Ticker

6/recent/ticker-posts

তড়িৎ প্রবাহের তাপীয় ফল | জুলের সূত্র | তাপীয় ফলের ব্যবহার

বিদ্যুৎ আমাদের দৈনন্দিন জীবনের এক অপরিহার্য অংশ। আলো জ্বালানো থেকে শুরু করে বৈদ্যুতিক ইস্ত্রি, হিটার, বৈদ্যুতিক কেটলি, ফিউজ ইত্যাদি অসংখ্য যন্ত্রের কার্যকারিতার সঙ্গে বিদ্যুতের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য জড়িয়ে আছে। তা হলো তড়িৎ প্রবাহের তাপীয় ফল।


তড়িৎ প্রবাহের তাপীয় ফল ও তার ব্যাবহার

নিচে তড়িৎ প্রবাহের তাপীয় ফল সংক্রান্ত সমস্ত বিষয়গুলি সহজ ভাষায় আলোচনা করা হলো:


তড়িৎ প্রবাহের তাপীয় ফল কী


● সংজ্ঞা: কোনো পরিবাহীর মধ্য দিয়ে তড়িৎ প্রবাহিত হলে সেটির রোধের কারণে বৈদ্যুতিক শক্তির একটি অংশ তাপ শক্তিতে রূপান্তরিত হয়। এই ঘটনাকেই তড়িৎ প্রবাহের তাপীয় ফল বলা হয়।


● তাপ উৎপন্ন হওয়ার কারণ: প্রত্যেক ধাতব পরিবাহীর মধ্যে অসংখ্য মুক্ত ইলেকট্রন থাকে। যখন পরিবাহীর দুই প্রান্তে বিভব প্রভেদ প্রয়োগ করা হয়, তখন এই ইলেকট্রনগুলো একটি নির্দিষ্ট দিকে চলতে শুরু করে এবং তড়িৎ প্রবাহ সৃষ্টি হয়।


তড়িৎ চলাচলের সময় ইলেকট্রনগুলো পরিবাহীর পরমাণু বা ধনাত্মক আয়নের সঙ্গে বারবার সংঘর্ষে লিপ্ত হয়। এই সংঘর্ষের ফলে ইলেকট্রনের বৈদ্যুতিক শক্তির একটি অংশ তাপ শক্তিতে রূপান্তরিত হয়। তাই পরিবাহীটি ধীরে ধীরে উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।


জুলের সূত্র


তড়িৎ প্রবাহের তাপীয় ফল সংক্রান্ত পদার্থবিদ্যার একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সূত্র হল জুলের সূত্র। বিজ্ঞানী জেমস প্রেসকট জুল  ১৮৪১ সালে পরীক্ষার মাধ্যমে প্রমাণ করেন যে, কোনো পরিবাহীর মধ্য দিয়ে তড়িৎ প্রবাহিত হলে উৎপন্ন তাপের পরিমাণ প্রধানত তিনটি বিষয়ের ওপর নির্ভর করে। এই তিনটি বিষয় হল তড়িৎ প্রবাহমাত্রা (I), পরিবাহীর রোধ (R) ও তড়িৎ প্রবাহের সময় (t)। এর ভিত্তিতে বিজ্ঞানী জুল তিনটি সূত্র প্রকাশ করেন।


নিচে জুলের তিনটি সূত্র সহজ ভাষায় আলোচনা করা হলো:


ধরা যাক,

H = উৎপন্ন তাপ

I = তড়িৎ প্রবাহমাত্রা

R = পরিবাহীর রোধ

t = তড়িৎ প্রবাহের সময়


◼ প্রথম সূত্র:


● বিবৃতি: পরিবাহীর রোধ (R) এবং তড়িৎ প্রবাহের সময় (t) অপরিবর্তিত থাকলে, পরিবাহীতে উৎপন্ন তাপ (H) তড়িৎ প্রবাহমাত্রার (I) বর্গের সমানুপাতিক হয়।


● গাণিতিক রূপ:

H ∝ I² (যখন R ও t স্থির)


● সহজ ব্যাখ্যা: যদি কোনো তারের রোধ ও তড়িৎ প্রবাহে সময় অপরিবর্তিত রেখে যদি কারেন্ট 2 গুণ করা হয়, তাহলে উৎপন্ন তাপ 4 গুণ ( অর্থাৎ, 2² = 4) বৃদ্ধি পাবে। আবার কারেন্ট 3 গুণ করলে তাপ 9 গুণ (অর্থাৎ, 3² = 9) বৃদ্ধি পাবে।


◼ দ্বিতীয় সূত্র:


● বিবৃতি: পরিবাহীর তড়িৎ প্রবাহমাত্রা (I) এবং সময় (t) অপরিবর্তিত থাকলে, উৎপন্ন তাপ (H) পরিবাহীর রোধ (R)-এর সমানুপাতিক হয়।


● গাণিতিক রূপ:

H ∝ R (যখন I ও t স্থির)


● সহজ ব্যাখ্যা: পরিবাহীর রোধ যত বেশি হবে, ইলেকট্রনের সঙ্গে পরমাণুর সংঘর্ষ তত বেশি হবে। এর ফলে উৎপন্ন তাপের পরিমাণও একই সঙ্গে বৃদ্ধি পেতে থাকবে। উদাহরণস্বরূপ, নাইক্রোম তারের রোধ তামার তারের তুলনায় অনেক বেশি। তাই একই কারেন্ট প্রবাহিত হলে নাইক্রোম তার দ্রুত উত্তপ্ত হয়ে যায়। এই কারণেই বৈদ্যুতিক হিটার ও ইস্ত্রিতে এই নাইক্রোম তার ব্যবহৃত হয়।


◼ তৃতীয় সূত্র:


● বিবৃতি: পরিবাহীর তড়িৎ প্রবাহমাত্রা (I) এবং রোধ (R) অপরিবর্তিত থাকলে, উৎপন্ন তাপ (H) তড়িৎ প্রবাহের সময় (t)-এর সমানুপাতিক হয়।


● গাণিতিক রূপ:

H ∝ t (যখন I ও R স্থির)


● সহজ ব্যাখ্যা: একটি বৈদ্যুতিক যন্ত্র যত বেশি সময় ধরে চালু থাকবে, তার মধ্যে তত বেশি তাপ উৎপন্ন হবে।



তড়িৎ প্রবাহের তাপীয় ফলের ব্যবহারিক প্রয়োগ


তড়িৎ প্রবাহের তাপীয় ফল শুধু পদার্থবিদ্যার একটি সূত্র নয়; এটি আমাদের দৈনন্দিন জীবনের নানা বৈদ্যুতিক যন্ত্রের কার্যপ্রণালির মূল ভিত্তি।


জুলের সূত্র অনুযায়ী,

H = I²Rt


অর্থাৎ, কোনো পরিবাহীর মধ্য দিয়ে তড়িৎ প্রবাহিত হলে তার রোধ, প্রবাহমাত্রা এবং সময়ের ওপর নির্ভর করে ওই ওই পরিবাহী টি উতপ্ত হয়। এই নীতিকেই কাজে লাগিয়ে তৈরি করা হয়েছে বিভিন্ন বৈদ্যুতিক যন্ত্র।


নিচে তড়িৎ প্রবাহের তাপীয় ফলের প্রধান ব্যবহারিক প্রয়োগগুলো আলোচনা করা হলো:


বৈদ্যুতিক ইস্ত্রি


তড়িৎ প্রবাহের তাপীয় ফলের ভিত্তিতে কাজ করে এমন একটি  গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্র হল বৈদ্যুতিক ইস্ত্রি। কাপড়ের ভাঁজ দূর করে মসৃণ করার জন্য এটি ব্যবহৃত হয়। বৈদ্যুতিক ইস্ত্রির কার্যপ্রণালি সম্পূর্ণভাবে জুলের সূত্র (H = I²Rt)-এর ওপর নির্ভরশীল।


◼ গঠন:

একটি বৈদ্যুতিক ইস্ত্রির প্রধান অংশগুলো হলো:


● হিটিং এলিমেন্ট: ইস্ত্রির ভেতরে সাধারণত নাইক্রোম তারের তৈরি একটি কুণ্ডলী থাকে। এর মধ্য দিয়ে তড়িৎ প্রবাহিত হলে এর রোধের কারণে তাপ উৎপন্ন হয়। আসলে এই অংশটি মূলত তড়িৎ শক্তিকে তাপ শক্তিতে রূপান্তরিত করে।


● অভ্র: নাইক্রোম তারটি সাধারণত অভ্রের পাত বা অভ্রের তৈরি নিরোধক অংশের ওপর প্যাঁচানো থাকে। অভ্র তড়িতের কুপরিবাহী এবং উচ্চ তাপমাত্রা সহ্য করতে সক্ষম। তাই এটি হিটিং এলিমেন্টকে বৈদ্যুতিকভাবে পৃথক রাখার পাশাপাশি তাপ  নিরোধক হিসেবেও কাজ করে।


● ধাতব তলদেশ: ইস্ত্রির নিচের অংশকে সোলপ্লেট বলা হয়। এটি সাধারণত অ্যালুমিনিয়াম বা স্টেইনলেস স্টিলের মতো ধাতু দিয়ে তৈরি হয়। সোলপ্লেট হিটিং এলিমেন্ট থেকে তাপ গ্রহণ করে এবং সেই তাপ কাপড়ের ওপর সমভাবে ছড়িয়ে দেয়।


● থার্মোস্ট্যাট: আধুনিক বৈদ্যুতিক ইস্ত্রিতে থার্মোস্ট্যাট নামক একটি বিশেষ যান্ত্রিক ব্যবস্থা থাকে। এটি ইস্ত্রির  নির্দিষ্ট তাপমাত্রা বজায় রাখে। নির্ধারিত তাপমাত্রায় পৌঁছালে এটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে বিদ্যুৎ প্রবাহ বন্ধ করে দেয়। তাপমাত্রা কমে গেলে আবার বিদ্যুৎ প্রবাহ চালু করে। এর সাহায্যে অতিরিক্ত তাপমাত্রা বৃদ্ধি রোধ করা যায় এবং বিভিন্ন ধরনের কাপড় অনুযায়ী উপযুক্ত তাপমাত্রা বজায় রাখা সম্ভব হয়। এটি কাপড় পুড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা কমায় এবং বিদ্যুতের অপচয়ও রোধ করে।


◼ কার্যপদ্ধতি:

ইস্ত্রি চালু করলেই নাইক্রোম তারের মধ্য দিয়ে বিদ্যুৎ প্রবাহিত হয়। নাইক্রোমের রোধ বেশি হওয়ায় জুলের সূত্র অনুযায়ী তড়িৎ শক্তির কিছু অংশ তাপ শক্তিতে রূপান্তরিত হয়, অর্থাৎ তারে প্রচুর তাপ উৎপন্ন হয়।


H = I²Rt


এই তাপ হিটিং এলিমেন্ট থেকে ধাতব সোলপ্লেটে সঞ্চারিত হয়। এরপর সোলপ্লেট কাপড়ের সংস্পর্শে এলে তাপ কাপড়ে পৌঁছায়। তাপের প্রভাবে কাপড়ের তন্তুগুলি কিছুটা নমনীয় হয়ে যায় এবং ইস্ত্রির চাপের ফলে কাপড়ের ভাঁজ দূর হয়ে কাপড় মসৃণ হয়।


* বৈদ্যুতিক ইস্ত্রিতে নাইক্রোম তার ব্যবহার করা হয় কেনো?


বৈদ্যুতিক ইস্ত্রির হিটিং এলিমেন্টে নাইক্রোম ব্যবহারের প্রধান কারণগুলি হলো:


● উচ্চ রোধ: নাইক্রোমের রোধ তুলনামূলক বেশি হওয়ায় এর মধ্য দিয়ে তড়িৎ প্রবাহিত হলে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ তাপ উৎপন্ন হতে পারে।


● উচ্চ গলনাঙ্ক: নাইক্রোমের গলনাঙ্ক অনেক বেশি (প্রায় 1400°C)। তাই এটি উচ্চ তাপমাত্রায় উত্তপ্ত হলেও সহজে গলে যায় না।


● অক্সিডেশন প্রতিরোধী: উচ্চ তাপমাত্রায় বাতাসের সংস্পর্শে থাকলেও এটি তুলনামূলকভাবে সহজে জারিত হয় না।


● দীর্ঘস্থায়ী: বারবার উত্তপ্ত ও ঠান্ডা হওয়া সত্ত্বেও নাইক্রোম দীর্ঘ সময় কার্যক্ষম থাকে।


বৈদ্যুতিক বাল্ব


তড়িৎ প্রবাহের তাপীয় ফলের একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যবহার হলো বৈদ্যুতিক বাল্ব। বৈদ্যুতিক বাল্বে তড়িৎ শক্তির কিছু অংশ প্রধানত আলোক শক্তিতে এবং কিছু অংশ তাপ শক্তিতে রূপান্তরিত হয়। বৈদ্যুতিক বাল্বের প্রধান অংশ হলো একটি সরু ফিলামেন্ট। এই ফিলামেন্টের মধ্য দিয়ে তড়িৎ প্রবাহিত হলে সেটি প্রচণ্ড উত্তপ্ত হয়ে উজ্জ্বল আলো বিকিরণ করে। প্রচলিত বৈদ্যুতিক বাল্বের কার্যপ্রণালি মূলত তড়িৎ প্রবাহের তাপীয় ফল এবং তাপীয় দীপ্তির ওপর নির্ভরশীল।


◼ গঠন:

একটি বৈদ্যুতিক বাল্বের প্রধান অংশগুলি হলো:


● ফিলামেন্ট: বাল্বের ঠিক মাঝখানে দুটি মোটা তারের মাথায় সরু, স্প্রিং-এর মতো পেঁচানো যে তার ঝুলানো থাকে, সেটিকে ফিলামেন্ট বলে। এটি সাধারণত টাংস্টেন ধাতু দিয়ে তৈরি করা হয়। অল্প জায়গার মধ্যে বেশি দৈর্ঘ্যের তার রাখার জন্য ফিলামেন্টকে অনেক সময় কুণ্ডলীর মতো পাকানো হয়ে থাকে।


● কাচের আবরণ: ফিলামেন্টকে ঘিরে একটি স্বচ্ছ কাচের আবরণ থাকে। এটি ফিলামেন্টকে বাইরের বাতাস থেকে রক্ষা করে। বাল্বের ভিতরে সাধারণত বায়ু বা অক্সিজেন রাখা যায় না। কারণ উচ্চ তাপমাত্রায় অক্সিজেনের উপস্থিতিতে টাংস্টেন ফিলামেন্ট দ্রুত জারিত হয়ে নষ্ট হয়ে যেতে পারে। তাই বাল্বের ভিতরের বায়ু বের করে সেখানে সাধারণত আর্গন বা নাইট্রোজেনের মতো নিষ্ক্রিয় বা কম সক্রিয় গ্যাস ভরা হয়।


● সাপোর্ট ওয়্যার: ফিলামেন্টকে নির্দিষ্ট অবস্থানে ধরে রাখার জন্য সূক্ষ্ম ধাতব সাপোর্ট ওয়্যার ব্যবহার করা হয়। এগুলি বাল্বের ভিতরে ফিলামেন্টকে স্থির থাকতে সাহায্য করে।


◼ কার্যপদ্ধতি:

বৈদ্যুতিক বাল্ব আসলে তড়িৎ প্রবাহের তাপীয় ফলের ওপর ভিত্তি কাজ করে। বাল্বকে বৈদ্যুতিক সার্কিটের সঙ্গে যুক্ত করে সুইচ চালু করলে ফিলামেন্টের মধ্য দিয়ে তড়িৎ প্রবাহিত হয়।

ফিলামেন্টটি উচ্চ রোধযুক্ত হওয়ায় তড়িৎ প্রবাহের ফলে তাতে তাপ উৎপন্ন হয়। অত্যন্ত সরু হওয়ায় এটি অল্প জায়গায় প্রচুর তাপ উৎপন্ন হতে পারে। ফলে ফিলামেন্টের তাপমাত্রা খুব বেশি বেড়ে যায়। তাপমাত্রা যথেষ্ট বেশি হলে টাংস্টেন ফিলামেন্টটি উজ্জ্বলভাবে জ্বলতে শুরু করে। এরফলে তাপীয় দীপ্তির কারণে এর থেকে দৃশ্যমান আলো নির্গত হয়। এই আলো কাচের আবরণের মধ্য দিয়ে বাইরে আসে এবং চারপাশ আলোকিত করে।


* বাল্বের ফিলামেন্ট টাংস্টেন দিয়ে তৈরি হয় কেনো?


বৈদ্যুতিক বাল্বের ফিলামেন্ট তৈরিতে টাংস্টেন ব্যবহারের প্রধান কারণগুলি হলো:


● উচ্চ গলনাঙ্ক: টাংস্টেনের গলনাঙ্ক অত্যন্ত বেশি, প্রায় 3422°C। ফলে এটি খুব উচ্চ তাপমাত্রায় উত্তপ্ত হলেও সহজে গলে যায় না। এই কারণে টাংস্টেন ফিলামেন্টকে অত্যন্ত উচ্চ তাপমাত্রায় উত্তপ্ত করে আলো উৎপন্ন করা সম্ভব হয়।


● তাপীয় দীপ্তির উপযুক্ত: টাংস্টেন ফিলামেন্টকে অত্যন্ত উচ্চ তাপমাত্রায় উত্তপ্ত করলে এটি তাপীয় দীপ্তির মাধ্যমে দৃশ্যমান আলো বিকিরণ করে। তাই এটি বৈদ্যুতিক বাল্বের জন্য উপযুক্ত।


● আকার পরিবর্তন যোগ্য: মজবুত ধাতু হলেও টাংস্টেনকে সূক্ষ্ম তারে পরিণত করা সম্ভব হয়। ফলে ছোট আকারের বাল্বের মধ্যেও উপযুক্ত দৈর্ঘ্যের ফিলামেন্ট তৈরি করা যায়।


বৈদ্যুতিক ফিউজ


তড়িৎ প্রবাহের তাপীয় ফলের আরো একটি উল্লেখযোগ্য ব্যবহার হল বৈদ্যুতিক ফিউজ। বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি ও তারকে অতিরিক্ত তড়িৎ প্রবাহ জনিত ক্ষতির হাত রক্ষা করার গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তা ব্যবস্থা হলো বৈদ্যুতিক ফিউজ। বৈদ্যুতিক বর্তনীতে কোনো কারণে নির্ধারিত মাত্রার চেয়ে বেশি তড়িৎ প্রবাহিত হলে ফিউজের তার অতিরিক্ত উত্তপ্ত হয়ে গলে যায় এবং বর্তনী বিচ্ছিন্ন করে দেয়। ফলে বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি ও বৈদ্যুতিক তার অতিরিক্ত তড়িৎ প্রবাহের ক্ষতিকর প্রভাব থেকে সুরক্ষিত থাকে।


◼ গঠন:

একটি সাধারণ বৈদ্যুতিক ফিউজের প্রধান অংশগুলি হলো:


● ফিউজ তার: ফিউজের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো ফিউজ তার। এটি সাধারণত কম গলনাঙ্ক এবং তুলনামূলকভাবে বেশি রোধবিশিষ্ট ধাতু বা সংকর ধাতু দিয়ে তৈরি হয়। প্রচলিত ফিউজ তার সাধারণত  টিন ও সীসার সংকর ধাতু দিয়ে তৈরি হয়। ফিউজ তার এমনভাবে নির্বাচন করা হয় যাতে নির্দিষ্ট সীমার বেশি তড়িৎ প্রবাহিত হলে এটি দ্রুত উত্তপ্ত হয়ে গলে যেতে পারে।


● ফিউজ ক্যারিয়ার: ফিউজ তারকে সঠিক অবস্থানে ধরে রাখার জন্য ফিউজ ক্যারিয়ার ব্যবহার করা হয়। এটি ফিউজকে বৈদ্যুতিক বর্তনীর সঙ্গে সংযুক্ত রাখতে সাহায্য করে।


● ফিউজ বেস বা হোল্ডার: ফিউজকে বৈদ্যুতিক সার্কিটের সঙ্গে সংযুক্ত করার জন্য ফিউজ বেস বা হোল্ডার ব্যবহার করা হয়। এটি ফিউজকে নিরাপদে ধরে রাখে।


◼ কার্যপ্রণালী:

স্বাভাবিক অবস্থায় বৈদ্যুতিক যন্ত্র চালু থাকলে বর্তনীতে নির্দিষ্ট পরিমাণ তড়িৎ প্রবাহিত হয়। এই তড়িৎ প্রবাহ ফিউজ তারের জন্য নির্ধারিত সীমার মধ্যে থাকলে ফিউজ তার উত্তপ্ত হলেও গলে যায় না। ফলে বর্তনী স্বাভাবিকভাবে কাজ করে। কিন্তু কোনো কারণে বর্তনীতে অতিরিক্ত তড়িৎ প্রবাহিত হলে ফিউজ তারে প্রচুর তাপ উৎপন্ন হয়। এই অতিরিক্ত তড়িৎ প্রবাহ শর্ট সার্কিট কিংবা অতিরিক্ত বৈদ্যুতিক লোড কিংবা একই সার্কিটে নির্ধারিত ক্ষমতার চেয়ে বেশি বৈদ্যুতিক যন্ত্র ব্যবহারের ফলে হতে পারে। এরপর অতিরিক্ত তাপের ফলে ফিউজ তারের তাপমাত্রা তার গলনাঙ্কে পৌঁছে যায় এবং ফিউজ তারটি গলে যায়। এরফলে বর্তনী বিচ্ছিন্ন হয়ে তড়িৎ প্রবাহ বন্ধ হয়ে যায়।

এভাবে ফিউজ বৈদ্যুতিক সার্কিটকে অতিরিক্ত তড়িৎ প্রবাহ থেকে রক্ষা করে।


◼ ফিউজ তারের বৈশিষ্ট্য:

একটি সাধারণ ফিউজ তারের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো:


● কম গলনাঙ্ক: যাতে অতিরিক্ত তড়িৎ প্রবাহিত হলে দ্রুত গলে যেতে পারে, তাই ফিউজ তারের গলনাঙ্ক যথেষ্ট কম হয়।


● তুলনামূলকভাবে বেশি রোধ: যাতে অতিরিক্ত তড়িৎ প্রবাহের সময় যথেষ্ট তাপ উৎপন্ন হতে পারে, তাই ফিউজ তারের রোধকতা বেশি হয়।


● উপযুক্ত ব্যাস: ফিউজের নির্ধারিত রেটিং অনুযায়ী তারের পুরুত্ব নির্বাচন করা হয়।


● নির্ভরযোগ্যতা: ফিউজ তার নির্দিষ্ট মাত্রার থেকে অতিরিক্ত তড়িৎ প্রবাহ হলে দ্রুত ও নির্ভরযোগ্যভাবে সার্কিট বিচ্ছিন্ন করতে পারে।

Post a Comment

0 Comments