স্বাভাবিক উদ্ভিদ হলো একটি দেশের ভৌগোলিক পরিবেশের এক অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। কোনো নির্দিষ্ট অঞ্চলের জলবায়ু, ভূ-প্রকৃতি এবং মৃত্তিকার ওপর নির্ভর করে মানুষের প্রচেষ্টা ছাড়াই প্রকৃতিতে স্বাভাবিক নিয়মে যে গাছপালা জন্মায় ও বেড়ে ওঠে, তাকেই স্বাভাবিক উদ্ভিদ বলা হয়।
প্রাকৃতিক পরিবেশের দিক থকে ভারত এক বিশাল বৈচিত্র্যের দেশ। উত্তরে হিমালয়ের তুষারআবৃত শৃঙ্গ, দক্ষিণে জলবেষ্টিত কন্যাকুমারীকা, পশ্চিমে উতপ্ত থর মরুভূমির এবং পূর্বে মেঘালয়ের অতিবৃষ্টির অঞ্চল সবমিলে ভারতে রয়েছে জলবায়ু ও ভূ-প্রকৃতির বিপুল তারতম্য।
এই ভৌগোলিক বৈচিত্র্যের কারণে ভারতের স্বাভাবিক উদ্ভিদের মধ্যেও প্রচুর ভিন্নতা দেখা যায়। বৃষ্টিপাত, উষ্ণতার তারতম্য ও আঞ্চলিক উদ্ভিদসমূহের ওপর ভিত্তি করে ভারতের অরণ্য অঞ্চলকে প্রধানত পাঁচটি ভাগে ভাগ করা যায়। যথা:
1) ক্রান্তীয় চিরহরিৎ অরণ্য, 2) ক্রান্তীয় পর্ণমোচী অরণ্য, 3) ক্রান্তীয় মরু ও গুল্মজাতীয় উদ্ভিদ, 4) পার্বত্য অরণ্য এবং 5) ম্যানগ্রোভ অরণ্য।
প্রতিটি অরণ্য অঞ্চলের বিস্তারিত বিবরণ নিচে দেওয়া হলো:
1) ক্রান্তীয় চিরহরিৎ অরণ্য
ভারতের ক্রান্তীয় চিরহরিৎ অরণ্য মূলত সেইসব অঞ্চলে দেখা যায় যেখানে সারা বছর প্রচুর বৃষ্টিপাত হয় এবং উচ্চ তাপমাত্রা বিরাজ করে। এই অরণ্যকে নিরক্ষীয় অরণ্যের প্রায় সমগোত্রীয় বলা যেতে পারে।
জলবায়ু ও পরিবেশগত অবস্থা
এই অরণ্য গড়ে ওঠার জন্য নির্দিষ্ট কিছু পরিবেশগত শর্ত প্রয়োজন। সেগুলি হলো:
● বৃষ্টিপাত: বার্ষিক গড় বৃষ্টিপাত 200 সেমি-র বেশি হওয়া প্রয়োজন। অনেক ক্ষেত্রে তা 250 - 300 সেমি পর্যন্ত হতে পারে।
● উষ্ণতা: সারা বছর গড় তাপমাত্রা 25°C থেকে 27°C -এর মধ্যে থাকতে হবে।
● আর্দ্রতা: বাতাসের আপেক্ষিক আর্দ্রতা অত্যন্ত বেশি অর্থাৎ প্রায় 77% এর উপরে এবং শুষ্ক ঋতু খুবই সংক্ষিপ্ত হতে হবে।
প্রধান বৈশিষ্ট্যসমূহ
● চিরসবুজ প্রকৃতি: অনুকূল পরিবেশের কারণে এই অরণ্যের গাছগুলির পাতা একসাথে কখনও ঝরে যায় না। তাই এই অরণ্য সারা বছরই সবুজ দেখায়।
● অভেদ্য অরণ্য: গাছগুলো অত্যন্ত ঘনভাবে জন্মায় বলে অরণ্যের অভ্যন্তরে চলাফেরা করা কঠিন।
● চাঁদোয়া সৃষ্টি: বড় বড় গাছের ডালপালা ও পাতা ওপরের দিকে একে অপরের সাথে মিশে একটি শামিয়ানার মতো আবরণ বা 'ক্যানোপি' তৈরি করে। এর ফলে সূর্যের আলো ঠিকমতো বনের তলদেশে পৌঁছাতে পারে না।
● স্তরীভূত বিন্যাস: এই অরণ্যে উচ্চতা অনুযায়ী গাছের বিভিন্ন স্তর দেখা যায়। বড় গাছগুলো সাধারণত 45 থেকে 60 মিটার পর্যন্ত লম্বা হয় থাকে।
● কাঠের প্রকৃতি: এখানকার গাছের কাঠ অত্যন্ত ভারী ও শক্ত হয়। তবে অরণ্য অত্যন্ত দুর্গম হওয়ায় এই কাঠ সংগ্রহ করা বেশ কঠিন।
প্রধান উদ্ভিদসমূহ
এই অরণ্যের প্রধান প্রধান উদ্ভিদ গুলি হলো:
● মূল গাছ: মেহগনি, রোজউড, আবলুস, রাবার, বাঁশ, বেত ইত্যাদি।
● অন্যান্য: এছাড়া এর মধ্যে বিভিন্ন ধরনের লতাগুল্ম, ফার্ন এবং অর্কিড প্রচুর পরিমাণে জন্মায়।
ভৌগোলিক অবস্থান
ভারতে প্রধানত তিনটি অঞ্চলে এই অরণ্য দেখা যায়:
● পশ্চিমঘাট পর্বতমালা: পর্বতের পশ্চিম ঢাল (মহারাষ্ট্র, কর্ণাটক, কেরালা রাজ্যে)।
● উত্তর-পূর্ব ভারত: অসম, মেঘালয়, ত্রিপুরা, মণিপুর এবং নাগাল্যান্ডের পার্বত্য অঞ্চল।
● আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জ: ভারতের আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জের জলবায়ুও সম্পূর্ণভাবে ক্রান্তীয় চিরহরিৎ অরণ্যের অনুকূল।
গুরুত্ব
● জীববৈচিত্র্য: এই অরণ্য ভারতের সবথেকে সমৃদ্ধ জীববৈচিত্র্যের আধার। অনেক বিপন্ন প্রজাতির পশুপাখি এখানে বসবাস করে।
● শিল্প: এই অঞ্চলের রাবার গাছ থেকে প্রাকৃতিক রবার সংগ্রহ করা হয়। এছাড়া এখানকার বাঁশ ও বেত বিভিন্ন আসবাবপত্র তৈরিতে ব্যবহৃত হয়।
● পরিবেশ রক্ষা: এই অরণ্য প্রচুর পরিমাণে অক্সিজেন সরবরাহ করে এবং বায়ুমণ্ডলের কার্বন ডাই-অক্সাইড শোষণ করে বায়ুমন্ডলে গ্যাসের ভারসাম্য বজায় রাখে।
2) ক্রান্তীয় পর্ণমোচী অরণ্য
ভারতের স্বাভাবিক উদ্ভিদ অঞ্চলের মধ্যে সবথেকে বেশি অঞ্চল জুড়ে বিস্তৃত হলো ক্রান্তীয় পর্ণমোচী অরণ্য। ভারতের প্রায় 65-70 শতাংশ বনভূমি এই শ্রেণির অন্তর্গত। মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে এই অরণ্যের বৈশিষ্ট্য নির্ধারিত হয় বলে একে অনেকসময় 'মৌসুমি অরণ্য' বলা হয়।
জলবায়ু ও পরিবেশগত অবস্থা
এই বনভূমি গড়ে ওঠার জন্য প্রয়োজনীয় পরিবেশগত শর্ত গুলি হল:
● বৃষ্টিপাত: এই অঞ্চলের বার্ষিক গড় বৃষ্টিপাত 70 সেমি থেকে 200 সেমি-র মধ্যে থাকে।
● উষ্ণতা: এখানকার গড় বার্ষিক তাপমাত্রা 24°C থেকে 28°C -এর মধ্যে থাকে।
● ঋতুচক্র: এই অরণ্যে ঋতু পরিবর্তন খুব স্পষ্টভাবে বোঝা যায়।
শ্রেণিবিভাগ
বৃষ্টিপাতের তারতম্য অনুসারে এই অরণ্যকে দুই ভাগে ভাগ করা যায়:
● আর্দ্র পর্ণমোচী: এই অঞ্চলের বার্ষিক গড় বৃষ্টিপাত 100 থেকে 200 সেমির মধ্যে থাকে। যেমন- পশ্চিমবঙ্গ, ওড়িশা ও উত্তরপ্রদেশের তরাই অঞ্চল।
● শুষ্ক পর্ণমোচী: এই অঞ্চলের বার্ষিক গড় বৃষ্টিপাত 70 থেকে 100 সেমির মধ্যে থাকে। যেমন- বিহার, উত্তরপ্রদেশের পশ্চিমাংশ, পাঞ্জাব ও হরিয়ানার কিছু অংশ।
প্রধান বৈশিষ্ট্যসমূহ
● পত্রমোচন: এই অরণ্যের প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো বছরের একটি নির্দিষ্ট সময়ে গাছের পাতা ঝরে যাওয়া। সাধারণত বসন্ত ও গ্রীষ্মের শুরুতে জলের অপচয় রোধ করতে এই অঞ্চলের গাছেদের সমস্ত পাতা ঝরে যায়।
● কাঠের গুণমান: এখানকার গাছের কাঠ খুব বেশি শক্তও নয়, আবার খুব নরমও নয়। আসবাবপত্র তৈরির জন্য এই কাঠ একেবারে আদর্শ তাই এগুলি অত্যন্ত মূল্যবান।
● গাছের উচ্চতা: চিরহরিৎ অরণ্যের তুলনায় এখানকার গাছগুলো উচ্চতায় কিছুটা কম। এদের উচ্চতা সাধারণত 20 থেকে 45 মিটার হয়ে থাকে।
● সূর্যালোক: পাতা ঝরে যাওয়ার কারণে বছরের একটি নির্দিষ্ট সময় বনের তলদেশে প্রচুর সূর্যালোক পৌঁছায়। ফলে সেখানে ঘাস ও ছোট গুল্ম জাতীয় উদ্ভিদও জন্মায়।
প্রধান উদ্ভিদসমূহ
ভারতের অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে এই অরণ্যের গাছগুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই অঞ্চলের প্রধান উদ্ভিদ গুলি হলো:
● মূল গাছ: এই অঞ্চলে প্রধানত শাল, সেগুন, বেল ইত্যাদি গাছ বেশি দেখা যায় ।
● অন্যান্য উদ্ভিদ: এছাড়া চন্দন, মহুয়া, পলাশ, শিমুল, শিরীষ, আমলকী, বাঁশ ইত্যাদি গাছ এই অঞ্চলে দেখা যায়।
ভৌগোলিক অবস্থান
ভারতের এক বিশাল অংশ জুড়ে এই অরণ্য বিস্তৃত।
● একদিকে হিমালয়ের পাদদেশ থেকে শুরু করে মধ্যপ্রদেশ, ছত্তিশগড়, ঝাড়খণ্ড, পশ্চিমবঙ্গ ও ওড়িশা রাজ্যে এই উদ্ভিদ দেখা যায়।
● অন্যদিকে দক্ষিণ ভারতের দাক্ষিণাত্য মালভূমি এবং পূর্বঘাট পর্বতমালার বিভিন্ন অংশে এই উদ্ভিদ দেখা যায়।
গুরুত্ব
● অর্থনৈতিক গুরুত্ব: সেগুন ও শাল কাঠ ঘরবাড়ি নির্মাণ ও রেলের স্লিপার তৈরিতে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়।
● চন্দন কাঠ: কর্নাটক ও তামিলনাড়ুর পর্ণমোচী অরণ্যে মূল্যবান চন্দন গাছ পাওয়া যায় যা সুগন্ধি ও প্রসাধন শিল্পে ব্যবহৃত হয়।
● কুটির শিল্প: মহুয়া ফুল থেকে পানীয় এবং পলাশ ফুল থেকে রং তৈরি করা হয়।
3) ক্রান্তীয় মরু ও গুল্মজাতীয় উদ্ভিদ
ভারতের যেসব অঞ্চলে বৃষ্টিপাত অত্যন্ত কম এবং শুষ্ক জলবায়ু বিরাজ করে, সেখানে মূলত ক্রান্তীয় মরু ও গুল্মজাতীয় উদ্ভিদ দেখা যায়। রাজস্থান ও গুজরাটের মরু অঞ্চল থেকে শুরু করে দাক্ষিণাত্যের বৃষ্টিচ্ছায় অঞ্চল পর্যন্ত এই উদ্ভিদ বিস্তৃত।
জলবায়ু ও পরিবেশগত অবস্থা
এই উদ্ভিদ অঞ্চলের প্রয়োজনীয় পরিবেশগত অবস্থাগুলি হলো:
● বৃষ্টিপাত: এই উদ্ভিদ অঞ্চলের বার্ষিক গড় বৃষ্টিপাত 50 সেমি-র কম হয়। কোনো কোনো অঞ্চলে এটি 25 সেমি-র নিচেও নেমে যায়।
● উষ্ণতা: গ্রীষ্মকালে এই অঞ্চলের তাপমাত্রা অত্যন্ত বেশি অর্থাৎ 40°C থেকে 45 °C পর্যন্ত পৌঁছে যায়। তবে শীতকালে তাপমাত্রা বেশ কম থাকে। সবমিলে এখানকার বার্ষিক গড় তাপমাত্রা 25 - 30°C হয়ে থাকে।
● আর্দ্রতা: এই অঞ্চলে বাতাসে জলীয় বাষ্পের পরিমাণ খুবই কম থাকে এবং বাষ্পীভবনের হার অনেক বেশি।
প্রধান বৈশিষ্ট্যসমূহ
মরুভূমির রুক্ষ পরিবেশে বেঁচে থাকার জন্য এই গাছগুলোর গঠনগত কিছু বিশেষত্ব লক্ষ্য করা যায়। এগুলি হলো:
● ক্ষুদ্র পাতা ও কাঁটা: বাষ্পমোচন কমানোর জন্য এই অঞ্চলের উদ্ভিদের পাতা খুব ছোট হয় অথবা পাতাগুলি কাঁটায় রূপান্তরিত হয়।
● দীর্ঘ মূল: জলের সন্ধানে এই গাছগুলোর মূল মাটির অনেক গভীরে প্রবেশ করে।
● রসালো কাণ্ড: ফণীমনসার মতো কিছু উদ্ভিদের কাণ্ড মাংসল ও সবুজ হয়। এগুলি জল সঞ্চয় করে রাখে এবং সালোকসংশ্লেষে সাহায্য করে।
● মোমের আস্তরণ: বাষ্পমোচনের হার কমানোর জন্য এখানকার অধিকাংশ উদ্ভিদদের কাণ্ড ও পাতায় মোমের মতো একধরণের স্তর দেখা যায়। এটি জলকে দেহ থেকে বেরিয়ে যেতে বাধা দেয়।
প্রধান উদ্ভিদসমূহ
এই অঞ্চলের প্রধান উদ্ভিদগুলি হলো:
● মূল গাছ: এখানে বাবলা ও খেজুর গাছ বেশি দেখা যায়।
● ক্যাকটাস ও গুল্ম: এছাড়া ফণীমনসা, ক্যাকটাস, নাগফণী, বুনো কুল ইত্যাদি গাছ এই অঞ্চলে দেখা যায়।
ভৌগোলিক অবস্থান
ভারতে এই অরণ্য অঞ্চলের অবস্থান হল:
● উত্তর-পশ্চিম ভারত: রাজস্থানের থর মরুভূমি, পাঞ্জাব, হরিয়ানা এবং গুজরাটের শুষ্ক অঞ্চল।
● দাক্ষিণাত্য মালভূমি: পশ্চিমঘাট পর্বতের পূর্ব ঢালে অবস্থিত বৃষ্টিচ্ছায় অঞ্চল। বিশেষ করে অন্ধ্রপ্রদেশ, কর্ণাটক এবং মহারাষ্ট্রের কিছু শুষ্ক অংশ।
গুরুত্ব
● জ্বালানি: এখানকার কাঠগুলি মূলত স্থানীয় মানুষেরা জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করে থাকে।
● পশুখাদ্য: রাজস্থান অঞ্চলে খেজরি গাছের পাতা গবাদি পশুর খাদ্য হিসেবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
● ফল: খেজুর এই অঞ্চলের অন্যতম প্রধান অর্থকরী ফসল।
● পরিবেশ রক্ষা: এই অঞ্চলের উদ্ভিদগুলো মরুভূমির প্রসার রোধ করতে এবং মাটির ক্ষয় কমাতে সাহায্য করে।
4) পার্বত্য অরণ্য
ভারতের স্বাভাবিক উদ্ভিদের মধ্যে পার্বত্য অরণ্য অঞ্চল হলো এক বিশেষ বৈচিত্র্যময় অঞ্চল। উচ্চতা এবং তাপমাত্রার পরিবর্তনের সাথে তাল মিলিয়ে এই অরণ্যের প্রকৃতি ধাপে ধাপে পরিবর্তিত হয়।
জলবায়ু ও পরিবেশগত অবস্থা
পার্বত্য অঞ্চলে উদ্ভিদ জন্মানোর প্রধান নিয়ন্ত্রক হলো উচ্চতা। উচ্চতা বাড়ার সাথে সাথে আবহাওয়া নিম্নরূপ হয়:
● উষ্ণতা: এই অরণ্য অঞ্চলের বার্ষিক গড় তাপমাত্রা প্রায় 10 থেকে 20°C হয়ে থাকে।
● বৃষ্টিপাত: পাহাড়ের ঢাল ও দিক অনুযায়ী বৃষ্টিপাতের পরিমাণ ভিন্ন হয়। এই অরণ্য অঞ্চলের বার্ষিক গড় বৃষ্টিপাত হল 75 - 125 সেমি।
● মাটি: এখানকার মাটি সাধারণত অম্লধর্মী এবং হিউমাস সমৃদ্ধ হয়। এটি এই অঞ্চলের নির্দিষ্ট কিছু গাছের জন্য বেশ সহায়ক।
প্রধান বৈশিষ্ট্যসমূহ
● উচ্চতা ভিত্তিক স্তর: এই অরণ্যের প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো এর স্তরীভূত বিন্যাস। উচ্চতা বাড়ার সাথে সাথে এখানে পর্ণমোচী থেকে সরলবর্গীয় এবং শেষে আল্পাইন উদ্ভিদের দেখা মেলে।
● শঙ্কু আকৃতি: 2000 মিটারের বেশি উচ্চতার গাছগুলো সাধারণত শঙ্কু আকৃতির হয়। এদের ডালপালা নিচের দিকে ঝুঁকে থাকে যাতে তুষারপাত হলে কোনো ডাল ভেঙে না তা মাটিতে পরতে পারে।
● পাতার গঠন: তুষারপাত ও প্রচণ্ড ঠাণ্ডা সহ্য করার জন্য এই অরণ্যের গাছের পাতাগুলো সুঁচের মতো সরু হয় এবং মোম জাতীয় পিচ্ছিল আবরণ দিয়ে ঢাকা থাকে।
● মাটির ঢাল: পাহাড়ি ঢালু জমিতে এই গাছগুলোর শিকড় অত্যন্ত গভীর ও শক্ত হয়। এগুলো ভূমিধস রোধে সাহায্য করে।
প্রধান উদ্ভিদসমূহ
উচ্চতা অনুযায়ী এই অরণ্যের প্রধান উদ্ভিদগুলো হলো:
● 1000 - 2000 মিটার উচ্চতায়: ওক, চেস্টনাট, ম্যাপল, লরেল ইত্যাদি।
● 2000 - 3000 মিটার উচ্চতায়: পাইন, দেবদারু, সিলভার ফার, স্প্রুস, সিডার ইত্যাদি।
● 3000 মিটারের ওপরে: রডোডেনড্রন, জুনিপার, বার্চ এবং বিভিন্ন ধরনের ঘাস ও লাইকেন।
ভৌগোলিক অবস্থান
ভারতে মূলত প্রধান দুটি পার্বত্য অঞ্চলে এই অরণ্য দেখা যায়:
● হিমালয় পার্বত্য অঞ্চল: এটি উত্তর ভারতের কাশ্মীর, হিমাচল প্রদেশ, উত্তরাখণ্ড থেকে শুরু করে সিকিম ও অরুণাচল প্রদেশ পর্যন্ত বিস্তৃত।
● দক্ষিণ ভারতের পাহাড়: নীলগিরি, আন্নামালাই ও পালনি পাহাড়ের উচ্চভূমিতেও এই ধরনের অরণ্য দেখা যায়। এখানে এই অরণ্যকে 'শোলা' বলা হয়।
গুরুত্ব
● মৃত্তিকা সংরক্ষণ: এই অরণ্যের উদ্ভিদেরা পাহাড়ের ঢালে মাটির ক্ষয় রোধ করে।
● অর্থনৈতিক গুরুত্ব: সরলবর্গীয় গাছের নরম কাঠ কাগজ শিল্প, দেশলাই কাঠি এবং প্যাকিং বাক্স তৈরিতে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়। পাইন গাছ থেকে রজন ও টার্পেনটাইন তেল পাওয়া যায়।
● বন্যপ্রাণী ও পর্যটন: এই অরণ্য তুষার চিতা, কস্তুরী মৃগ ও রেড পান্ডা-র মতো দুর্লভ প্রাণীর বাসস্থান। এছাড়া এই অঞ্চলের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য পর্যটন শিল্পের অন্যতম ভিত্তি।
5) ম্যানগ্রোভ অরণ্য
ভারতের উপকূলীয় অঞ্চলের এক অনন্য বৈশিষ্ট্য হলো ম্যানগ্রোভ অরণ্য। জোয়ার-ভাটার প্রভাবে নোনা জল ও কাদাযুক্ত উপকূলীয় এলাকায় এই বিশেষ ধরনের বনভূমি গড়ে ওঠে। এটি 'লবণাম্বু উদ্ভিদ' বা 'বাদাবন' নামেও পরিচিত।
জলবায়ু ও পরিবেশগত অবস্থা
এই অরণ্য গড়ে ওঠার জন্য নির্দিষ্ট কিছু পরিবেশগত অবস্থা প্রয়োজন হয়। এগুলি হলো:
● বৃষ্টিপাত: এই অরণ্য অঞ্চলের বার্ষিক গড় বৃষ্টিপাত সাধারণত 150 থেকে 250 সেমির মধ্যে থাকে।
● উষ্ণতা: বছরের গড় তাপমাত্রা সাধারণত 20°C থেকে 30°C পর্যন্ত হয়ে থাকে।
● লবণাক্ততা: জোয়ারের সময় সমুদ্রের নোনা জল এবং নদীর মিষ্টি জল মিশে যেখানে অল্প লবণাক্ত ও কাদাটে পরিবেশ তৈরি হয়, সেখানে এই গাছ ভালো জন্মায়।
প্রধান বৈশিষ্ট্যসমূহ
● শ্বাসমূল: কাদাটে লবণাক্ত মাটিতে অক্সিজেনের অভাব থাকায় এই গাছের শিকড়গুলো খাড়াভাবে মাটির ওপরে উঠে আসে। এগুলি বাতাস থেকে অক্সিজেন গ্রহণ করে। একে শ্বাসমূল বলে।
● ঠেসমূল: জোয়ার-ভাটার টান এবং ঢেউয়ের জোরালো ঝাপটার মধ্যে টিকে থাকতে কিছু গাছের কাণ্ড থেকে এক ধরনের বাঁকা শিকড় মাটিতে প্রবেশ করে। এই মূলগুলি গাছকে ঠেস দিয়ে রাখে বলে একে ঠেসমূল বলে।
● জরায়ুজ অঙ্কুরোদগম: এখানকার বেশ কিছু গাছের বীজ ফলের ভেতরে থাকা অবস্থাতেই বীজের অঙ্কুরোদগম হয়। এর কারণ হল যাতে নোনা জল বা কাদায় পড়ার আগেই চারাগাছ তৈরি হতে পারে।
● চিরসবুজ প্রকৃতি: লবণাক্ত পরিবেশে থাকলেও এই অরণ্যের গাছগুলো সারা বছর সবুজ থাকে। আর এদের পাতাগুলোও বেশ পুরু ও রসালো হয়।
● অভেদ্য বন: শ্বাসমূল ও ঠেসমূলের জটলার কারণে এই অরণ্যের ভেতর দিয়ে চলাফেরা করা অত্যন্ত কঠিন।
প্রধান উদ্ভিদসমূহ
এই অরণ্যের প্রধান উদ্ভিদগুলি হলো:
● মূল গাছ: এখানে সুন্দরী, গরান, গেঁওয়া ইত্যাদি গাছ বেশি দেখা যায়। সুন্দরী গাছের আধিক্যের জন্যই পশ্চিমবঙ্গের ম্যানগ্রোভ অরণ্য 'সুন্দরবন' নামে পরিচিত।
● অন্যান্য: এছাড়া এখানে কেওড়া, ধুন্দুল, গোলপাতা, হিংতাল ইত্যাদি গাছ দেখা যায়।
ভৌগোলিক অবস্থান
ভারতে প্রধানত সমুদ্র উপকূলবর্তী বদ্বীপ অঞ্চলে এই অরণ্য দেখা যায়। ভারতের প্রধান ম্যানগ্রোভ অরণ্য অঞ্চল গুলি হলো:
● পশ্চিমবঙ্গ: গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র বদ্বীপের দক্ষিণ অংশে অবস্থিত 'সুন্দরবন'। এটি বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ অরণ্য।
● পূর্ব উপকূল: ওড়িশার ভিতরকণিকা, অন্ধ্রপ্রদেশের গোদাবরী ও কৃষ্ণা নদীর বদ্বীপ অঞ্চল।
● অন্যান্য: গুজরাটের কচ্ছ উপসাগর এবং আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জের উপকূলীয় এলাকায়ও ম্যানগ্রোভ অরণ্য দেখা যায়।
গুরুত্ব
● উপকূল রক্ষা: এই অরণ্য উপকূলীয় অঞ্চলে প্রাকৃতিক প্রাচীর হিসেবে কাজ করে। এরা শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড় ও সুনামির হাত থেকে স্থলভাগকে রক্ষা করে।
● জীববৈচিত্র্য: সুন্দরবন অঞ্চল বিশ্ববিখ্যাত রয়্যাল বেঙ্গল টাইগারের একমাত্র আবাস্থল। এছাড়া এখানে কুমির, কচ্ছপ, নানা প্রজাতির পরিযায়ী পাখি ইত্যাদি জীবেরা বসবাস করে।
● মৃত্তিকা সংরক্ষণ: এই গাছেদের শিকড় গুলি নদীর পাড়ের মাটিকে শক্ত করে ধরে রাখে। এর ফলে উপকূলীয় অঞ্চল ভাঙ্গনের হাত থেকে রক্ষা পায়।
● জীবিকা: স্থানীয় মানুষ এই অরণ্য থেকে মধু, মোম, গোলপাতা ইত্যাদি বনজ সম্পদ সংগ্রহ করে জীবিকা নির্বাহ করেন।
