ষোড়শ মহাজনপদের ইতিহাস (৬০০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দ থেকে ৩২১ খ্রিস্টপূর্বাব্দ)

পরবর্তী বৈদিক যুগে ছোট ছোট জন পদ গুলি যুক্ত হয়ে অপেক্ষাকৃত বড় জনপদে পরিণত হয়। 'জনপদ' কথাটির আভিধানিক অর্থ হল সেই স্থান, যেখানে 'জন' বা মানুষ নিজেদের বসতি স্থাপন করে। পরবর্তী বৈদিক যুগের শেষের দিকে এই জনপদগুলিই ধীরে ধীরে আরও বড় ও শক্তিশালী হয়ে রূপান্তরিত হয় মহাজনপদে। খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ শতকের দিকে উত্তর ভারতে এরকম ১৬ টি বৃহৎ রাজ্য গড়ে উঠেছিল, এদের একত্রে বলা হয় 'ষোড়শ মহাজনপদ'।


16-Mahajanapadas-Map-in-bengali
ষোড়শ মহাজনপদের মানচিত্র (আনুমানিক অবস্থান)

ষোড়শ মহাজনপদের নাম ও রাজধানীর তালিকা (এক নজরে)


মহাজনপদ রাজধানী অবস্থান
1. অঙ্গ চম্পা বিহার (মুঙ্গের ও ভাগলপুর)
2. মগধ রাজগৃহ/গিরিব্রজ, পরে পাটলিপুত্র বিহার (পাটনা ও গয়া)
3. কাশী বেনারস/বারাণসী উত্তরপ্রদেশের বারাণসীর আশেপাশে
4. কোশল শ্রাবন্তী উত্তর প্রদেশ (পূর্ব ভাগ)
5. বৃজি বৈশালী বিহার (বৈশালী, মুজাফফরপুর)
6. মল্ল কুশিনগর ও পাবা উত্তর প্রদেশ (গোরক্ষপুর)
7. চেদি শুক্তিমতী বুন্দেলখণ্ড অঞ্চল
8. বৎস কৌশাম্বী উত্তর প্রদেশ (এলাহাবাদের কাছে)
9. কুরু ইন্দ্রপ্রস্থ ও হস্তিনাপুর দিল্লি ও মীরাট অঞ্চল
10. পাঞ্চাল অহিচ্ছত্র ও কাম্পিল্য উত্তর প্রদেশ (গঙ্গা-যমুনা দোয়াবের উচ্চাংশ)
11. মৎস্য বিরাটনগর রাজস্থান (জয়পুর)
12. সূরসেন মথুরা উত্তর প্রদেশ (মথুরা)
13. অস্মক পোটালি বা পোটান গোদাবরী নদীর তীরে (দক্ষিণ ভারত)
14. অবন্তী উজ্জয়িনী ও মহিষ্মতী মধ্য প্রদেশ (মালব অঞ্চল)
15. গান্ধার তক্ষশীলা পাকিস্তান (পেশোয়ার ও রাওয়ালপিন্ডি)
16. কম্বোজ রাজপুর কাশ্মীর ও আফগানিস্তান

মহাজনপদগুলির উত্থানের কারণ


১. কৃষির প্রসার ও উৎপাদন বৃদ্ধি: খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ শতাব্দীর দিকে লোহার লাঙ্গলের ব্যবহার এবং উর্বর গাঙ্গেয় সমভূমির কারণে এই অঞ্চলে কৃষির ব্যাপক অগ্রগতি ঘটে এবং উৎপাদন বহুগুণ বেড়ে যায়। যার ফলে জনপদ গুলিতে জনসংখ্যা বৃদ্ধি ও অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি ঘটে মহাজনপদের ভিত গঠিত হয়।


২. অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি: কৃষিজ উৎপাদন বৃদ্ধি পাওয়ায় এই অঞ্চলে বিস্তীর্ণ এলাকায় অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি আসে। সেই সঙ্গে উৎপাদিত কৃষিজাত পণ্য বা শস্য ক্রয় বিক্রয়ের মাধ্যমে ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসার ঘটতে থাকে। নতুন নতুন বণিক শ্রেণী ও কারিগর শ্রেণীর উত্থান হয়, যারা রাষ্ট্রকে কর দিতে সক্ষম ছিল। ফলে বাণিজ্যের ব্যাপক বৃদ্ধির কারণে নগর কেন্দ্রগুলি জনপদ থেকে মহাজনপদে রূপান্তরিত হয়।


৩. সামরিক শক্তি বৃদ্ধি: সেইসময় সম্পদ এবং উর্বর জমির অধিকার নিয়ে জনপদগুলির মধ্যে সংঘর্ষ অনেক বেড়ে যায়। এই যুদ্ধে টিকে থাকার জন্য ক্ষুদ্র জনপদগুলি একত্রিত হয়ে বৃহৎ মহাজনপদে পরিণত হয়।


৪. ভৌগোলিক সুবিধা: উর্বর গাঙ্গেয় সমভূমি ছিল কৃষি কাজের জন্য বিশেষ উপযোগী। সেই সঙ্গে এই অঞ্চল ছিল যথেষ্ট লৌহ সমৃদ্ধ যা অস্ত্র ও অন্যান্য সরঞ্জাম তৈরি সহজ করে তুলেছিল। এছাড়া, কিছু মহাজনপদের বিশেষ সুবিধা ছিল নদী দ্বারা সুরক্ষিত রাজধানী। যেমন মগধের রাজগৃহ ছিল পাঁচটি পাহাড় দ্বারা সুরক্ষিত।


এই সময়ে বেশিরভাগ রাজ্যেই রাজতান্ত্রিক শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়, যদিও কিছু মহাজনপদ 'গণ' বা 'সংঘ' নামে পরিচিত প্রজাতন্ত্র বা গণতান্ত্রিক কাঠামো বজায় রেখেছিল (যেমন: বৃজি, মল্ল)।


ষোড়শ মহাজনপদের পরিচিতি


বৌদ্ধ ধর্মগ্রন্থ 'অঙ্গুত্তর নিকায়', জৈন ধর্মগ্রন্থ 'ভগবতী সূত্র' এবং অন্যান্য প্রাচীন সাহিত্য গুলি থেকে এই ষোলোটি মহাজনপদের নাম জানা যায়। প্রতিটি মহাজন পদের বর্ণনা নিচে দেওয়া হল:


1. অঙ্গ


ষোড়শ মহাজনপদের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এবং প্রাচীন একটি রাজ্য ছিল অঙ্গ। প্রাচীন ভারতের পূর্ব সীমান্তে অবস্থিত এই রাজ্যটি তৎকালীন সময়ে বাণিজ্য, সংস্কৃতি এবং নৌ-পরিবহনের একটি অন্যতম প্রধান কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত ছিল।

​◼ অঙ্গ রাজ্যের অবস্থান ও সীমানা


● মূল কেন্দ্র: ​অঙ্গ রাজ্যটি বিস্তৃত ছিল মূলত বর্তমান ভারতের বিহার এবং পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের কিছু অংশ জুড়ে। বর্তমান বিহারের ভাগলপুর এবং মুঙ্গের জেলা দুটি ছিল অঙ্গের মূল ভূখণ্ড।


সীমানা: অঙ্গ রাজ্যের উত্তর ও পূর্বে প্রবাহিত হতো গঙ্গা নদী। পশ্চিম দিকে চম্পা নদী অঙ্গ রাজ্যকে তার চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী প্রতিবেশী রাজ্য মগধ থেকে পৃথক করত। মহাভারতের তথ্য অনুযায়ী, এটি পূর্ব দিকে সমুদ্র উপকূল অর্থাৎ বঙ্গোপসাগর পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। এর মধ্যে বর্তমান ঝাড়খণ্ডের সাঁওতাল পরগনা এবং পশ্চিমবঙ্গের কিছু অংশও অন্তর্ভুক্ত ছিল।


​◼ অঙ্গ রাজ্যের ​রাজধানী


● নামকরণ: ​অঙ্গ রাজ্যের রাজধানী ছিল চম্পা। এটি তৎকালীন ভারতের অন্যতম প্রধান মহানগরি হিসেবে খ্যাত ছিল। প্রাচীনকালে এই শহরটি 'মালিনী' নামে পরিচিত ছিল। অনেকের মতে, পরে চম্পক বৃক্ষের প্রাচুর্য বা রাজা চম্পার নামানুসারে এর নাম হয় চম্পা।


বাণিজ্যিক গুরুত্ব: চম্পা নদী ও গঙ্গা নদীর সংযোগস্থলে অবস্থিত হওয়ায় চম্পা নগরী একটি বিখ্যাত নদী-বন্দর হয়ে উঠেছিল। এখান থেকে সুদূর দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া এবং শ্রীলঙ্কায় বড় বড় বাণিজ্যতরী গুলি যাতায়াত করত।


সুরক্ষা: বৌদ্ধ গ্রন্থ অনুযায়ী, চম্পা শহরটি একটি বিশাল দুর্গ ও প্রাচীর দ্বারা ঘেরা ছিল, যাতে শত্রুরা সহজে আক্রমণ করতে না পারে।


​◼ ঐতিহাসিক ও পৌরাণিক প্রেক্ষাপট


​হিন্দু, বৌদ্ধ এবং জৈন তিন ধর্মের গ্রন্থেই অঙ্গ রাজ্যের উল্লেখ  অত্যন্ত গুরুত্ব সহকারে পাওয়া যায়।


মহাভারত ও পুরাণ অনুসারে: মহাভারতের কাহিনী অনুযায়ী, অঙ্গ রাজ্যের রাজা ছিলেন কর্ণ । দুর্যোধন তাকে এই রাজ্যের সিংহাসনে বসিয়েছিলেন। তাই কর্ণের আরেক নাম ছিল 'অঙ্গরাজ'। এছাড়া পৌরাণিক তথ্যমতে, রাজা তিতিক্ষুর এক বংশধর ছিলেন রাজা 'অঙ্গ'। তার নামানুসারেই নাকি এই অঞ্চলের নামকরণ হয়েছিল।


বৌদ্ধ ও জৈন ধর্ম অনুসারে: গৌতম বুদ্ধ এবং জৈন তীর্থঙ্কর মহাবীর উভয়েই চম্পা নগরীতে দীর্ঘ সময় অতিবাহিত করেছিলেন এবং ধর্ম প্রচার করেছিলেন। এছাড়া জানা যায়, চম্পা ছিল জৈন ধর্মের দ্বাদশ তীর্থঙ্কর বাসুপূজ্যের জন্ম ও নির্বাণ ভূমি।


​◼ অঙ্গ রাজ্যের ​শাসনব্যবস্থা ও অর্থনীতি


● শাসনব্যবস্থা: অঙ্গ একটি শক্তিশালী রাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র ছিল। বিভিন্ন প্রাচীন সূত্রে জানা যায়, এখানকার রাজারা 'ব্রহ্মদত্ত' উপাধি বা নাম ব্যবহার করতেন।


অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি: ভূপ্রকৃতিগত দিক থেকে অঙ্গ রাজ্যের জমি ছিল অত্যন্ত উর্বর। তাই এই অঞ্চল চাষবাসের ক্ষেত্রে বেশি সমৃদ্ধ ছিল। অঙ্গ রাজ্যটি সুতি বস্ত্র এবং রেশম উৎপাদনেও বিশেষ খ্যাতি খ্যাতি অর্জন করেছিল। এই কারণে চম্পার বণিকরা একসময় অত্যন্ত ধনী ও প্রভাবশালী হয়ে উঠেছিলেন।


​◼ অঙ্গ রাজ্যের পতন

অঙ্গ রাজ্যের প্রতিবেশী মগধ রাজ্য ছিল তাদের চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী। ক্ষমতা নিয়ে তাদের মধ্যে লড়াই ছিল দীর্ঘদিনের। নদী অববাহিকার নিয়ন্ত্রণ এবং বাণিজ্যিক আধিপত্য বজায় রাখাই ছিল এই সংঘাতের মূল কারণ।


​শুরুর দিকে অঙ্গের রাজারা বেশ শক্তিশালী ছিলেন এবং তারা মগধের কিছু অংশ জয় করে নিয়েছিলেন।


​কিন্তু খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ শতকে মগধের হর্যঙ্ক বংশের শক্তিশালী রাজা বিম্বিসার অঙ্গ রাজ্য আক্রমণ করেন। তিনি অঙ্গের শেষ স্বাধীন রাজা ব্রহ্মদত্তকে যুদ্ধে পরাজিত করে অঙ্গ রাজ্যকে মগধ সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত করেন। এরপর তার পুত্র অজাতশত্রুকে সেখানকার রাজ্যপাল হিসেবে নিযুক্ত করেন।


2. মগধ


​ষোড়শ মহাজনপদের মধ্যে মগধের ভৌগোলিক অবস্থান ছিল সবচেয়ে কৌশলগত ও সুরক্ষিত। এই অনুকূল অবস্থানই পরবর্তীকালে মগধকে উত্তর ভারতের সবথেকে শক্তিশালী রাষ্ট্রে পরিণত হতে সাহায্য করেছিল।


◼ মগধের অবস্থান ও সীমানা


মূল কেন্দ্র: বর্তমান ভারতের বিহার রাজ্যের পাটনা, গয়া, নালন্দা এবং শাহাবাদ জেলার বিস্তীর্ণ অঞ্চল নিয়ে প্রাচীন মগধ রাজ্য গঠিত হয়েছিল।


সীমানা: মগধের উত্তর সীমান্তে প্রবাহিত ছিল গঙ্গা নদী, পশ্চিম সীমান্তে সোন নদী এবং পূর্ব সীমান্তে চম্পা নদী। দক্ষিণ দিকে ছিল বিন্ধ্য পর্বতমালার দুর্ভেদ্য পাহাড় ও জঙ্গল। এই প্রাকৃতিক সীমানাগুলিই মগধকে বহিঃশত্রুর আক্রমণ থেকে সুরক্ষা প্রদান করত।


◼ মগধের ​রাজধানী


​মগধের ইতিহাসে দুটি প্রধান রাজধানীর উল্লেখ পাওয়া যায়। এগুলি হল:


রাজগৃহ বা গিরিব্রজ: মগধের প্রথম তথা প্রাচীন রাজধানী ছিল রাজগৃহ বা গিরিব্রজ। এই শহরটি ঘেরা ছিল পাঁচটি পাহাড় দিয়ে। যার ফলে এটি একটি প্রাকৃতিক দুর্গের মতো কাজ করত। শত্রুদের পক্ষে এই শহরে আক্রমণ করা যথেষ্ট কঠিন ছিল।


পাটলিপুত্র: পরবর্তীতে হর্যঙ্ক বংশের রাজা উদয়ীন গঙ্গা, সোন ও গন্ধক নদীর মিলনস্থলে পাটলিপুত্র নগরী গড়ে তোলেন এবং রাজধানী সেখানে স্থানান্তরিত করেন। জলপথের বাণিজ্যের জন্য এই শহরের গুরুত্ব ছিল অপরিসীম।


◼ ঐতিহাসিক ও পৌরাণিক প্রেক্ষাপট


​হিন্দু পৌরাণিক কাহিনী থেকে শুরু করে বৌদ্ধ ও জৈন ধর্মেও মগধের উল্লেখ পাওয়া যায়।


মহাভারত ও পুরাণ অনুসারে: পৌরাণিক কাহিনি অনুসারে, মগধের প্রাচীনতম রাজবংশ ছিল বৃহদ্রথ বংশ। এই বংশের সবচেয়ে বিখ্যাত এবং পরাক্রমশালী রাজা ছিলেন জরাসন্ধ। মহাভারতের বর্ণনা অনুযায়ী, শ্রীকৃষ্ণের নির্দেশনায় ভীম মল্লযুদ্ধে জরাসন্ধকে পরাজিত করে বধ করেন।


বৌদ্ধ ও জৈন ধর্ম অনুসারে: বৌদ্ধ ও জৈন উভয় ধর্মেরই অন্যতম প্রধান কেন্দ্র ছিল মগধ। গৌতম বুদ্ধ মগধের উরুবিল্ব অঞ্চলে দিব্যজ্ঞান বা বোধি লাভ করেছিলেন। জৈন ধর্মের ২৪তম তীর্থঙ্কর মহাবীরও তাঁর জীবনের বেশিরভাগ সময় মগধেই ধর্ম প্রচার করে কাটিয়েছিলেন। তাছাড়া, বিম্বিসার ও অজাতশত্রুর মতো শাসকরা এই দুই ধর্মেরই পৃষ্ঠপোষকতা করেছিলেন।


◼ মগধের শাসনব্যবস্থা ও অর্থনীতি


● শাসনব্যবস্থা: মগধ ছিল একটি অত্যন্ত শক্তিশালী ও সুসংগঠিত রাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র। রাজারা বংশানুক্রমিকভাবে শাসন করতেন এবং তাঁদের অধীনে বৃহৎ স্থায়ী সেনাবাহিনী ছিল। পদাতিক, অশ্বারোহী, রথবাহিনী ও বিশেষত হস্তীবাহিনী ছিল মগধের সামরিক শক্তির প্রধান ভিত্তি।


অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি: মগধ ছিল তৎকালীন ভারতের সবচেয়ে ধনী মহাজনপদ। গঙ্গা ও সোন নদীর উর্বর পলিমাটির কারণে এই অঞ্চল কৃষিক্ষেত্রে ব্যাপক সমৃদ্ধ ছিল। এছাড়া এই অঞ্চলে সমৃদ্ধ লৌহ আকরিকের ভাণ্ডার মগধকে উন্নত কৃষিযন্ত্র ও শক্তিশালী অস্ত্র নির্মাণে সহায়তা করেছিল।


◼ মগধের উত্থান


মগধের শক্তি বৃদ্ধির মূল কারণ ছিল এর দক্ষ শাসকগণ ও ধারাবাহিক সামরিক সাফল্য। বিম্বিসার, অজাতশত্রু এবং মহাপদ্মনন্দের মতো দূরদর্শী ও শক্তিশালী শাসকদের নেতৃত্বে মগধ বাকি সমস্ত মহাজনপদকে একে একে গ্রাস করে নেয়।


হর্যঙ্ক বংশ: রাজা বিম্বিসার প্রতিবেশী অঙ্গ রাজ্য জয় করে সেটিকে মগধের সাথে যুক্ত করেন। তাঁর পুত্র অজাতশত্রু দীর্ঘ ১৬ বছর লড়াইয়ের পর শক্তিশালী বজ্জি (বৃজি) প্রজাতান্ত্রিক সংঘ জয় করেন এবং তারপর কোশল রাজ্যের ওপরেও প্রভাব বিস্তার করেন।


শিশুনাগ ও নন্দ বংশ: পরবর্তীকালে শিশুনাগ বংশ মগধের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী অবন্তী রাজ্যকে পরাজিত করে। এরপর নন্দ বংশের সম্রাট মহাপদ্মনন্দ একে একে উত্তর ভারতের বহু মহাজনপদ জয় করে নেন। তার শাসনকালেই মগধক ভারতের ইতিহাসে প্রথম বিশাল ও অখণ্ড একক সাম্রাজ্যে পরিণত হয়।


3. কাশী


কাশী ছিল ষোড়শ মহাজনপদের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটি রাজ্য। ভৌগোলিক অবস্থান গঙ্গা উপত্যকার কেন্দ্রীয় অঞ্চলে হওয়ায় এটি একসময় কৃষি, বাণিজ্য ও সংস্কৃতির এক প্রধান কেন্দ্র পরিণত হয়েছিল।


◼ কাশীর অবস্থান ও সীমানা


​কাশী রাজ্যের ভৌগোলিক অবস্থান ছিল প্রাচীন ভারতের মধ্য-গাঙ্গেয় উপত্যকায়, যা প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরপুর ছিল।


মূল কেন্দ্র: বর্তমান ভারতের উত্তরপ্রদেশ রাজ্যের বারাণসী এবং তার আশপাশের অঞ্চল নিয়ে প্রাচীন কাশী রাজ্য গঠিত হয়েছিল।


সীমানা: কাশীর উত্তর ও দক্ষিণে যথাক্রমে বরণা এবং অসি নদী প্রবাহিত হতো। পূর্ব দিকে প্রবাহিত হতো পবিত্র গঙ্গা নদী। এই নদীমাতৃক অবস্থানের কারণে কাশীর ভূমি ছিল অত্যন্ত উর্বর।


◼ কাশীর ​রাজধানী


​কাশী রাজ্যের রাজধানীর নাম ছিল বারাণসী। এটি প্রাচীন বিশ্বের অন্যতম প্রাচীন এবং নিরবচ্ছিন্নভাবে বসবাসকারী শহর হিসেবে খ্যাত।


নামকরণ: বরণা এবং অসি নদী দুটির সংযোগস্থলে অবস্থিত হওয়ায় এই শহরের নাম হয়েছিল বারাণসী। এটি 'কাশীপুরী' নামেও পরিচিত ছিল।


বাণিজ্যিক গুরুত্ব: গঙ্গা নদীর তীরে কৌশলগত অবস্থানের কারণে বারাণসী ছিল উত্তর ভারতের অন্যতম প্রধান বাণিজ্যিক কেন্দ্র। এখান থেকে স্থলপথ ও জলপথে ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলের বাণিজ্য চলত।


◼ ঐতিহাসিক ও পৌরাণিক প্রেক্ষাপট


মহাভারত ও পুরাণ অনুসারে: পৌরাণিক কাহিনী অনুযায়ী, এই শহরটি ছিল ভগবান শিবের অত্যন্ত প্রিয়। মহাভারতে কাশীর রাজকন্যা অম্বা, অম্বিকা এবং অম্বালিকার স্বয়ম্বরের উল্লেখ পাওয়া যায়। সেই স্বয়ম্বর থেকেই ভীষ্ম তাদের হরণ করেছিলেন।


বৌদ্ধ ও জৈন ধর্ম অনুসারে: বৌদ্ধ 'জাতক' গল্পগুলোতে কাশীর রাজাদের শাসনকাল এবং বারাণসীর সমৃদ্ধি সম্পর্কে অসংখ্য গল্প রয়েছে। জৈন ধর্মগ্রন্থ অনুযায়ী, জৈন ধর্মের ২৩তম তীর্থঙ্কর পার্শ্বনাথ এই কাশীতেই জন্মগ্রহণ করেছিলেন এবং তাঁর পিতা অশ্বসেন ছিলেন কাশীর রাজা।


◼ কাশীর ​শাসনব্যবস্থা ও অর্থনীতি


● শাসনব্যবস্থা: কাশী ছিল একটি রাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র। বিভিন্ন বৌদ্ধ জাতক কাহিনিতে কাশীর রাজাদের ‘ব্রহ্মদত্ত’ নামে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে এটি কোনো একক রাজার নাম নয়। অনেক ক্ষেত্রে এটি একটি উপাধি বা রাজবংশীয় নাম হিসেবেও ব্যবহৃত হয়েছে বলে মনে করা হয়।


অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি: কাশী ছিল তৎকালীন ভারতের অন্যতম সমৃদ্ধ রাজ্য। বিশেষ করে উৎকৃষ্ট মানের সূতি ও রেশমি বস্ত্রের জন্য এটি বিশেষ সুপ্রসিদ্ধ ছিল। এছাড়া হাতির দাঁতের শিল্প, সুগন্ধি দ্রব্য, ধাতব সামগ্রী ও মৃৎশিল্পেরও উল্লেখযোগ্য বিকাশ ঘটেছিল।


◼ কাশী রাজ্যের পতন


খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ শতকের পূর্বে কাশী উত্তর ভারতের অন্যতম শক্তিশালী মহাজনপদ ছিল। তবে পরবর্তীকালে প্রতিবেশী কোশল রাজ্যের সঙ্গে তীব্র দ্বন্দ্ব শুরু হয়। প্রথমদিকে কখনো কাশী কোশলের ওপর আধিপত্য বিস্তার করেছিল, আবার কখনো কোশল কাশীকে পরাজিত করেছিল। তবে শেষ পর্যন্ত কোশল রাজ্য কাশীর ওপর স্থায়ী নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করলে কাশী তার স্বাধীনতা হারায়।


কোশলরাজ মহাকোশল তাঁর কন্যা কোশল দেবীর সঙ্গে  মগধরাজ বিম্বিসারের বিবাহ দেন। সেই বিবাহে তিনি কাশীর একটি গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল যৌতুক হিসেবে বিম্বিসারকে প্রদান করেছিলেন। পরবর্তীকালে অজাতশত্রু ও কোশলরাজ প্রসেনজিতের মধ্যে সংঘর্ষের পর কাশী অঞ্চল মগধের প্রভাবাধীন হয়ে পড়ে।


মগধ সাম্রাজ্যের ক্রমবর্ধমান শক্তির ফলে কাশীর স্বাধীন রাজনৈতিক অস্তিত্ব বিলুপ্ত হয় এবং একসময় এটি বৃহত্তর মগধ সাম্রাজ্যের অংশে পরিণত হয়।


4. কোশল


ষোড়শ মহাজনপদের অন্যতম শক্তিশালী এবং বিস্তীর্ণ রাজ্য ছিল কোশল। এটি প্রাচীন ভারতের মধ্য-গাঙ্গেয় উপত্যকার একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল জুড়ে বিস্তৃত ছিল।


◼ কোশলের অবস্থান ও সীমানা

মূল কেন্দ্র: বর্তমান ভারতের উত্তরপ্রদেশের অযোধ্যা অঞ্চল এবং নেপালের তরাই অঞ্চলের কিছু অংশ নিয়ে প্রাচীন কোশল রাজ্য গঠিত হয়েছিল।


সীমানা: কোশলের উত্তরে ছিল হিমালয় পর্বতমালা, দক্ষিণে স্যন্দিকা  নদী, পূর্বে সদানীরা নদী এবং পশ্চিমে পাঞ্চাল রাজ্য। সরযূ নদী রাজ্যটিকে উত্তর কোশল ও দক্ষিণ কোশল নামে দুটি ভাগে বিভক্ত করেছিল।


◼ কোশলের ​রাজধানী


কোশল রাজ্যের ইতিহাসে দুটি গুরুত্বপূর্ণ রাজধানীর উল্লেখ পাওয়া যায়।


● শ্রাবস্তী: উত্তর কোশলের রাজধানী ছিল শ্রাবস্তী। বুদ্ধদেবের সময়ে এটি ছিল রাজ্যের প্রধান প্রশাসনিক ও বাণিজ্যিক কেন্দ্র।


● অযোধ্যা বা সাকেত: দক্ষিণ কোশলের রাজধানী অযোধ্যা বা সাকেত। রামায়ণের যুগ থেকেই এই শহরটি অত্যন্ত পবিত্র ও ঐতিহাসিক নগরী হিসেবে খ্যাত ছিল।


◼ ঐতিহাসিক ও পৌরাণিক প্রেক্ষাপট


রামায়ণ ও পুরাণ অনুসারে: হিন্দু পৌরাণিক কাহিনী এবং রামায়ণ অনুযায়ী, কোশল ছিল সূর্যবংশীয় ইক্ষ্বাকু রাজাদের রাজ্য। এই বংশেরই পরম পূজনীয় অবতার শ্রীরামচন্দ্র অযোধ্যায় রাজত্ব করেছিলেন। পুরাণে কোশলকে একটি অত্যন্ত পুণ্যভূমি হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে।


বৌদ্ধ ও জৈন ধর্ম: বৌদ্ধ ধর্মে কোশলের গুরুত্ব অপরিসীম। গৌতম বুদ্ধ তাঁর জীবনের বহু বর্ষাবাস শ্রাবস্তীর জেতবন বিহারে কাটিয়েছিলেন। জৈন ধর্মগ্রন্থ অনুযায়ী, জৈন ধর্মের প্রথম তীর্থঙ্কর ঋষভনাথ বা আদিনাথ-সহ আরও কয়েকজন তীর্থঙ্করের জন্মভূমি ছিল অযোধ্যা নগরী।


◼ কোশলের ​শাসনব্যবস্থা ও অর্থনীতি


● শাসনব্যবস্থা: কোশল ছিল একটি শক্তিশালী রাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র। বুদ্ধদেবের সময় এই রাজ্যের বিখ্যাত শাসক ছিলেন রাজা প্রসেনজিৎ। তিনি গৌতম বুদ্ধের প্রতি গভীর শ্রদ্ধাশীল ছিলেন।


● অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি: সরযূ ও রাপ্তী নদীর উর্বর অববাহিকার কারণে কোশল রাজ্য ছিল কৃষিতে অত্যন্ত উন্নত। এছাড়া উত্তর ভারত থেকে পূর্ব ভারত এবং নেপালের দিকে যাওয়ার প্রধান বাণিজ্যিক পথগুলি কোশলের ওপর দিয়ে যেত। ফলে ব্যবসা-বাণিজ্য থেকে এই রাজ্য প্রচুর রাজস্ব আদায় করত।


◼ কোশল রাজ্যের পতন


কোশল রাজ্যটি দীর্ঘদিন উত্তর ভারতের অন্যতম প্রধান শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত ছিল। তবে মগধের উত্থানের ফলে তার প্রভাব ধীরে ধীরে হ্রাস পায়।


প্রথম দিকে কাশী রাজ্যের সঙ্গে কোশলের মধ্যে দীর্ঘদিন আধিপত্যের লড়াই চলেছিল। শেষ পর্যন্ত কোশল কাশীর ওপর প্রভাব প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়।


এরপর কোশলরাজ মহাকোশল তাঁর কন্যা কোশল দেবীর বিবাহ দেন মগধরাজ বিম্বিসারের সঙ্গে। বিবাহে কোশলরাজ কাশীর একটি রাজস্বসমৃদ্ধ অঞ্চল যৌতুক হিসেবে বিম্বিসারকে প্রদান করেন। পরবর্তীকালে এই অঞ্চলকে কেন্দ্র করেই মগধ ও কোশলের মধ্যে সংঘর্ষ শুরু হয়।


এরপর প্রসেনজিতের মৃত্যুর পর কোশলের রাজনৈতিক শক্তি দুর্বল হয়ে পড়ে। সেই সুযোগে শক্তিশালী মগধ রাজ্য কোশলকে নিজেদের অধীনস্থ করতে সক্ষম হয়। ফলে কোশলের স্বাধীন রাজনৈতিক অস্তিত্বের অবসান ঘটে এবং এটি মগধ সাম্রাজ্যের অংশে পরিণত হয়।


5. বৃজি বা বজ্জি


ষোড়শ মহাজনপদের মধ্যে বৃজি বা বজ্জি ছিল একটি অনন্য ও শক্তিশালী প্রজাতান্ত্রিক রাষ্ট্র। এটি তৎকালীন অন্যান্য রাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রের তুলনায় ভিন্ন শাসনব্যবস্থার জন্য বিশেষভাবে পরিচিত ছিল।


◼ বৃজির অবস্থান ও সীমানা

● মূল কেন্দ্র: বর্তমান বিহারের উত্তরাঞ্চল, অর্থাৎ বৈশালী, মুজাফ্ফরপুর, সীতামঢ়ি, দরভাঙ্গা এবং চম্পারণ জেলার বিস্তীর্ণ অঞ্চল নিয়ে বৃজি সংঘ গঠিত হয়েছিল। এর কিছু অংশ বর্তমান নেপালের তরাই অঞ্চল পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল।


● সীমানা: বৃজির দক্ষিণে ছিল গঙ্গা নদী, যা এটিকে মগধ থেকে পৃথক করেছিল। এর পূর্ব সীমান্তে মহানন্দা নদী, পশ্চিমে গণ্ডক বা সদানীরা নদী এবং উত্তরে হিমালয়ের পাদদেশীয় অঞ্চল অবস্থিত ছিল।


◼ বৃজির রাজধানী


বৃজি সংঘের রাজধানী ছিল বৈশালী। এটি প্রাচীন ভারতের অন্যতম সমৃদ্ধ ও উন্নত নগরী হিসেবে পরিচিত ছিল।


● গঠনশৈলী: ​বৈশালী শহরটি তিনটি বিশাল প্রাচীর ও দুর্গ দ্বারা পরিবেষ্টিত ছিল। বৌদ্ধ গ্রন্থ অনুযায়ী, এই শহরটি ছিল অত্যন্ত জনবহুল এবং এখানে অসংখ্য অট্টালিকা, পদ্মপুকুর ও আম্রকানন ছিল।


● বাণিজ্যিক গুরুত্ব: গঙ্গা উপত্যকার গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যপথের ওপর অবস্থিত হওয়ায় বৈশালী উত্তর ভারতের একটি প্রধান বাণিজ্যিক কেন্দ্রে পরিণত হয়েছিল।


◼ ঐতিহাসিক ও পৌরাণিক প্রেক্ষাপট


রামায়ণ ও পুরাণ অনুসারে: পৌরাণিক কাহিনী এবং রামায়ণ অনুযায়ী, বৈশালীর প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন ইক্ষ্বাকু বংশের রাজা বিশাল। শ্রীরামচন্দ্র ও লক্ষ্মণ বিশ্বামিত্র মুনির সাথে মিথিলা যাওয়ার পথে এই বৈশালী নগরী দর্শন করেছিলেন। এছাড়া বৃজি সংঘের অন্তর্গত মিথিলা অঞ্চল ছিল রাজা জনকের রাজ্য এবং সীতার জন্মভূমি।


বৌদ্ধ ও জৈন ধর্ম অনুসারে: বৌদ্ধ গ্রন্থ অনুসারে, গৌতম বুদ্ধ বহুবার বৈশালীতে এসেছিলেন এবং তাঁর জীবনের শেষ বর্ষাবাস এখানেই কাটিয়েছিলেন। বৈশালীর বিখ্যাত নর্তকী আম্রপালী বুদ্ধদেবের শিষ্যাত্ব গ্রহণ করেছিলেন এবং তাঁর আম্রকাননটি বৌদ্ধ সংঘকে দান করেছিলেন। অন্যদিকে জৈন ধর্ম অনুসারে, জৈন ধর্মের ২৪তম তীর্থঙ্কর মহাবীর বৈশালীর নিকটবর্তী কুন্দগ্রামে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। ফলে বৈশালী জৈন ধর্মাবলম্বীদের কাছে অত্যন্ত পবিত্র স্থান হিসেবে পরিচিত।


◼ বৃজির ​শাসনব্যবস্থা ও অর্থনীতি


● শাসনব্যবস্থা: বৃজি ছিল একটি শক্তিশালী গণসংঘ বা প্রজাতান্ত্রিক রাষ্ট্র। এটি কয়েকটি গোষ্ঠীর সমন্বয়ে গঠিত ছিল। এর মধ্যে লিচ্ছবি, বিদেহ ও জ্ঞাতৃক গোষ্ঠী বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত সভার মাধ্যমে গৃহীত হতো। এই কারণে বৃজিকে প্রাচীন ভারতের অন্যতম গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে বিবেচনা করা হয়।


● অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি: উর্বর গাঙ্গেয় উপত্যকায় অবস্থিত হওয়ায় বৃজি রাজ্য কৃষিকাজে বেশ উন্নত ছিল। কৃষিজ উৎপাদন এবং উন্নত বাণিজ্য ব্যবস্থার কারণে বৃজি অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধ হয়ে উঠেছিল। বৈশালীর ধনী বণিক শ্রেণি রাজ্যের উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করত।


◼ বৃজি রাজ্যের পতন


বৃজির শক্তিশালী ঐক্য এবং সমৃদ্ধি মগধের সম্প্রসারণবাদী নীতির পথে প্রধান বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল।


মগধের রাজা অজাতশত্রু বৃজিকে পরাজিত করার জন্য তাঁর চতুর মন্ত্রীকে বৈশালীতে পাঠান। তিনি বৃজি সংঘের বিভিন্ন গোষ্ঠীর মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করার চেষ্টা করেন।


এরপর দীর্ঘ সংঘর্ষ ও অভ্যন্তরীণ দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে অজাতশত্রু বৃজি আক্রমণ করেন। অবশেষে খ্রিস্টপূর্ব পঞ্চম শতকে বৃজি সংঘ মগধের অধীনে চলে যায়।


6. মল্ল


ষোড়শ মহাজনপদের মধ্যে মল্ল ছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ গণরাজ্য বা প্রজাতান্ত্রিক রাষ্ট্র। এটি প্রাচীন ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে অবস্থিত ছিল।


◼ মল্ল রাজ্যের অবস্থান ও সীমানা

মূল কেন্দ্র: বর্তমান উত্তরপ্রদেশের কুশীনগর, দেওরিয়া, গোরক্ষপুর এবং পার্শ্ববর্তী অঞ্চল নিয়ে প্রাচীন মল্ল রাষ্ট্রটি গঠিত হয়েছিল।


● সীমানা: মল্লের উত্তরে ছিল নেপালের তরাই অঞ্চল, দক্ষিণে কাশী মহাজনপদ, পূর্বে বৃজি সংঘ এবং পশ্চিমে কোশল রাজ্য।


◼ মল্ল রাজ্যের ​রাজধানী


​ভৌগোলিক ও প্রশাসনিক সুবিধার জন্য মল্ল রাজ্যটি দুটি প্রধান শাখায় বিভক্ত ছিল এবং এদের দুটি আলাদা রাজধানী ছিল।


কুশিনারা বা কুশীনগর : মল্ল রাজ্যের একটি প্রধান শাখার রাজধানী ছিল কুশিনারা বা কুশীনগর। বৌদ্ধ ধর্মে এই স্থানটির ঐতিহাসিক গুরুত্ব অপরিসীম। এখানেই গৌতম বুদ্ধ মহাপরিনির্বাণ লাভ করেছিলেন।


পাবা বা পাপাপুরী: মল্ল রাজ্যের দ্বিতীয় শাখার রাজধানী ছিল পাবা বা পাপাপুরী। জৈন ধর্মের ইতিহাসে এই শহরটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এখানেই মহাবীর তাঁর শেষ দিনগুলি অতিবাহিত করেছিলেন এবং মহানির্বাণ লাভ করেছিলেন বলে উল্লেখ পাওয়া যায়


◼ ঐতিহাসিক ও পৌরাণিক প্রেক্ষাপট


মহাভারত ও পুরাণ অনুসারে: মহাভারত অনুযায়ী, মল্লরা ছিল অত্যন্ত বীর এবং যুদ্ধপ্রিয় জাতি। পাণ্ডুপুত্র ভীম তাঁর দিগ্বিজয় যাত্রার সময় মল্ল দেশের রাজাদের পরাজিত করেছিলেন। পুরাণে এদের ইক্ষ্বাকু বংশীয় ক্ষত্রিয় হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। 'মল্ল' শব্দের অর্থ হল যোদ্ধা বা কুস্তিগীর।


বৌদ্ধ ও জৈন ধর্ম: বৌদ্ধ গ্রন্থ অনুসারে, মল্লদের রাজধানী কুশিনগরেই গৌতম বুদ্ধ মহাপরিনির্বাণ লাভ করেন। বুদ্ধের দাহক্রিয়ার পর তাঁর অস্থিভষ্মের একটি অংশ মল্লরা সংরক্ষণ করেছিল এবং তার ওপর স্তূপ নির্মাণ করেছিল। অন্যদিকে জৈন ধর্ম অনুসারে, জৈন ধর্মের ২৪তম তীর্থঙ্কর মহাবীর পাবা নগরীতে মহানির্বাণ লাভ করেছিলেন। ফলে মল্ল অঞ্চল জৈন ধর্মাবলম্বীদের কাছেও অত্যন্ত পবিত্র।


◼ মল্ল রাজ্যের ​শাসনব্যবস্থা ও অর্থনীতি


● শাসনব্যবস্থা: মল্ল ছিল একটি গণরাজ্য বা প্রজাতান্ত্রিক সংঘ। এখানে কোনো একক রাজা শাসন করতেন না। প্রধান ক্ষত্রিয় গোষ্ঠীর প্রতিনিধিরা সভায় মিলিত হয়ে রাষ্ট্র পরিচালনা, আইন প্রণয়ন ও যুদ্ধসংক্রান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতেন।


● অর্থনীতি: উর্বর ভূমি ও নদী অববাহিকার কারণে কৃষিকাজ ছিল মল্ল রাজ্যের অর্থনীতির প্রধান ভিত্তি। কৃষিকাজের পাশাপাশি বনজ সম্পদ, পশুপালন এবং আঞ্চলিক বাণিজ্য থেকেও মল্লরা বেশ লাভবান হতো। উত্তর ভারতের প্রধান বাণিজ্যিক পথগুলির সংলগ্ন হওয়ায় ব্যবসা-বাণিজ্যেও মল্লদের বেশ ভালো পরিচিতি ছিল।


◼ মল্ল রাজ্যের পতন


​মল্লরা বীর জাতি হলেও ছোট রাজ্য হওয়ার কারণে সমসাময়িক বড় বড় রাজতান্ত্রিক রাজ্যগুলির আগ্রাসী নীতির থেকে তাদের সতর্ক থাকতে হতো।


বৃজি ও মল্ল উভয়ই গণরাজ্য হওয়ায় তাদের মধ্যে রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ ছিল।


তবে খ্রিস্টপূর্ব পঞ্চম শতকে মগধের ক্রমবর্ধমান শক্তির সামনে মল্লদের স্বাধীনতা টিকিয়ে রাখা কঠিন হয়ে পড়ে। শেষ পর্যন্ত মগধ সাম্রাজ্য মল্ল রাষ্ট্রকে নিজেদের অন্তর্ভুক্ত করে নেয়। এর ফলে মল্লদের স্বাধীন রাজনৈতিক অস্তিত্বের অবসান ঘটে।


7. চেদি


ষোড়শ মহাজনপদের অন্যতম প্রাচীন রাজ্য ছিল চেদি। এটি মধ্য ভারতের বুন্দেলখণ্ড অঞ্চলে অবস্থিত ছিল এবং উত্তর ও দক্ষিণ ভারতের মধ্যে সংযোগ রক্ষাকারী একটি গুরুত্বপূর্ণ জনপদ হিসেবে পরিচিত ছিল।


◼ চেদির অবস্থান ও সীমানা


● মূল কেন্দ্র: বর্তমান মধ্যপ্রদেশের বুন্দেলখণ্ড অঞ্চল এবং উত্তরপ্রদেশের কিছু সংলগ্ন এলাকা নিয়ে প্রাচীন চেদি রাজ্য গঠিত হয়েছিল।


সীমানা: চেদির উত্তরে ছিল যমুনা নদী, পশ্চিমে অবন্তী রাজ্য এবং পূর্ব ও দক্ষিণে বিন্ধ্য পর্বতমালার পাহাড়ি অঞ্চল। কেন নদী  এই রাজ্যের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হতো এবং কৃষি ও জনজীবনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করত।


◼ চেদির ​রাজধানী


● পরিচিতি: ​চেদি রাজ্যের রাজধানীর ছিল শুক্তিমতি। এটি কেন নদীর তীরে অবস্থিত ছিল বলে মনে করা হয়। বর্তমান মধ্যপ্রদেশের রেওয়া বা উত্তরপ্রদেশের বান্দা জেলার কাছাকাছি এর অবস্থান ছিল বলে ঐতিহাসিকরা মনে করেন।


● বাণিজ্যিক গুরুত্ব: উত্তর ভারতের গঙ্গা-যমুনা উপত্যকা এবং দক্ষিণ ভারতের মধ্যবর্তী বাণিজ্যপথে অবস্থিত হওয়ায় শুক্তিমতি একটি গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যকেন্দ্রে পরিণত হয়েছিল।


◼ ঐতিহাসিক ও পৌরাণিক প্রেক্ষাপট


● মহাভারত অনুসারে: মহাভারতের বিখ্যাত ও বিতর্কিত রাজা শিশুপাল ছিলেন চেদি রাজ্যের শাসক। তিনি ছিলেন শ্রীকৃষ্ণের পিসতুতো ভাই। যুধিষ্ঠিরের রাজসূয় যজ্ঞে কৃষ্ণকে অপমান করার কারণে তিনি কৃষ্ণের হাতে নিহত হন। তাঁর পুত্র ধৃষ্টকেতু পরবর্তীকালে চেদির রাজা হন এবং কুরুক্ষেত্র যুদ্ধে পাণ্ডবদের পক্ষে যোগ দিয়েছিলেন


● বৌদ্ধ সাহিত্য: বৌদ্ধ জাতক কাহিনিতেও চেদি রাজ্যের উল্লেখ পাওয়া যায়, যা এর প্রাচীন ঐতিহ্য ও গুরুত্বের প্রমাণ বহন করে।


◼ চেদি রাজ্যের শাসনব্যবস্থা ও অর্থনীতি


● শাসনব্যবস্থা: চেদি ছিল একটি রাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র। এখানকার রাজারা বংশানুক্রমিকভাবে শাসন করতেন এবং প্রাচীন ভারতের রাজনৈতিক ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন।


● অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি: কৃষি, পশুপালন এবং বনজ সম্পদ ছিল চেদির অর্থনীতির প্রধান ভিত্তি। এছাড়া গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যপথের ওপর অবস্থানের কারণে এই রাজ্যের ব্যবসা-বাণিজ্যও বেশ সমৃদ্ধ ছিল।


◼ চেদি রাজ্যের পতন


চেদি মধ্য ভারতের একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজ্য হলেও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এর রাজনৈতিক প্রভাব হ্রাস পেতে থাকে। প্রথমদিকে চেদি রাজ্য কুরু, বৎস এবং অবন্তীর মতো গুরুত্বপূর্ণ জনপদের সঙ্গে রাজনৈতিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক বজায় রাখত।


তবে খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ ও পঞ্চম শতকে মগধ এবং অবন্তীর মতো শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলোর উত্থানের ফলে চেদির প্রভাব কমতে শুরু করে। অনেকের মতে, নন্দ বংশের পরাক্রমশালী সম্রাট মহাপদ্মনন্দের সময়ে চেদি রাজ্য মগধ সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত হয়।  এর ফলে এটি স্বাধীন রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে নিজের গুরুত্ব হারায়।


8. বৎস


ষোড়শ মহাজনপদের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রাজ্য ছিল বৎস। এটি যমুনা নদীর উর্বর উপত্যকায় অবস্থিত ছিল। উত্তর ভারতের বাণিজ্য ও রাজনীতিতে বৎস রাজ্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করত।


◼ বৎস রাজ্যের অবস্থান ও সীমানা

● মূল কেন্দ্র: বর্তমান উত্তরপ্রদেশের কৌশাম্বী, প্রয়াগরাজ, ফতেহপুর এবং তার আশপাশের কিছু অঞ্চল নিয়ে প্রাচীন বৎস রাজ্য গঠিত হয়েছিল।


● সীমানা: বৎস রাজ্যের উত্তর-পূর্ব সীমান্তে ছিল শক্তিশালী কোশল রাজ্য এবং পূর্ব সীমান্তে ছিল কাশী মহাজনপদ। দক্ষিণ-পশ্চিম সীমান্তে ছিল চেদি রাজ্য এবং উত্তর-পশ্চিম সীমান্তে ছিল কুরু রাজ্য। যমুনা নদী ছিল এই রাজ্যের প্রধান জীবনরেখা।


◼ বৎস রাজ্যের ​রাজধানী


● পরিচিতি: বৎস রাজ্যের রাজধানী ছিল কৌশাম্বী। এটি প্রাচীন ভারতের অন্যতম সমৃদ্ধ নগরী ও বাণিজ্যকেন্দ্র হিসেবে পরিচিত ছিল। প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন থেকে জানা যায় যে কৌশাম্বী একটি সুদৃঢ় প্রাচীর ও পরিখাবেষ্টিত নগরী ছিল।


● বাণিজ্যিক গুরুত্ব: উত্তর ভারতের উত্তরাপথ, পূর্ব ভারতের মগধ অঞ্চল এবং দক্ষিণ ভারতের সঙ্গে সংযোগকারী গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যপথ কৌশাম্বীর মধ্য দিয়ে অতিক্রম করত। ফলে এটি একটি প্রধান বাণিজ্যকেন্দ্রে পরিণত হয়েছিল।


◼ ঐতিহাসিক ও পৌরাণিক প্রেক্ষাপট


● পুরাণ ও মহাভারত অনুসারে: পুরাণ অনুসারে, কুরু বংশের রাজা নিচক্ষু হস্তিনাপুরে বন্যার পর কৌশাম্বীতে এসে নতুন রাজধানী স্থাপন করেছিলেন। ফলে বৎসের রাজারা কুরু বা ভরত বংশের উত্তরাধিকারী হিসেবে পরিচিত ছিলেন।


● সংস্কৃত সাহিত্য অনুসারে: বৎসের সর্বাধিক বিখ্যাত শাসক ছিলেন রাজা উদয়ন। সংস্কৃত সাহিত্যিক ভাস তাঁর বিখ্যাত 'স্বপ্নবাসবদত্তা' এবং 'প্রতিজ্ঞাযৌগন্ধরায়ণ' নাটকে রাজা উদয়ন এবং অবন্তীর রাজকন্যা বাসবদত্তার প্রেম ও বিয়ের কাহিনী ফুটিয়ে তুলেছেন।


● বৌদ্ধ ধর্ম অনুসারে: কৌশাম্বী ছিল বৌদ্ধ ধর্মের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। গৌতম বুদ্ধ এখানে একাধিকবার বর্ষাবাস কাটিয়েছিলেন। এখানকার ঘোষিতারাম বিহার ছিল বৌদ্ধ ভিক্ষুদের একটি প্রধান আবাসস্থল।


◼ বৎস রাজ্যের ​শাসনব্যবস্থা ও অর্থনীতি


● শাসনব্যবস্থা: বৎস ছিল একটি শক্তিশালী রাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র। রাজা উদয়নের শাসনকালে এটি উত্তর ভারতের অন্যতম প্রভাবশালী রাজ্যে পরিণত হয়েছিল।


● ​অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি: যমুনা ও গঙ্গার দোয়াব অঞ্চলে অবস্থিত হওয়ায় বৎসের জমি ছিল অত্যন্ত উর্বর। এখানে প্রচুর পরিমাণে তুলা এবং অন্যান্য উন্নত মানের ফসল উৎপাদিত হতো। এইসময় কৌশাম্বীর বস্ত্র শিল্প ছিল অত্যন্ত উন্নত। দেশ-বিদেশের বণিকদের যাতায়াতের কারণে এখানকার রাজকোষ সবসময় ধন-সম্পদে পূর্ণ থাকত।

◼ বৎস রাজ্যের পতন


​বৎস রাজ্যটি তার ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে প্রতিবেশী শক্তিশালী রাজ্যগুলির তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতার মুখে পড়েছিল।


পশ্চিমের শক্তিশালী রাজ্য অবন্তীর রাজা চণ্ডপ্রদ্যোত প্রথমে উদয়নকে বন্দি করেছিলেন। কিন্তু পরে উদয়ন প্রদ্যোতের কন্যা বাসবদত্তাকে নিয়ে কৌশাম্বীতে পালিয়ে যান। তারপর তাঁদের বিয়ে হয়। এই বৈবাহিক সম্পর্কের ফলে অবন্তী ও বৎসের শত্রুতার অবসান ঘটে এবং একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক অক্ষ তৈরি হয়। মগধের রাজকন্যা পদ্মাবতীর সাথেও উদয়নের বিয়ে হয়েছিল।


পরবর্তীতে রাজা উদয়নের মৃত্যুর পর বৎসের রাজনৈতিক শক্তি ধীরে ধীরে হ্রাস পেতে থাকে। সেইসঙ্গে প্রতিবেশী শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলোর প্রভাবও বৃদ্ধি পায়।


খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ ও পঞ্চম শতকে অবন্তী ও মগধের উত্থানের ফলে বৎস তার স্বাধীনতা হারায়। পরবর্তীকালে এটি বৃহত্তর মগধ সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যায় এবং এর স্বাধীন রাজনৈতিক সত্তা  বিলুপ্ত হয়।


9. কুরু


ষোড়শ মহাজনপদের অন্যতম প্রাচীন এবং ঐতিহাসিকভাবে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ রাজ্য ছিল কুরু। এটি গঙ্গা-যমুনা দোয়াবের উত্তর-পশ্চিম অংশে অবস্থিত ছিল। তাছাড়া কুরু রাজ্য বৈদিক সভ্যতার অন্যতম প্রধান কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত ছিল।


◼ কুরু রাজ্যের অবস্থান ও সীমানা

​ 

এটি উত্তর ভারতের গঙ্গা-যমুনা দোয়াব অঞ্চলের ওপরের অংশে গড়ে উঠেছিল।


● মূল কেন্দ্র: বর্তমান দিল্লি, হরিয়ানা এবং উত্তরপ্রদেশের মিরাট ও থানেস্বর অঞ্চল নিয়ে প্রাচীন কুরু রাজ্য গঠিত হয়েছিল।


● সীমানা: কুরুর পূর্বে ছিল পাঞ্চাল রাজ্য, পশ্চিমে সরস্বতী নদীর অববাহিকা, দক্ষিণে শূরসেন ও মৎস্য রাজ্য এবং উত্তরে হিমালয়ের পাদদেশীয় অঞ্চল।


◼ কুরুর ​রাজধানী


কুরু রাজ্যের ইতিহাসে দুটি রাজধানী বা গুরুত্বপূর্ণ নগরীর উল্লেখ পাওয়া যায়।


● ​ইন্দ্রপ্রস্থ: কুরু মহাজনপদের মূল প্রধান রাজধানী ছিল ইন্দ্রপ্রস্থ। ঐতিহাসিকরা মনে করেন, বর্তমান দিল্লির পুরনো কেল্লা সংলগ্ন অঞ্চলটিই ছিল প্রাচীন ইন্দ্রপ্রস্থ।


● ​হস্তিনাপুর: কুরু রাজ্যের আরেকটি বিখ্যাত ও প্রাচীন রাজধানী শহর ছিল হস্তিনাপুর। এটি বর্তমান উত্তরপ্রদেশের মিরাট জেলার কাছাকাছি অবস্থিত ছিল।


◼ ঐতিহাসিক ও পৌরাণিক প্রেক্ষাপট


● ​বৈদিক কাহিনী ও মহাভারত অনুসারে: পুরু ও ভরত গোষ্ঠীর সমন্বয়ে কুরু জনপদের উত্থান ঘটে। বৈদিক সংস্কৃতি ও ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের বিকাশে কুরুদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। মহাভারত অনুসারে, মহাভারতের পুরো কাহিনীটিই আবর্তিত হয়েছে এই কুরু বংশের অভ্যন্তরীণ বিবাদকে কেন্দ্র করে। কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধ এই রাজ্যের বুকেই সংঘটিত হয়েছিল। কুরু রাজাদের মাধ্যমেই বৈদিক রীতিনীতি সুসংগঠিত রূপ পেয়েছিল।


● ​বৌদ্ধ ও জৈন ধর্ম অনুসারে: বুদ্ধদেবের সময়ে কুরু রাজ্য রাজনৈতিকভাবে আগের তুলনায় দুর্বল থাকলেই সাংস্কৃতিকভাবে এটি ছিল খুবই গুরুত্বপূর্ণ। বৌদ্ধ গ্রন্থে কোরব্য নামে এক কুরু শাসকের উল্লেখ পাওয়া যায়। বুদ্ধ কুরু অঞ্চলের কম্মাসধম্ম নামক স্থানে বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ধর্মদেশনা প্রদান করেছিলেন। জৈন ধর্মগ্রন্থেও কুরু বংশের রাজাদের সত্যনিষ্ঠা ও বীরত্বের প্রশংসা করা হয়েছে।


◼ কুরুর ​শাসনব্যবস্থা ও অর্থনীতি


● ​শাসনব্যবস্থা: শুরুতে কুরু ছিল মূলত একটি শক্তিশালী রাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র। তবে খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ শতকে এটি প্রজাতান্ত্রিক বা গণরাজ্যে পরিবর্তিত হয়েছিল বলে ধারণা করা হয়।


● ​অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি: গঙ্গা-যমুনা দোয়াবের উর্বর ভূমির কারণে কৃষি ও পশুপালন ছিল কুরুর অর্থনীতির প্রধান ভিত্তি। এছাড়া গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যপথের নিকটে অবস্থানের ফলে বাণিজ্যও যথেষ্ট উন্নত ছিল।


◼ কুরু রাজ্যের পতন


কুরু ও পাঞ্চাল ছিল উত্তর ভারতের দুটি প্রভাবশালী জনপদ। তাদের মধ্যে রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা থাকলেও সাংস্কৃতিক ও বৈদিক ঐতিহ্যে অনেক মিল ছিল।


খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ শতকের পর মগধ, কোশল ও অবন্তীর মতো শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলোর উত্থানের ফলে কুরুর রাজনৈতিক প্রভাব ধীরে ধীরে কমতে থাকে।


​অবশেষে, খ্রিস্টপূর্ব চতুর্থ শতকে মগধের নন্দ বংশের সম্রাট মহাপদ্মনন্দ উত্তর ভারতের ছোট-বড় ক্ষত্রিয় রাজ্যগুলি জয় করার সময় কুরু রাজ্যকেও মগধ সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত করে নেন।


10. পাঞ্চাল


ষোড়শ মহাজনপদের আরো একটি শক্তিশালী ও গুরুত্বপূর্ণ রাজ্য ছিল পাঞ্চাল। এটি উত্তর ভারতের গঙ্গা-যমুনা দোয়াব অঞ্চলের মধ্য ও উত্তরাংশে অবস্থিত ছিল।


◼ পাঞ্চালের অবস্থান ও সীমানা

● ​মূল কেন্দ্র: বর্তমান উত্তরপ্রদেশের বেরিলি, বদায়ুঁ, শাহজাহানপুর, ফাররুখাবাদ এবং তার পার্শ্ববর্তী অঞ্চল নিয়ে প্রাচীন পাঞ্চাল রাজ্য গঠিত হয়েছিল।


● ​সীমানা: পাঞ্চাল রাজ্যের পশ্চিম সীমান্তে ছিল কুরু রাজ্য। পাঞ্চাল ও কুরুর মাঝখান দিয়ে প্রবাহিত হতো পবিত্র গঙ্গা নদী। পাঞ্চালের উত্তরে ছিল হিমালয় পর্বতমালা, পূর্বে ছিল কোশল রাজ্য এবং দক্ষিণে ছিল যমুনা নদী ও বৎস রাজ্য।


◼ পাঞ্চালের ​রাজধানী


পাঞ্চাল রাজ্য উত্তর ও দক্ষিণ নামে দুই ভাগে বিভক্ত ছিল। উভয় অংশেরই দুটি পৃথক রাজধানী ছিল।


● ​অহিচ্ছত্র: উত্তর পাঞ্চালের রাজধানী ছিল অহিচ্ছত্র। বর্তমান উত্তরপ্রদেশের বেরিলী জেলার রামনগরের কাছে এর অবস্থান ছিল।


● ​কাম্পিল্য: দক্ষিণ পাঞ্চালের রাজধানী ছিল কাম্পিল্য। বর্তমান উত্তরপ্রদেশের ফাররুখাবাদ জেলার কাম্পিল নামক অঞ্চলের কাছে যমুনা ও গঙ্গা নদীর মধ্যবর্তী স্থানে এটি অবস্থিত ছিল।


◼ ঐতিহাসিক ও পৌরাণিক প্রেক্ষাপট

● ​বৈদিক যুগ অনুসারে: পরবর্তী বৈদিক যুগে পাঁচটি ছোট ছোট বৈদিক উপজাতির মিলনে এই জনপদের সৃষ্টি হয়েছিল। তাই অনেকের মতে ওই 'পঞ্চ' শব্দ থেকে এর নাম হয় পাঞ্চাল। শতপথ ব্রাহ্মণের মতো প্রাচীন গ্রন্থে পাঞ্চালকে বৈদিক সংস্কৃতি, যজ্ঞ ও দর্শনের শ্রেষ্ঠ কেন্দ্র হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে।


● ​মহাভারত অনুসারে: পাঞ্চাল রাজ্যের বিখ্যাত রাজা ছিলেন দ্রুপদ। তাঁর কন্যা দ্রৌপদী বা পাঞ্চালী ছিলেন মহাভারতের অন্যতম প্রধান চরিত্র। পাঞ্চালের সঙ্গে কুরু রাজ্যের দীর্ঘদিন রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা ছিল।


● ​বৌদ্ধ ও জৈন ধর্ম: বুদ্ধদেবের সময়েও পাঞ্চাল একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত ছিল। বৌদ্ধ গ্রন্থে গৌতম বুদ্ধের পাঞ্চাল রাজ্যে ভ্রমণ ও ধর্ম প্রচারের উল্লেখ পাওয়া যায়। জৈন ধর্মগ্রন্থ অনুযায়ী, জৈনদের ২১তম তীর্থঙ্কর নমিনাথ এবং ২৪তম তীর্থঙ্কর মহাবীর এই অঞ্চলের সাথে যুক্ত ছিলেন।


◼ পাঞ্চালের ​শাসনব্যবস্থা ও অর্থনীতি


● ​শাসনব্যবস্থা: কুরুর মতোই পাঞ্চালও শুরুর দিকে একটি শক্তিশালী রাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র ছিল। কিন্তু খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ শতকে, পাঞ্চাল রাজ্যটিও রাজতন্ত্র ত্যাগ করে একটি প্রজাতান্ত্রিক বা গণরাজ্যে রূপান্তরিত হয়।


● ​অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি: গঙ্গা-যমুনা দোয়াব অঞ্চলের উর্বর ভূমির কারণে কৃষি ছিল পাঞ্চালের অর্থনীতির প্রধান ভিত্তি। এছাড়া বস্ত্রশিল্প, হস্তশিল্প এবং বাণিজ্যও পাঞ্চালের অর্থনীতিকে বেশ সমৃদ্ধ করেছিল।


◼ পাঞ্চাল রাজ্যের পতন


পাঞ্চাল ও কুরু উভয়ই উত্তর ভারতের দুটি প্রভাবশালী জনপদ ছিল। প্রথম থেকেই এদের মধ্যে সীমানা ও আধিপত্য নিয়ে বহুবার যুদ্ধ হয়েছে। তবে রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা থাকলেও সাংস্কৃতিক ও বৈদিক ঐতিহ্যে তাদের মধ্যে অনেক মিল ছিল।


খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ শতকের পর মগধ, কোশল ও অবন্তীর মতো শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলোর উত্থানের ফলে পাঞ্চালের রাজনৈতিক প্রভাব ক্রমশ কমতে থাকে।


অবশেষে, খ্রিস্টপূর্ব চতুর্থ শতকে মগধের নন্দ বংশের সম্রাট মহাপদ্মনন্দ উত্তর ভারতের ক্ষত্রিয় রাজ্যগুলি দখলের সময় পাঞ্চাল রাজ্যকেও জয় করে মগধ সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত করেন।


11. মৎস্য


ষোড়শ মহাজনপদের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রাজ্য ছিল মৎস্য। এটি উত্তর-পশ্চিম ভারতের একটি বিস্তীর্ণ অঞ্চলে অবস্থিত ছিল।


◼ ​ভৌগোলিক অবস্থান ও সীমানা


● ​মূল কেন্দ্র: বর্তমান রাজস্থানের জয়পুর, আলওয়ার এবং ভরতপুর জেলা ও পার্শ্ববর্তী কিছু অঞ্চল নিয়ে প্রাচীন মৎস্য রাজ্য গঠিত হয়েছিল।


● ​সীমানা: মৎস্য রাজ্যের উত্তরে ছিল কুরু রাজ্য, পূর্বে যমুনা নদী ও শূরসেন রাজ্য, দক্ষিণে চেদি রাজ্য এবং পশ্চিমে রাজস্থানের মরুপ্রধান অঞ্চল। রাজ্যের মধ্য দিয়ে বানাস ও অন্যান্য ক্ষুদ্র নদী প্রবাহিত হতো।


◼ মৎস্য রাজ্যের ​রাজধানী


​মৎস্য রাজ্যের রাজধানীছিল বিরাটনগর। মহাভারত অনুসারে রাজা বিরাটের নামানুসারেই এই নগরীর এরূপ নামকরণ হয়েছিল।


​বৈরাটে প্রাচীন ভারতের বহু ঐতিহাসিক নিদর্শন পাওয়া গেছে। এখানে সম্রাট অশোকের শিলালিপি এবং প্রাচীন বৌদ্ধ স্তূপ ও বিহারের ধ্বংসাবশেষ আবিষ্কৃত হয়েছে। এর থেকে জানা যায় যে প্রাচীনকালে এটি একটি বড় সাংস্কৃতিক কেন্দ্র ছিল।


◼ ঐতিহাসিক ও পৌরাণিক প্রেক্ষাপট


● ​বৈদিক যুগ অনুসারে: ঋগ্বেদে মৎস্য জাতির উল্লেখ রয়েছে। এটি উত্তর-পশ্চিম ভারতের একটি প্রাচীন আর্য জনপদ হিসেবে পরিচিত ছিল।


● ​মহাভারত অনুসারে: মৎস্য রাজ্যের সর্বাধিক পরিচিত শাসক ছিলেন রাজা বিরাট। পাণ্ডবরা তাঁদের অজ্ঞাতবাসের শেষ বছর এই রাজ্যেই কাটিয়েছিলেন। অর্জুনের পুত্র অভিমন্যুর সঙ্গে রাজা বিরাটের কন্যা উত্তরার বিবাহ হয়েছিল। কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে রাজা বিরাট পাণ্ডবদের পক্ষে অংশগ্রহণ করেছিলেন।


◼ মৎস্য রাজ্যের শাসনব্যবস্থা ও অর্থনীতি


● ​শাসনব্যবস্থা: মৎস্য ছিল একটি রাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র। রাজারা বংশানুক্রমিকভাবে শাসন করতেন এবং স্থানীয় রাজনৈতিক জীবনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতেন।


● ​অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি: যমুনা নদীর অববাহিকার কাছাকাছি ও চম্বল নদীর উপত্যকায় অবস্থিত হওয়ায় মৎস্য রাজ্যের একটি বড় অংশে কৃষিকাজ হতো। তবে ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে এই রাজ্যের মূল অর্থনীতি গড়ে উঠেছিল পশুপালনকে কেন্দ্র করে। এছাড়া বিভিন্ন বাণিজ্যপথের সঙ্গে সংযোগ থাকার কারণে ব্যবসা-বাণিজ্যও বিকশিত হয়েছিল।


◼ মৎস্য রাজ্যের পতন


প্রথম দিকে মৎস্য রাজ্য কুরু, শূরসেন এবং চেদির মতো গুরুত্বপূর্ণ জনপদের সঙ্গে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সুসম্পর্ক বজায় রাখত।


খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ শতকের শেষের দিকে যখন উত্তর ভারতে মগধের সাম্রাজ্যবাদী নীতি চরম রূপ নেয়, তখন মৎস্য রাজ্যের স্বাধীন অস্তিত্ব বিপন্ন হয়ে পড়ে। 


অবশেষে, খ্রিস্টপূর্ব চতুর্থ শতকে মগধের সম্রাট মহাপদ্মনন্দ  মৎস্য রাজ্যটিকে জয় করে মগধ সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত করেন।


12. শূরসেন


ষোড়শ মহাজনপদের মধ্যে শূরসেন ছিল উত্তর ভারতের একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজ্য। এটি মূলত যমুনা নদীর তীরবর্তী অঞ্চলে গড়ে উঠেছিল।


◼ শূরসেনের অবস্থান ও সীমানা


● ​মূল কেন্দ্র: বর্তমান উত্তরপ্রদেশের মথুরা জেলা এবং ব্রজভূমি অঞ্চল নিয়ে শূরসেন মহাজনপদ গঠিত হয়েছিল।


● ​সীমানা: শূরসেন রাজ্যের উত্তরে ছিল কুরু রাজ্য, পূর্বে পাঞ্চাল রাজ্য, পশ্চিমে মৎস্য রাজ্য এবং দক্ষিণে চেদি রাজ্য। যমুনা নদী এই রাজ্যের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়ে এর অর্থনৈতিক ও সামরিক শক্তি বৃদ্ধি করেছিল।


◼ শূরসেনের ​রাজধানী


শূরসেনের রাজধানী ছিল মথুরা। এটি প্রাচীন ভারতের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক, ধর্মীয় ও বাণিজ্যিক কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত ছিল।


● ​বাণিজ্যিক গুরুত্ব: উত্তর-পশ্চিম ভারতের উত্তরাপথ এবং দক্ষিণ ভারতের দিকে যাওয়া গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যপথ মথুরার মধ্য দিয়ে অতিক্রম করত। ফলে এটি একটি সমৃদ্ধ বাণিজ্য নগরীতে পরিণত হয়।


● ​সুরক্ষা: গ্রীক ঐতিহাসিকদের বিবরণ অনুযায়ী, যমুনা নদীর তীরে অবস্থিত মথুরা শহরটি ছিল অত্যন্ত সুরক্ষিত এবং প্রাচীর দিয়ে ঘেরা।


◼ ঐতিহাসিক ও পৌরাণিক প্রেক্ষাপট


● ​পূরাণ ও মহাভারত অনুসারে: পৌরাণিক কাহিনী অনুযায়ী, যদু বংশের বিখ্যাত রাজা শূরসেন। তার নামানুসারেই এই রাজ্যের নামকরণ হয়েছিল। মহাভারতের যুগে এই রাজ্য ছিল রাজনৈতিক আলোচনার অন্যতম কেন্দ্রে। শূরসেনের পুত্র বসুদেবের ঘরেই জন্মগ্রহণ করেছিলেন ভগবান শ্রীকৃষ্ণ। শ্রীকৃষ্ণ মথুরার অত্যাচারী রাজা কংসকে বধ করে উগ্রসেনকে পুনরায় সিংহাসনে বসান। এছাড়া মহাভারতের কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে শ্রীকৃষ্ণ পাণ্ডবদের পক্ষে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছিলেন।


● ​বৌদ্ধ ও জৈন ধর্ম অনুসারে: বুদ্ধদেবের সময়ে শূরসেনের রাজা ছিলেন অবন্তিপুত্র। তিনি বুদ্ধের অন্যতম প্রধান শিষ্য মহাকাত্যায়নের প্রভাবে বৌদ্ধ ধর্ম গ্রহণ করেন এবং মথুরায় বৌদ্ধ ধর্মের প্রসার ঘটান। এছাড়া মথুরা ছিল প্রাচীন জৈন ভাস্কর্য ও সংস্কৃতির একটি অন্যতম শ্রেষ্ঠ কেন্দ্র। এই অঞ্চলে প্রত্নতাত্ত্বিক খননকার্যে বহু প্রাচীন জৈন স্তূপ ও কঙ্কালী টিলার নিদর্শন পাওয়া গেছে।


◼ শাসনব্যবস্থা ও অর্থনীতি


● ​শাসনব্যবস্থা: শূরসেন ছিল মূলত একটি রাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র। মহাভারতের যুগে প্রথমে শূরসেনের যাদবরা একটি প্রজাতান্ত্রিক সংঘ গঠন করে শাসনকার্য পরিচালনা করতেন। তবে খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ শতকে শূরসেনে পুনরায় রাজতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা শুরু হয়।


● ​অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি: যমুনা নদীর তীরে এবং প্রধান দুটি বাণিজ্য পথের মিলনস্থলে অবস্থিত হওয়ায় মথুরা ছিল ব্যবসা-বাণিজ্যে অত্যন্ত উন্নত। এছাড়া যমুনা উপত্যকার উর্বর ভূমিতে অবস্থানের কারণে শূরসেন কৃষিকাজ এবং পশুপালনে যথেষ্ট খ্যাতি অর্জন করেছিল।


◼ শূরসেন রাজ্যের পতন


ধারণা করা হয়, শূরসেনের সঙ্গে অবন্তী রাজ্যের বেশ ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক সম্পর্ক ছিল। এই সম্পর্কের ইঙ্গিত পাওয়া যায় রাজা অবন্তিপুত্রের নাম থেকেই ।


খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ-পঞ্চম শতকে মগধের শক্তি ক্রমশ বৃদ্ধি পেতে থাকলে শূরসেনের রাজনৈতিক গুরুত্ব কমতে শুরু করে।


এরপর খ্রিস্টপূর্ব চতুর্থ শতকে নন্দ বংশের শাসক মহাপদ্মনন্দ শূরসেনকে মগধ সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত করেন। এর ফলে শূরসেনের স্বাধীন রাজনৈতিক অস্তিত্বের অবসান ঘটে।


13. অশ্মক


ষোড়শ মহাজনপদের মধ্যে অশ্মক ছিল একমাত্র মহাজনপদ যা উত্তর ভারতের বাইরে দাক্ষিণাত্য অঞ্চলে অবস্থিত ছিল।



◼ ভৌগোলিক অবস্থান ও সীমানা


● ​মূল কেন্দ্র: বর্তমান মহারাষ্ট্র ও তেলেঙ্গানার গোদাবরী নদী অববাহিকা অঞ্চল জুড়ে অশ্মক রাজ্য গড়ে উঠেছিল।


● ​​সীমানা: অশ্মক রাজ্যের উত্তর সীমান্তে ছিল গোদাবরী নদী,  উত্তর-পূর্ব সীমান্তে ছিল অবন্তী রাজ্য এবং দক্ষিণ-পূর্ব সীমান্তে ছিল কৃষ্ণা নদী।


◼ অশ্মকের ​রাজধানী


অশ্মকের রাজধানী ছিল পোটালি। বৌদ্ধ গ্রন্থে এটি পোতন বা পোদন নামেও উল্লেখিত হয়েছে।


ঐতিহাসিকদের মতে, বর্তমান তেলেঙ্গানার নিজামাবাদ জেলার 'বোধন' শহরটিই ছিল প্রাচীন পোটালি নগরী।


গোদাবরী নদীর অববাহিকায় অবস্থিত হওয়ায় পোটালি ছিল দক্ষিণ ভারতের একটি গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক কেন্দ্র। উত্তর ভারত থেকে দাক্ষিণাত্যে আসার প্রধান দক্ষিণাপথ এই শহরের কাছাকাছি এসেই শেষ হতো। এর ফলে ব্যবসা-বাণিজ্যে এর গুরুত্ব ছিল অপরিসীম।


◼ ঐতিহাসিক ও পৌরাণিক প্রেক্ষাপট


● ​পুরাণ ও মহাভারত অনুসারে: পুরাণের তথ্য অনুযায়ী, অযোধ্যার সূর্যবংশীয় বা ইক্ষ্বাকু বংশের রাজা ছিলেন অশ্মক। তার নামানুসারেই এই রাজ্যের নামকরণ হয়েছিল অশ্মক। মহাভারতে কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধেও অশ্মক রাজাদের অংশগ্রহণের উল্লেখ পাওয়া যায়।


● ​বৌদ্ধ ও জৈন ধর্মগ্রন্থ অনুসারে: বৌদ্ধ ধর্মগ্রন্থ 'অঙ্গুত্তর নিকায়' অনুসারে ১৬টি মহাজনপদের মধ্যে অশ্মক ছিল অন্যতম প্রধান নাম। 'চুলা কলিঙ্গ জাতক' অনুযায়ী, একসময় অশ্মকের রাজা অরুণ প্রতিবেশী কলিঙ্গ রাজাকে যুদ্ধে পরাজিত করেছিলেন। জৈন ধর্মগ্রন্থ অনুযায়ী, জৈনদের প্রথম তীর্থঙ্কর ঋষভনাথের পুত্র বাহুবলী এই পোদনপুর বা পোটালির রাজা ছিলেন। তাই জৈনদের কাছে এই প্রাচীন রাজধানী অত্যন্ত পবিত্র একটি স্থান।


◼ অশ্মকের শাসনব্যবস্থা ও অর্থনীতি


● ​শাসনব্যবস্থা: অশ্মক ছিল একটি শক্তিশালী রাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র। বৌদ্ধ গ্রন্থ অনুযায়ী, এখানকার রাজারা ছিলেন ইক্ষ্বাকু বংশীয় ক্ষত্রিয়। তারা বংশানুক্রমিকভাবে অত্যন্ত নিয়মতান্ত্রিক উপায়ে রাজ্য শাসন করতেন।


● ​অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি: গোদাবরী নদীর উর্বর অববাহিকায় অবস্থিত হওয়ায় অশ্মক রাজ্যে কৃষিকাজে যথেষ্ট উন্নত ছিল। সেইসঙ্গে দাক্ষিণাত্যের খনিজ সম্পদ, বনাঞ্চলের কাঠ ও হাতি এই রাজ্যেকে অর্থনৈতিক দিক থেকে আরও শক্তিশালী করে তুলেছিল।


◼ ​অশ্মক রাজ্যের পতন


অশ্মকের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল পশ্চিম ও উত্তর-পশ্চিমের শক্তিশালী অবন্তী মহাজনপদ। দুই রাজ্যের মধ্যে রাজনৈতিক ও সামরিক সংঘাতের উল্লেখ পাওয়া যায়।


খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ-পঞ্চম শতকে উত্তর ভারতের শক্তিশালী রাজ্যগুলোর উত্থানের ফলে অশ্মকের স্বাধীন প্রভাব ধীরে ধীরে কমতে থাকে।


পরবর্তীকালে অশ্মক রাজ্যটি অবন্তীর অধীনে চলে যায়। পরে অবন্তী মগধ সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত হলে অশ্মক অঞ্চলও বৃহত্তর মগধ সাম্রাজ্যের অংশে পরিণত হয়।


14. অবন্তী 


ষোড়শ মহাজনপদের যুগে উত্তর ও মধ্য ভারতের রাজনীতিতে মগধের সবচেয়ে বড় এবং শক্তিশালী প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল অবন্তী। এটি ছিল তৎকালীন ভারতের অন্যতম প্রধান সামরিক শক্তি।


◼ ​অবন্তীর অবস্থান ও সীমানা


● ​মূল কেন্দ্র: বর্তমান মধ্যপ্রদেশের মালব অঞ্চল এবং নর্মদা উপত্যকার বিস্তীর্ণ এলাকা নিয়ে প্রাচীন অবন্তী রাজ্য গঠিত হয়েছিল।


● ​​সীমানা: অবন্তী রাজ্যের উত্তর-পূর্ব সীমান্তে ছিল চেদি রাজ্য, পূর্ব সীমান্তে ছিল বৎস রাজ্য এবং দক্ষিণ সীমান্তে প্রবাহিত হতো গোদাবরী নদী। বিখ্যাত বেত্রবতী নদী অবন্তী রাজ্যকে উত্তর অবন্তী ও দক্ষিণ অবন্তী নামে দুটি ভাগে বিভক্ত করেছিল।


◼ অবন্তীর ​রাজধানী


​ভৌগোলিক বিশালতা ও সামরিক সুবিধার জন্য অবন্তী রাজ্যটি দুটি প্রধান প্রশাসনিক অংশে বিভক্ত ছিল। দুটি অংশেরই আলাদা আলাদা দুটি রাজধানী ছিল।


● ​উজ্জয়িনী: উত্তর অবন্তীর রাজধানী ছিল উজ্জয়িনী । এটি ছিল প্রাচীন ভারতের শিক্ষা, সংস্কৃতি, জ্যোতির্বিজ্ঞান এবং বাণিজ্যের অন্যতম প্রধান আন্তর্জাতিক কেন্দ্র।


● ​​মহিষ্মতী: দক্ষিণ অবন্তীর রাজধানী ছিল মহিষ্মতী। নর্মদা নদীর তীরে অবস্থিত এই শহরটি তার দুর্ভেদ্য দুর্গ এবং সামরিক সুরক্ষার জন্য বিখ্যাত ছিল।


◼ ​ঐতিহাসিক ও পৌরাণিক প্রেক্ষাপট


● ​পুরাণ ও মহাভারত অনুসারে: পুরাণের তথ্য অনুযায়ী, যদু বংশের অন্যতম বিখ্যাত শাখা 'হৈহয়' বংশের রাজারা অবন্তী রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। মহাভারতে কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে অবন্তীর দুই পরাক্রমশালী রাজকুমার বিন্দ ও অনুবিন্দ কৌরবদের পক্ষে যোগ দিয়েছিলেন।


● ​​বৌদ্ধ ধর্ম অনুসারে: বুদ্ধদেবের সমসাময়িককালে অবন্তীর রাজ সিংহাসনে বসেছিলেন প্রদ্যোত বংশের প্রতিষ্ঠাতা চণ্ডপ্রদ্যোত। শুরুতে তিনি বৌদ্ধ ধর্মের বিরোধী হলেও, পরবর্তীতে বিখ্যাত বৌদ্ধ ভিক্ষু মহাকাত্যায়নের প্রভাবে তিনি বৌদ্ধ ধর্ম গ্রহণ করেন। এরপর তিনি অবন্তীকে বৌদ্ধ সংস্কৃতির একটি প্রধান কেন্দ্রে পরিণত করেন।


● ​সংস্কৃত সাহিত্যে: অবন্তীর রাজকন্যা বাসবদত্তা এবং বৎসের রাজা উদয়নের অমর প্রেমের কাহিনী নিয়ে মহাকবি ভাস তাঁর বিখ্যাত নাটক 'স্বপ্নবাসবদত্তা' রচনা করেছেন।


◼ অবন্তীর ​শাসনব্যবস্থা ও অর্থনীতি


● ​শাসনব্যবস্থা: অবন্তী ছিল একটি অত্যন্ত সুসংগঠিত এবং আগ্রাসী রাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র। চণ্ডপ্রদ্যোতের সময়ে অবন্তীর একটি বিশাল শক্তিশালী স্থায়ী সেনাবাহিনী ছিল। অবন্তীর কারিগররা উন্নত মানের লোহার যুদ্ধাস্ত্র তৈরিতে পারদর্শী ছিল। এই দক্ষতা তাদের সামরিক দিক থেকে প্রায় অপরাজেয় করে তুলেছিল।


● ​অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি: অবন্তী ছিল তৎকালীন ভারতের অন্যতম ধনী মহাজনপদ। মালব অঞ্চলের কালো মাটি কৃষিকাজের উপযুক্ত হওয়ায় অবন্তী কৃষি ক্ষেত্রেও যথেষ্ট উন্নত ছিল। এছাড়া বিন্ধ্য পর্বতমালার খনিজ সম্পদ এবং বিস্তৃত বনাঞ্চল এই রাজ্যের অর্থনৈতিক শক্তি বৃদ্ধি করেছিল। এছাড়া দক্ষিণাপথের সাথে উত্তর ভারতের বাণিজ্যের প্রধান সংযোগস্থল ছিল উজ্জয়িনী। ফলে বাণিজ্য থেকে অবন্তী প্রচুর কর বা রাজস্ব আদায় করে অর্থনৈতিক দিক থেকে আরও সমৃদ্ধ হয়ে উঠেছিল।

◼ অবন্তী রাজ্যের পতন


প্রথমদিকে অবন্তী অত্যন্ত আগ্রাসী নীতি নিয়ে তার প্রতিবেশী ছোট ছোট রাজ্যগুলোকে গ্রাস করতে শুরু করে। রাজা চণ্ডপ্রদ্যোত প্রতিবেশী বৎস রাজ্য এবং দক্ষিণ ভারতের অশ্মক রাজ্যকে জয় করে অবন্তী সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত করেন। এমনকি মগধের রাজা অজাতশত্রুও অবন্তীর আক্রমণের ভয়ে তাঁর রাজধানী রাজগৃহকে নতুন করে দুর্গ দিয়ে ঘিরে ফেলেছিলেন।


খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ-পঞ্চম শতকে মগধ ও অবন্তী উত্তর ভারতের দুই প্রধান শক্তি হয়ে উঠেছিল। উভয় রাজ্যের মধ্যে আধিপত্য বিস্তার নিয়ে দীর্ঘদিন প্রতিদ্বন্দ্বিতা চলেছিল।


তবে ​চণ্ডপ্রদ্যোতের মৃত্যুর পর তাঁর উত্তরাধিকারীরা মগধের ক্রমবর্ধমান শক্তির সামনে ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে পড়েন। অবশেষে, খ্রিস্টপূর্ব পঞ্চম শতকের শেষের দিকে মগধের শিশুনাগ বংশের রাজা শিশুনাগ অবন্তী রাজ্য আক্রমণ করেন। এক চূড়ান্ত ও ঐতিহাসিক যুদ্ধে মগধের সেনাবাহিনী অবন্তীকে সম্পূর্ণরূপে পরাজিত করে। এর ফলে অবন্তী নিজের স্বাধীনতা হারায় এবং শক্তিশালী মগধ সাম্রাজ্যের একটি প্রদেশে পরিণত হয়।


15. গান্ধার


ষোড়শ মহাজনপদের মধ্যে গান্ধার ছিল উত্তর-পশ্চিম ভারতের একটি অন্যতম সমৃদ্ধ রাজ্য। এটি ভারতীয় উপমহাদেশের উত্তর-পশ্চিম প্রবেশদ্বারে অবস্থিত ছিল। তৎকালীন সময়ে গান্ধার রাজ্যটি মধ্য এশিয়ার সঙ্গে ভারতের যোগাযোগের প্রধান কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত ছিল।


◼ গন্ধরের অবস্থান ও সীমানা


● ​মূল কেন্দ্র: বর্তমান পাকিস্তানের পেশোয়ার ও রাওয়ালপিন্ডি  উপত্যকা এবং আফগানিস্তানের পূর্ব অংশ বিশেষত জালালাবাদ অঞ্চল নিয়ে প্রাচীন গান্ধার রাজ্য গঠিত হয়েছিল।


● ​সীমানা: গান্ধার রাজ্যের উত্তর ও উত্তর-পশ্চিমে ছিল হিন্দুকুশ পর্বতমালা ও কম্বোজ মহাজনপদ। পূর্বে সিন্ধু নদ এবং দক্ষিণে সুলাইমান পর্বতমালা ও পার্বত্য এলাকা। কাশ্মীর উপত্যকার কিছু অংশও একসময় গান্ধার রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত ছিল।


◼ গন্ধারের ​রাজধানী


​গান্ধার রাজ্যের রাজধানী ছিল তক্ষশীলা। প্রাচীন বিশ্বে এই শহরটি জ্ঞান-বিজ্ঞান, শিক্ষা এবং সংস্কৃতির অন্যতম প্রধান আন্তর্জাতিক কেন্দ্র হিসেবে খ্যাত ছিল।


● ​শিক্ষাকেন্দ্র: তক্ষশীলা বিশ্ববিদ্যালয় ছিল বিশ্বের প্রাচীনতম উচ্চশিক্ষা কেন্দ্রগুলোর একটি। এখানে বেদ, দর্শন, চিকিৎসাশাস্ত্র, সামরিক বিদ্যা, ব্যাকরণ ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানসহ বহু বিষয়ে শিক্ষা দেওয়া হতো। ভারতের ইতিহাসের বিখ্যাত পণ্ডিত আচার্য চাণক্য বা কৌটিল্য, ব্যাকরণবিদ পাণিনি এবং বিখ্যাত চিকিৎসক জীবক সকলেই এই তক্ষশীলার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।


● ​বাণিজ্যিক গুরুত্ব: তক্ষশীলার অবস্থান ছিল অত্যন্ত কৌশলগত। এটি প্রাচীন আন্তর্জাতিক বাণিজ্য পথ 'উত্তরাপথ'-এর ওপর অবস্থিত ছিল। এই পথ ভারতকে মধ্য এশিয়া, পারস্য এবং গ্রীসের সাথে যুক্ত করেছিল।


◼ ঐতিহাসিক ও পৌরাণিক প্রেক্ষাপট


● ​মহাভারত অনুসারে: মহাভারতের যুগে গান্ধার ছিল একটি অন্যতম রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দু। কৌরবদের মাতা গান্ধারী ছিলেন এই রাজ্যের রাজকন্যা। মহাভারতের অন্যতম কূটকৌশলী চরিত্র শকুনি ছিলেন গান্ধারের যুবরাজ বা রাজা।


● ​বৌদ্ধ ধর্ম অনুসারে: বুদ্ধদেবের সমসাময়িককালে গান্ধারের রাজা ছিলেন পুক্কুসাতি। তিনি মগধের রাজা বিম্বিসারের সমসাময়িক ছিলেন। রাজা পুক্কুসাতি মগধে তাঁর দূত পাঠিয়েছিলেন। পরবর্তীতে তিনি গৌতম বুদ্ধের দর্শনে উদ্বুদ্ধ হয়ে রাজ্য ত্যাগ করেন এবং বৌদ্ধ ধর্ম গ্রহণ করেন।


● ​গান্ধার শিল্পকলা: পরবর্তী যুগে, বিশেষ করে কুষাণ আমলে, গ্রীক, পারস্য এবং ভারতীয় শিল্পধারার সমন্বয়ে এই অঞ্চলে এক অপূর্ব ভাস্কর্য শিল্পের বিকাশ ঘটে। এটি 'গান্ধার শিল্পরীতি' নামে বিশ্ববিখ্যাত হয়ে ওঠে।


◼ গন্ধারের ​শাসনব্যবস্থা ও অর্থনীতি


● ​শাসনব্যবস্থা: গান্ধার ছিল একটি শক্তিশালী রাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র। রাজা পুক্কুসাতির সময়ে গান্ধার সামরিক শক্তিতে প্রচণ্ড শক্তিশালী হয়ে উঠেছিল।


● ​অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি: আন্তর্জাতিক বাণিজ্য পথের প্রধান কেন্দ্র হওয়ায় গান্ধার ছিল ব্যবসা-বাণিজ্যে অত্যন্ত উন্নত। মধ্য এশিয়া ও পারস্য থেকে আসা বণিকদের মাধ্যমে এখানে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রার আদান-প্রদান হতো। এছাড়া সিন্ধু নদের অববাহিকায় অবস্থিত হওয়ায় কৃষিকাজ ও পশুপালন ছিল এখানকার অর্থনীতির অন্যতম প্রধান ভিত্তি।


◼ গন্ধারের পতন


​ভারতের উত্তর-পশ্চিম সীমান্তে অবস্থিত হওয়ায় গান্ধার রাজ্যটিকে ভারতের মূল ভূখণ্ডের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের চেয়ে বিদেশী শক্তির মুখোমুখি বেশি হতে হয়েছিল।


খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ শতাব্দীর শেষভাগে পারস্যের একিমেনিড  সাম্রাজ্যের সম্রাট প্রথম দরায়ুস গান্ধারকে আক্রমণ করে নিজ সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত করেন। এর ফলে গান্ধার দীর্ঘ সময় ধরে পারস্যের অধীনে ছিল।


খ্রিস্টপূর্ব ৩২৬ অব্দে গ্রীক বীর আলেকজান্ডার যখন ভারত আক্রমণ করেন, তখন তক্ষশীলার রাজা আম্ভি আলেকজান্ডারের কাছে আত্মসমর্পণ করেন। এরপর চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য পারসিয়ান ও গ্রীকদের তাড়িয়ে গান্ধারকে শক্তিশালী মৌর্য সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত করেন।


16. কম্বোজ


ষোড়শ মহাজনপদের মধ্যে কম্বোজ ছিল উত্তর-পশ্চিম সীমান্তে অবস্থিত একটি গুরুত্বপূর্ণ জনপদ। এটি গান্ধার রাজ্যের ঠিক পাশেই হিন্দুকুশ পর্বতমালার পার্বত্য অঞ্চলে গড়ে উঠেছিল। তৎকালীন সময়ে কম্বোজ রাজ্যটি মধ্য এশিয়ার সঙ্গে ভারতের যোগাযোগের একটি প্রধান সেতুবন্ধন হিসেবে পরিচিত ছিল।


◼ ভৌগোলিক অবস্থান ও সীমানা

● ​মূল কেন্দ্র: অধিকাংশ ঐতিহাসিক মনে করেন,  বর্তমান পাকিস্তানের হাজারা জেলা ও রাজৌরি অঞ্চল, আফগানিস্তানের উত্তর-পূর্বাঞ্চল এবং হিন্দুকুশ পর্বতমালার পার্শ্ববর্তী এলাকাগুলি নিয়ে প্রাচীন কম্বোজ জনপদ গঠিত হয়েছিল।


● ​সীমানা: কম্বোজের দক্ষিণ-পূর্বে ছিল গান্ধার রাজ্য। উত্তর ও উত্তর-পশ্চিমে ছিল পামির মালভূমি ও মধ্য এশিয়ার পার্বত্য অঞ্চল। চারদিকে পাহাড় ও গিরিপথ দ্বারা বেষ্টিত থাকায় এর অবস্থান ছিল অত্যন্ত দুর্ভেদ্য।


◼ কম্বোজের ​রাজধানী


​কম্বোজ রাজ্যের রাজধানী ছিল রাজপুর বা হাটক


ঐতিহাসিকদের মতে, বর্তমান জম্মু ও কাশ্মীরের রাজৌরি অঞ্চলটিই ছিল প্রাচীন রাজপুর। অনেকের মতে আবার, এর রাজধানী হাটক ছিল আফগানিস্তানের একটি প্রাচীন বাণিজ্যিক কেন্দ্র।


◼ ঐতিহাসিক ও পৌরাণিক প্রেক্ষাপট

● ​মহাভারত অনুসারে: মহাভারতে কম্বোজ রাজাদের বীরত্বের প্রচুর প্রশংসার কথা পাওয়া যায়। মহাভারতের যুগে কম্বোজের বিখ্যাত রাজা ছিলেন সুদক্ষিণ। তিনি কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে কৌরবদের পক্ষে যোগ দিয়েছিলেন। সুদক্ষিণ এক বিশাল অশ্বারোহী সেনাবাহিনী নিয়ে পাণ্ডবদের বিরুদ্ধে লড়াই করেছিলেন এবং অর্জুনের হাতে নিহত হন।


● ​অন্যান্য প্রাচীন সূত্রে: কম্বোজের সবচেয়ে বড় খ্যাতি অর্জন করেছিল তাদের উন্নত জাতের ঘোড়ার জন্য। প্রাচীন ভারতের অধিকাংশ গ্রন্থে এমনকি কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্রেও কম্বোজের ঘোড়াকে শ্রেষ্ঠ বলা হয়েছে। সম্রাট অশোকের ৫ম এবং ১৩তম প্রধান শিলালিপিতে 'যোন-কম্বোজেষু' অঞ্চলের উল্লেখ আছে। সেখানে বলা হয়েছে যে এই সীমান্ত অঞ্চলে মানুষের ধর্মীয় ও নৈতিক উন্নতির জন্য তিনি ধর্ম-মহামাত্রদের নিযুক্ত করেছিলেন।


◼ কম্বোজের ​শাসনব্যবস্থা ও অর্থনীতি


● ​শাসনব্যবস্থা: শুরুর দিকে কম্বোজ ছিল একটি রাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র। কিন্তু খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ শতকে কম্বোজ রাজতন্ত্র ত্যাগ করে একটি শক্তিশালী প্রজাতান্ত্রিক বা গণরাজ্যে রূপান্তরিত হয়। আচার্য চাণক্য তাঁর বিশ্ববিখ্যাত 'অর্থশাস্ত্র' গ্রন্থে কম্বোজকে 'বার্তা-শস্ত্রোপজীবী' সংঘ বা গণরাজ্য বলে বর্ণনা করেছেন।


● ​অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি: পাহাড়ি অঞ্চলে অবস্থানের কারণে কৃষিকাজের পরিবর্তে পশুপালন ছিল কম্বোজের অর্থনীতির মূল ভিত্তি। উন্নত জাতের ঘোড়া, ভেড়া, পশম ও কম্বল উৎপাদনের জন্য কম্বোজ বিশেষ ভাবে সুপরিচিত ছিল। এছাড়া মধ্য এশিয়া ও ভারতের মধ্যে বাণিজ্যিক যোগাযোগের ফলে এই অঞ্চলের ব্যবসা-বাণিজ্য যথেষ্ট সমৃদ্ধি লাভ করেছিল।


◼ কম্বোজ রাজ্যের পতন


​ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে কম্বোজ রাজ্যটি সবসময়ই মধ্য এশিয়া এবং পারস্যের সংস্কৃতির দ্বারা গভীরভাবে প্রভাবিত ছিল।


​গান্ধারের মতোই খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ শতকের শেষে কম্বোজ রাজ্যটিও পারস্যের একিমেনিড সাম্রাজ্যের সম্রাট প্রথম দরায়ুসের দ্বারা পারসিয়ান সাম্রাজ্যের অংশে পরিণত হয়। পরবর্তীতে খ্রিস্টপূর্ব ৩২৭-৩২৬ অব্দে গ্রীক বীর আলেকজান্ডার যখন এই অঞ্চলে আসেন, তখন কম্বোজের উপজাতিরা গ্রীকদের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিরোধ গড়ে তোলে। আলেকজান্ডার স্বয়ং এই যুদ্ধে আহত হয়েছিলেন।


​এরপর চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য এই সমগ্র উত্তর-পশ্চিম সীমান্তকে বিদেশী শাসন থেকে মুক্ত করে শক্তিশালী মৌর্য সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত করেন।


ষোড়শ মহাজনপদের পরিসমাপ্তি ও মগধের উত্থান:


ষোড়শ মহাজনপদগুলির মধ্যে রাজনৈতিক ক্ষমতা দখলের জন্য দীর্ঘ প্রতিদ্বন্দ্বিতা চলে। শেষ পর্যন্ত, প্রাকৃতিক সম্পদ, লৌহ খনি থেকে অস্ত্রের যোগান, উর্বর জমি এবং শক্তিশালী শাসকদের (যেমন: বিম্বিসার, অজাতশত্রু) কারণে মগধ বাকি মহাজনপদগুলির উপর প্রাধান্য বিস্তার করতে সক্ষম হয়। মগধ ধীরে ধীরে অঙ্গ, কাশী, কোশল ও অন্যান্য প্রতিদ্বন্দ্বী রাজ্যগুলিকে নিজ সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত করে নেয়। মগধের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন বৃহদ্রথের পুত্র জরাসন্ধ। তবে মগধের উত্থান শুরু হয় হর্যঙ্ক বংশের শাসনকাল থেকে। শিশুনাগ ও নন্দ বংশের সময়ে এই সাম্রাজ্য বিস্তৃতি লাভ করতে থাকে। এবং সাম্রাজ্য শীর্ষে পৌঁছেছিল মৌর্যদের শাসনকালে।

*

Post a Comment (0)
Previous Post Next Post