারতে বৃষ্টিপাত না ঘটিয়ে উত্তর দিকে চলে যেত এবং ভারত শুষ্ক মরুভূমিতে পরিণত হতো।
3. সমুদ্র থেকে দূরত্ব:
সমুদ্রের কাছাকাছি অঞ্চলগুলিতে জলবায়ু সমভাবাপন্ন বা মৃদু প্রকৃতির হয় (যেমন: মুম্বাই, চেন্নাই)। এখানে গ্রীষ্মে অত্যধিক গরম বা শীতে অত্যধিক ঠান্ডা অনুভূত হয় না। কারণ জলভাগের তাপ গ্রহণ ও বর্জন করার বিশেষ ক্ষমতা রয়েছে। সমুদ্র থেকে দূরত্ব বাড়ার সাথে সাথে জলবায়ু চরমভাবাপন্ন হয় (যেমন: দিল্লি, কানপুর)। এই অঞ্চলগুলিতে গ্রীষ্মকালে তাপমাত্রা খুব বেশি হয় এবং শীতকালে তাপমাত্রা খুব কমে যায়। একে মহাদেশীয় জলবায়ুর প্রভাব বলা হয়।
4. সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে উচ্চতা:
সাধারণভাবে, সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে উচ্চতা বৃদ্ধির সাথে সাথে প্রতি 1000 মিটার উচ্চতায় তাপমাত্রা প্রায় 6.4°C হারে কমতে থাকে। এই কারণে সমভূমি অঞ্চলের তুলনায় পাহাড়ি অঞ্চল বা উচ্চভূমিতে জলবায়ু অধিক শীতল হয়। উদাহরণস্বরূপ, গ্রীষ্মকালে সমতলে যখন তীব্র গরম, তখন দার্জিলিং বা সিমলার তাপমাত্রা মনোরম থাকে।
5. ভূ-প্রকৃতি:
বিভিন্ন পাহাড়, পর্বত, মালভূমি এবং সমভূমির অবস্থান জলবায়ুকে স্থানীয়ভাবে প্রভাবিত করে। পশ্চিমঘাট পর্বতমালা হলো এর অন্যতম প্রধান উদাহরণ। দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমী বায়ু যখন পশ্চিমঘাট পর্বতের পশ্চিম ঢালে বাধা পেয়ে প্রচুর বৃষ্টিপাত ঘটায়, তখন পর্বতের পূর্ব ঢাল বৃষ্টিপাতের অভাবে বৃষ্টিচ্ছায় অঞ্চলে পরিণত হয় (যেমন: মহারাষ্ট্রের কিছু অংশ ও কর্ণাটকের কিছু অংশ)। এছাড়া, ভূ-প্রকৃতি বায়ুপ্রবাহের গতিপথ ও আর্দ্রতাকে প্রভাবিত করে স্থানীয় বৃষ্টিপাত ও তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করে।
6. মৌসুমী বায়ুচক্র:
ভারতের জলবায়ুর অন্যতম প্রধান নিয়ন্ত্রক হলো মৌসুমী বায়ু। গ্রীষ্মকালে স্থলভাগে নিম্নচাপ সৃষ্টি হওয়ায় সমুদ্র থেকে আর্দ্র বায়ু (দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমী বায়ু) স্থলভাগে প্রবেশ করে এবং বৃষ্টিপাত ঘটায়। এই বৃষ্টিপাতের ফলে স্থানীয় তাপমাত্রা গড়ে প্রায় 8°-10°C কমে যায়। শীতকালে আবার স্থলভাগে উচ্চচাপ থাকায় বায়ু স্থলভাগ থেকে সমুদ্রের দিকে প্রবাহিত হয়। তাই ভারতে শীতকাল শুষ্ক প্রকৃতির হয়।
7. জেট স্ট্রিম:
পশ্চিম দিক থেকে আসা দ্রুতগামী উচ্চাকাশের বায়ুপ্রবাহ উত্তর ভারতে শীতকালীন আবহাওয়াকে নিয়ন্ত্রণ করে এবং পশ্চিমা ঝঞ্ঝাগুলিকে ভারতে নিয়ে আসতে সাহায্য করে। এই বায়ু প্রবাহ 'সাবট্রপিক্যাল ওয়েস্টার্লি জেট স্ট্রিম' নামে পরিচিত।
ভারতীয় মৌসুমী বায়ু
ভারতের জলবায়ু সম্পূর্ণরূপে মৌসুমী বায়ু দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। তাই ভারতীয় জলবায়ুকে প্রায়শই ক্রান্তীয় মৌসুমী জলবায়ু বলা হয়। মৌসুমী কথাটি আরবি শব্দ 'মৌসুম' থেকে এসেছে, যার অর্থ হলো ঋতু। এই বায়ুপ্রবাহ নির্দিষ্ট ঋতুতে তার দিক পরিবর্তন করে বলে একে মৌসুমী বায়ু বলা হয়। ভারতের মৌসুমী বায়ু প্রবাহকে সাধারণত দুটি ভাগে ভাগ করা যায়। যথা:
1. দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমী বায়ু (গ্রীষ্মকালীন):
মৌসুমী বায়ুর এই শাখাটি হলো ভারতের প্রধান বৃষ্টিপাত সৃষ্টিকারী বায়ু। এটি জুন থেকে সেপ্টেম্বর মাস পর্যন্ত সক্রিয় থাকে। স্থলভাগের নিম্নচাপের টানে সমুদ্র থেকে আর্দ্র বায়ু স্থলভাগে প্রবেশ করে এবং এই সময়ে ভারতের প্রায় 80%-এরও বেশি বৃষ্টিপাত হয়।
2. উত্তর-পূর্ব মৌসুমী বায়ু (শীতকালীন):
উত্তর-পূর্ব মৌসুমী বায়ুর শাখাটি মূলত স্থলভাগ থেকে সমুদ্রের দিকে প্রবাহিত হয়। এটি শুষ্ক হলেও বঙ্গোপসাগরের উপর দিয়ে যাওয়ার সময় আর্দ্রতা সংগ্রহ করে তামিলনাড়ুর উপকূলে শীতকালে বৃষ্টিপাত ঘটায়।
ভারতের জলবায়ুতে মৌসুমী বায়ুর প্রভাব
● ঋতু পরিবর্তন ও ঋতুচক্র নিয়ন্ত্রণ:
মৌসুমি বায়ুর আগমনের ওপর ভিত্তি করেই ভারতে প্রধান ঋতুগুলো আবর্তিত হয়। জুন মাসে দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমি বায়ুর আগমনে ভারতে বর্ষাকাল শুরু হয় এবং অক্টোবর মাসে এই বায়ুর প্রত্যাবর্তনের ফলে শরৎ ও শীতের আমেজ শুরু হয়। অর্থাৎ, ভারতের ঋতুচক্র মূলত মৌসুমি বায়ুর গতিবিধির ওপর অনেকাংশেই নির্ভরশীল।
● বৃষ্টিপাতের অসম বণ্টন:
ভারতের বার্ষিক বৃষ্টিপাতের প্রায় 75% থেকে 90% ঘটে মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে। তবে এই বৃষ্টিপাতের পরিমাণ সব জায়গায় সমান হয় না।
- শৈলোৎক্ষেপ বৃষ্টিপাত: দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমি বায়ু হিমালয় এবং পশ্চিমঘাট পর্বতে বাধা পেয়ে ওই অঞ্চলে প্রচুর বৃষ্টি ঘটায়। যেমন- মেঘালয়ের মৌসিনরাম বিশ্বের সর্বাধিক বৃষ্টিপাতযুক্ত অঞ্চল।
- বৃষ্টিচ্ছায় অঞ্চল: অপরদিকে পর্বতের বিপরীতে মৌসুমি বায়ু পৌঁছাতে পারে না বলে সেখানে বৃষ্টিপাতের পরিমাণ একেবারেই কম হয়। যেমন- দাক্ষিণাত্য মালভূমির কিছু অংশ।
● তাপমাত্রার হ্রাস-বৃদ্ধি:
গ্রীষ্মকালে ভারতের তাপমাত্রা যখন অত্যধিক বেড়ে যায়, তখন দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে বৃষ্টি শুরু হলে তাপমাত্রা এক ধাক্কায় অনেকটাই কমে যায়। আবার শীতকালে উত্তর-পূর্ব মৌসুমি বায়ু স্থলভাগ থেকে আসায় তা বেশ শীতল ও শুষ্ক হয়।
● কৃষিকাজের ওপর প্রভাব:
ভারত হলো একটি কৃষিপ্রধান দেশ। ভারতীয় কৃষিকে বলা হয় 'Gamble of the Monsoon' অর্থাৎ মৌসুমি বায়ুর জুয়া। ভারতে মৌসুমি বায়ু সঠিক সময়ে প্রবেশ করলে ধান, পাট, আখ ইত্যাদি ফলন ভালো হয়। আর যদি মৌসুমি বায়ু দেরিতে আসে তবে বৃষ্টিপাতের অভাবে দেশজুড়ে খরার পরিস্থিতি তৈরি হয়।
● আর্দ্র ও শুষ্ক ঋতুর পর্যায়ক্রম:
মৌসুমি বায়ুর প্রত্যাবর্তনের ফলে ভারতে সুস্পষ্ট আর্দ্র ও শুষ্ক ঋতুর সৃষ্টি হয়। গ্রীষ্মকালীন মৌসুমি বায়ু জলীয় বাষ্পপূর্ণ থাকায় বৃষ্টিপাত ঘটায়। তবে শীতকালীন উত্তর-পূর্ব মৌসুমি বায়ু শুষ্ক হওয়ায় তামিলনাড়ুর করমণ্ডল উপকূল বাদে ভারতের বাকি অংশ শুষ্ক থাকে।
ITCZ বা আন্তঃক্রান্তীয় মিলন অঞ্চল
ITCZ-এর সম্পূর্ণ কথা হলো Inter-Tropical Convergence Zone। এর বাংলা অর্থ হলো আন্তঃক্রান্তীয় মিলন অঞ্চল। উত্তর গোলার্ধের 'উত্তর-পূর্ব অয়ন বায়ু' এবং দক্ষিণ গোলার্ধের 'দক্ষিণ-পূর্ব অয়ন বায়ু' নিরক্ষরেখার কাছাকাছি যে অঞ্চলে মিলিত হয়, তাকে ITCZ বলে।
◼ ITCZ-এর বৈশিষ্ট্য
ITCZ -এর প্রধান বৈশিষ্ট্য গুলি হল:
● অবস্থান:
ITCZ সাধারণত 5° উত্তর থেকে 5° দক্ষিণ অক্ষাংশের মধ্যে অবস্থান করে। তবে স্থলভাগের প্রভাবে এটি 40° থেকে 45° পর্যন্ত সরতে পারে।
● নিম্নচাপ বলয়:
এই অঞ্চলে সূর্যের তাপ অনেক বেশি থাকার কারণে বায়ু উষ্ণ ও হালকা হয়ে ওপরের দিকে উঠে যায়। এইকারনে ভূপৃষ্ঠের সমান্তরালে বায়ুর প্রবাহ প্রায় থাকে না বললেই চলে। ফলে একটি নিম্নচাপ বলয় তৈরি হয় এবং বায়ুপ্রবাহ একেবারে না হওয়ার কারণে চারিদিকে শান্ত অবস্থা বিরাজ করে। নাবিকদের ভাষায় এটিকে ডোলড্রামস বা শান্ত বলয় বলা হয়।
● মেঘের বলয়:
ওপরের দিকে উঠে যাওয়া ওই উষ্ণ ও আর্দ্র বায়ু শীতল হয়ে ঘনীভূত হয়। এর ফলে এই অঞ্চল জুড়ে সারা বছর ঘন কিউমুলোনিম্বাস মেঘ এবং বজ্রবিদ্যুৎসহ প্রচুর বৃষ্টিপাত ঘটে।
◼ ভারতীয় জলবায়ুতে ITCZ -এর ভূমিকা
ভারতের জলবায়ুতে ITCZ -এর গুরুত্ব অপরিসীম। কারণ, এটিই হলো মৌসুমি বায়ুর মূল চালিকাশক্তি। ভারতের জলবায়ুতে এর ভূমিকা গুলি নিচে আলোচনা করা হলো:
● মৌসুমি নিম্নচাপ:
গ্রীষ্মকালে যখন ITCZ উত্তর ভারতে অবস্থান করে, তখন সেখানে এক বিশাল নিম্নচাপের সৃষ্টি হয়। এই নিম্নচাপটি এতটাই শক্তিশালী হয় যে এটি দক্ষিণ গোলার্ধের অয়ন বায়ুকে নিরক্ষরেখা পার করে ভারতের দিকে টেনে আনে। এর ফলে ওই বায়ু তখন দিক পরিবর্তন করে 'দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমি বায়ু' হিসেবে ভারতে প্রবেশ করে এবং বৃষ্টি ঘটায়।
● বৃষ্টিপাত:
ITCZ ভারতের যত উত্তর দিকে অবস্থান করবে, মৌসুমি বায়ু তত বেশি সক্রিয় থাকবে। যদি কোনো কারণে এটি তার স্বাভাবিক অবস্থান থেকে বিচ্যুত হয়, তবে ভারতে অনাবৃষ্টি বা খরা দেখা দেয়।
● বর্ষার প্রস্থান:
শরৎকালে যখন ITCZ দক্ষিণ দিকে সরতে শুরু করে, তখন ভারতের স্থলভাগ থেকে জলীয় বাষ্পহীন উত্তর-পূর্ব বায়ু প্রবাহিত হতে থাকে। একে তখন 'মৌসুমি বায়ুর প্রত্যাবর্তন' বলা হয়।
El-Nino (এল নিনো)
'এল নিনো' হল একটি স্প্যানিশ শব্দ। এর ইংরেজি অর্থ হল 'Christ Child' অর্থাৎ বাংলায় বললে 'শিশু খ্রিষ্ট'। এটি সাধারণত বড়দিনের সময় পেরু উপকূলে দেখা যায় বলে এর এরকম নামকরণ। অনেকে আবার এটিকে 'Little boy' বা 'ছোট্টো ছেলে' বলে থাকেন।
কোনো কোনো বছর ডিসেম্বর-জানুয়ারি মাস নাগাদ ক্রান্তীয় প্রশান্ত মহাসাগরের পূর্ব ও মধ্য অংশের জলরাশি স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি গরম হয়ে যায়, তখন সেই অবস্থাকে এল নিনো বলা হয়।
◼ এল নিনো সৃষ্টির প্রক্রিয়া:
স্বাভাবিক অবস্থায় প্রশান্ত মহাসাগরের উষ্ণ জলরাশি পশ্চিম দিকে অর্থাৎ ইন্দোনেশিয়ার দিকে প্রবাহিত হয়। কিন্তু এল নিনোর সময় অয়ন বায়ু দুর্বল হয়ে পড়ে। ফলে প্রশান্ত মহাসাগরের পূর্ব ও মধ্য ভাগ অর্থাৎ পেরু ও ইকুয়েডরের জলরাশি অস্বাভাবিকভাবে উষ্ণ হয়ে ওঠে।
◼ ভারতের জলবায়ুতে এল নিনোর প্রভাব
ভারতের জলবায়ু এবং বিশেষ করে মৌসুমি বায়ুর ওপর এল নিনোর প্রভাব সাধারণত ধ্বংসাত্মক হয়। এর প্রধান প্রভাবগুলো হলো:
● দুর্বল মৌসুমি বায়ু:
এল নিনোর প্রভাবে প্রশান্ত মহাসাগরের ওপর তৈরি হওয়া উচ্চচাপ ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলের নিম্নচাপ বলয়কে দুর্বল করে দেয়। এর ফলে দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমি বায়ু ভারতে প্রবেশের শক্তি হারিয়ে ফেলে।
● অনাবৃষ্টি ও খরা:
যে বছরগুলোতে এল নিনো জোড়ালো হয়েছে, সেই বছরগুলোতে ভারতে বৃষ্টিপাত স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক কম হয়েছে। এর ফলে দেশজুড়ে তীব্র খরা এবং জলের সংকট তৈরি হয়। যেমন, ২০০২, ২০০৪, ২০০৯ এবং ২০১৪ সালের খরা অনেকাংশে এল নিনোর সাথেই সম্পর্কিত ছিল।
● কৃষিকাজে বিপর্যয়:
ভারতীয় কৃষি প্রধানত বৃষ্টিপাতের ওপর নির্ভরশীল। এল নিনোর কারণে বৃষ্টি কম হলে ধান, আখ এবং পাটের মতো খরিফ ফসলের চাষ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এর ফলে খাদ্যদ্রব্যের দাম বেড়ে যায় এবং ভারতের অর্থনীতিতে এক নেতিবাচক প্রভাব পরে।
● তাপপ্রবাহ:
এল নিনোর প্রভাবে বর্ষাকালেও বৃষ্টিতে দীর্ঘ বিরতি দেখা দেয়। ফলে প্রাক-বর্ষা মরশুমে তাপপ্রবাহের মাত্রা ও সময়কাল বেড়ে যায়। এই কারণে গ্রীষ্মকালে দেশের অনেক জায়গায় তাপপ্রবাহ চলে ও অস্বস্তিকর আবহাওয়া তৈরি হয়।
La-Nina (লা নিনা)
স্প্যানিশ শব্দ 'লা নিনা' -এর অর্থ হলো 'Little girl' বা 'ছোট বালিকা'। এটি এল নিনোর ঠিক বিপরীত অবস্থা। সারা বিশ্বের আবহাওয়ায় এটিও ব্যাপক পরিবর্তন আনে।
◼ লা নিনা সৃষ্টির প্রক্রিয়া
স্বাভাবিক অবস্থায় প্রশান্ত মহাসাগরের ওপর দিয়ে অয়ন বায়ু পূর্ব থেকে পশ্চিমে প্রবাহিত হয়। তবে কোনো কোনো বছর এই বায়ুপ্রবাহ অনেক বেশি শক্তিশালী হয়ে ওঠে। শক্তিশালী অয়ন বায়ু তখন সমুদ্রের ওপরের স্তরের উষ্ণ জলকে আরও বেশি করে এশিয়ার দিকে ঠেলে দেয়। এর ফলে দক্ষিণ আমেরিকার পেরু ও ইকুয়েডর উপকূলে সমুদ্রের গভীর থেকে অতি শীতল জল ওপরে উঠে আসে। এতে মধ্য ও পূর্ব প্রশান্ত মহাসাগরের জল স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেশি ঠান্ডা হয়ে যায়।
◼ ভারতের জলবায়ুতে লা নিনার প্রভাব
ভারতের জলবায়ুতে লা নিনার প্রধান প্রভাবগুলি হলো:
● মৌসুমি বায়ুর ওপর প্রভাব:
লা নিনার প্রভাবে ভারতে মৌসুমি বায়ু অত্যন্ত সক্রিয় থাকে। এর ফলে দেশজুড়ে প্রচুর বৃষ্টিপাত হয়।
● ফসল উৎপাদন:
পর্যাপ্ত বৃষ্টিপাতের কারণে ভারতে ধান, পাট ইত্যাদি খরিফ ফসলের উৎপাদন বৃদ্ধি পায়। ফলে এটি ভারতের অর্থনীতিকে আরো মজবুত করতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলে।
● শীতের তীব্রতা:
লা নিনার প্রভাব দেখা দিলে সেই বছর ভারতে শীতকাল সাধারণত বেশি ঠান্ডা হয়। এর ফলে উত্তর ভারতে শৈত্যপ্রবাহের প্রকোপ বেড়ে যায়
● বন্যার ঝুঁকি:
লা নিনার প্রভাব অতিরিক্ত বৃষ্টি হলে মাঝে মাঝে দেশের কিছু নিচু এলাকায় বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়ে থাকে।
পশ্চিমী ঝঞ্ঝা
ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চল থেকে উৎপন্ন যে নাতিশীতোষ্ণ ঘূর্ণবাত বা নিম্নচাপ পশ্চিম দিক থেকে ভারতে প্রবেশ করে ভারতের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে শীতকালে বৃষ্টিপাত ও তুষারপাত ঘটায়, তাকে পশ্চিমী ঝঞ্ঝা বলে।
◼ পশ্চিমী ঝঞ্ঝার বৈশিষ্ট্য:
পশ্চিমী ঝঞ্ঝার প্রধান বৈশিষ্ট্য গুলি হল:
● উৎপত্তি:
আটলান্টিক মহাসাগর, ভূমধ্যসাগর এবং কাস্পিয়ান সাগর থেকে এটি উৎপত্তি লাভ করে।
● যাত্রাপথ:
ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চল থেকে উৎপত্তি লাভ করে এটি ইরাক, ইরান, আফগানিস্তান ও পাকিস্তান অতিক্রম করে ভারতের উত্তর ও উত্তর-পশ্চিম অংশে প্রবেশ করে।
● চালিকা শক্তি:
বায়ুমণ্ডলের উচ্চস্তরের বায়ুপ্রবাহ বা জেট স্ট্রিম এটিকে ভারতের দিকে বয়ে নিয়ে আসে।
● সময়কাল:
ভারতে এর প্রভাব দেখা দেয় মূলত শীতকালে অর্থাৎ, ডিসেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি মাস পর্যন্ত সময়ে।
● প্রভাবিত অঞ্চল:
পশ্চিমী ঝঞ্ঝার প্রভাব দেখা যায় প্রধানত জম্মু-কাশ্মীর, হিমাচল প্রদেশ, উত্তরাখণ্ড, পাঞ্জাব, হরিয়ানা, রাজস্থান এবং উত্তর-পশ্চিম ভারতের অন্যান্য অংশে।
◼ ভারতের জলবায়ুতে এর প্রভাব
ভারতের জলবায়ুতে পশ্চিমী ঝঞ্ঝার মূল প্রভাব গুলি হল:
● আকস্মিক বৃষ্টিপাত:
পশ্চিমী ঝঞ্ঝার প্রভাবে উত্তর ও উত্তর-পশ্চিম ভারতের সমভূমি অঞ্চলে বিশেষ করে দিল্লি ও পাঞ্জাবের বিস্তীর্ণ এলাকায় হালকা থেকে মাঝারি বৃষ্টিপাত হয়। কখনো কখনো এর প্রভাব পশ্চিমবঙ্গ পর্যন্তও পৌঁছে যায়।
● তুষারপাত:
এর প্রভাবে ভারতের হিমালয় পার্বত্য অঞ্চলে প্রচুর তুষারপাত ঘটে। এটি হিমালয়ের নদ-নদীগুলোর জলের অন্যতম প্রধান উৎস হিসেবে কাজ করে।
● তাপমাত্রার পরিবর্তন:
পশ্চিমী ঝঞ্ঝা আসার ঠিক আগে বায়ুর তাপমাত্রা কিছুটা বেড়ে যায়। তবে ঝঞ্ঝা কেটে যাওয়ার পর উত্তর দিক থেকে আসা কনকনে ঠান্ডা হাওয়ায় ভারতের সমভূমি অঞ্চলে তীব্র শৈত্যপ্রবাহ শুরু হয়।
ভারতের ঋতুচক্র
ঋতুচক্র মূলত মৌসুমী বায়ুপ্রবাহের আগমন ও প্রত্যাগমন দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়। ভারতীয় আবহাওয়া বিভাগ ভারতের ঋতুচক্রকে সাধারণত চারটি প্রধান ভাগে বিভক্ত করেছে। নিচে প্রতিটি ঋতুর বিস্তারিত ব্যাখ্যা আলোচনা করা হলো:
1. শীতকাল:
● সময়কাল:
নভেম্বর মাসের মাঝামাঝি থেকে ফেব্রুয়ারি মাস পর্যন্ত।
● বৈশিষ্ট্য:
- এই সময় ভারতে নিম্ন তাপমাত্রা বিরাজ করে, বিশেষত উত্তর ভারত এবং হিমালয় সংলগ্ন অঞ্চলে। আকাশ সাধারণত পরিষ্কার থাকে এবং বাতাসে আর্দ্রতার পরিমাণ কম থাকে।
- উত্তর-পশ্চিম দিক থেকে বায়ুপ্রবাহ হয়, যা শুষ্ক ও শীতল।
- উত্তর ভারতে শৈত্যপ্রবাহ: জানুয়ারি মাস হল উত্তর ভারতের শীতলতম মাস। এইসময় এখানকার সমভূমি অঞ্চলে তাপমাত্রা 10°C-এর নীচে নেমে যায়। হিমালয়ের উঁচু উঁচু স্থানগুলিতে আবার তুষারপাতও হয়।
- দক্ষিণ ভারতে উষ্ণতা: দক্ষিণ ভারত (উপকূলীয় অঞ্চল) সমুদ্রের নিকটবর্তী হওয়ায় সেখানকার তাপমাত্রা তুলনামূলকভাবে বেশি থাকে (20°C থেকে 25°C এর কাছাকাছি)।
- পশ্চিমা ঝঞ্ঝার প্রভাব: ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চল থেকে আসা পশ্চিমা ঝঞ্ঝা-র প্রভাবে উত্তর-পশ্চিম ভারতের পাঞ্জাব, হরিয়ানা এবং জম্মু ও কাশ্মীর অঞ্চলে হালকা বৃষ্টিপাত বা তুষারপাত হয়। যা রবি শস্য (যেমন গম) চাষের জন্য অত্যন্ত উপকারী।
2. গ্রীষ্মকাল:
● সময়কাল:
মার্চ মাস থেকে মে মাস পর্যন্ত।
● বৈশিষ্ট্য:
এই সময় সূর্য বিষুবরেখা থেকে কর্কটক্রান্তি রেখার দিকে সরতে থাকে। ফলে সারা ভারত জুড়েই তাপমাত্রা বৃদ্ধি পায় এবং বায়ুচাপ কমতে থাকে।
- উচ্চ তাপমাত্রা: এপ্রিল থেকে মে মাসে উত্তর-পশ্চিম ভারতের সমভূমি অঞ্চলে তাপমাত্রা 40°C-এরও বেশি হতে পারে। মধ্য ও দক্ষিণ ভারতের কিছু অংশেও তাপমাত্রা প্রায় 40°C-তে পৌঁছে যায়।
- লু: উত্তর-পশ্চিম ভারতের সমভূমি অঞ্চলে দুপুরের দিকে অত্যন্ত উষ্ণ, শুষ্ক এবং ধূলিপূর্ণ বায়ুপ্রবাহ লক্ষ্য করা যায়, যা স্থানীয় ভাষায় 'লু' নামে পরিচিত। এর প্রভাবে মানুষ ও অন্যান্য প্রাণীরা অসুস্থ হয়ে পরে।
- কালবৈশাখী: গ্রীষ্মকালে দুপুরের পর মাঝে মাঝে পূর্ব ভারতে (বিশেষত, পশ্চিমবঙ্গ ও অসমে) বজ্রবিদ্যুৎ সহ ঝড়, বৃষ্টি ও শিলা বৃষ্টি হয়ে থাকে। পশ্চিমবঙ্গে এটিকে স্থানীয় ভাষায় কালবৈশাখী বলে। অসমে এই ঝড় 'বরদৌছিলা' নামে পরিচিত। এটি চা ও ধান চাষের জন্য উপকারী।
- আঁধি: গ্রীষ্মকালে রাজস্থানের মরুভূমি অঞ্চলে মাঝে মাঝে জোরালো ধূলিঝড় সৃষ্টি হয়ে থাকে। একে স্থানীয় ভাষায় আঁধি বলে। এই ঝড়ের প্রভাবে প্রচণ্ড ধুলো উড়লেও বৃষ্টিপাত হয় না।
- আম্রবৃষ্টি: গ্রীষ্মকালের শেষের দিকে কর্ণাটক ও কেরলের উপকূলবর্তী অঞ্চলে যে বৃষ্টিপাত হয় তাকে আম্রবৃষ্টি বলে। এই বৃষ্টিপাত দ্রুত আম পাকতে সাহায্য করে।
- ব্লসম শাওয়ার: গ্রীষ্মকালে কেরালা ও তার পার্শ্ববর্তী উপকূল অঞ্চলে সমুদ্র থেকে আগত আদ্র বায়ুর প্রভাবে জোরালো বৃষ্টিপাত হয়ে থাকে। এই বৃষ্টিপাত কেরালায় কফি ফুল ফোটাতে সাহায্য করে।
3. বর্ষাকাল:
● সময়কাল:
জুন মাসের শুরু থেকে সেপ্টেম্বর মাস পর্যন্ত।
● বৈশিষ্ট্য:
এই ঋতুতে দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমী বায়ুর আগমনের ফলে ভারতে বিপুল পরিমাণে বৃষ্টিপাত হয়। এটিই হলো ভারতের প্রধান বৃষ্টিপাতের ঋতু।
- মৌসুমী বিস্ফোরণ: জুন মাসের প্রথম দিকে এই জলীয় বাষ্পপূর্ণ বায়ু হঠাৎ করে ভারতে প্রবেশ করলে বজ্রবিদ্যুৎ সহ প্রবল বৃষ্টি শুরু হয়, যা 'মৌসুমী বিস্ফোরণ' নামে পরিচিত।
- দুই শাখা: এই বায়ুপ্রবাহ দুটি শাখায় বিভক্ত হয়ে সারা দেশে বৃষ্টিপাত ঘটায়। এর মধ্যে একটি হলো আরব সাগরীয় শাখা এবং অপরটি বঙ্গোপসাগরীয় শাখা।
- কৃষিতে প্রভাব: ভারতের কৃষি সম্পূর্ণরূপে এই বৃষ্টিপাতের উপর নির্ভরশীল। ধান, পাট, ভুট্টা, বাজরা প্রভৃতি খরিফ শস্য এই সময় চাষ করা হয়।
- বৃষ্টির বন্টনে বৈচিত্র্য: মেঘালয়ের মৌসিনরাম (সর্বাধিক বৃষ্টিপাত) এবং রাজস্থানের থর মরুভূমি (সর্বনিম্ন বৃষ্টিপাত) এর মাধ্যমে বৃষ্টিপাতের বন্টনে চরম বৈচিত্র্য লক্ষ্য করা যায়।
4. শরৎকাল:
● সময়কাল:
অক্টোবর মাস থেকে নভেম্বরের মাঝামাঝি পর্যন্ত।
● বৈশিষ্ট্য:
এই সময় দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমী বায়ু ধীরে ধীরে উত্তর ভারতের সমভূমি অঞ্চল থেকে পিছু হটে আসে। এই প্রক্রিয়াকে মৌসুমী বায়ুর প্রত্যাগমন বলা হয়।
- উচ্চ তাপমাত্রা ও আর্দ্রতা: প্রত্যাগমনের প্রাথমিক পর্যায়ে উত্তর ভারতের আকাশ পরিষ্কার হলেও দক্ষিণ ভারত ও উপকূলীয় অঞ্চলে তখনও তাপমাত্রা বেশি থাকে এবং বাতাসের আর্দ্রতাও বেশি থাকে। এর ফলে দিন ও রাতের তাপমাত্রার পার্থক্য খুব কম হয় এবং আবহাওয়া খুবই অস্বস্তিকর ও ভ্যাপসা লাগে। একেই 'অক্টোবর হিট' বলা হয়।
- শীতকালীন বৃষ্টিপাত: এই সময়ে বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট নিম্নচাপ বা ঘূর্ণিঝড়গুলির প্রভাবে উত্তর-পূর্ব মৌসুমী বায়ু সক্রিয় হয়। এই বায়ুপ্রবাহ বঙ্গোপসাগরের উপর দিয়ে যাওয়ার সময় জলীয় বাষ্প সংগ্রহ করে তামিলনাড়ুর উপকূলীয় অঞ্চলে এবং অন্ধ্রপ্রদেশের দক্ষিণ ভাগে বৃষ্টিপাত ঘটায়।
ভারতের জলবায়ু অঞ্চলসমূহ
বিখ্যাত জার্মান আবহাওয়াবিদ ভ্লাদিমির কোপেন 1918 সালে তাপমাত্রা, বৃষ্টিপাত এবং উদ্ভিদের উপর ভিত্তি করে বিশ্বের জলবায়ুকে শ্রেণীবদ্ধ করেন। কোপেন তাঁর পদ্ধতিটি পরে সংশোধন করেন যা বর্তমানে বিশ্বব্যাপী জলবায়ুর অধ্যয়নে বহুল প্রচলিত। ভারতেও এই শ্রেণীবিন্যাসটি ব্যাপকভাবে গ্রহণযোগ্য। তাই আমরা ভারতের জলবায়ুর 'কোপেন শ্রেণীবিভাগ' বিস্তারিতভাবে আলোচনা করবো।
কোপেন তাঁর জলবায়ু শ্রেণীবিভাগে ইংরেজি বর্ণমালা ব্যবহার করে বিভিন্ন জলবায়ুকে চিহ্নিত করেছেন। ভারতে প্রধানত নিম্নলিখিত জলবায়ু প্রকারগুলি দেখা যায়:
![]() |
| ভারতের কোপেন জলবায়ু শ্রেণীবিভাগ |
1. ক্রান্তীয় বৃষ্টি অরণ্য জলবায়ু (Am):
A = ক্রান্তীয় জলবায়ু (Tropical Climate), m = মৌসুমী বায়ু দ্বারা প্রভাবিত।
● অবস্থান:
পশ্চিম উপকূলের দক্ষিণ ভাগ (যেমন, গোয়া থেকে কেরালা পর্যন্ত) এবং আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জ।
● বৈশিষ্ট্য:
- এই অঞ্চলে সারা বছরই উষ্ণতা বেশি থাকে এবং প্রচুর বৃষ্টিপাত হয়।এখানে একটি সংক্ষিপ্ত শুষ্ক ঋতু থাকে (সাধারণত শীতকালে), কিন্তু বার্ষিক বৃষ্টিপাতের পরিমাণ এতটাই বেশি যে শুষ্ক ঋতুতে আর্দ্রতার ঘাটতি অনুভূত হয় না।
- মাসিক গড় তাপমাত্রা সর্বদা 18°C-এর উপরে থাকে।
- এই অঞ্চলের স্বাভাবিক উদ্ভিদ হলো ক্রান্তীয় চিরহরিৎ বৃষ্টি অরণ্য।
2. ক্রান্তীয় সাভানা জলবায়ু (Aw):
A = ক্রান্তীয় জলবায়ু, w = শুষ্ক শীতকাল (Winter dry season)।
● অবস্থান:
পশ্চিম উপকূলের বাইরে অবস্থিত দাক্ষিণাত্য মালভূমির বেশিরভাগ অঞ্চল।
● বৈশিষ্ট্য:
- এখানে বর্ষাকালে প্রচুর বৃষ্টিপাত হয়, কিন্তু শীতকাল সম্পূর্ণ শুষ্ক থাকে। এটি ভারতের বৃহত্তম জলবায়ু অঞ্চল।
- মাসিক গড় তাপমাত্রা সর্বদা 18°C-এর উপরে থাকে।
- এই অঞ্চলের স্বাভাবিক উদ্ভিদ হল সাভানা (Savanna) তৃণভূমি এবং পর্ণমোচী অরণ্য।
3. উষ্ণ মরু জলবায়ু (BWhw):
B = শুষ্ক জলবায়ু (Dry Climate), W = মরুভূমি (Desert), h = উষ্ণ (Hot), w= শুষ্ক শীতকাল।
● অবস্থান:
পশ্চিম রাজস্থানের বেশিরভাগ অংশ (যেমন, থর মরুভূমি)।
● বৈশিষ্ট্য:
- এখানে বৃষ্টিপাতের পরিমাণ অত্যন্ত কম (বার্ষিক ২৫ সেমি-এর কম)।
- গড় বাষ্পীভবনের হার বৃষ্টিপাতের তুলনায় অনেক বেশি।
- গ্রীষ্মকাল অত্যন্ত উষ্ণ এবং শীতকাল মৃদু হয়।
4. উষ্ণ অর্ধ-শুষ্ক জলবায়ু (BShw):
B = শুষ্ক জলবায়ু, S = অর্ধ-শুষ্ক বা স্টেপ (Semi-arid or Steppe), h = উষ্ণ, w = শুষ্ক শীতকাল।● অবস্থান:
রাজস্থানের পূর্বাংশ, গুজরাট, পাঞ্জাবের দক্ষিণ-পশ্চিম এবং হরিয়ানার কিছু অংশ।
● বৈশিষ্ট্য:
- এই জলবায়ু অঞ্চলটি মরু জলবায়ু (BWhw) এবং আর্দ্র জলবায়ুর (Aw) মধ্যবর্তী স্থান দখল করে।
- বৃষ্টিপাতের পরিমাণ কম হলেও তা মরুভূমির চেয়ে বেশি।
- এখানে গ্রীষ্মকালে উচ্চ তাপমাত্রা এবং শীতকালে কম তাপমাত্রা অনুভূত হয়।
- এই অঞ্চলের স্বাভাবিক উদ্ভিদ হল কাঁটাযুক্ত গুল্ম ও স্টেপ তৃণভূমি।
5. উষ্ণ নাতিশীতোষ্ণ জলবায়ু (Cwg):
C = নাতিশীতোষ্ণ জলবায়ু (Warm Temperate Climate), w = শুষ্ক শীতকাল, g = গঙ্গা।
● অবস্থান:
উত্তর ভারতের বেশিরভাগ সমভূমি অঞ্চল (পাঞ্জাব থেকে পশ্চিমবঙ্গ পর্যন্ত গাঙ্গেয় সমভূমি)।
● বৈশিষ্ট্য:
- এখানে গ্রীষ্মকাল খুবই উষ্ণ হয় এবং শীতকাল শুষ্ক ও শীতল হয়।
- বৃষ্টিপাত প্রধানত গ্রীষ্মকালে (মৌসুমী বায়ু দ্বারা) হয়ে থাকে।
- কোপেন এই অঞ্চলকে 'গঙ্গা' (g) দ্বারা চিহ্নিত করেছেন, কারণ এটি গঙ্গা উপত্যকার জলবায়ুর প্রতিনিধিত্ব করে।
6. সংক্ষিপ্ত গ্রীষ্মের শীতল আর্দ্র জলবায়ু (Dfc):
D = মহাদেশীয় হিম জলবায়ু (Continental Cold Climate), f = কোনো শুষ্ক ঋতু নেই (Fully humid), c = অল্প গ্রীষ্মকাল।
● অবস্থান:
অরুণাচল প্রদেশ, সিকিম এবং অসমের উচ্চ পার্বত্য অঞ্চল।
● বৈশিষ্ট্য:
- এই অঞ্চলে গ্রীষ্মকাল সংক্ষিপ্ত এবং শীতল থাকে, এবং শীতকাল তীব্র দীর্ঘ হয়।
- সারা বছরই বৃষ্টিপাত ও তুষারপাত হয়।
7. মেরু জলবায়ু (ET) এবং উচ্চভূমি জলবায়ু (H):
E = মেরু জলবায়ু (Polar Climate), T = তুন্দ্রা (Tundra), H = উচ্চভূমি (Highland)।
● অবস্থান:
হিমালয় পর্বতমালার উচ্চতম শৃঙ্গগুলি (যেমন, কাশ্মীর, উত্তরাখণ্ড, হিমাচল প্রদেশ)।
● বৈশিষ্ট্য:
- ET (তুন্দ্রা): এই জলবায়ুতে উষ্ণতম মাসের গড় তাপমাত্রা 0°C থেকে 10°C-এর মধ্যে থাকে। এখানে কোনো সত্যিকারের গ্রীষ্মকাল থাকে না।
- উচ্চভূমি (H): এই শ্রেণীবিভাগটি উচ্চতা-নিয়ন্ত্রিত জলবায়ুকে বোঝায়, যেখানে তাপমাত্রা দ্রুত হ্রাস পায় এবং প্রায়শই চিরস্থায়ী তুষারপাত দেখা যায়। এই জলবায়ু অঞ্চলটি স্থায়ী বরফের রেখার উপরে অবস্থিত।
8. ক্রান্তীয় শুষ্ক গ্রীষ্মকালীন জলবায়ু (As):
A = ক্রান্তীয় জলবায়ু, s = শুষ্ক গ্রীষ্মকাল (Summer dry season)।
● অবস্থান:
তামিলনাড়ুর করোমণ্ডল উপকূল।
● বৈশিষ্ট্য:
- এটি একটি বিরল ব্যতিক্রম। গ্রীষ্মকালে যখন দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমী বায়ু সারা ভারতে বৃষ্টিপাত ঘটায়, তখন এই অঞ্চলটি বৃষ্টিচ্ছায় অঞ্চলে থাকার কারণে শুষ্ক থাকে।
- বৃষ্টিপাত প্রধানত শীতকালে উত্তর-পূর্ব মৌসুমী বায়ু বা প্রত্যাগমনকারী মৌসুমী বায়ুর প্রভাবে হয়।

