বৌদ্ধ ধর্ম হল বিশ্বের অন্যতম প্রাচীন এবং প্রভাবশালী ধর্মগুলোর মধ্যে একটি। আজ থেকে প্রায় আড়াই হাজার বছর আগে, আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ শতকে প্রাচীন ভারতের পবিত্র মাটিতে এই ধর্মের উৎপত্তি ঘটে। রাজপুত্র সিদ্ধার্থ গৌতমের রাজকীয় বিলাসিতা ত্যাগ ও জীবনের সত্য অনুসন্ধানের মধ্য দিয়ে এই ধর্মের যাত্রার শুরু হয়েছিল। এরপর কালক্রমে এটি বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি মানুষের হৃদয়ে স্থান করে নিয়েছে। গৌতম বুদ্ধ ও বৌদ্ধ ধর্মের গুরুত্বপুর্ণ ঘটনাবলী নিচে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:
গৌতম বুদ্ধ
◼ জন্ম ও বংশ পরিচয়:
বেশিরভাগ ঐতিহাসিকদের মতে, গৌতম বুদ্ধ আনুমানিক 563 খ্রিস্টপূর্বাব্দে বর্তমান নেপালের কপিলাবস্তুর লুম্বিনীতে শাক্য বংশের রাজপরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা ছিলেন রাজা শুদ্ধোধন। এবং মাতা ছিলেন মহামায়াদেবী। জন্মের পর তাঁর নাম রাখা হয় সিদ্ধার্থ। সিদ্ধার্থ কথার অর্থ হলো "যিনি সিদ্ধিলাভ করেছেন" বা "যার লক্ষ্য পূরণ হয়েছে"। তার জন্মের 7 দিন পর তার মাতা মারা যান। তাই তার বিমাতা গৌতমী তাকে লালন-পালন করেন।
◼ শৈশব ও শিক্ষা:
সিদ্ধার্থ অত্যন্ত রাজকীয় বিলাসবহুল পরিবেশে বড় হয়ে ওঠেন। কারণ তার পিতা শুদ্ধোধন ছিলেন কপিলাবস্তুর শাক্য গণরাজ্যের প্রধান। রাজা শুদ্ধোধন চেয়েছিলেন তাঁর পুত্র যেন একজন মহান সম্রাট হয়ে ওঠেন। শৈশব থেকেই সিদ্ধার্থ শাস্ত্রপাঠ, ধনুর্বিদ্যা এবং যুদ্ধবিদ্যায় পারদর্শিতা অর্জন করেন। তৎকালীন শ্রেষ্ঠ শিক্ষকদের কাছ থেকে তিনি খুব অল্প সময়েই সমস্ত রাজকীয় বিদ্যা আয়ত্ত করেন। তবে শৈশব থেকেই সিদ্ধার্থ ছিলেন অত্যন্ত গম্ভীর, চিন্তাশীল এবং দয়ালু।
◼ সংসার জীবন:
সিদ্ধার্থের জন্মের পর ঋষি অসিত ভবিষ্যৎবাণী করেছিলেন যে, এই বালক হয় একজন মহান সম্রাট হবেন, নয়তো ঘরসংসার ত্যাগ করে একজন মহান সন্ন্যাসী হবেন। পুত্র যেন কোনোভাবেই জগতের দুঃখ-কষ্ট দেখে বিবাগী না হয়ে যায় তার সব রকম প্রচেষ্টা রাজা শুদ্ধোধন করেছিলেন। জগতের দুঃখ কষ্ট যেন কোনোভাবেই সিদ্ধার্থের কাছে পৌঁছতে না পারে এর জন্য তার চারপাশ কেবল আনন্দ ও উৎসবে ভরিয়ে রাখার ব্যবস্থা করা হয়েছিল। এরপর সংসার ধর্মে আবদ্ধ করার জন্য মাত্র 16 বছর বয়সে সিদ্ধার্থের বিয়ে দেওয়া হয় রাজকুমারী যশোধরার সাথে। তাঁদের ঘরে জন্ম নেয় এক পুত্রসন্তান। তাদের পুত্রের নামকরণ হয় রাহুল। কিন্তু এই রাজকীয় সুখ এবং সাংসারিক বন্ধন সিদ্ধার্থের মনকে আটকে রাখতে পারেনি।
◼ চতুর দৃশ্য:
'চতুর দৃশ্য' বলতে বোঝানো হয়েছে চারটি বিশেষ দৃশ্য। রাজা শুদ্ধোধন তাঁর পুত্রকে জগতের সমস্ত দুঃখ থেকে আড়াল করে রেখেছিলেন। কিন্তু একদিন সিদ্ধার্থের ইচ্ছা হলো তিনি কপিলাবস্তু নগরী ঘুরে দেখবেন। তাই তার সারথি ছন্দককে নিয়ে তিনি রথে চড়ে নগর ভ্রমণে বের হন। আর তারপরই একে একে এই চারটি বিশেষ দৃশ্য তাঁর চোখের সামনে ভেসে ওঠে। সেই বিশেষ চারটি দৃশ্য হল:
1. জরাজীর্ণ বৃদ্ধ (বার্ধক্য): ভ্রমণে বেরিয়ে প্রথমবার সিদ্ধার্থ দেখেন এক অত্যন্ত বৃদ্ধ ব্যক্তিকে। লোকটির শরীর ছিল কুঁকড়ে যাওয়া, চুল সাদা এবং দাঁত পড়ে গেছে। তবুও লাঠিতে ভর দিয়ে বৃদ্ধ অতি কষ্টে কোনোরকমে হেঁটে যাচ্ছিলেন। সিদ্ধার্থ আগে কখনও এমন বার্ধক্য দেখেননি। তখন ছন্দক তাকে বলে যে, এটিই প্রকৃতির নিয়ম এবং সময়ের সাথে সাথে প্রতিটি মানুষকেই এভাবে বৃদ্ধ হতে হবে। তখন জগতের এই সত্যটি সিদ্ধার্থকে বিচলিত করে তোলে।
2. রুগ্ন বা অসুস্থ ব্যক্তি (ব্যাধি): দ্বিতীয়বারে সিদ্ধার্থ দেখেন এক মুমূর্ষু ব্যক্তিকে, যিনি যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছিলেন। রোগাক্রান্ত ওই ব্যক্তি অন্যের সাহায্য ছাড়া নড়াচড়া করতে পারছিলেন না। এর থেকে সিদ্ধার্থ উপলব্ধি করেন যে, শরীর সারাজীবন সুস্থ থাকবে এমনটা সম্ভব নয়; এটি যে কোনো সময় কঠিন রোগের দ্বারা আক্রান্ত হতে পারে। অর্থাৎ সুস্বাস্থ্য যে চিরস্থায়ী নয় সেই চিন্তাটি তখন তাঁকে অস্থির করে তোলে।
3. মৃতদেহ (মৃত্যু): তৃতীয়বারে তিনি দেখতে পান একটি শবযাত্রা। আত্মীয়-স্বজনদের কান্নার মধ্যে দিয়ে চারজন মানুষ একটি মৃতদেহ বয়ে নিয়ে যাচ্ছে। ওই মুহূর্তে জীবনের সবচাইতে কঠিন সত্যটি সিদ্ধার্থের সামনে আসে যা হলো- মৃত্যু। তখন ছন্দক তাঁকে জানান যে, জন্ম নিলে মৃত্যু অনিবার্য। রাজা হোক বা প্রজা, একদিন সকলকেই এই নশ্বর দেহ ত্যাগ করতে হবে। এইবারে সিদ্ধার্থ উপলব্ধি করেন প্রিয়জনদের সাথে এই বিচ্ছেদই হলো জগতের সবথেকে বড়ো দুঃখ।
4. প্রসন্ন সন্ন্যাসী: চতুর্থ দৃশ্যে তিনি দেখতে পান একজন সৌম্য ও শান্ত সন্ন্যাসীকে। তাঁর পরনে গেরুয়া বস্ত্র, হাতে ভিক্ষাপাত্র এবং মুখে এক অদ্ভুত প্রশান্তি। জরা, ব্যাধি বা মৃত্যুর ভয়ের কোনো লেশমাত্র তাঁর চোখেমুখে নেই। সিদ্ধার্থ জানতে পারলেন যে ওই ব্যক্তিটি জাগতিক মোহ ত্যাগ করে শান্তি ও সত্যের খোঁজে বেড়িয়েছেন। তারপরই সিদ্ধার্থ উপলব্ধি করলেন যে, দুঃখময় এই সংসার থেকে মুক্তির একমাত্র পথ হলো আধ্যাত্মিক সাধনা।
◼ মহাভিনিষ্ক্রমণ:
সিদ্ধার্থ 29 বছর বয়সে রাজকীয় জীবন ও পারিবারিক মায়া ত্যাগ করে সত্যের সন্ধানে বেরিয়ে পড়েন। তার গৃহত্যাগের এই ঘটনাকে বৌদ্ধ ধর্মে 'মহাভিনিষ্ক্রমণ' বা 'মহান প্রস্থান' বলা হয়। সিদ্ধার্থের গৃহ ত্যাগের ঘটনা নিচে বর্ণনা করা হলো:
● সিদ্ধার্থের উপলব্ধি: চতুর দৃশ্য দেখার পর সিদ্ধার্থের মনে এক ভিন্ন চেতনা জেগে ওঠে। তিনি বুঝতে পারেন যে রাজপ্রাসাদের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য আসলে ক্ষণস্থায়ী। বাস্তবে মানুষের দুঃখের কোনো স্থায়ী সমাধান সেখানে নেই। ঠিক সেই সময়েই তাঁর পুত্র রাহুলের জন্ম হয়। তবে সেই নতুন পারিবারিক মায়াও তাঁকে আটকে রাখতে পারেনি। তিনি মনে করেছিলেন পারিবারিক বন্ধন তাঁকে সত্যের পথ থেকে বিচ্যুত করতে পারে।
● শেষ বিদায়: এরপর এক গভীর রাতে, যখন পুরো কপিলাবস্তু নগরী ঘুমে মগ্ন, তখন সিদ্ধার্থ চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। তিনি নিঃশব্দে স্ত্রী যশোধরা ও নবজাতক পুত্র রাহুলের শয়নকক্ষে যান। তাঁদের শেষবারের মতো দেখেন এবং তাঁদেরকে না জাগিয়েই ঘর থেকে বেরিয়ে আসেন।
● সঙ্গী ও বাহন: তাঁর বিশ্বস্ত সারথি ছন্দককে এবং প্রিয় ঘোড়া কন্থককে নিয়ে তিনি প্রাসাদ ত্যাগ করেন।
● প্রতিজ্ঞা: অনেকের মতে, কপিলাবস্তুর সীমানা ছাড়িয়ে তিনি অনমা নদীর তীরে পৌঁছান। সেখানে পৌঁছে প্রথমে তিনি তাঁর সুন্দর লম্বা চুল কেটে ফেলেন। তারপর রাজকীয় অলঙ্কার ও মূল্যবান পোশাক গুলি খুলে সারথি ছন্দককে দিয়ে দেন এবং সাধারণ গেরুয়া বস্ত্র পরিধান করেন।
তিনি ছন্দককে আদেশ দেন প্রাসাদে ফিরে গিয়ে রাজা শুদ্ধোধনকে জানাতে যে, সিদ্ধার্থ সত্য ও অমরত্বের পথ খুঁজে না পাওয়া পর্যন্ত আর ফিরবেন না।
◼ বোধিলাভ:
মহাভিনিষ্ক্রমণের পর দীর্ঘ ছয় বছর কঠোর সাধনার পর বুদ্ধের জীবনে আসে সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। গৌতম বুদ্ধ লাভ করেন পরম জ্ঞান, যা বিশ্ব ইতিহাসে 'বোধিলাভ' নামে পরিচিত। নিচে গৌতম বুদ্ধের এই বোধিলাভের ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ দেওয়া হলো:
● কঠোর তপস্যা ও মধ্যপন্থা: রাজপ্রাসাদ ত্যাগের পর সিদ্ধার্থ প্রথমে আলারা কালাম এবং উদ্রক রামপুত্র নামক দুই গুরুর কাছে যোগশিক্ষা গ্রহণ করেন। এরপর তিনি উরুবিল্ব নামক স্থানে পাঁচজন সঙ্গীর সাথে কঠোর তপস্যা শুরু করেন। তপস্যার সময় তিনি এতটাই অনাহারে ছিলেন যে তাঁর শরীর কঙ্কালসার হয়ে গিয়েছিল। তিনি উপলব্ধি করেন, শরীরকে কষ্ট দিয়ে সত্য লাভ সম্ভব নয়। ঠিক সেই সময়ে তিনি সুজাতা নামক এক যুবতীর দেওয়া পরমান্ন বা পায়েস গ্রহণ করেন। এরফলে তাঁর সঙ্গীরা তাঁকে ধর্মচ্যুত বলে মনে করে তার সঙ্গ ত্যাগ করে চলে যান। এরপর সিদ্ধার্থ উপলব্ধি করেন যে, চরম ভোগবিলাস এবং চরম কৃচ্ছ্রসাধন কোনোটিই সঠিক নয়। তাই তিনি বেছে নেন 'মধ্যপন্থা'।
● প্রতিজ্ঞা গ্রহণ: সুজাতার দেওয়া পরমান্ন গ্রহণের পর সিদ্ধার্থের শরীরে নতুন করে শক্তির সঞ্চার হয়। এরপর তিনি গয়ার নিরঞ্জনা নদীর তীরে একটি অশ্বত্থ গাছের নিচে পুনরায় ধ্যানমগ্ন হন। তিনি প্রতিজ্ঞা করেন যে, পরম জ্ঞান লাভ না করা পর্যন্ত তিনি তার আসন ত্যাগ করবেন না।
● ভূমিস্পর্শ মুদ্রা: বৌদ্ধ ধর্মগ্রন্থ অনুসারে, সিদ্ধার্থ যখন গভীর ধ্যানে মগ্ন হন, তখন 'মার' অর্থাৎ পাপ বা কামনার অধিপতি তাঁকে বিচ্যুত করার জন্য বিভিন্ন ভয়ংকর বিভীষিকা এবং প্রলোভন দেখায়। কিন্তু সিদ্ধার্থ নিজের লক্ষ্যে অটল থাকেন এবং ভূমি স্পর্শ করে পৃথিবীর কাছে তাঁর সাধনার সাক্ষ্য চান। বৌদ্ধ ধর্মের ইতিহাসে এই ঘটনা 'ভূমিস্পর্শ মুদ্রা' নামে পরিচিত।
● জ্ঞান লাভ: অবশেষে ৩৫ বছর বয়সে, এক বৈশাখী পূর্ণিমা রাতে দীর্ঘ ধ্যানের পর সিদ্ধার্থের মনের সমস্ত অন্ধকার দূর হয়ে যায়। তিনি চার আর্য সত্য এবং অষ্টাঙ্গিক মার্গের রহস্য ভেদ করেন এবং লাভ করেন পরম জ্ঞান বা 'বোধি'।
● নতুন পরিচিতি: বোধিলাভ করার পর থেকে সিদ্ধার্থ আর রাজকুমার সিদ্ধার্থ রইলেন না। তখন তিনি পরিচিত হলেন 'বুদ্ধ' অর্থাৎ 'গৌতম বুদ্ধ' নামে। বুদ্ধ কথার অর্থ হল যিনি পরম জ্ঞান লাভ করেছেন বা জাগ্রত হয়েছেন। যে অশ্বত্থ গাছের নিচে তিনি জ্ঞান লাভ করেছিলেন, সেটি পরিচিত হয় 'বোধিবৃক্ষ' নামে এবং স্থানটি পরিচিতি পায় 'বুদ্ধগয়া' হিসেবে।
◼ ধর্মচক্র প্রবর্তন:
গৌতম বুদ্ধ বোধিলাভ করার পর প্রথম জ্ঞান প্রচারের ঘটনা বৌদ্ধ ধর্মের ইতিহাসে 'ধর্মচক্র প্রবর্তন' নামে পরিচিত। এটি বৌদ্ধ ধর্মের ইতিহাসের অন্যতম প্রধান ভিত্তি। নিচে এর বিস্তারিত বিবরণ দেওয়া হলো:
● স্থান: বুদ্ধগয়ায় জ্ঞান লাভের পর গৌতম বুদ্ধ স্থির করেন যে তাঁর এই সত্যের বাণী তিনি সবার আগে তাঁর সেই পাঁচজন সঙ্গীকে দেবেন, যাঁরা সাধনার সময় তাঁকে ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন। এই উদ্দেশ্যে তিনি বুদ্ধগয়া থেকে পদযাত্রা করে বারাণসীর কাছে সারনাথের মৃগদাব নামক হরিণ উদ্যানে পৌঁছান। সেখানেই সেই পাঁচজন সঙ্গীর সাথে বুদ্ধের সাক্ষাৎ হয় এবং তাদেকে ধর্মোপদেশ প্রদান করেন।
● পঞ্চবর্গীয় শিষ্য: গৌতম বুদ্ধ যাঁদেরকে প্রথম ধর্মোপদেশ দিয়েছিলেন, তাঁদের 'পঞ্চবর্গীয় শিষ্য' বলা হয়। প্রথমে তাঁরা বুদ্ধকে উপেক্ষা করতে চাইছিলেন। তবে বুদ্ধের শান্ত ও জ্যোতির্ময় রূপ দেখে তাঁরা অভিভূত হন এবং তাঁর শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন। পঞ্চবর্গীয় শিষ্যগণ হলেন:
- কৌন্ডিন্য
- ভদ্দীয়
- বপ্প
- মহানাম
- অশ্বজিৎ
◼ চার আর্য সত্য:
বৌদ্ধ ধর্মের মূল ভিত্তি হলো চার আর্য সত্য। গৌতম বুদ্ধ জ্ঞান লাভের পর এই চারটি সত্যই প্রথম প্রচার করেন। এগুলি মানুষের দুঃখ এবং তা থেকে মুক্তির পথ নির্দেশ করে। চারটি আর্য সত্য হলো:
- জগৎ দুঃখময়: প্রথম সত্য হলো যে, মানব জীবন দুঃখময়। দুঃখ বলতে শুধু কষ্ট নয়, জীবনের নশ্বরতা, অস্থিরতা এবং অতৃপ্তিকেও বোঝানো হয়েছে। জন্ম, বার্ধক্য, ব্যাধি, মৃত্যু, অপ্রিয় বস্তুর সাথে সংযোগ এবং প্রিয় বস্তুর বিচ্ছেদ এই সবই দুঃখের অন্তর্ভুক্ত।
- দুঃখ সমুদয়: দ্বিতীয় সত্য হলো দুঃখের কারণ। বুদ্ধের মতে, দুঃখের মূল কারণ হলো তৃষ্ণা বা তীব্র আকাঙ্ক্ষা, লোভ এবং আসক্তি। এই তৃষ্ণাই মানুষকে জন্ম-মৃত্যুর চক্রে আবদ্ধ রাখে।
- দুঃখ নিরোধ: তৃতীয় সত্যটি হলো দুঃখ নিবারণ। যেহেতু দুঃখের কারণ তৃষ্ণা, তাই তৃষ্ণা বা আসক্তিকে সম্পূর্ণরূপে নিবৃত্তি করা গেলে দুঃখের অবসান সম্ভব। এই অবস্থাই হলো নির্বাণ লাভ বা পরম মুক্তি।
- দুঃখ নিরোধগামিনী প্রতিপদ: চতুর্থ সত্যটি হলো সেই পথ, যা অনুসরণ করে নির্বাণ লাভ করা যায়। এই পথটি হলো অষ্টাঙ্গিক মার্গ বা মধ্যপন্থা।
◼ অষ্টাঙ্গিক মার্গ:
'অষ্টাঙ্গিক মার্গ' বা আর্য অষ্টাঙ্গিক মার্গ হলো বৌদ্ধ ধর্মের চতুর্থ আর্য সত্য অর্থাৎ দুঃখ নিরোধের পথ। গৌতম বুদ্ধ যে আটটি পথকে দুঃখ থেকে মুক্তি বা নির্বাণ লাভের মধ্যপন্থা হিসেবে বর্ণনা করেছেন সেগুলি হলো:
- 1. সৎ দৃষ্টি: চার আর্য সত্য সম্পর্কে সঠিক জ্ঞান।
- 2. সৎ সংকল্প: অহিংসা ও ত্যাগের প্রতি দৃঢ় মানসিকতা।
- 3. সৎ বাক্য: মিথ্যা ও রূঢ় কথা পরিহার।
- 4. সৎ কর্ম: হত্যা, চুরি ও অন্যান্য অসৎ কাজ থেকে বিরত থাকা।
- 5. সৎ জীবনধারণ: সৎ ও অহিংস জীবিকা গ্রহণ।
- 6. সৎ প্রচেষ্টা: কল্যাণকর চিন্তা তৈরি ও অকল্যাণকর চিন্তা দূর করার চেষ্টা।
- 7. সৎ স্মৃতি: শরীর ও মনের প্রতি সর্বদা সজাগ থাকা।
- 8. সৎ সমাধি: ধ্যানের মাধ্যমে গভীর মানসিক একাগ্রতা অর্জন।
◼ মহাপরিনির্বাণ:
গৌতম বুদ্ধ দীর্ঘ 45 বছর ধরে উত্তর ও পূর্ব ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে তাঁর অহিংসা ও মৈত্রীর বাণী প্রচার করেন। অবশেষে 80 বছর বয়সে তিনি ইহলোক ত্যাগ করেন। গৌতম বুদ্ধের এই দেহ ত্যাগের ঘটনা বৌদ্ধ ধর্মে 'মহাপরিনির্বাণ' নামে পরিচিত। নিচে মহাপরিনির্বাণের বিস্তারিত বিবরণ দেওয়া হলো:
● মহাপরিনির্বাণের প্রেক্ষাপট: কুশীনগরে যাওয়ার আগে গৌতম বুদ্ধ পাবা নগরীতে চুন্দ নামক এক কামারের দেওয়া খাবার 'সুকর-মদ্দব' গ্রহণ করেন। এরপর তিনি মারাত্মক অসুস্থ হয়ে পড়েন। অসুস্থ শরীর নিয়েই তিনি কষ্ট করে কুশীনগরে পৌঁছান। এরপর তাঁর প্রিয় শিষ্য আনন্দকে বলেন তাঁর শয্যা প্রস্তুত করতে। অসুস্থতার মধ্যেও তিনি চুন্দকে অভয় দিয়ে বলেন যে, বুদ্ধকে শেষ অন্ন দান করাটা অত্যন্ত মহৎ কাজ তাই চুন্দ যেন অনুতপ্ত না হন।
● মহাপরিনির্বাণের স্থান: ভারতের উত্তরপ্রদেশ রাজ্যের কুশীনগরে হিরণ্যবতী নদীর তীরে দুটি বিশাল শাল গাছের নিচে গৌতম বুদ্ধ শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তৎকালীন সময়ে এটি মল্ল রাজবংশের রাজধানী ছিল।
● মহাপরিনির্বাণের সময়: মহাপরিনির্বাণের সঠিক সময়কাল নিয়ে ঐতিহাসিকদের মধ্যে অনেক মতভেদ রয়েছে। অনেকের মতে, আনুমানিক ৪৮৩ খ্রিস্টপূর্বাব্দের এক বৈশাখী পূর্ণিমা তিথিতে গৌতম বুদ্ধ দেহ ত্যাগ করেন।
● বুদ্ধের শেষ শিষ্য: মৃত্যুর ঠিক আগে সুভদ্র নামক এক পরিব্রাজক বুদ্ধের কাছে ধর্ম উপদেশ নেওয়ার জন্য আসেন। শিষ্যরা তাঁকে বাধা দিলেও বুদ্ধ তাঁকে কাছে ডাকেন এবং তাঁকে দীক্ষা দেন। সুভদ্রই ছিলেন বুদ্ধের জীবনের সর্বশেষ শিষ্য।
● অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া ও দেহাবশেষ বণ্টন: বুদ্ধের দেহত্যাগের পর মল্ল রাজারা অত্যন্ত সম্মানের সাথে তাঁর অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া সম্পন্ন করেন। তবে তারপর বুদ্ধের পবিত্র দেহাবশেষ অর্থাৎ অস্থি ও ভস্ম নিয়ে বিভিন্ন রাজ্যের প্রধানদের মধ্যে বিবাদ তৈরি হয়। তখন দ্রোণ নামক এক ব্রাহ্মণ তা আটটি ভাগে ভাগ করে দেন। এই অবশেষগুলো দিয়ে পরবর্তীকালে মগধ, বৈশালী, কপিলাবস্তুসহ বিভিন্ন স্থানে স্তূপ নির্মাণ করা হয়।
শাস্ত্রীয় যুগ ও বৌদ্ধ সংগীতি
বুদ্ধের মহাপরিনির্বাণের পর তাঁর শিক্ষা সংরক্ষণ ও প্রচারের জন্য চারটি প্রধান সম্মেলন বা সংগীতি অনুষ্ঠিত হয়।
◼ প্রথম বৌদ্ধ সংগীতি
প্রথম বৌদ্ধ সংগীতি বৌদ্ধ ধর্মের ইতিহাসে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। গৌতম বুদ্ধের মহাপরিনির্বাণের পর বৌদ্ধ সংঘের ঐক্য বজায় রাখা এবং তাঁর বাণী ও শাসনবিধিকে সংরক্ষণ করার উদ্দেশ্যে এই মহাসভার আয়োজন করা হয়েছিল।
● সময়কাল: প্রচলিত মতে, বুদ্ধের মহাপরিনির্বাণের কিছুদিন পর, আনুমানিক 483 খ্রিস্টপূর্বাব্দে প্রথম বৌদ্ধ সংগীতি আয়োজিত হয়।
● স্থান: স্থানটি ছিল মগধের রাজধানী রাজগৃহের সপ্তপর্ণী গুহা। বর্তমান বিহারের রাজগিরে অবস্থিত।
● পৃষ্ঠপোষকতা: মগধের হর্যাঙ্ক বংশের পরাক্রমশালী রাজা অজাতশত্রু এই সংগীতির সম্পূর্ণ পৃষ্ঠপোষকতা করেন। তিনি সভার নিরাপত্তার সমস্ত ব্যবস্থা করেছিলেন।
● সভাপতি: বুদ্ধের অন্যতম প্রধান প্রবীণ শিষ্য মহাকাশ্যপ এই সভার সভাপতিত্ব করেন।
● সদস্য সংখ্যা: বুদ্ধের শিষ্যদের মধ্য থেকে বেছে নেওয়া 500 জন অর্হৎ বা উচ্চজ্ঞানসম্পন্ন ভিক্ষু এই সভায় অংশ নিয়েছিলেন। এই কারণে এই সংগীতিকে অনেক সময় 'পঞ্চশতিকা' বলা হয়ে থাকে।
● গুরুত্ব ও ফলাফল: প্রথম বৌদ্ধ সংগীতির মাধ্যমেই বৌদ্ধ ধর্মগ্রন্থ ত্রিপিটকের প্রথম দুটি অংশ অর্থাৎ, সূত্ত পিটক ও বিনয় পিটক প্রথম সুনির্দিষ্ট রূপ পায়।
বুদ্ধের মৃত্যুর পর সংঘের মধ্যে বিভেদের যে আশঙ্কা দেখা দিয়েছিল, এর মাধ্যমে তা কঠোরভাবে দমন করা সম্ভব হয়। এছাড়া এর মাধ্যমে বৌদ্ধ ধর্মের মূল আদর্শ সুরক্ষিত থাকে।
এই সংগীতিতে আবৃত্ত ও অনুমোদিত বাণীগুলো বহু শতাব্দী ধরে ভিক্ষুদের মুখে মুখে সংরক্ষিত ছিল। পরবর্তীকালে এগুলো লিখিত আকারে লিপিবদ্ধ হয়।
◼ দ্বিতীয় বৌদ্ধ সংগীতি
প্রথম বৌদ্ধ সংগীতির প্রায় একশত বছর পরে অনুষ্ঠিত দ্বিতীয় বৌদ্ধ সংগীতি। এই মহাসভায় সংঘের শৃঙ্খলা ও বিনয় সংক্রান্ত মতবিরোধ নিয়ে আলোচনা করা হয়। এই সংগীতির ফলেই বৌদ্ধ সংঘে প্রথম বড় ধরনের বিভেদের সূচনা ঘটে।
● সময়কাল: মতান্তরে, বুদ্ধের মহাপরিনির্বাণের ঠিক 100 বছর পর, আনুমানিক 383 খ্রিস্টপূর্বাব্দে দ্বিতীয় বৌদ্ধ সংগীতি আয়োজিত হয়।
● স্থান: স্থানটি ছিল বৈশালীর বালুকারাম বিহার।
● পৃষ্ঠপোষকতা: মগধের শিশুনাগ বংশের রাজা কালাশোক এই সভার আয়োজন ও নিরাপত্তার দায়িত্ব নেন।
● সভাপতি: এই সংগীতির প্রধান আচার্য বা সভাপতি ছিলেন প্রবীণ ভিক্ষু সবকামী।
● সদস্য সংখ্যা: বিতর্ক নিষ্পত্তির জন্য ভারতের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে 700 জন অর্হৎ ভিক্ষু এই মহাসভায় সমবেত হয়েছিলেন। তাই এই সভাকে অনেক সময় 'সপ্তশতিকা' বলা হয়।
● গুরুত্ব: দ্বিতীয় বৌদ্ধ সংগীতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ফল ছিল সংঘের মধ্যে প্রথম বড় ধরনের মতভেদের প্রকাশ। এর মাধ্যমে বৌদ্ধ ধর্মে বিভিন্ন সম্প্রদায় গঠনের প্রক্রিয়া শুরু হয়। এই সংগীতির মাধ্যমে ভিক্ষুদের জন্য প্রণীত নিয়মাবলির গুরুত্ব পুনরায় প্রতিষ্ঠিত হয় এবং সংঘের শৃঙ্খলা বজায় রাখার চেষ্টা করা হয়।
◼ তৃতীয় বৌদ্ধ সংগীতি
দ্বিতীয় বৌদ্ধ সংগীতির প্রায় একশ ত্রিশ বছর পরে অনুষ্ঠিত হয় তৃতীয় বৌদ্ধ সংগীতি। এই মহাসভায় বৌদ্ধ সংঘের অভ্যন্তরীণ ভেদাভেদ, দুর্নীতি দূরীকরণ এবং বুদ্ধের মূল শিক্ষা বা ধম্মকে পরিশুদ্ধ করার বিষয়ে আলোচনা করা হয়। এই সংগীতির মাধ্যমেই বৌদ্ধ ধর্মগ্রন্থের শেষ খণ্ডটি সংকলিত হয় এবং এটি একটি বিশ্বজনীন ধর্মে রূপান্তরিত হওয়ার পথ পায়।
● সময়কাল: মতান্তরে, বুদ্ধের মহাপরিনির্বাণের প্রায় 236 বছর পর, আনুমানিক 250 খ্রিস্টপূর্বাব্দে তৃতীয় বৌদ্ধ সংগীতি আয়োজিত হয়।
● স্থান: স্থানটি ছিল মৌর্য সাম্রাজ্যের রাজধানী পাটলিপুত্রের অশোকারাম বিহার।
● পৃষ্ঠপোষকতা: মৌর্য বংশের মহান সম্রাট অশোক এই সভার আয়োজন ও নিরাপত্তার দায়িত্ব নেন।
● সভাপতি: এই সংগীতির প্রধান আচার্য বা সভাপতি ছিলেন পণ্ডিত ভিক্ষু মোগলিপুত্ত তিষ্য।
● সদস্য সংখ্যা: সংঘের শুদ্ধিকরণ এবং বিতর্ক নিষ্পত্তির জন্য ভারতের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে 1,000 জন অর্হৎ ভিক্ষু এই মহাসভায় সমবেত হয়েছিলেন। তাই এই সভাকে 'সহস্রিকা' বলা হয়।
গুরুত্ব: তৃতীয় বৌদ্ধ সংগীতির সঙ্গে অভিধর্ম পিটকের সুসংগঠিত রূপ প্রদানের বিষয়টি যুক্ত। এর মাধ্যমে বৌদ্ধ ধর্মগ্রন্থ ত্রিপিটকের প্রচলিত কাঠামো আরও সুদৃঢ় হয়। এই সংগীতির মাধ্যমে সংঘ থেকে সুবিধাবাদী ও ভণ্ড ভিক্ষুদের বহিষ্কার করে পুনরায় শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠিত করা হয়। এছাড়া, এই সভার পর সম্রাট অশোকের উদ্যোগে ভারতের বাইরে শ্রীলঙ্কা ও মায়ানমার সহ বিভিন্ন দেশে বৌদ্ধ ধর্ম প্রচারের জন্য ধর্মদূত পাঠানো শুরু হয়।
◼ চতুর্থ বৌদ্ধ সংগীতি
তৃতীয় বৌদ্ধ সংগীতির প্রায় তিনশো বছর পরে অনুষ্ঠিত হয় চতুর্থ বৌদ্ধ সংগীতি। এই মহাসভায় বৌদ্ধ ধর্মের আদর্শগত ও দার্শনিক মতভেদ নিয়ে আলোচনা করা হয়। এই সংগীতির ফলেই বৌদ্ধ সংঘ আনুষ্ঠানিকভাবে সম্পূর্ণ দুটি ভিন্ন চিন্তাধারা বা সম্প্রদায়ে বিভক্ত হয়ে যায়। আর ধর্মীয় আলোচনার প্রধান ভাষা হিসেবে সংস্কৃতের আত্মপ্রকাশ ঘটে।
● সময়কাল: আনুমানিক প্রথম খ্রিস্টীয় শতকে (মতান্তরে 72 খ্রিস্টাব্দে) চতুর্থ বৌদ্ধ সংগীতি আয়োজিত হয়।
● স্থান: স্থানটি ছিল কাশ্মীরের কুণ্ডলবন বিহার। মতান্তরে, জলন্ধরের কুয়ানা বিহার।
● পৃষ্ঠপোষকতা: কুশাণ বংশের মহান সম্রাট কণিষ্ক এই সভার আয়োজন ও নিরাপত্তার দায়িত্ব নেন।
● সভাপতি: এই সংগীতির প্রধান আচার্য বা সভাপতি ছিলেন পণ্ডিত ভিক্ষু বসুমিত্র এবং সহ-সভাপতি ছিলেন বিখ্যাত কবি ও দার্শনিক অশ্বঘোষ।
● সদস্য সংখ্যা: বৌদ্ধ ধর্মের বিভিন্ন শাখার জটিল তত্ত্বের সমাধান ও শাস্ত্রের ভাষ্য রচনার জন্য 500 জন অর্হৎ এবং 500 জন পণ্ডিত ভিক্ষুসহ মোট 1,000 জন সদস্য এই মহাসভায় সমবেত হয়েছিলেন।
● গুরুত্ব: এই সংগীতির মাধ্যমে ত্রিপিটকের জটিল তত্ত্বগুলির ব্যাখ্যা হিসেবে 'বিভাষা শাস্ত্র' নামক বিশাল ভাষ্য গ্রন্থ রচনা করা হয়। এছাড়া, এই মহাসভার পর থেকে বৌদ্ধ সাহিত্য ও দার্শনিক আলোচনায় সংস্কৃত ভাষার ব্যবহার বৃদ্ধি পায়।
বৌদ্ধ ধর্মের বিশ্বায়ন
বৌদ্ধ ধর্মের ইতিহাসে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময় হল সম্রাট অশোকের রাজত্বকাল অর্থাৎ 268 থেকে 232 খ্রিস্টপূর্বাব্দ পর্যন্ত সময়কাল ।
- অশোকের পৃষ্ঠপোষকতা: কলিঙ্গ যুদ্ধের পর অনুশোচনা থেকে অশোক বৌদ্ধ ধর্ম গ্রহণ করেন। এরপর তিনি এটিকে বিশেষ মর্যাদা দেন এবং বৌদ্ধ ধর্মের প্রচারকে আরো উৎসাহিত করেন। তিনি শিলালিপি ও স্তূপ নির্মাণের মাধ্যমে ধর্মের প্রচার করেন।
- মিশনারি কার্যকলাপ: অশোক তাঁর পুত্র মহেন্দ্র এবং কন্যা সংঘমিত্রাকে শ্রীলঙ্কা-সহ বিভিন্ন অঞ্চলে ধর্ম প্রচারের জন্য পাঠান। ফলে এই ধর্ম ভারতের সীমানা ছাড়িয়ে আন্তর্জাতিক পরিচিতি লাভ করে।
বৌদ্ধ ধর্মের বিভাজন
গৌতম বুদ্ধের দেহত্যাগের প্রায় 250 বছরের মধ্যে বৌদ্ধ ধর্ম প্রধানত হীনযান ও মহাযান নামে দুটি বড় শাখায় বিভক্ত হয়।
◼ হীনযান:
হীনযান" শব্দের অর্থ হলো 'ক্ষুদ্র যান' বা 'ছোট পথ'। এটি শ্রীলঙ্কা, মায়ানমার, থাইল্যান্ড এবং কম্বোডিয়াতে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। এর মূল বৈশিষ্ট্য গুলি হল:
- শিক্ষার উৎস: এর অনুসারীরা বুদ্ধের মূল শিক্ষা বা ত্রিপিটকের পালি সংস্করণের প্রতি সবচেয়ে বেশি বিশ্বস্ত ছিলেন।
- আদর্শ: হীনযানের সর্বোচ্চ আদর্শ হলো অর্হৎ হওয়া। অর্হৎ হলেন সেই ব্যক্তি, যিনি ব্যক্তিগতভাবে বুদ্ধের নির্দেশিত পথে সাধনা করে নির্বাণ লাভ করেন এবং সকল দুঃখের অবসান ঘটান।
- নির্বাণের পথ: নির্বাণ লাভ বা মুক্তি এখানে মূলত ব্যক্তিগত প্রচেষ্টার ফল। প্রত্যেককে নিজের পথ নিজেকেই তৈরি করতে হয়।
- বুদ্ধের ধারণা: বুদ্ধকে এখানে একজন ঐতিহাসিক শিক্ষক এবং পথ-প্রদর্শক হিসেবে দেখা হয়। যিনি সাধারণ মানুষের মতো জন্মগ্রহণ করেছিলেন এবং কঠোর সাধনার মাধ্যমে জ্ঞান লাভ করেছিলেন। এটিতে বুদ্ধকে দেবতা হিসেবে পূজা করা হতো না। অর্থাৎ এর অনুসারীরা মূর্তি পূজায় বিশ্বাসী নয়।
- প্রচার ও প্রসার: এটি প্রধানত শ্রীলঙ্কা, থাইল্যান্ড, মায়ানমার (বার্মা), কম্বোডিয়া এবং লাওসের মতো দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোতে প্রচলিত হয়।
◼ মহাযান:
'মহাযান' শব্দের অর্থ হলো 'মহৎ যান' বা 'বৃহত্তর পথ'। এটি চীন, জাপান, কোরিয়া এবং তিব্বতে ছড়িয়ে পড়ে। এর মূল বৈশিষ্ট্য গুলি হল:
- শিক্ষার উৎস: মহাযানের অনুসারীরা ত্রিপিটক ছাড়াও তাদের নিজস্ব সূত্র বা শাস্ত্র (যেমন প্রজ্ঞাপারমিতা সূত্র) অনুসরণ করে। তারা মনে করে বুদ্ধের উচ্চতর ও গভীর শিক্ষা এই সূত্রগুলোতে নিহিত।
- আদর্শ: মহাযানের সর্বোচ্চ আদর্শ হলো বোধিসত্ত্ব। বোধিসত্ত্ব হলেন সেই ব্যক্তি যিনি নির্বাণ লাভ করার পরও, জগতের সকল প্রাণীর মুক্তি না হওয়া পর্যন্ত স্বেচ্ছায় নিজের নির্বাণ স্থগিত রাখেন এবং অন্যদের সাহায্য করেন।
- নির্বাণের পথ: মহাযান অনুসারে মুক্তি ব্যক্তিগত নয়, বরং সামগ্রিক। অন্যের প্রতি করুণা দেখিয়ে এবং তাদের মুক্তির জন্য কাজ করার মাধ্যমেই প্রকৃত মুক্তি আসে। এর অনুসারীরা বুদ্ধ ও বোধিসত্ত্বদের পূজা করাই বিশ্বাসী।
- বুদ্ধের ধারণা: বুদ্ধকে এখানে একজন অতিমানবীয় এবং চিরন্তন সত্তা হিসেবে দেখা হয়। তাদের কাছে অনেক বুদ্ধ এবং বোধিসত্ত্ব আছেন, যারা সাধকদের মুক্তি পেতে সাহায্য করেন।
- প্রচার ও প্রসার: এটি প্রধানত চীন, জাপান, কোরিয়া, ভিয়েতনাম, তিব্বত এবং মঙ্গোলিয়ার মতো পূর্ব এশিয়া ও হিমালয় অঞ্চলে প্রচলিত।
বৌদ্ধ সাহিত্য
বৌদ্ধ সাহিত্যকে প্রাথমিকভাবে দুটি প্রধান ধারা এবং বিভিন্ন আঞ্চলিক ভাষা ও ঐতিহ্যের ভিত্তিতে ভাগ করা যায়। বৌদ্ধ ধর্মের আদি সাহিত্য সাধারণত পালি এবং পরবর্তী সাহিত্য মূলত সংস্কৃত ভাষায় রচিত হয়েছিল।
◼ ত্রিপিটক
ত্রিপিটক হলো বৌদ্ধ ধর্মের প্রাচীনতম ও সবচেয়ে প্রামাণ্য ধর্মগ্রন্থ। 'ত্রিপিটক' শব্দের অর্থ হলো 'তিনটি ঝুড়ি'। এটি মূলত পালি ভাষায় রচিত এবং থেরবাদ (হীনযান) শাখার মূল ভিত্তি।
◉ বিনয় পিটক:
- বিষয়বস্তু: এটি বৌদ্ধ ভিক্ষু ও ভিক্ষুণীদের জন্য সংঘের আচরণবিধি, নিয়মাবলী এবং জীবনযাপন সংক্রান্ত নির্দেশিকা নিয়ে গঠিত।
- গুরুত্ব: সংঘের শৃঙ্খলা ও পবিত্রতা বজায় রাখার জন্য এটি অপরিহার্য।
◉ সুত্ত পিটক:
- বিষয়বস্তু: এটি হলো গৌতম বুদ্ধ এবং তাঁর প্রধান শিষ্যদের দ্বারা প্রদত্ত উপদেশ, ধর্মোপদেশ এবং কথোপকথনগুলির সংগ্রহ।
- প্রধান ভাগ: এতে পাঁচটি প্রধান বিভাগ বা নিকায় রয়েছে, যেমন দীর্ঘ নিকায়, মজ্ঝিম নিকায়, সংযুক্ত নিকায়, অঙ্গুত্তর নিকায় এবং খুদ্দক নিকায়।
- গুরুত্ব: এটি বুদ্ধের মূল দার্শনিক ও নৈতিক শিক্ষাগুলির উৎস।
◉ অভিধর্ম পিটক:
- বিষয়বস্তু: এটি বুদ্ধের শিক্ষাগুলির দার্শনিক ব্যাখ্যা, মনোবিজ্ঞান এবং উচ্চতর দর্শন নিয়ে গঠিত।
- গুরুত্ব: এটি ধর্মীয় সত্যের বৈজ্ঞানিক ও তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ করে। এটি প্রধানত তৃতীয় বৌদ্ধ সংগীতিতে সংকলিত হয়েছে।
◼ মহাযান সূত্র
মহাযান বৌদ্ধ ধর্মের নিজস্ব বিপুল সাহিত্য ভান্ডার রয়েছে, যা প্রধানত সংস্কৃত ভাষায় রচিত এবং পরে চীনা, তিব্বতি ও অন্যান্য ভাষায় অনুবাদিত হয়।
- প্রজ্ঞাপারমিতা সূত্র: 'প্রজ্ঞার পূর্ণতা' নামে পরিচিত এই সূত্রগুলি শূন্যতা এবং বোধিসত্ত্বের আদর্শের উপর জোর দিয়েছে। এর মধ্যে বিখ্যাত হল হৃদয় সূত্র এবং হীরক সূত্র।
- সদ্ধর্ম পুণ্ডরীক সূত্র বা লোটাস সূত্র: এটি মহাযানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ধর্মগ্রন্থ। এটি বুদ্ধের চিরন্তন প্রকৃতি এবং সকল প্রাণীর বুদ্ধত্ব লাভের সম্ভাবনার কথা বলে।
- অবতংসক সূত্র বা ফ্লাওয়ার গার্ল্যান্ড সূত্র: এটি মহাবিশ্বের আন্তঃসংযুক্ততা এবং ঐক্যের ধারণা বর্ণনা করে।
- দশভূমিক সূত্র: এটি বোধিসত্ত্বের দশটি স্তর বা ধাপ গুলিকে বর্ণনা করে।
◼ ভাষ্য সাহিত্য
ত্রিপিটক এবং সূত্রগুলির গভীর ব্যাখ্যা ও বিশ্লেষণ করার জন্য বহুভাষ্য এবং গ্রন্থ রচিত হয়েছিল:
- মিলিন্দ পঞহো: এটি থেরবাদ ঐতিহ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ। এটি ইন্দো-গ্রিক রাজা মেনান্ডার (মিলিন্দ) এবং বৌদ্ধ ভিক্ষু নাগসেনের মধ্যে হওয়া দার্শনিক কথোপকথনের মাধ্যমে বৌদ্ধ ধারণা ব্যাখ্যা করে।
- বিসু্দ্ধিমাগ্গা: আচার্য বুদ্ধঘোষ কর্তৃক রচিত এই গ্রন্থটি থেরবাদ ঐতিহ্যে মুক্তি লাভের পথ এবং ধ্যানের পদ্ধতিগুলির একটি বিশদ ম্যানুয়াল।
- বিভাষা শাস্ত্র: কণিষ্কের চতুর্থ বৌদ্ধ সংগীতিতে ত্রিপিটকের ওপর যে টীকা সংকলিত হয়েছিল।
◼ জাতক এবং অন্যান্য আখ্যানমূলক সাহিত্য
- জাতক: খুদ্দক নিকায়ের একটি অংশ। এটি মূলত গৌতম বুদ্ধের পূর্ববর্তী জন্মগুলির ৫৪৭টি গল্প নিয়ে গঠিত, যা নৈতিকতা, করুণা এবং ধর্মীয় মূল্যবোধ শিক্ষা দেয়। এই গল্পগুলো ভারতের ভাস্কর্য ও চিত্রকলায় ব্যাপক প্রভাব ফেলেছিল।
- ললিতবিস্তর: বুদ্ধের জীবনী বর্ণনা করে, যা মহাযান ঐতিহ্যে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
◼ তিব্বতীয় ও বজ্রযান সাহিত্য
বজ্রযান শাখার নিজস্ব বিশাল সাহিত্য রয়েছে, যা 'কঞ্জুর' (বুদ্ধের কথা) এবং 'তেঞ্জুর' (টীকা ও ভাষ্য) নামে দুটি প্রধান অংশে সংকলিত।
- তন্ত্র: এটি বজ্রযান বৌদ্ধধর্মের মূল গ্রন্থ। বিভিন্ন যোগিক অনুশীলন, আচার-অনুষ্ঠান এবং দেব-দেবীর আরাধনা নিয়ে এটি গঠিত।
ভারতে বৌদ্ধ ধর্মের পতনের কারণ
গুপ্ত যুগ (খ্রিস্টীয় ৪র্থ-৬ষ্ঠ শতক) পর্যন্ত বৌদ্ধ ধর্ম ভারতে যথেষ্ট প্রভাব বিস্তার করেছিল। এই সময় নালন্দা ও বিক্রমশীলার মতো বৃহৎ মহাবিহারগুলো আন্তর্জাতিক শিক্ষাকেন্দ্র হিসেবে কাজ করত। একসময় অত্যন্ত প্রভাবশালী ও রাজকীয় পৃষ্ঠপোষকতা লাভ করা সত্বেও বৌদ্ধ ধর্ম তার জন্মভূমিতেই খ্রিস্টীয় ত্রয়োদশ শতকের মধ্যে বিলুপ্ত হতে শুরু করে। এই বিলুপ্তির পিছনে একাধিক কারণ ছিল। কারণ গুলি হলো নিম্নরূপ:
● বিলাসিতা ও নিষ্ক্রিয়তা:
গুপ্ত যুগের পর, নালন্দা ও বিক্রমশীলার মতো বৃহৎ মহাবিহারগুলো বিপুল পরিমাণে রাজকীয় ও বণিকদের দান পেতে শুরু করে। ফলে এই বিহারগুলো ধীরে ধীরে সাধারণ মানুষের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। সেখানে শিক্ষাদান ও আধ্যাত্মিক সাধনার চেয়ে বিলাসবহুল জীবনযাপন প্রাধান্য পেতে শুরু করে।
● তাৎপর্য হারানো:
বৌদ্ধধর্মের প্রধান আকর্ষণ ছিল এর সরলতা এবং জাতিভেদহীনতা। কিন্তু সময়ের সাথে সাথে বৌদ্ধধর্মেও জটিল আচার-অনুষ্ঠান, তান্ত্রিক প্রভাব এবং মূর্তি পূজা বৃদ্ধি পায়। ফলে এটি সনাতন ধর্মের মতোই জটিল হয়ে ওঠে এবং এর মৌলিক আবেদন হারায়।
● বজ্রযানের উত্থান:
মহাযানের তান্ত্রিক রূপ, বজ্রযান বা তান্ত্রিক বৌদ্ধ ধর্মের উত্থান হয়। এই তান্ত্রিক চর্চাগুলিতে অনেক সময় গোপনীয় ও বিতর্কিত আচারের অনুপ্রবেশ ঘটেছিল, যা সাধারণ মানুষের মধ্যে বিরূপ ধারণা তৈরি করে।
● শঙ্করাচার্যের প্রভাব:
খ্রিস্টীয় অষ্টম শতকে আদি শঙ্কর (শঙ্করাচার্য) অদ্বৈত বেদান্তের প্রচারের মাধ্যমে সনাতন ধর্মকে দার্শনিক স্তরে সুসংগঠিত করেন। তিনি বৌদ্ধদের শূন্যবাদকে বুদ্ধির জোরে খণ্ডন করেন এবং সনাতন ধর্মের প্রতি বিদ্বানদের আকর্ষণ ফিরিয়ে আনতে সফল হন।
● ভক্তি আন্দোলনের উত্থান:
মধ্যযুগে যে ভক্তি আন্দোলনের সূচনা হয়, তা সাধারণ মানুষের কাছে ঈশ্বরকে পাওয়ার সহজ ও আবেগপূর্ণ পথ খুলে দেয়। এর ফলে জটিল দর্শন ও আচার-সর্বস্ব বৌদ্ধ ধর্মের প্রয়োজন কমে যায়।
● গুপ্তদের পৃষ্ঠপোষকতা হ্রাস:
গুপ্ত সাম্রাজ্যের অনেক শাসক বৌদ্ধদের পৃষ্ঠপোষকতা করলেও, তারা প্রধানত সনাতন ধর্মের সমর্থক ছিলেন। পরবর্তী রাজবংশগুলিও বৌদ্ধ ধর্মের চেয়ে ব্রাহ্মণ্যবাদী ধর্ম ও মন্দির নির্মাণে বেশি মনোযোগী হয়। এর ফলে বৌদ্ধ ধর্মের প্রাধান্য কমতে থাকে।
● তুর্কি আক্রমণ:
খ্রিস্টীয় একাদশ এবং দ্বাদশ শতকে মুহাম্মদ ঘোরি এবং তাঁর সেনাপতি বখতিয়ার খিলজি একাধিকবার ভারতে আক্রমণ করে। বখতিয়ার খিলজি আনুমানিক ১১৯৩ খ্রিস্টাব্দে বিহারে অবস্থিত নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয় এবং বিক্রমশীলা মহাবিহারের মতো বৃহৎ বৌদ্ধ শিক্ষাকেন্দ্রগুলি সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস করে দেন।
বিশ্বজুড়ে বিস্তার
ভারতে বিলুপ্ত হলেও বৌদ্ধ ধর্ম বিশ্বজুড়ে তার অস্তিত্ব বজায় রাখে এবং বিকশিত হতে থাকে।
- দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া: শ্রীলঙ্কা থেকে থেরবাদ বৌদ্ধ ধর্ম থাইল্যান্ড, লাওস ও কম্বোডিয়াতে শক্তিশালী ঐতিহ্য হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়।
- পূর্ব এশিয়া: মহাযান বৌদ্ধ ধর্ম সিল্ক রুট ধরে চীন, কোরিয়া এবং জাপানে প্রবেশ করে। জাপানে এটি 'জেন বৌদ্ধ ধর্ম' হিসেবে বিশেষ পরিচিতি লাভ করে।
- তিব্বত ও হিমালয়: সপ্তম শতকে তিব্বতে বজ্রযান বা তান্ত্রিক বৌদ্ধ ধর্মের বিকাশ ঘটে। দালাই লামা হলেন এই ঐতিহ্যের প্রধান ধর্মগুরু।

