সিন্ধু সভ্যতা হল ভারতীয় উপমহাদেশের সবচেয়ে উন্নত তাম্র ও ব্রোঞ্জ যুগীয় সভ্যতার প্রাচীনতম নিদর্শন। এটি ছিল একটি নগরকেন্দ্রিক সভ্যতা। এটি প্রধানত সিন্ধু নদ ও তার উপনদীগুলির অববাহিকা অঞ্চল জুড়ে বিস্তৃত ছিল। এই সভ্যতার প্রধান দুটি কেন্দ্র হল হরপ্পা ও মহেঞ্জোদারো। হরপ্পা কথার অর্থ হল পশুপতির খাদ্য। এবং মহেঞ্জোদারো কথার অর্থ হল মৃতের স্তুপ। সিন্ধু সভ্যতার সম্পূর্ন বর্ণনা নিচে দেওয়া হল।
সিন্ধু সভ্যতার পরিচিতি ও সময়কাল

চিত্র: সিন্ধু সভ্যতার জীবনযাত্রার কাল্পনিক চিত্র
● নামকরণ: এই সভ্যতা সিন্ধু সভ্যতা বা হরপ্পা সভ্যতা নামে পরিচিত। প্রথম আবিষ্কৃত প্রত্নতাত্ত্বিক স্থান হরপ্পার নামানুসারে প্রথমে এই সভ্যতা 'হরপ্পা সভ্যতা' নামে পরিচিত হয়। এরপর মহেঞ্জোদারো ও অন্যান্য প্রত্নতাত্ত্বিক কেন্দ্র গুলি একে একে আবিষ্কার হয়েছিল। যেগুলির মধ্যে বেশিরভাগই ছিল সিন্ধু ও তার উপনদী গুলির অববাহিকা অঞ্চল জুড়ে। তাই পরবর্তীতে এই সভ্যতার নামকরণ হয় সিন্ধু সভ্যতা।
● সময়কাল: আনুমানিক ২৫০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ থেকে ১৮০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ পর্যন্ত সময়কালের মধ্যে এই সভ্যতার সূচনা, বিস্তার ও অবলুপ্তি ঘটে।
● আবিষ্কার: সিন্ধু সভ্যতার প্রধান দুটি গুরুত্বপূর্ণ প্রত্নতাত্ত্বিক কেন্দ্র হলো হরপ্পা ও মহেঞ্জোদারো। ১৯২১ খ্রিস্টাব্দে প্রত্নতাত্ত্বিক দয়ারাম সাহানি বর্তমান পাকিস্তানের পাঞ্জাব প্রদেশের মন্টেগোমারি জেলায় এই সভ্যতার প্রথম কেন্দ্র হরপ্পা আবিষ্কার করেন। এরপর ১৯২২ খ্রিস্টাব্দে রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায় সিন্ধু প্রদেশের লারাকানা জেলায় মহেঞ্জোদাড়ো আবিষ্কার করেন। স্যার জন মার্শালের তত্ত্বাবধানে এই খননকার্য শুরু হয়।
● ভৌগোলিক বিস্তার: এই সভ্যতা প্রাচীন মিশরীয় সভ্যতা, মেসোপটেমীয় সভ্যতা অন্যান্য সমসাময়িক সভ্যতা গুলির মধ্যে সবচেয়ে বৃহত্তর অঞ্চল জুড়ে বিস্তৃত ছিল। সিন্ধু সভ্যতা আয়তনে প্রায় ১৩ লক্ষ বর্গ কিলোমিটার এলাকা জুড়ে বিস্তৃত ছিল। চারদিকে শেষ সীমানা গুলি ছিল নিম্নরূপ:
সিন্ধু সভ্যতার চারিদিকের শেষ সীমানা
সিন্ধু সভ্যতার নগর পরিকল্পনা
সিন্ধু বা হরপ্পা সভ্যতার সবচেয়ে আকর্ষণীয় এবং বিস্ময়কর বিষয় হলো এর উন্নত নগর পরিকল্পনা। আজ থেকে প্রায় ৪,৫০০ বছর আগে সম্পূর্ণ বৈজ্ঞানিক ও জ্যামিতিক পদ্ধতি মেনে এই সভ্যতার শহরগুলো গড়ে উঠেছিল। এরূপ বৈশিষ্ট্য সমসাময়িক প্রাচীন মিশর বা মেসোপটেমিয়ার সভ্যতাতেও দেখা যায়নি। হরপ্পা, মহেঞ্জোদাড়ো, কালিবঙ্গান এবং লোথালের মতো প্রধান শহরগুলোর প্রায় একই পদ্ধতিতে গড়ে উঠেছিল। এই নগর পরিকল্পনার মূল বৈশিষ্ট্যগুলো নিচে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:
◼ দ্বি-স্তরিক নগর বিন্যাস
সিন্ধু সভ্যতার নগর পরিকল্পনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো দ্বি-স্তর বিশিষ্ট নগর বিন্যাস । বেশিরভাগ বড়ো শহরগুলি
সিটাডেল ব দুর্গ অঞ্চল এবং নিম্নের শহর নামে দুটি অংশে বিভক্ত ছিল।
1. দুর্গ অঞ্চল বা সিটাডেল: শহরের পশ্চিম দিকে একটি উঁচু ঢিবির ওপর অংশ তৈরি করা হতো, এই অঞ্চলটি সিটাডেল নামে পরিচিত। ঐতিহাসিকদের মতে, এই অঞ্চলটি ছিল শহরের প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক কেন্দ্র। এখানে মূলত শাসক শ্রেণী, পুরোহিত, এবং রাজকর্মচারীরা বসবাস করতেন। সাধারণ মানুষের ঘরবাড়ির পরিবর্তে এখানে ছিল বড় বড় সরকারি ও সামাজিক ভবন। মাটির তৈরি বিশাল মঞ্চের ওপর পোড়া ইট দিয়ে এর চারপাশ ঘেরা থাকত। অনেকের মতে, এর প্রধান কারণ ছিল সিন্ধু নদের আকস্মিক বন্যা ও বহিরাগত আক্রমণ থেকে প্রশাসনিক ভবনগুলোকে রক্ষা করা।
2. নিম্নের শহর: দুর্গ অঞ্চলের ঠিক পূর্ব দিকে, বেশ খানিকটা নিচু সমতল ভূমিতে গড়ে উঠেছিল 'নিম্নের শহর'। আয়তনের দিক থেকে এটি দুর্গ অঞ্চলের চেয়ে অনেক বেশি বড় এবং বিস্তৃত ছিল। এটিই ছিল সাধারণ নাগরিকদের প্রধান বাসস্থান। এখানে ব্যবসায়ী, কারিগর, কৃষক, সৈনিক, শ্রমিক ইত্যাদি বিভিন্ন পেশার নাগরিকরা বসবাস করতেন। শহরের অংশটিতেই সিন্ধু সভ্যতার বিখ্যাত দাবার বোর্ডের মতো রাস্তার বিন্যাস এবং সুপরিকল্পিত নিকাশি ব্যবস্থা দেখা যেত। এখানকার বাড়িগুলো ছিল পোড়া ইটের তৈরি এবং এক তল বা দুই তল বিশিষ্ট। শহরের এই অংশেই বিভিন্ন কারুশিল্পের কর্মশালা, পুঁতি তৈরির কারখানা এবং ছোট ছোট দোকানপাট থাকত।
* ব্যতিক্রমী শহর: সব শহরে কিন্তু এই দ্বি-স্তরিক বিন্যাস হুবহু এক ছিল না। যেমন, লোথাল শহরে দুর্গ অঞ্চলটি আলাদাভাবে প্রাচীর দিয়ে ঘেরা ছিল না। এখানে দুর্গ অঞ্চলটি নিম্নের শহরের সাথেই যুক্ত ছিল। আবার গুজরাটের ধোলাভিরা শহরটির নগর ব্যবস্থাও ছিল কিছুটা ভিন্ন। ধোলাভিরাতে দুই স্তরের বদলে ত্রি-স্তরিক বিন্যাস দেখা যেতো। অর্থাৎ এখানে দুর্গ অঞ্চল, মধ্যম শহর এবং নিম্নের শহর এই তিনটি অংশে গোটা শহরটি বিভক্ত ছিল।
◼ গ্রিড পদ্ধতি
সিন্ধু সভ্যতার নগর পরিকল্পনার এক আশ্চর্যজনক বৈশিষ্ট্য ছিল গ্রিড পদ্ধতি। আজ থেকে প্রায় সাড়ে চার হাজার বছর আগে সিন্ধু সভ্যতার স্থপতিরা একদম বৈজ্ঞানিক উপায়ে শহরের রাস্তাঘাট ও ঘরবাড়ির নকশা গুলি তৈরি করেছিলেন।
গ্রিড পদ্ধতির মূল ভিত্তি ছিল রাস্তাগুলোর সুশৃঙ্খল বিন্যাস। শহরের প্রধান রাস্তাগুলো কোনো আঁকাবাঁকা পথে চলত না; বরং সেগুলো উত্তর-দক্ষিণ এবং পূর্ব-পশ্চিম দিকে একেবারে সোজাভাবে প্রসারিত ছিল। এই সোজা রাস্তাগুলো পরস্পরকে ৯০ ডিগ্রি বা সমকোণে ছেদ করত। ফলে পুরো শহরটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে ছোট-বড় বহু চৌকো বা আয়তাকার ব্লকে বিভক্ত হয়ে যেত, ঠিক যেমন দাবার বোর্ড বা গ্রিড পেপারে দেখা যায়।
গ্রিড পদ্ধতিকে কার্যকর করতে রাস্তাগুলোকে প্রধানত তিনটি শ্রেণিতে ভাগ করা হয়েছিল। প্রথম শ্রেণির রাস্তাগুলো ছিল শহরের সবচেয়ে চওড়া প্রধান সড়ক, যা সাধারণত উত্তর-দক্ষিণ দিকে বিস্তৃত থাকত। মহেঞ্জোদাড়োতে এমন একটি প্রধান রাস্তার সন্ধান পাওয়া গেছে, যার প্রস্থ ছিল প্রায় ১০ মিটার। এই রাস্তাগুলো দিয়ে একসঙ্গে একাধিক পণ্যবাহী গরুর গাড়ি চলাচল করতে পারত।
দ্বিতীয় শ্রেণির রাস্তাগুলো প্রধান সড়কের সঙ্গে সমকোণে যুক্ত থাকত এবং এগুলোর প্রস্থ সাধারণত ৩ থেকে ৪ মিটার ছিল। আর তৃতীয় শ্রেণির রাস্তাগুলো ছিল শহরের অভ্যন্তরের সরু গলিপথ, যেগুলোর প্রস্থ সাধারণত ১.৫ থেকে ২ মিটার হতো। এই গলিপথগুলো সরাসরি নাগরিকদের বাড়ির দরজার সামনে গিয়ে পৌঁছাত।
অনেকের মতে এই গ্রিড পদ্ধতিটি কেবল যাতায়াতের সুবিধার্থেই কিন্তু তৈরি করা হয়নি। এটি শহরের নিকাশি বা ড্রেনেজ ব্যবস্থাকে নিখুঁত ভাবে গড়ে তোলার জন্য অপরিহার্য ছিল। প্রতিটি রাস্তার সমান্তরালে মাটির নিচে ঢাকা নর্দমা তৈরি করা হয়েছিল। প্রতিটি বাড়ির নোংরা জল সহজেই একটি ছোট পাইপের মাধ্যমে রাস্তার মূল নর্দমায় গিয়ে মিশত।
◼ আবাস ভবন
সিন্ধু সভ্যতার সাধারণ নাগরিকদের আবাস ভবনগুলির নির্মাণশৈলী বিশ্লেষণ করলে বোঝা যায়, আজ থেকে প্রায় সাড়ে চার হাজার বছর আগেও তারা কতটা আধুনিক এবং স্বাচ্ছন্দ্যপ্রিয় ছিলেন। রাজপ্রাসাদ বা বিলাসবহুল স্থাপত্য নির্মাণের তুলনায় তারা সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন নাগরিক সুবিধা ও জনস্বাস্থ্যের ওপর বেশি গুরুত্ব দিয়েছিলেন।
সিন্ধু সভ্যতার আবাস ভবনগুলো নির্মাণের প্রধান উপাদান ছিল রোদে শুকানো কিংবা আগুনে পোড়ানো পাকা ইট। জল ও লোনা ধরার হাত থেকে রক্ষা করার জন্য বাড়ির ভিত ও দেয়াল অত্যন্ত মজবুত পোড়া ইট দিয়ে তৈরি করা হতো। পুরো সভ্যতার প্রায় সব বাড়িতেই একই মাপের ইট ব্যবহার করা হতো, যার অনুপাত ছিল ৪:২:১। ইটগুলো জোড়া দেওয়ার জন্য কাদা, চুন ও জিপসামের মিশ্রণে তৈরি মর্টার ব্যবহার করা হতো।
সিন্ধু সভ্যতার বাড়িগুলো ছোট-বড় বিভিন্ন আকারের ছিল। এর থেকে তৎকালীন সমাজের অর্থনৈতিক বৈচিত্র্যের পরিচয় পাওয়া যায়। তবে অধিকাংশ বাড়ির নকশায় দেখা যায় বাড়ির মাঝখানে একটি খোলা উঠোন এবং সেই উঠোনকে কেন্দ্র করেই চারপাশে শোবার ঘর, বসার ঘর ও অন্যান্য কক্ষ।
উঠোনের এক পাশে থাকত রান্নাঘর, যেখানে মাটির তৈরি উনুন ব্যবহার করা হতো। বেশিরভাগ বাড়িই ছিল দুই বা ততোধিক তল বিশিষ্ট। ওপরের তলায় ওঠার জন্য তারা ইট বা কাঠের তৈরি মজবুত সিঁড়ি ব্যবহার করত। সম্ভবত বাড়ির ছাদগুলো সমতল ছিল এবং সেগুলি কাঠের বিমের ওপর মাটির প্রলেপ দিয়ে তৈরি করা হতো।
জনস্বাস্থ্য ও পরিচ্ছন্নতার দিক থেকেও প্রতিটি আবাস ভবন ছিল অত্যন্ত উন্নত। প্রায় প্রতিটি বাড়িতেই একটি নিজস্ব স্নানাগার ছিল। স্নানাগারের মেঝে ইট দিয়ে পাকা করা হতো এবং জল যাতে সহজেই বেরিয়ে যেতে পারে তাই একদিকে সামান্য ঢালু রাখা হতো। অনেক বাড়ির ভেতরে কিংবা প্রবেশদ্বারের পাশে একটি নিজস্ব কুয়োও থাকত। এতে বাড়ির বাসিন্দাদের পাশাপাশি বাইরের অতিথি বা পথচারীরাও সহজে জল ব্যবহার করতে পারত।
আবাস ভবনগুলোর সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য ছিল উন্নত জল নিষ্কাশন ব্যবস্থা। প্রতিটি বাড়ির স্নানাগার ও রান্নাঘরের নোংরা জল মাটির পাইপ বা ছোট নর্দমার মাধ্যমে শহরের প্রধান নর্দমার সঙ্গে যুক্ত থাকত। এই ব্যবস্থা এতটাই উন্নত ছিল যে বাড়ির ভেতরে কখনোই নোংরা জল জমা হতে পারত না। এর ফলে পরিবেশ পরিচ্ছন্ন রাখা সম্ভব হতো।
◼ জল নিকাশি ব্যবস্থা
সিন্ধু সভ্যতার নগর পরিকল্পনার আরো একটি বিস্ময়কর দিক ছিল উন্নত নিকাশি ব্যবস্থা। আজ থেকে প্রায় সাড়ে চার হাজার বছর আগে এই সভ্যতার মানুষ জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশ পরিচ্ছন্নতার প্রতি যে সচেতনতার পরিচয় দিয়েছিল, তা সত্যিই প্রসংশনীয়।
ঐতিহাসিকদের মতে, হরপ্পার স্থপতিরা রাজপ্রাসাদ বা স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণের চেয়ে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন পরিবেশের প্রতি বেশি গুরুত্ব দিয়েছিলেন। জল নিকাশি ব্যবস্থার শুরুটা ছিল প্রতিটি বাড়ির ভেতর থেকেই। বাড়ির স্নানাগার ও রান্নাঘরের মেঝে সামান্য ঢালু করে তৈরি করা হতো। ফলে ব্যবহৃত জল সহজেই একদিকে প্রবাহিত হতে পারত। এই নোংরা জল মাটির পাইপ বা ছোট ড্রেনের মাধ্যমে রাস্তার ধারের নর্দমায় গিয়ে পড়ত। রাস্তার ছোট নর্দমাগুলো আবার শহরের প্রধান নর্দমার সঙ্গে যুক্ত ছিল।
সিন্ধু সভ্যতার নর্দমাগুলো সাধারণত খোলা রাখা হতো না। অধিকাংশ নর্দমা মাটির নিচে নির্মিত ছিল। নর্দমার ওপর বড় বড় ইটের স্ল্যাব বা পাথরের চাঙড় দিয়ে ঢেকে রাখা হতো। ভেতরের ময়লা পরিষ্কার করার সময় এই ঢাকনাগুলো সহজেই সরিয়ে নেওয়া যেতো।
বাড়ির নোংরা জল সরাসরি প্রধান নর্দমায় পড়ত না। প্রথমে তা একটি বিশেষ কুণ্ড বা সোক পিটের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হতো। এতে জলের সঙ্গে থাকা কাদা ও কঠিন আবর্জনা নিচে থিতিয়ে জমে যেত। এরপর অপেক্ষাকৃত পরিষ্কার জল মূল নর্দমায় প্রবেশ করত। এর ফলে নর্দমা সহজে বন্ধ হতে পারত না।
নর্দমাগুলোকে মজবুত ও জলরোধী করার দিকেও বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল। এগুলো পোড়া ইট দিয়ে তৈরি করা হতো। ইট জোড়া দিতে চুন, বালি ও জিপসামের মর্টার ব্যবহার করা হতো। এই মর্টার জলরোধী স্তর হিসেবে কাজ করত এবং নর্দমাকে দীর্ঘস্থায়ী করে তুলত।
সিন্ধু সভ্যতার গুরুত্বপূর্ণ স্থাপত্য ও নিদর্শন
◼ মহেঞ্জোদারোর বৃহৎ স্নানাগার
সিন্ধু সভ্যতার প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বিস্ময়কর এবং আকর্ষণীয় স্থাপত্য হলো মহেঞ্জোদারোর 'বৃহৎ স্নানাগার'। ১৯২২ সালে রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায়ের হাত ধরে মহেঞ্জোদারো আবিষ্কারের পর, ১৯২৬-১৯২৭ সালের দিকে খননকার্যের মাধ্যমে এই বিশালাকার স্নানাগারটি উন্মোচিত হয়।
অনেকে এটিকেই প্রাচীন বিশ্বের সামাজিক স্নানের অন্যতম প্রথম নিদর্শন বলে মনে করে থাকেন।
● স্নানগরের বৈশিষ্ট্য: স্নানাগারটি মহেঞ্জোদারো শহরের পশ্চিম দিকে অবস্থিত উঁচু সুরক্ষিত এলাকা বা 'সিটাডেল' অঞ্চলে অবস্থিত ছিল। সমগ্র স্নানাগার চত্বরটি বেশ বড় হলেও মূল জলাশয়টির দৈর্ঘ্য ছিল প্রায় ৩৯ ফুট, প্রস্থ প্রায় ২৩ ফুট এবং গভীরতা ছিল প্রায় ৮ ফুট। স্নানাগারের মেঝে এবং চারপাশের দেয়ালগুলো পোড়া ইট দিয়ে নিখুঁতভাবে তৈরি করা হয়েছিল। ইটগুলোকে জোড়া দেওয়ার জন্য তারা জিপসামের তৈরি বিশেষ মর্টারের প্রলেপ ব্যবহার করেছিল। জল যাতে কোনোভাবেই চুঁইয়ে বাইরে না যেতে পারে, তারজন্য ইটের স্তরের মাঝে প্রায় ১ ইঞ্চি পুরু বিটুমিনের একটি ওয়াটারপ্রুফ স্তর দেওয়া হয়েছিল। স্নানাগারে নামার জন্য উত্তর ও দক্ষিণ দুই প্রান্তে চওড়া ইটের তৈরি সিঁড়ি ছিল। ধারণা করা হয় সিঁড়ির ধাপগুলোতে নাকি কাঠের তক্তা বসানোর ব্যবস্থা ছিল। স্নানাগারটির উত্তর, পূর্ব ও দক্ষিণ দিকে সারিবদ্ধ ছোট ছোট ঘর বা কক্ষ ছিল। ইতিহাসবিদদের মতে, এগুলো নাকি স্নানের পর পোশাক পরিবর্তন করার জন্য ব্যবহার করা হতো। একটি কক্ষে আবার ওপরের তলায় ওঠার সিঁড়িও পাওয়া গেছে, যা থেকে বোঝা যায় এর ওপরেও কোনো কাঠামো ছিল।
● স্নানাগারের জল সরবরাহ ব্যবস্থা: স্নানাগারে সবসময় পরিষ্কার জলের জোগান রাখা এবং নোংরা জল বের করার চমৎকার ব্যবস্থা ছিল। স্নানাগারের ঠিক পূর্ব দিকের একটি কক্ষে একটি বড় দোতলা কুয়ো ছিল। সেই কুয়ো থেকেই স্নানাগারের প্রধান জলাশয়ে জল সরবরাহ হতো। স্নানাগারের আর এক কোণে ছিল একটি বড় নিকাশি পথ। এই নিকাশি পথটি একটি বিশাল ড্রেনের সাথে যুক্ত হয়ে শহরের মূল ড্রেনে গিয়ে মিশত। স্নানাগারের নোংরা জলকে এই পথের মাধ্যমেই বাইরে বের করে দেওয়া হতো।
● স্নানাগারের ব্যবহার: এই বিশাল স্নানাগারটি ঠিক কী উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত হতো, তা নিয়ে বিশেষজ্ঞদের মধ্যে অনেক মতভেদ রয়েছে। বেশিরভাগ ঐতিহাসিকদের মতে, সিন্ধু সভ্যতার মানুষেরা কোনো বড় উৎসব, পূজা বা ধর্মীয় অনুষ্ঠানের আগে গণ-স্নান বা পবিত্র স্নানের জন্য এটি ব্যবহার করত। অনেকের মতে আবার, এটি যেহেতু সিটাডেল অঞ্চলে অবস্থিত ছিল, তাই সম্ভবত এটি শাসক, পুরোহিত বা সমাজের উচ্চবিত্ত শ্রেণির ব্যবহারের জন্য সংরক্ষিত ছিল।
◼ মহেঞ্জোদারোর শস্যাগার
সিন্ধু সভ্যতার অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি এবং উন্নত স্থাপত্যশৈলীর অন্যতম বড় নিদর্শন হলো মহেঞ্জোদারোর বিশালাকার শস্যাগার। হরপ্পা এবং মহেঞ্জোদারো দুই প্রধান শহরেই খননকার্যের ফলে বিশাল শস্যাগারের অস্তিত্ব মিলেছে। হরপ্পা এবং মহেঞ্জোদারো দুই জায়গাতেই বিশাল শস্যাগারের সন্ধান মিলেছে। তবে মহেঞ্জোদারোর শস্যাগারটি ছিল সবথেকে বিশাল।
● শস্যাগারের বৈশিষ্ট্য: মহেঞ্জোদারোর বৃহৎ স্নানাগারটির ঠিক পাশেই এই বিশাল শস্যাগারটি অবস্থিত। এটি ছিল লম্বায় প্রায় ১৫০ ফুট এবং চওড়ায় প্রায় ৭৫ ফুট। মাটি থেকে বেশ উঁচুতে ইটের তৈরি একটি বিশাল মঞ্চের ওপর শস্যাগারটি বানানো হয়েছিল। সিন্ধু নদের বন্যায় যাতে খাদ্যশস্য কোনোভাবেই নষ্ট না হয়ে যায় তাই এরূপ ব্যবস্থা করা হয়েছিল। ইটের তৈরি এই বিশাল ভিত্তির ওপর ২৭টি ব্লকে ভাগ করা কাঠের বিশাল কাঠামো বা দেওয়ালের মধ্যে শস্য মজুত রাখা হতো। কালক্রমে কাঠের অংশগুলি ধ্বংস হয়ে গেলেও ইটের মজবুত ভিত্তিটি আজও টিকে রয়েছে। এছাড়া শস্য যেন আর্দ্রতা বা স্যাঁতসেঁতে পরিবেশের কারণে পচে না যায়, সেজন্য ব্লকের মাঝখানে বিশেষ বায়ু চলাচলের পথ ছিল। এর ফলে ভেতরে সবসময় হাওয়া চলাচল করত এবং শস্য দীর্ঘকাল শুষ্ক ও ভালো থাকত।
● শস্যাগারের ব্যবহার: ঐতিসাহিকদের একাংশের মতে, সিন্ধু অববাহিকায় মাঝে মাঝেই বন্যা দেখা দিত। তাই খরা বা বন্যার মতো জরুরি পরিস্থিতিতে আপদকালীন খাদ্য সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে এখানে বিপুল পরিমাণ খাদ্যশস্য মজুত রাখা হতো। আবার অনেকের মতে, এই শস্যাগারগুলো শস্য রাখার জন্য ব্যবহার হলেও, এর সঙ্গে কিছু রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কারণও জড়িত ছিল। সিন্ধু সভ্যতায় কোনো ধাতব মুদ্রার প্রচলন ছিল না। বাণিজ্যের মূল মাধ্যম ছিল বিনিময় প্রথা। তাই ধারণা করা হয়, প্রজাদের কাছ থেকে কর বা রাজস্ব হিসেবে খাদ্যশস্য নেওয়া হতো এবং সেগুলিকেই জমা রাখা হতো কেন্দ্রীয় শস্যাগারে। এছাড়াও, সরকারি শ্রমিক ও কর্মচারীদের বেতনের একটা বড় অংশ এই শস্যাগার থেকেই খাদ্যশস্য আকারে প্রদান করত।
◼ ডক ইয়ার্ড বা কৃত্রিম পোতাশ্রয়
সিন্ধু সভ্যতার অন্যতম প্রত্নতাত্ত্বিক স্থান লোথালে একটি কৃত্রিম পোতাশ্রয় বা ডক ইয়ার্ড পাওয়া গেছে। এটি বর্তমান ভারতের গুজরাটের আহমেদাবাদ জেলায় অবস্থিত। ১৯৫৪ সালে প্রত্নতাত্ত্বিক এস. আর. রাও-এর নেতৃত্বে খননকার্য চালিয়ে এই ঐতিহাসিক বন্দরটি আবিষ্কার করা হয়। লোথালের এই ডক ইয়ার্ডটি মানব ইতিহাসের সবচেয়ে প্রাচীন কৃত্রিম পোতাশ্রয়গুলোর মধ্যে একটি। এটি সিন্ধু সভ্যতার উন্নত প্রকৌশল ও সামুদ্রিক বাণিজ্যের এক অনবদ্য নিদর্শন।
● ডক ইয়ার্ডের বৈশিষ্ট্য: ডক ইয়ার্ডটি ছিল আসলে একটি বিশাল আয়তকার জলাশয়। এর দৈর্ঘ্য ছিল প্রায় ২১৭ মিটার, প্রস্থ প্রায় ৩৭ মিটার এবং গভীরতা ছিল প্রায় ৪ মিটার। এটি প্রাচীন ভোগাবো নদীর সাথে একটি খালের মাধ্যমে সরাসরি যুক্ত ছিল। ভোগাবো নদী ছিল সবরমতী নদীর একটি উপনদী। এর ফলে জোয়ারের সময় সমুদ্র থেকে জাহাজ সহজেই এই ডক ইয়ার্ডে যাতায়াত করতে পারত। জলের চাপ এবং ক্ষয় রোধ করার জন্য পুরো ডক ইয়ার্ডের দেয়ালগুলো শক্ত পোড়া ইট দিয়ে তৈরি করা হয়েছিল। দেয়ালগুলো ছিল বেশ চওড়া ও মজবুত। ডক ইয়ার্ডটিতে জল স্তর নিয়ন্ত্রণ করার জন্য একটি সুন্দর জলকপাটের ব্যবস্থা ছিল। জোয়ার ও ভাটার সময় জলস্তর ওঠা নামার কারণে যাতে বন্দরে থাকা জাহাজগুলির সমস্যা না হয়, তার জন্য জল আটকানোর গেট ছিল। ডকইয়ার্ডের ঠিক পাশেই একটি বিশাল মাটির তৈরি উঁচু ভিতের ওপর একটি বড় গুদামঘর। জাহাজ থেকে নামানো পণ্য বা বিদেশে রপ্তানির জন্য তৈরি জিনিসপত্র এখানে সুরক্ষিত রাখা হতো। খননকার্যের সময় এখান থেকে বহু পোড়ামাটির সিলমোহর পাওয়া যায়। এর থেকেই এই অঞ্চলের বাণিজ্যের প্রমাণ পাওয়া যায়।
● প্রধান আমদানি ও রপ্তানি পণ্য: লোথাল ছিল সিন্ধু সভ্যতার অন্যতম প্রধান প্রবেশদ্বার। সেইসঙ্গে এটি একটি শিল্পকেন্দ্রও ছিল। এখান থেকে মেসোপটেমিয়া, পারস্য এবং মিশরের সাথে সরাসরি সামুদ্রিক পথে বাণিজ্য চলত। হাতির দাঁতের তৈরি জিনিস, পুঁতির গয়না, তামা, এবং সুতি বস্ত্র ছিল এখানকার প্রধান রপ্তানী পণ্য। আর এখানকার প্রধান আমদানি পণ্যের মধ্যে ছিল পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের সিলমোহর এবং মূল্যবান রত্নপাথর।
সিন্ধু সভ্যতার প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনসমূহ (একনজরে)
- শস্যাগার
- কফিন সমাধি
- তামা গলানোর চুল্লি
- ব্রোঞ্জের তৈরি গরুর গাড়ি
- বৃহৎ স্নানাগার
- বৃহৎ শস্যাগার
- ব্রোঞ্জের তৈরি নৃত্যরতা নারী মূর্তি
- পশুপতি শিবের সিলমোহর
- দাড়িওয়ালা পুরোহিতের মূর্তি
- কৃত্রিম পোতাশ্রয় বা বন্দর
- ধানের তুষ বা চালের অস্তিত্ব
- দাবার মতো খেলার বোর্ড
- যুগল সমাধি
- লাঙল দেওয়া জমির দাগ (চাষের প্রমাণ)
- অগ্নিকুণ্ড বা যজ্ঞবেদী
- কাঠের তৈরি লাঙল
- উটের হাড়
- উন্নত জল নিকাশী ও জল সংরক্ষণ ব্যবস্থা
- স্টেডিয়ামের অস্তিত্ব
- সিন্ধু লিপির ১০টি বড় চিহ্নের সাইনবোর্ড
- পুঁতি তৈরির কারখানা
- কালির দোয়াত
- লিপস্টিক বা প্রসাধনীর ব্যবহার
- একমাত্র শহর যেটির কোনো দুর্গ ছিল না
- মাটির তৈরি লাঙলের খেলনা
- বার্লি বা যবের ভালো মানের নমুনা
- মানুষের কবরে পোষা কুকুরের সমাধি
- ঘোড়ার হাড়ের অবশিষ্টাংশ
- পাথরে ঢাকা সমাধি
সিন্ধু সভ্যতার অর্থনীতি ও জীবিকা
● কৃষি: সিন্ধু সভ্যতার অধিবাসীদের প্রধান জীবিকা ছিল কৃষি। গম, যব, বার্লি, মটর, তিল, সরিষা ইত্যাদি নানা শস্যের চাষ হতো। বর্ষাকালে বৃষ্টির জল সংরক্ষণ করে কৃষি কাজে ব্যবহার করা হতো। সিন্ধু সভ্যতার মানুষেরা প্রথম তুলা চাষ শুরু করে বলে মনে করা হয়। কালিবঙ্গানে কাঠের তৈরি লাঙ্গল ব্যবহারের নিদর্শন পাওয়া যায়।
● পশুপালন: কৃষিকাজের পাশাপাশি পশুপালনও ছিল সিন্ধু সভ্যতার অধিবাসীদের ওপর একটি গুরুত্বপূর্ণ পেশা। গরু, মহিষ, ভেড়া, ছাগল ইত্যাদি পশু পালন করা হতো। এছাড়া কিছু ক্ষেত্রে মালপত্র পরিবহনের জন্য উট ও গাধা পালন করা হতো।
● বাণিজ্য: এই সভ্যতার অভ্যন্তরীণ ও বহির্বাণিজ্য খুবই উন্নত ছিল। স্থল ও জল উভয় পথেই বাণিজ্য হতো। গুজরাটের লোথাল ছিল সিন্ধু সভ্যতার প্রধান বাণিজ্য বন্দর। এটিকেই ভারতবর্ষের প্রাচীনতম বন্দর বলে মনে করা হয়ে থাকে। তাদের মুখ্য বাণিজ্য পণ্য ছিল তুলা। মেসোপটেমিয়া (সুমের), পারস্য, এবং মধ্য এশিয়ার সঙ্গে বাণিজ্য চলত। সিলমোহর ও বাটখারা ব্যবহারের প্রমাণ পাওয়া যায়, যা থেকে বোঝা যায় একটি সুসংগঠিত ওজন ও পরিমাপ ব্যবস্থা চালু ছিল। বড় বড় বণিক ও তার পরিবারের নিজস্ব সিল ছিল। সেগুলিতে খোদিত ছিল বিভিন্ন সংকেত এবং সংক্ষিপ্ত তথ্য। তবে এগুলিকে সিন্ধুবাসীরা মুদ্রা হিসেবে ব্যবহার করত কিনা তার যথাযথ কোন প্রমাণ পাওয়া যায়নি। অধিকাংশ ঐতিহাসিকদের মতে সিন্ধু সভ্যতায় দ্রব্য বিনিময় প্রথা প্রচলন ছিল।
সিন্ধু সভ্যতার ধর্মীয় বিশ্বাস
● মাতৃদেবীর পূজা: প্রচুর সংখ্যক মাতৃমূর্তি বা মাটির নারীমূর্তি আবিষ্কার হয়েছে, যা থেকে প্রমাণ পাওয়া যায় সেইসময় মাতৃদেবীর পূজা করা হতো।
● পশুপতি শিব: মহেঞ্জোদারোতে একটি সিলমোহরে তিন-মুখো পুরুষ দেবতার (সম্ভবত আদি-শিব বা পশুপতি মহাদেব) মূর্তি পাওয়া গেছে, যার চারপাশে হাতি, বাঘ, গণ্ডার ও মহিষের মূর্তি খোদিত। তার পায়ের সামনে রয়েছে দুটি হরিণের মূর্তি।
● বৃক্ষ ও পশুর পূজা: অশ্বত্থ গাছ এবং একশৃঙ্গ পশুর পূজা প্রচলিত ছিল।
● প্রতীক পূজা: এছাড়া লিঙ্গ ও যোনী পূজার প্রমাণ মিলেছে।
সিন্ধু সভ্যতার শিল্প ও সংস্কৃতি
সিন্ধু সভ্যতার মানুষেরা শিল্প ও সংস্কৃতির ক্ষেত্রেও অত্যন্ত উন্নত রুচির পরিচয় দিয়েছিল। আজ থেকে প্রায় সাড়ে চার হাজার বছর আগে তারা পাথর, ধাতু, পোড়ামাটি এবং হাতির দাঁত ব্যবহার করে নানা ধরনের শিল্পকর্ম তৈরি করেছিল। এসব শিল্পকর্ম তাদের উচ্চমানের শিল্প দক্ষতার প্রমাণ দেয়। সিন্ধু সভ্যতার শিল্প, স্থাপত্য ও সাংস্কৃতিক জীবনের প্রধান দিকগুলো নিচে আলোচনা করা হলো:
1. ভাস্কর্য শিল্প
সিন্ধু সভ্যতার ভাস্কর্য শিল্প মূলত ধাতু, পাথর এবং পোড়ামাটিকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছিল।
● ধাতু শিল্প: মহেঞ্জোদাড়ো থেকে উদ্ধার হওয়া ব্রোঞ্জের তৈরি ‘নর্তকী’ মূর্তিটি এই সভ্যতার ধাতু শিল্পের অন্যতম শ্রেষ্ঠ নিদর্শন। এটি ‘লস্ট-ওয়াক্স’ বা মধূচ্ছিষ্ট পদ্ধতিতে তৈরি হয়েছিল। মূর্তিটির এক হাত কোমরে রাখা এবং অন্য হাতটি চুড়িতে ভরা অবস্থায় উরুর ওপর রাখা। এটিকে বিশ্বের প্রাচীনতম ব্রোঞ্জ মূর্তিগুলোর একটি বলে মনে করা হয়।
● প্রস্তর ভাস্কর্য: মহেঞ্জোদাড়ো থেকে স্টিয়াটাইট পাথরের তৈরি একটি দাড়িওয়ালা পুরুষের আবক্ষ মূর্তি পাওয়া গেছে। ঐতিহাসিকদের অনেকে এটিকে ‘পুরোহিত রাজা’ নামে উল্লেখ করেছেন। মূর্তিটির গায়ে জড়ানো রয়েছে একটি শাল। আর শালের ওপর খোদাই করা আছে সুন্দর ত্রিবলয় নকশা।
● পোড়ামাটির মূর্তি: সিন্ধু সভ্যতার সাধারণ মানুষের শিল্পচর্চার অন্যতম প্রধান মাধ্যম ছিল পোড়ামাটি। এখান থেকে প্রচুর পশুপাখির মূর্তি পাওয়া গেছে। এর মধ্যে কুঁজওয়ালা ষাঁড়, বাঁদর ও কুকুর উল্লেখযোগ্য। এছাড়া বহু নারী মূর্তিও পাওয়া গেছে। ঐতিহাসিকরা এই নারী মূর্তি গুলিকে ‘মাতৃদেবী’ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।
2. সিলমোহর শিল্প
সিন্ধু সভ্যতার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিল্পনিদর্শনগুলোর একটি হলো সিলমোহর। এই অঞ্চলে প্রত্নতাত্ত্বিক খননে প্রায় ৩,০০০-এর বেশি সিল পাওয়া গেছে। সিলগুলো মূলত স্টিয়াটাইট বা নরম পাথর দিয়ে তৈরি হতো। এগুলো সাধারণত চৌকো বা আয়তাকার আকৃতির ছিল।
● খোদাই শিল্প: সিলমোহরগুলোর ওপর অত্যন্ত নিখুঁতভাবে বিভিন্ন পশুর ছবি খোদাই করা হতো। এর মধ্যে একশৃঙ্গী প্রাণী, হাতি, বাঘ, গণ্ডার এবং কুঁজওয়ালা ষাঁড় উল্লেখযোগ্য।
● পশুপতি সিল: মহেঞ্জোদাড়োতে একটি বিখ্যাত সিলমোহর পাওয়া গেছে, যা ‘পশুপতি সিল’ নামে পরিচিত। ওই সিলমোহরে দেখা যায়, এক যোগীসদৃশ ব্যক্তি ধ্যানমগ্ন অবস্থায় আছেন আর তার চারপাশে রয়েছে বিভিন্ন বন্য প্রাণী। ঐতিহাসিকদের অনেকে এই মূর্তিটিকে ‘পশুপতি শিব’ বা আদি শিবের প্রতীক বলে মনে করে থাকেন।
3. মৃৎশিল্প
সিন্ধু সভ্যতার মৃৎপাত্রগুলি ছিল অত্যন্ত উন্নত মানের।
● বৈশিষ্ট্য: মৃৎশিল্পীরা মূলত লাল ও কালো রঙের মৃৎপাত্র তৈরি করত। পাত্রগুলো আগুনে পুড়িয়ে লাল করা হতো। এরপর তার ওপর কালো রঙে বিভিন্ন নকশা আঁকা হতো। এসব নকশার মধ্যে জ্যামিতিক চিত্র, গাছপালা, পাতা এবং পশুপাখির ছবি ছিল।
● ব্যবহার: এই মাটির পাত্র রান্না, জল সংরক্ষণ এবং শস্য মজুতের কাজে ব্যবহৃত হতো। এছাড়া ফুটো করা বিশেষ ধরনের পাত্রও পাওয়া গেছে। ধারণা করা হয়, এগুলো তরল পদার্থ ছাঁকার কাজে ব্যবহৃত হতো।
4. অলঙ্কার এবং পুঁতি শিল্প
সিন্ধু সভ্যতার নারী ও পুরুষ উভয়েই অলঙ্কার ব্যবহার করত। সোনা, রূপো, তামা, হাতির দাঁত এবং বিভিন্ন মূল্যবান পাথর দিয়ে অলংকার তৈরি করা হতো।
চনহুদাড়ো এবং লোথালে বড় বড় পুঁতি তৈরির কারখানার সন্ধান পাওয়া গেছে। তারা কার্নেলিয়ান পাথর কেটে, পালিশ করে এবং ফুটো করে সূক্ষ্ম পুঁতি তৈরি করত। এসব পুঁতির মালা বিদেশেও, বিশেষ করে মেসোপটেমিয়ায় রপ্তানি করা হতো।
ধনী ব্যক্তিরা সোনা ও রূপার হার, বলা, কানের দুল ইত্যাদি অলঙ্কার পরতেন। অন্যদিকে সাধারণ মানুষ পোড়ামাটি ও শাঁখের তৈরি অলঙ্কার ব্যবহার করতেন।
5. বিনোদন এবং সাংস্কৃতিক জীবন
সিন্ধু সভ্যতার মানুষেরা কেবল কাজেই ব্যস্ত থাকতেন না, তাদের জীবনে বিনোদনেরও গুরুত্বপূর্ণ স্থান ছিল।
● খেলনা: শিশুদের জন্য পোড়ামাটির তৈরি চাকাওয়ালা গাড়ি, শিস দেওয়া পাখি এবং মাথা নাড়ানো ষাঁড়ের মতো খেলনা তৈরি করা হতো।
● খেলাধুলা: মহেঞ্জোদাড়ো থেকে দাবার ছকের মতো বোর্ড এবং ইটের তৈরি ঘুঁটি বা পাশা পাওয়া গেছে। এগুলো থেকে বোঝা যায়, তারা পাশা বা বোর্ডজাতীয় খেলায় অংশ নিত। এছাড়া নাচ, গান এবং পশুপাখির লড়াই দেখাও তাদের বিনোদনের অংশ ছিল।
সিন্ধু সভ্যতার গুরুত্বপূর্ণ প্রত্নস্থল
সিন্ধু সভ্যতার কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রত্নতাত্ত্বিক স্থান হলোঃ
সিন্ধু সভ্যতার লিপি
সিন্ধু সভ্যতার লিপি প্রাচীন বিশ্বের অন্যতম বড় এক রহস্য। হাজারো চেষ্টা সত্ত্বেও গবেষকেরা আজও এই লিপির সম্পূর্ণ পাঠোদ্ধার করতে পারেননি।
◼ লিপির বৈশিষ্ট্য:
সিন্ধু লিপি কোনো সাধারণ বর্ণমালা ছিল না। এটি ছিল একটি লোগো-সিলেবিক লিপি। অর্থাৎ, একটি চিহ্ন কখনো পুরো একটি শব্দকে বোঝাত, আবার কখনো কোনো নির্দিষ্ট শব্দাংশ বা উচ্চারণকে নির্দেশ করত।
● চিহ্নের সংখ্যা: এই লিপিতে মোট কতটি চিহ্ন ছিল, তা নিয়ে গবেষকদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। তবে সাধারণভাবে মনে করা হয়, এতে প্রায় ৪০০-এর বেশি মৌলিক চিহ্ন ছিল।
● লেখার নিয়ম: সিন্ধু লিপি সাধারণত ডান দিক থেকে বাম দিকে লেখা হতো। তবে লেখা যদি একাধিক লাইনের হতো, তবে প্রথম লাইন ডান থেকে বামে এবং পরের লাইন বাম থেকে ডানে লেখা হতো। লেখার এই শৈলীকে বলা হয় বুস্ট্রফেডন।
● চিত্রলিপির বৈশিষ্ট্য: সিন্ধু লিপির অনেক চিহ্নে মানুষ, মাছ, পাখি, পশুপাখি ও বিভিন্ন জ্যামিতিক আকৃতির ছাপ দেখা যায়। এর মধ্যে মাছের চিহ্ন সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয়েছে বলে মনে করা হয়।
◼ লিপির উৎস ও নিদর্শন
হরপ্পা, মহেঞ্জোদাড়ো, কালিবঙ্গান ও লোথাল থেকে এই লিপির বহু নিদর্শন পাওয়া গেছে।
● সিলমোহর: সবচেয়ে বেশি লিপি পাওয়া গেছে স্টিয়াটাইট পাথরের তৈরি সিলমোহরের ওপর। এগুলো সাধারণত চৌকো বা আয়তাকার আকৃতির ছিল। সিলের ওপরের অংশে লিপি এবং নিচের অংশে পশুর ছবি খোদাই করা থাকত। সিলমোহর গুলিতে একশৃঙ্গ প্রাণী, ষাঁড়, বাঘ ও হাতির ছবি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
● ধোলাবিরার সাইনবোর্ড: গুজরাটের ধোলাবিরা থেকে একটি বড় আকারের সাইনবোর্ড পাওয়া গেছে। এতে প্রায় ১০টি বড় হরপ্পান চিহ্ন সাজানো ছিল। এটিকে বিশ্বের অন্যতম প্রাচীন সাইনবোর্ড বলে মনে করা হয়।
● অন্যান্য মাধ্যম: সিলমোহর ছাড়াও পোড়ামাটির পাত্র, তামার ফলক, হাতির দাঁতের তৈরি বস্তু এবং কিছু ব্রোঞ্জ সামগ্রীর ওপরও এই লিপি খোদাই করা অবস্থায় পাওয়া গেছে।
◼ পাঠোদ্ধার না হওয়ার কারণ
দীর্ঘদিন ধরে দেশ-বিদেশের বহু ভাষাবিদ ও প্রত্নতাত্ত্বিক এই লিপির অর্থ উদ্ধারের চেষ্টা করছেন, কিন্তু এখনও কেউ সর্বসম্মত কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারেননি। এর প্রধান কারণগুলো হলো:
● দ্বিভাষিক দলিলের অভাব: মিশরের হায়ারোগ্লিফিক লিপি ‘রোসেটা স্টোন’-এর সাহায্যে পাঠোদ্ধার করা সম্ভব হয়েছিল। কারণ সেখানে একই লেখা একাধিক ভাষায় পাওয়া গিয়েছিল। কিন্তু সিন্ধু লিপির ক্ষেত্রে এখনো তেমন কোনো দ্বিভাষিক দলিল পাওয়া যায়নি।
● ছোট আকৃতির লেখা: সিন্ধু লিপির লেখাগুলো খুবই সংক্ষিপ্ত। বেশিরভাগ লেখায় মাত্র কয়েকটি চিহ্ন দেখা যায়। সবচেয়ে বড় লেখাতেও প্রায় ২৬টির বেশি চিহ্ন পাওয়া যায়নি। তাই ভাষার ব্যাকরণ বোঝা কঠিন হয়ে পড়েছে।
● মূল ভাষা নিয়ে বিতর্ক: সিন্ধু সভ্যতার মানুষের ভাষা কী ছিল, তা নিয়েও মতভেদ রয়েছে। গবেষকদের একাংশ মনে করেন, এটি দ্রাবিড় ভাষাগোষ্ঠীর অন্তর্গত ছিল। অন্যদিকে কিছু গবেষকের মতে, এটি প্রাক-সংস্কৃত বা ইন্দো-আর্য ভাষার প্রাচীন রূপ হতে পারে।
সিন্ধু সভ্যতা পতনের কারণ
আনুমানিক ১৮০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ নাগাদ সিন্ধু সভ্যতার পতন শুরু হয়। পতনের কারণ সম্পর্কে ঐতিহাসিকদের মধ্যে ভিন্ন ভিন্ন মত রয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য মতামত গুলি হলো:
● নদীপথের পরিবর্তন: অনেকে মনে করেন সিন্ধু ও তার উপনদী গুলি এবং সরস্বতী নদীর গতিপথ পরিবর্তন বা শুকিয়ে যাওয়া এই সভ্যতা বিলুপ্তির অন্যতম প্রধান কারণ। নদীর গতিপথ পরিবর্তন বা শুকিয়ে যাওয়ার ফলে কৃষিকাজ ব্যাহত হয় এবং সেইসঙ্গে শহরগুলিতে জলের অভাব দেখা দেয়। ফলে সিন্ধু বাসিরা এই অঞ্চল ছাড়তে বাধ্য হয়।
● বহিরাক্রমণ: স্যার মর্টিমার হুইলারের মতে সিন্ধু সভ্যতা ধ্বংসের কারণ ছিল আর্যদের আক্রমণ। তার মতে মধ্য এশিয়া থেকে আগত আরজোড়া সিন্ধু সভ্যতার শহর গুলিকে একে একে আক্রমণ করতে থাকে।
● প্রাকৃতিক দুর্যোগ/বন্যা: প্রত্নতাত্ত্বিক খননে মহেঞ্জোদারো এবং অন্যান্য শহরে বন্যার ফলে সৃষ্টি এমন পুরু পলির স্তর পাওয়া গেছে। তাই অনেকে মনে করেন, ঘন ঘন বিধ্বংসী বন্যায় সিন্ধু সভ্যতার শহর গুলিকে ধ্বংস করে দেই।
● মহামারী: সিন্ধু সভ্যতা ধ্বংসের কারণগুলি আলোচনার ক্ষেত্রে মহামারীর বিষয়টিও কিন্তু এড়িয়ে যাওয়া যায় না। কোন মারণ রোগ হয়তো মহামারীর আকার ধারণ করে অনেক মানুষের প্রাণহানি ঘটায়, যা এই সভ্যতার পতন ডেকে আনে।