বিশেষত ভারতবর্ষ হলো একটি নদীমাতৃক দেশ। ভারতবর্ষের সভ্যতা, সংস্কৃতি, কৃষি এবং অর্থনীতি নদনদীগুলির ওপর গভীরভাবে নির্ভরশীল। হিমালয়ের বরফ গলা জল থেকে সৃষ্ট নদীগুলি ও দক্ষিণ ভারতের বৃষ্টির জলে পুষ্ট নদীগুলি শুধুমাত্র ভারতের জলের উৎসই নয়, এগুলি দেশের জীবনরেখা এবং কোটি কোটি মানুষের আস্থার প্রতীক। নদীগুলি ভারতের জলসেচ, জলবিদ্যুৎ ও পরিবহনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
ভারতে প্রবাহিত নদীগুলিকে উৎস, প্রবাহিত অঞ্চল ও বৈশিষ্ট্য অনুসারে দুটি প্রধান ভাগে ভাগ করা হয়ে থাকে। যথা: 1. উত্তর ভারতের নদনদী বা হিমালয়ের নদনদী ও 2. দক্ষিণ ভারতের নদনদী বা উপদ্বীপীয় নদনদী।
![]() |
| ভারতের প্রধান নদ-নদী মানচিত্র |
হিমালয়ের নদনদী:
হিমালয়ের নদনদী গুলির মধ্যে রয়েছে বিশেষত হিমালয় পর্বতমালা থেকে উৎপন্ন হওয়া নদী গুলি। হিমালয়ের নদী প্রণালী পৃথিবীর বৃহত্তম নদী অববাহিকা গুলির মধ্যে একটি। এটি আয়তনে প্রায় 3,21,289 বর্গ কিলোমিটার এরিয়া জুড়ে বিস্তৃত। ভারতে এটির মোট দৈর্ঘ্য 1114 কিমি। হিমালয়ের নদনদী গুলিকে তিনটি নদী প্রণালীতে ভাগ করা হয়। যথা: সিন্ধু নদী প্রণালী, গঙ্গা নদী প্রণালী ও ব্রহ্মপুত্র নদী।
1. সিন্ধু নদী প্রণালী:
সিন্ধু নদী ব্যবস্থা হলো হিমালয়ের তিনটি প্রধান নদী ব্যবস্থার মধ্যে অন্যতম। এটি সিন্ধু নদ এবং তার প্রধান উপনদীগুলিকে নিয়ে গঠিত।
◼ সিন্ধু নদের উৎপত্তি:
সিন্ধু নদের উৎপত্তি হয়েছে তিব্বতের কৈলাস পর্বতমালার বোখারচু হিমবাহের কাছে মানস সরোবর হ্রদের উত্তর দিকে অবস্থিত সিন-কা-বাব জলধারা থেকে।
◼ সিন্ধু নদের গতিপথ:
সিন্ধু নদের মোট দৈর্ঘ্য হল 2880 কিমি। তিব্বতে এটি 'সিংগি খাম্বান' বা 'সিংহ মুখ' নামে পরিচিত। এখান থেকে এটি উত্তর-পশ্চিম দিকে প্রবাহিত হয়েছে। জম্মু ও কাশ্মীরের (বর্তমানে লাদাখ) দমচক এর কাছ থেকে এটি ভারতে প্রবেশ করেছে। ভারতে 709 কিমি প্রবাহিত হয়েছে। লাদাখ ও জাস্কর পর্বতমালার মাঝখান দিয়ে এটি উত্তর-পশ্চিম দিকে প্রবাহিত হয়েছে। এরপর লেহ-এর কাছে এর প্রধান উপনদী জাস্কর নদ এর সাথে মিলিত হয়েছে। সিন্ধু নদী লাদাখের বুঞ্জি-তে প্রায় 5200 মিটার গভীর একটি বিশাল গিরিখাত সৃষ্টি করেছে। এরপর এটি চিল্লাস এর কাছে দক্ষিণে বাঁক নিয়ে পাকিস্তানে প্রবেশ করে। দীর্ঘ 2880 কিলোমিটার পথ অতিক্রম করে সিন্ধু নদ শেষে করাচির পূর্বে আরব সাগরে পতিত হয়।
◼ সিন্ধু নদের প্রধান উপনদী সমূহ:
সিন্ধু নদের পাঁচটি প্রধান উপনদী আছে। এগুলি একত্রে পঞ্চনদ নামে পরিচিত। নিচে এই পঞ্চনদের বর্নণা দেওয়া হলো:
i) বিতস্তা বা ঝিলাম
● উৎপত্তি: ঝিলাম নদীর উৎপত্তি জম্মু ও কাশ্মীরের দক্ষিণ-পূর্ব অংশে পীর পাঞ্জাল পর্বতের পাদদেশে অবস্থিত ভেরিনাগ নামক একটি গভীর প্রস্রবণ থেকে।
● দৈর্ঘ্য: ঝিলাম নদীর মোট দৈর্ঘ্য প্রায় 725 কিলোমিটার।
● গতিপথ: ভেরিনাগ থেকে উৎপন্ন হয়ে ঝিলাম নদী শ্রীনগর শহরের পাশ দিয়ে প্রবাহিত হয়ে উলার হ্রদে প্রবেশ করেছে। উলার হ্রদ থেকে বের হয়ে এটি আবার বারামুলার কাছে একটি গভীর গিরিখাত তৈরি করে পীর পাঞ্জাল পর্বত পার হয়েছে। এরপর মুজাফফরাবাদের কাছে কিষেণগঙ্গা নদীর সাথে মিলিত হয়ে ভারত-পাকিস্তান সীমান্ত বরাবর প্রবাহিত হয়ে এটি পাকিস্তানের পাঞ্জাব প্রদেশে প্রবেশ করেছে। সবশেষে পাকিস্তানের ঝং জেলার ত্রিম্মু নামক স্থানে এটি চেনাব নদীর সাথে মিলিত হয়েছে।
● ঐতিহাসিক গুরুত্ব: প্রাচীন গ্রিক ইতিহাসে ঝিলাম নদীর নাম ছিল 'হাইডাসপিস' এবং ঋগ্বেদে এটিকে 'বিতস্তা' নামে অভিহিত করা হয়েছে। 326 খ্রিস্টপূর্বাব্দে এই নদীর তীরেই রাজা পুরু এবং আলেকজান্ডারের মধ্যে বিখ্যাত হাইডাসপিসের যুদ্ধ হয়েছিল।
● অর্থনৈতিক গুরুত্ব: কাশ্মীর উপত্যকার কৃষিকাজ ও নৌ-পরিবহনের জন্য ঝিলাম নদীটি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। এর ওপর উরি জলবিদ্যুৎ প্রকল্প এবং পাকিস্তানে মংলা বাঁধ নির্মিত হয়েছে।
ii) চেনাব বা চন্দ্রভাগা
● উৎপত্তি: হিমাচল প্রদেশের লাহাউল ও স্পিতি জেলায় হিমালয়ের বরা-লাচা পাসের দুই দিক থেকে উৎপন্ন 'চন্দ্র' এবং 'ভাগা' নামক দুটি নদীর মিলনে ছেনাব নদী সৃষ্টি হয়েছে। হিমাচলের তান্ডি নামক স্থানে নদী দুটি মিলিত হয়ে 'চন্দ্রভাগা' নামে পরিচিত হয়েছে।
● দৈর্ঘ্য: চেনাব নদীর মোট দৈর্ঘ্য প্রায় 960 কিলোমিটার।
● গতিপথ: তান্ডি থেকে উৎপন্ন হয়ে চেনাব নদী হিমাচল প্রদেশ ও জম্মু-কাশ্মীরের পার্বত্য অঞ্চল অতিক্রম করে পাকিস্তানের পাঞ্জাব প্রদেশে প্রবেশ করেছে। সেখানে ঝিলাম ও রাভি নদীর জল গ্রহণ করে অবশেষে শতদ্রু নদীর সঙ্গে মিলিত হয়েছে।
● ভৌগোলিক গুরুত্ব: জল বহনের পরিমাণের দিক থেকে চেনাব নদী সিন্ধু নদের বৃহত্তম উপনদী। ঋগ্বেদে এই নদী 'অসিক্নী' নামে উল্লেখিত হয়েছে।
● প্রকৌশলগত গুরুত্ব: জম্মু-কাশ্মীরে চেনাব নদীর ওপর বিশ্বের সর্বোচ্চ খিলানাকৃতি রেল সেতু 'চেনাব ব্রিজ' নির্মিত হয়েছে। এছাড়াও ভারতের সালাল, দুলহাস্তি এবং বাগলিহারের মতো গুরুত্বপূর্ণ জলবিদ্যুৎ প্রকল্প এই নদীর ওপরেই অবস্থিত।
iii) রাভি বা ইরাবতী
● উৎপত্তি: হিমাচল প্রদেশের চাম্বা জেলায় হিমালয়ের রোহতাং পাসের পশ্চিমে অবস্থিত কুলা পাহাড় থেকে রাভি বা ইরাবতী নদীর উৎপত্তি।
● দৈর্ঘ্য: রাভি বা ইরাবতী নদীর মোট দৈর্ঘ্য প্রায় 720 কিলোমিটার।
● গতিপথ: উৎপত্তিস্থল থেকে রাভি নদী চাম্বা উপত্যকা অতিক্রম করে দক্ষিণ-পশ্চিম দিকে প্রবাহিত হয়েছে। এরপর ভারত-পাকিস্তান সীমান্ত বরাবর প্রবাহিত হয়ে পাকিস্তানে প্রবেশ করেছে। তারপর পাকিস্তানে আহমেদপুর শিয়ালের কাছে রাভি নদীটি চেনাব নদীর সঙ্গে মিলিত হয়েছে।
● ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক গুরুত্ব: প্রাচীন বৈদিক সাহিত্যে রাভি নদী 'পরুষ্ণী' নামে এবং সংস্কৃত সাহিত্যে 'ইরাবতী' নামে পরিচিত। বৈদিক যুগের বিখ্যাত দশ রাজার যুদ্ধ এই নদীর তীরেই সংঘটিত হয়েছিল।
● অর্থনৈতিক গুরুত্ব: ভারত ও পাকিস্তানের কৃষি ও সেচ ব্যবস্থায় রাভি নদী গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ভারতের পাঞ্জাবে এই নদীর ওপর নির্মিত রঞ্জিত সাগর বাঁধ সেচ ও জলবিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য বিশেষ গুরুত্বপুর্ণ।
iv) বিয়াস বা বিপাশা
● উৎপত্তি: হিমাচল প্রদেশের রোহতাং পাসের কাছে অবস্থিত 'বিয়াস কুন্ড' থেকে বিয়াস নদীর উৎপত্তি।
● দৈর্ঘ্য: পঞ্চনদের মধ্যে বিয়াস সবচেয়ে ছোট নদী। এর মোট দৈর্ঘ্য প্রায় 470 কিলোমিটার।
● গতিপথ: বিয়াস নদী কুল্লু উপত্যকা অতিক্রম করে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পশ্চিম দিকে প্রবাহিত হয়েছে। এরপর এটি পশ্চিম ও দক্ষিণ-পশ্চিম দিকে ঘুরে ভারতের পাঞ্জাব সমভূমিতে প্রবেশ করেছে। সবশেষে পাঞ্জাবের কপূরথলা জেলার হারিকে নামক স্থানে এটি শতদ্রু নদীর সাথে মিলিত হয়েছে।
● ভৌগোলিক ও ঐতিহাসিক গুরুত্ব: পঞ্চনদের মধ্যে বিয়াসই একমাত্র নদী যা সম্পূর্ণরূপে ভারতের ভূখণ্ডের মধ্যেই প্রবাহিত হয়েছে। এর প্রাচীন নাম হলো 'বিপাশা'। গ্রিকদের কাছে এটি 'হাইফাসিস' নামে পরিচিত ছিল।
● অর্থনৈতিক গুরুত্ব: বিয়াস ও শতদ্রু নদীর মিলনস্থলে গঠিত হারিকে জলাভূমি উত্তর ভারতের একটি গুরুত্বপূর্ণ জলসম্পদ কেন্দ্র। এখানকার জল এই অঞ্চলের সেচব্যবস্থা ও কৃষিকাজে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়। এছাড়া বিয়াস নদীর ওপর নির্মিত পং বাঁধ জলসেচ, বন্যা নিয়ন্ত্রণ এবং জলবিদ্যুৎ উৎপাদনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
v) সুতলেজ শতদ্রু
● উৎপত্তি: তিব্বতের কৈলাস পর্বতের কাছে মানস সরোবরের পশ্চিমে অবস্থিত রাক্ষসতাল হ্রদ অঞ্চল থেকে শতদ্রু নদীর উৎপত্তি। তিব্বতে এর স্থানীয় নাম লাংচেন খাম্বাব।
● দৈর্ঘ্য: শতদ্রু নদীর মোট দৈর্ঘ্য প্রায় 1,450 কিলোমিটার। এটি পঞ্চনদের মধ্যে দীর্ঘতম নদী।
● গতিপথ: তিব্বত থেকে পশ্চিম দিকে প্রবাহিত হয়ে এটি হিমাচল প্রদেশের শিপকি-লা গিরিপথ দিয়ে ভারতে প্রবেশ করেছে। এরপর হিমাচল প্রদেশ ও পাঞ্জাব অতিক্রম করে হারিকে অঞ্চলে বিয়াস নদীর সঙ্গে মিলিত হয়েছে। তারপর দক্ষিণ-পশ্চিম দিকে প্রবাহিত হয়ে ভারত-পাকিস্তান সীমান্ত বরাবর প্রবাহিত হয়েছে। অবশেষে পাকিস্তানের পাঞ্জাবে প্রবেশ করে চেনাব নদীর সাথে মিলিত হয়েছে।
● ভৌগোলিক গুরুত্ব: শতদ্রু একটি পূর্ববর্তী নদী, অর্থাৎ হিমালয় পর্বতমালা গড়ে ওঠার আগে থেকেই এর অস্তিত্ব ছিল এবং পর্বত গঠনের পরও এটি নিজের প্রবাহপথ বজায় রেখেছে। ঋগ্বেদে এই নদী 'শতুদ্রী' নামে উল্লেখিত হয়েছে।
● অর্থনৈতিক গুরুত্ব: উত্তর ভারতের কৃষি, সেচ ও জলবিদ্যুৎ উৎপাদনে শতদ্রু নদীর অবদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই নদীর ওপর নির্মিত ভাকরা-নাঙ্গাল প্রকল্প ভারতের অন্যতম বৃহত্তম বহুমুখী নদী উপত্যকা প্রকল্প। এই প্রকল্পের মাধ্যমে পাঞ্জাব, হরিয়ানা, রাজস্থান ও হিমাচল প্রদেশে জলসেচ ও বিদ্যুৎ সরবরাহ হয়।
◼ সিন্ধু নদের গুরুত্ব:
ভারতবর্ষের ইতিহাস ও জীবনযাত্রায় সিন্ধু নদের প্রধান গুরুত্ব গুলি নিচে দেওয়া হল:
● প্রাচীন সভ্যতা ও ঐতিহাসিক ভিত্তি: প্রাচীন ভারতীয় সংস্কৃতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নদী হলো সিন্ধু নদ। ঋগ্বেদেও সিন্ধু নদের বিশেষ প্রশংসা করা হয়েছে। ঋগ্বেদীয় যুগের আর্য সভ্যতার প্রধান কেন্দ্র ছিল সিন্ধু ও তার উপনদীগুলির অববাহিকা অঞ্চল। তৎকালীন সময়ে এই অঞ্চল 'সপ্তসিন্ধু অঞ্চল' নামে পরিচিত ছিল। ভারতের প্রাচীন নাম 'হিন্দুস্তান' এবং আধুনিক নাম 'ইন্ডিয়া' দুটিই উৎপত্তিগত দিক থেকে সিন্ধু নদের সথে জড়িত। পারসিকরা 'সিন্ধু' শব্দকে 'হিন্দু' এবং গ্রিকরা 'ইন্দোস' নামে উচ্চারণ করত। এর থেকেই পরবর্তীকালে 'ইন্ডিয়া' নামের উৎপত্তি হয়।
● কৃষিকাজের উন্নতি: সিন্ধু নদ ও তার পাঁচটি প্রধান উপনদী মিলিতভাবে পঞ্চনদ ব্যবস্থা গঠন করেছে। এই নদীগুলির জল পাঞ্জাব, হিমাচল প্রদেশ ও তার আশপাশের অঞ্চলগুলির কৃষিকাজে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। শতদ্রু নদীর ওপর নির্মিত ভাকরা-নাঙ্গাল প্রকল্প ভারতের অন্যতম বৃহৎ বহুমুখী নদী প্রকল্প। এছাড়া হারিকে ব্যারেজ থেকে শুরু হয়েছে ইন্দিরা গান্ধী খাল। এটি পাঞ্জাব, হরিয়ানা ও রাজস্থানের শুষ্ক অঞ্চলেও সেচের সুবিধা তৈরি করেছে। অর্থাৎ, সিন্ধু নদী ব্যবস্থা ভারতের কৃষিজ উৎপাদন ও সবুজ বিপ্লবের বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে।
● জলবিদ্যুৎ উৎপাদন: হিমালয়ের পার্বত্য অঞ্চল দিয়ে প্রবাহিত হওয়ায় সিন্ধু নদের স্রোত অত্যন্ত শক্তিশালী। এই কারণে নদীটি জলবিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য বিশেষ উপযোগী। লাদাখে অবস্থিত নিমু-বাজগো জলবিদ্যুৎ প্রকল্প এবং চুটক জলবিদ্যুৎ প্রকল্প এই অঞ্চলের বিদ্যুৎ সরবরাহে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে। দুর্গম সীমান্ত অঞ্চলে এই প্রকল্প গুলি বিদ্যুৎ উৎপাদনের মাধ্যমে লাদাখের উন্নয়ন ও পরিকাঠামো বৃদ্ধিতে সহায়তা করে চলেছে।
● ভূ-রাজনৈতিক গুরুত্ব (সিন্ধু জল চুক্তি): সিন্ধু নদ ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে জলসম্পদ রাজনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। 1960 সালে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে স্বাক্ষরিত হয় সিন্ধু জল চুক্তি। এই চুক্তি অনুযায়ী পূর্বাঞ্চলীয় নদী, অর্থাৎ রাভি, বিয়াস ও শতদ্রু নদীর জল ব্যবহারের প্রধান অধিকার হয় ভারতের এবং পশ্চিমাঞ্চলীয় নদী, অর্থাৎ সিন্ধু, ঝিলাম ও চেনাব নদীর জল ব্যবহারের প্রধান অধিকার হয় পাকিস্তানের। তবে ভারত নিজের সীমানার মধ্যে পশ্চিমাঞ্চলীয় নদীগুলোর জলকে কৃষিকাজ, পানীয় জল ও জলবিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যবহার করার অধিকার রাখে। তাই উত্তর-পশ্চিম সীমান্তের নিরাপত্তা ও কৌশলগত দিক থেকে সিন্ধু নদ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
2. গঙ্গা নদী প্রণালী:
ভারতের বৃহত্তম নদী ব্যবস্থা হলো গঙ্গা নদী প্রণালী। এটি ভারতের উত্তর ও পূর্বের বিশাল এলাকা জুড়ে বিস্তৃত। এই নদী ব্যবস্থা ভারতীয় সংস্কৃতি, অর্থনীতি এবং ইতিহাসে এক কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করে আসছে।
◼ গঙ্গা নদীর উৎপত্তি:
গঙ্গা নদী উত্তরাখণ্ড রাজ্যের উত্তরকাশী জেলার গঙ্গোত্রী হিমবাহের গোমুখ নামক স্থান থেকে উৎপন্ন হয়েছে। উৎপত্তিস্থলে এটি ভাগীরথী নামে পরিচিত। এই ভাগীরথী নদী দেবপ্রয়াগে অলকানন্দা নদীর সঙ্গে মিলিত হয়ে গঙ্গা নামে পরিচিত হয়েছে।
◼ গঙ্গা নদীর গতিপথ:
গঙ্গা ভারতের চারটি রাজ্য যথাক্রমে উত্তরাখণ্ড, উত্তরপ্রদেশ, বিহার এবং পশ্চিমবঙ্গের মধ্যে দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। উত্তরাখণ্ডের হরিদ্বার নামক স্থানে গঙ্গা প্রথম সমভূমিতে প্রবেশ করেছে। সমভূমিতে প্রবেশ করে এটি দক্ষিণ-পূর্ব দিকে প্রবাহিত হয়েছে। উত্তর প্রদেশ ও বিহার রাজ্যে বহু উপনদী গঙ্গার সাথে মিলিত হওয়ায় এর আয়তন ও গভীরতা আরো বৃদ্ধি পেয়েছে। এরপর পশ্চিমবঙ্গে প্রবেশ করে মুর্শিদাবাদ জেলার ধুলিয়ান-এর কাছে গঙ্গা দুটি শাখায় বিভক্ত হয়েছে। প্রথম শাখাটি ভাগীরথী-হুগলী নামে পশ্চিমবঙ্গের মধ্যে দিয়ে দক্ষিণে প্রবাহিত হয়ে অবশেষে বঙ্গোপসাগরে পতিত হয়েছে। এই শাখাটি পশ্চিমবঙ্গের প্রধান নদী। ওপর শাখা অর্থাৎ মূল প্রবাহটি পদ্মা নামে বাংলাদেশে প্রবেশ করে ব্রহ্মপুত্র নদীর সঙ্গে মিলিত হয়ে বঙ্গোপসাগরে পতিত হয়েছে।
◼ পঞ্চ প্রয়াগ:
◼ গঙ্গার প্রধান উপনদীসমূহ:
গঙ্গার উপনদীগুলিকে প্রধানত বাম তীরের এবং ডান তীরের উপনদী হিসেবে দুটি ভাগে ভাগ করা যায়। গঙ্গার বাম তীরের প্রধান উপনদী গুলি হলো রামগঙ্গা, গোমতী, কালি, গণ্ডক, কোশি, ঘর্ঘরা। এই নদীগুলি হিমালয় থেকে উৎপন্ন হওয়ায় সাধারণত সারাবছরই নদীগুলিতে জল থাকে। এবং গঙ্গার ডান তীরের উপনদী গুলি হলো যমুনা, শোন ও দামোদর। এই নদীগুলি উপদ্বীপীয় মালভূমি বা অপেক্ষাকৃত নিচু পর্বত থেকে উৎপন্ন হওয়ায় এগুলির জলের পরিমাণ মৌসুমী বৃষ্টির ওপর বেশি নির্ভরশীল।
● গঙ্গার বাম তীরের উপনদীসমূহ (একনজরে):
গঙ্গার বাম তীরের উপনদী গুলির উৎপত্তি, দৈর্ঘ্য ও গঙ্গার সাথে মিলনস্থল নিচে ছকের মাধ্যমে দেওয়া হল:
● গঙ্গার ডান তীরের উপনদীসমূহ (একনজরে):
◼ গঙ্গা নদীর গুরুত্ব:
গঙ্গা নদী কিন্তু শুধুই একটি নদী নয়, এটি ভারতের অর্থনীতি, সংস্কৃতি, ইতিহাস এবং কোটি কোটি মানুষের জীবনযাত্রার অন্যতম প্রধান ভিত্তি। ভারতের প্রায় 26% ভূখণ্ড এই নদী অববাহিকার অন্তর্গত। গঙ্গা নদীর বহুমুখী গুরুত্ব নিচে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:
● উর্বর পলিমাটি গঠন: গঙ্গা ও তার উপনদীগুলি প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ উর্বর পলিমাটি বহন করে আনে। এর ফলে উত্তর ও পূর্ব ভারতের গাঙ্গেয় সমভূমি বিশ্বের অন্যতম উর্বর কৃষি অঞ্চলে পরিণত হয়েছে। এই অঞ্চল ধান, গম, আখ, আলু ও পাটের মতো গুরুত্বপূর্ণ ফসলের উৎপাদনে বিশেষ ভূমিকা পালন করে।
● সেচ ব্যবস্থা: কৃষিকাজে জল সরবরাহের জন্য গঙ্গা থেকে অসংখ্য সেচ খাল নির্মাণ করা হয়েছে। এর মধ্যে আপার গঙ্গা ক্যানাল ও লোয়ার গঙ্গা ক্যানাল উল্লেখযোগ্য। এই খালগুলির মাধ্যমে উত্তর প্রদেশ, বিহার ও পশ্চিমবঙ্গের বিস্তীর্ণ কৃষিজমিতে সেচের জল পৌঁছে দেওয়া হয়।
● শিল্প ও নগরায়ণ: গঙ্গার তীরে কানপুর, প্রয়াগরাজ, বারাণসী, পাটনা ও কলকাতার মতো গুরুত্বপূর্ণ শহর গড়ে উঠেছে। এই শহরগুলোতে গড়ে ওঠা চামড়া, বস্ত্র, কাগজ ও রাসায়নিক শিল্পকারখানাগুলো জলের জন্য সম্পূর্ণভাবে গঙ্গার ওপর নির্ভরশীল।
● বহুমুখী নদী পরিকল্পনা: গঙ্গা নদী ও তার পার্বত্য উপনদীগুলোর তীব্র স্রোতকে কাজে লাগিয়ে প্রচুর জলবিদ্যুৎ উৎপাদন করা হচ্ছে। যেমন গঙ্গার প্রধান উৎস ধারা ভাগীরথী নদীর ওপর নির্মিত তেহরি বাঁধ হল ভারতের সর্বোচ্চ জলবিদ্যুৎ প্রকল্প।
● ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক ক্ষেত্র: হিন্দুধর্মে গঙ্গাকে 'মা গঙ্গা' বা দেবী হিসেবে পুজো করা হয়ে থাকে। গঙ্গার তীরে অবস্থিত ঋষিকেশ, হরিদ্বার, প্রয়াগরাজ এবং বারাণসী শহর গুলিকে হিন্দু ধর্মে পবিত্র তীর্থ হিসেবে মানা হয়। এছাড়া প্রয়াগরাজে প্রতি ১২ বছর অন্তর আয়োজিত 'মহাকুম্ভ মেলা' হল বিশ্বের বৃহত্তম মানব সমাবেশ। এটি ইউনেস্কোর সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের স্বীকৃতি পেয়েছে।
3. ব্রহ্মপুত্র নদী প্রণালী:
ব্রহ্মপুত্র নদী হলো একটি বিশাল আন্তঃসীমান্ত নদী। এটি তিব্বত, ভারত এবং বাংলাদেশ জুড়ে প্রবাহিত হয়েছে। জলপ্রবাহের দিক থেকে এটি ভারতের বৃহত্তম নদী। এছাড়া, পলি বহন করার ক্ষমতা এবং বৃহৎ নদী দ্বীপ সৃষ্টির জন্যও ব্রহ্মপুত্র নদ বিশেষ বিখ্যাত।
◼ ব্রহ্মপুত্র নদের উৎপত্তি:
ব্রহ্মপুত্র নদের উৎপত্তি হয়েছে তিব্বতের কৈলাস পর্বতমালায় অবস্থিত চেমা-য়ুং-দুং হিমবাহ থেকে। স্থানটি সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় 5,300 মিটার উচ্চতায় অবস্থিত।
◼ ব্রহ্মপুত্র নদীর গতিপথ:
ব্রহ্মপুত্র নদ তিব্বতে হিমালয় পর্বতমালার সমান্তরালে পূর্ব দিকে প্রবাহিত হয়েছে। সেখানে এটি ইয়ারলুং সাংপো নামে পরিচিত। হিমালয়ের পূর্বতম প্রান্ত নামচা বারোয়া পর্বতশৃঙ্গের কাছে নদীটি তীব্রভাবে দক্ষিণ দিকে বাঁক নিয়েছে এবং একটি গভীর গিরিখাত তৈরি করে ভারতের অরুণাচল প্রদেশে প্রবেশ করছে।
অরুণাচল প্রদেশে এটি দিয়াং বা সিয়াং নামে পরিচিত। অরুণাচল প্রদেশ থেকে নেমে আসার পর এটি আসামের সমভূমিতে প্রবেশ করে এবং সেখানেই এটি ব্রহ্মপুত্র নামে পরিচিত। আসামে এর সাথে এর প্রধান দুটি উপনদী দিবং ও লোহিত মিলিত হয়। এই তিনটি নদীর সম্মিলিত স্রোতটি আসামের সমভূমি জুড়ে প্রবাহিত হয়েছে। আসামে ব্রহ্মপুত্র নদের উপর অবস্থিত মাজুলি হলো বিশ্বের বৃহত্তম নদী দ্বীপ। ধুবড়ির কাছে ব্রহ্মপুত্র দক্ষিণ দিকে বাঁক নিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। বাংলাদেশে ব্রহ্মপুত্র নদী যমুনা নামে পরিচিত। বাংলাদেশে চাঁদপুর-এর কাছে এটি গঙ্গা নদীর প্রধান শাখা পদ্মা-র সাথে মিলিত হয়েছে। এই সম্মিলিত স্রোতটি আরও দক্ষিণে প্রবাহিত হয়ে মেঘনা নামে অবশেষে বিশাল বদ্বীপ গঠন করে বঙ্গোপসাগরে পতিত হয়।
◼ ব্রহ্মপুত্র নদের উপনদীসমূহ:
ব্রহ্মপুত্র নদীর প্রধান উপনদী গুলি হল:
- বাম তীরের উপনদী- দিবং, লোহিত, কপিলি
- ডান তীরের উপনদী- সুবর্ণসিঁড়ি, মানস, তিস্তা
◼ ব্রহ্মপুত্র নদের গুরুত্ব:
ব্রহ্মপুত্র নদ কেবল ভারতের একটি বিশাল জলধারাই নয়, এটি উত্তর-পূর্ব ভারতের অর্থনীতি, কৃষি, পরিবহন, সংস্কৃতি এবং জীববৈচিত্র্যের অন্যতম প্রধান ভিত্তি। ভারতের জীবনযাত্রা ও অর্থনীতিতে ব্রহ্মপুত্র নদের গুরুত্ব নিচে আলোচনা করা হলো:
● উত্তর-পূর্ব ভারতের কৃষিকাজ: ব্রহ্মপুত্র নদকে আসাম ও অরুণাচল প্রদেশের জীবনরেখা বলা হয়। নদীটির বহন করা উর্বর পলিমাটি আসাম উপত্যকাকে ভারতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কৃষি অঞ্চলে পরিণত করেছে। ব্রহ্মপুত্র নদ ও তার অসংখ্য উপনদী গুলি আসামের বিশ্ববিখ্যাত চা বাগান এবং উপত্যকার প্রধান ফসল ধান ও পাট চাষের জন্য প্রয়োজনীয় জল সরবরাহ করে।
● জলবিদ্যুৎ উৎপাদন ও সম্ভাবনা: ভারতের মোট জলবিদ্যুৎ সম্ভাবনার একটি বিশাল অংশ লুকিয়ে আছে ব্রহ্মপুত্র এবং তার উপনদীগুলির পার্বত্য গতিপথে। অরুণাচল প্রদেশ এবং আসামে এই নদী ব্যবস্থার ওপর বড় বড় জলবিদ্যুৎ প্রকল্প গড়ে তোলা হচ্ছে। এগুলি আগামী দিনে ভারতের একটি বড় অংশে বিদ্যুতের ঘাটতি মেটাতে গুরুত্বপুর্ণ ভূমিকা রাখবে।
● অভ্যন্তরীণ জলপথ ও বাণিজ্য: পাহাড়ি ও দুর্গম উত্তর-পূর্বাঞ্চলে সাশ্রয়ী মূল্যে পণ্য পরিবহনের জন্য ব্রহ্মপুত্র নদ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। আসামের সাদিয়া থেকে ধুবরি পর্যন্ত ব্রহ্মপুত্র নদের প্রায় ৮৯১ কিলোমিটার দীর্ঘ অংশকে 'জাতীয় জলপথ-২' হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। এই জলপথ উত্তর-পূর্ব ভারতের সঙ্গে দেশের অন্যান্য অঞ্চলের বাণিজ্যিক যোগাযোগকে আরও সহজ করে তুলেছে।
● বিশ্বের বৃহত্তম নদী দ্বীপ 'মাজুলি': আসামে ব্রহ্মপুত্র নদের মাঝখানে গড়ে উঠেছে বিশ্বের বৃহত্তম নদী দ্বীপ 'মাজুলি'। এটি ভারতের প্রথম নদী দ্বীপ যা নিজস্ব জেলার মর্যাদা পেয়েছে। এই মাজুলি হলো আসামের নববৈষ্ণব সংস্কৃতির মূল কেন্দ্র। প্রতি বছর এখানে দেশ-বিদেশের হাজার হাজার পর্যটকের আগমন ঘটে। এর ফলে ভারতের পর্যটন শিল্প ও স্থানীয় অর্থনীতি আরো সমৃদ্ধ হয়ে উঠছে।
● মৎস্যসম্পদ ও জীবিকা: ব্রহ্মপুত্র নদ ও এর অসংখ্য উপনদী উত্তর-পূর্ব ভারতের মৎস্যসম্পদের অন্যতম প্রধান উৎস। লক্ষাধিক মানুষ এখানে মৎস্য শিকার, মৎস্যচাষ এবং সংশ্লিষ্ট পেশার মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহ করেন।
2. উপদ্বীপীয় নদনদী:
উপদ্বীপীয় নদী ব্যবস্থা মূলত দক্ষিণ ভারতের মালভূমি অঞ্চল থেকে উৎপন্ন হওয়া নদীগুলিকে নিয়ে গঠিত। এদের গতিপথ এবং বৈশিষ্ট্য হিমালয়ের নদীগুলির থেকে আলাদা। বেশিরভাগ নদীই পশ্চিমঘাট পর্বতমালা এবং মধ্য ভারতের মালভূমি অঞ্চল থেকে উৎপন্ন। এই নদীগুলি মূলত বৃষ্টির জলে পুষ্ট। অর্থাৎ এদের জলের পরিমাণ দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমী বৃষ্টিপাতের ওপর নির্ভরশীল। তাই গ্রীষ্মকালে জলের পরিমাণ কমে যায় এবং কিছু নদী শুকিয়েও যায়। এদেরকে অ-বারোমাসি নদী বলা হয়। এগুলি তুলনামূলকভাবে ছোট এবং কম খরস্রোতা। এদের উপত্যকাগুলি সুগঠিত ও চওড়া এবং নদীর ক্ষয়কার্য প্রায় শেষ হয়ে এসেছে। এই নদীগুলির মধ্যে বিশেষত পশ্চিমবাহিনী নদীগুলি অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহনের জন্য কম উপযুক্ত। উপদ্বীপীয় নদ-নদী গুলিকে দুটি ভাগে ভাগ করা হয়েছে, যথা- পূর্ববাহিনী নদী এবং পশ্চিম বাহিনী নদী।
i) পূর্ববাহিনী নদী:
ভারতের উপদ্বীপীয় নদীর প্রায় ৭৭% বঙ্গোপসাগরে পতিত হয়। পশ্চিমঘাট পর্বতমালা থেকে উৎপন্ন হয়ে এদের অধিকাংশই পূর্ব দিকে প্রবাহিত হয়েছে। কয়েকটি উল্লেখযোগ্য পূর্ব বাহিনী নদী হল:
◼ মহানদী
● উৎস: মহানদীর উৎপত্তি হয়েছে ছত্তিশগড়ের রায়পুর জেলার কাছে অবস্থিত সিহাওয়া পর্বত থেকে।
● দৈর্ঘ্য: মহানদীর দৈর্ঘ্য প্রায় 858 কিমি।
● গতিপথ: নদীটি ছত্তিশগড় থেকে উৎপন্ন হয়ে পূর্ব দিকে প্রবাহিত হয়ে ওড়িশা রাজ্যে প্রবেশ করেছে। এরপর কটক শহরের কাছে একটি বিশাল বদ্বীপ সৃষ্টি করে বঙ্গোপসাগরে মিশেছে। এর প্রধান উপনদীগুলি হলো সেওনাথ, হাসদেও, মান্দ, জঙ্ক এবং তেল।
● গুরুত্ব: এই নদীর ওপর ভারতের অন্যতম দীর্ঘ মাটির বাঁধ 'হীরাকুদ বাঁধ' নির্মিত হয়েছে। এটি বন্যা নিয়ন্ত্রণ, সেচ এবং জলবিদ্যুৎ উৎপাদনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এছাড়া ওড়িশা ও ছত্তিশগড়ের বিস্তীর্ণ কৃষিজমি এই নদীর জলের ওপর নির্ভরশীল। কৃষি, পানীয় জল, শিল্প এবং পরিবহনে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখার জন্য মহানদীকে 'ওড়িশার জীবনরেখা' বলা হয়।
◼ গোদাবরী
● উৎস: মহারাষ্ট্রের নাসিক জেলার ত্র্যম্বকেশ্বর উচ্চভূমি থেকে গোদাবরী নদীর উৎপত্তি।
● দৈর্ঘ্য: গোদাবরী নদীর মোট দৈর্ঘ্য প্রায় 1,465 কিলোমিটার। এটি দক্ষিণ ভারতের দীর্ঘতম এবং ভারতের দ্বিতীয় দীর্ঘতম নদী। বিশাল আকৃতি ও দৈর্ঘ্যের জন্য একে 'দক্ষিণের গঙ্গা' বা 'বৃদ্ধ গঙ্গা' বলা হয়।
● গতিপথ: মহারাষ্ট্র থেকে পূর্বদিকে প্রবাহিত হয়ে নদীটি তেলেঙ্গানা ও অন্ধ্রপ্রদেশ রাজ্যের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। এরপরে রাজামহেন্দ্রবরম বা রাজামুন্দ্রি অঞ্চলের কাছে একটি বৃহৎ বদ্বীপ গঠন করে বঙ্গোপসাগরে পতিত হয়েছে। এর প্রধান উপনদীগুলি হলো: প্রাণহিতা, পেনগঙ্গা, ওয়েনগঙ্গা, ওয়ার্ধা, ইন্দ্রাবতী এবং মঞ্জিরা।
● গুরুত্ব: শ্রীরাম সাগর এবং পোলাভারম প্রকল্পের মাধ্যমে তেলেঙ্গানা ও অন্ধ্রপ্রদেশের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে জলসেচ ও পানীয় জল সরবরাহ সম্ভব হয়েছে। এছাড়া নাসিক ও রাজামহেন্দ্রবরমের মতো গুরুত্বপূর্ণ তীর্থস্থান এই নদীর তীরে অবস্থিত। প্রতি 12 বছর অন্তর এখানে গোদাবরী পুষ্করম উৎসব অনুষ্ঠিত হয়।
◼ কৃষ্ণা
● উৎস: মহারাষ্ট্রের পশ্চিমঘাট পর্বতমালার মহাবালেশ্বরের নিকটবর্তী অঞ্চল থেকে কৃষ্ণা নদীর উৎপত্তি হয়েছে।
● দৈর্ঘ্য: কৃষ্ণা নদীর মোট প্রায় 1,400 কিলোমিটার। এটি ভারতের উপদ্বীপীয় অঞ্চলের দ্বিতীয় দীর্ঘতম নদী।
● গতিপথ: উৎসস্থল থেকে নদীটি মহারাষ্ট্র, কর্ণাটক, তেলেঙ্গানা এবং অন্ধ্রপ্রদেশের ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে শেষে অন্ধ্রপ্রদেশের হংসলাদেবী গ্রামের কাছে বঙ্গোপসাগরে মিশেছে। এর প্রধান উপনদীগুলি হলো: তুঙ্গভদ্রা, ভীমা, কোয়না, ঘটপ্রভা, মালপ্রভা এবং মুসি।
● গুরুত্ব: কৃষ্ণা নদীর ওপর নির্মিত নাগার্জুন সাগর বাঁধ এবং শ্রীশৈলম বাঁধ দক্ষিণ ভারতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জলবিদ্যুৎ ও সেচ প্রকল্প। এই নদীর অববাহিকায় অমরাবতী ও বিজয়ওয়াড়ার মতো গুরুত্বপূর্ণ শহর গড়ে উঠেছে। এর উপনদী মুসি নদীর তীরে হায়দ্রাবাদ শহর অবস্থিত।
◼ কাবেরী
● উৎস: কর্ণাটকের পশ্চিমঘাট পর্বতমালার ব্রহ্মগিরি পাহাড়ের তালাকাবেরী থেকে কাবেরী নদীর উৎপত্তি হয়েছে।
● দৈর্ঘ্য: কাবেরী নদীর মোট দৈর্ঘ্য প্রায় 800 কিলোমিটার।
● গতিপথ: কাবেরী নদী কর্ণাটক ও তামিলনাড়ুর মধ্য দিয়ে দক্ষিণ-পূর্ব দিকে প্রবাহিত হয়ে কাবেরীপত্তনমের কাছে বঙ্গোপসাগরে মিশেছে। নদীটি তার গতিপথে শ্রীরঙ্গপত্তনম ও শিবসমুদ্রম দ্বীপ সৃষ্টি করেছে। কাবেরী নদীর প্রধান উপনদীগুলি হলো: হেমাবতী, শিমসা, অর্কাবতী, লক্ষ্মণতীর্থ, কাবিনী এবং অমরাবতী।
● গুরুত্ব: কাবেরীর বদ্বীপ অঞ্চল অত্যন্ত উর্বর হওয়ায় একে "দক্ষিণ ভারতের শস্যভাণ্ডার" বলা হয়। তামিলনাড়ুর থাঞ্জাভুর জেলা এর অন্যতম উদাহরণ। দক্ষিণ ভারতের অন্যান্য নদীর তুলনায় কাবেরীতে সারা বছর তুলনামূলকভাবে বেশি জল থাকে। এর কারণ হলো কাবেরী নদীর অববাহিকায় দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমী বায়ু ও উত্তর-পূর্ব মৌসুমি বায়ু প্রভাবে বছরে দুইবার বৃষ্টিপাত ঘটে। এছাড়া কাবেরী নদীর ওপর নির্মিত কৃষ্ণরাজ সাগর বাঁধ এবং মেত্তুর বাঁধ দক্ষিণ ভারতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সেচ ও জলসংরক্ষণ প্রকল্প।
ii) পশ্চিমবাহিনী নদী:
পশ্চিমবাহিনী নদীগুলি পূর্ববাহিনী নদীর তুলনায় সংখ্যায় কম এবং দৈর্ঘ্যের দিক থেকে তুলনামূলকভাবে ছোট। ভারতের উপদ্বীপীয় অঞ্চলের পশ্চিম বাহিনী নদীগুলির মধ্যে নর্মদা ও তাপ্তি বিশেষ উল্লেখযোগ্য। নদী গুলির বর্ণনা নিচে দেওয়া হল:
◼ নর্মদা
● উৎস: মধ্যপ্রদেশের অনুপপুর জেলার অমরকন্টক মালভূমি থেকে নর্মদা নদীর উৎপত্তি হয়েছে।
● দৈর্ঘ্য: নর্মদা নদীর দৈর্ঘ্য প্রায় 1,312 কিলোমিটার। এটি ভারতের দীর্ঘতম পশ্চিমবাহিনী নদী।
● গতিপথ: নর্মদা নদী মধ্যপ্রদেশ, মহারাষ্ট্র ও গুজরাটের মধ্য দিয়ে পশ্চিমদিকে প্রবাহিত হয়ে গুজরাটের ভরুচ শহরের কাছে খাম্বাত উপসাগরে তথা আরব সাগরে পতিত হয়েছে। নদীটি উত্তরে বিন্ধ্য পর্বত এবং দক্ষিণে সাতপুরা পর্বতের মধ্যবর্তী রিফট বা গ্রাবেন উপত্যকার মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। নর্মদা নদীর প্রধান উপনদীগুলি হলো তওয়া, বাঞ্জার, হিরণ, শের ও ওরসাং।
● গুরুত্ব: মধ্যপ্রদেশের জবলপুরের কাছে মার্বেল পাথরের খাদের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়ে নর্মদা নদী বিখ্যাত ধুঁয়াধার জলপ্রপাত সৃষ্টি করেছে। গুজরাটে নর্মদা নদীর ওপর নির্মিত সর্দার সরোবর বাঁধ ভারতের অন্যতম বৃহৎ বহুমুখী নদী প্রকল্প। এটি গুজরাট, রাজস্থান ও মধ্যপ্রদেশের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে সেচব্যবস্থা, পানীয় জল সরবরাহ এবং জলবিদ্যুৎ উৎপাদনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। কৃষি, শিল্প ও পানীয় জলের প্রধান উৎস হওয়ায় নর্মদাকে "মধ্যপ্রদেশের জীবনরেখা" বলা হয়।
◼ তাপ্তি
● উৎস: মধ্যপ্রদেশের বেতুল জেলার সাতপুরা পর্বতমালার অন্তর্গত মুলতাই অঞ্চল থেকে তাপ্তি নদীর উৎপত্তি হয়েছে।
● দৈর্ঘ্য: তপ্তি নদীর দৈর্ঘ্য প্রায় 724 কিলোমিটার।
● গতিপথ: নর্মদা নদীর প্রায় সমান্তরালে প্রবাহিত তাপ্তি নদী মধ্যপ্রদেশ, মহারাষ্ট্র ও গুজরাটের মধ্য দিয়ে পশ্চিমদিকে প্রবাহিত হয়ে গুজরাটের সুরাট শহরের কাছে খাম্বাত উপসাগরে পতিত হয়েছে। এটিও একটি রিফট উপত্যকার মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। এর প্রধান উপনদীগুলি হলো: পূর্ণা, গিরনা, পাঞ্জহরা, বোরি ও আনের।
● গুরুত্ব: তাপ্তি নদীর ওপর নির্মিত উকাই বাঁধ গুজরাটের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সেচ ও জলবিদ্যুৎ প্রকল্প। এটি বন্যা নিয়ন্ত্রণেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ভারতের অন্যতম প্রধান বাণিজ্যিক কেন্দ্র সুরাট তাপ্তি নদীর মোহনায় অবস্থিত। তপ্ত নদীর জল এই অঞ্চলের শিল্পোন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে। এছাড়া তাপ্তি অববাহিকার কৃষ্ণ মৃত্তিকা অঞ্চল তুলো চাষের জন্য বিশেষ বিখ্যাত।
অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ পশ্চিমবাহিনী নদী
● মাহি: মধ্যপ্রদেশ থেকে উৎপন্ন হয়ে গুজরাটের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে।
● সবরমতী: রাজস্থানের আরাবল্লী পর্বতমালা থেকে উৎপন্ন হয়ে গুজরাটের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে।
আরো পড়ুন:
ভারতের ভূ-প্রাকৃতিক বিভাগ গুলির বর্ণনা

0 Comments