হর্যঙ্ক বংশের শেষ পর্যায়ে মগধে রাজনৈতিক অস্থিরতা, উত্তরাধিকার-সংক্রান্ত দ্বন্দ্ব এবং প্রশাসনিক দুর্বলতা ক্রমশ বৃদ্ধি পায়। শেষ শাসক নাগদশকের সময়কালে কেন্দ্রীয় শাসনব্যবস্থা একেবারে দুর্বল হয়ে পড়ে। এর ফলে জনগণের মধ্যে তীব্র অসন্তোষ সৃষ্টি হয়। এই অসন্তোষের কারণে মগধে রাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রয়োজন দেখা দেয়। এরপর আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব ৪১৩ অব্দে (মতান্তরে ৪১২) নাগদশককে সিংহাসনচ্যুত করা হয়। অধিকাংশ ঐতিহাসিকের মতে, তাঁর প্রধান অমাত্য ও দক্ষ প্রশাসক শিশুনাগ জনগণ ও রাজকর্মচারীদের সমর্থনে মগধের সিংহাসনে আরোহণ করেন। এর মাধ্যমে মগধে হর্যঙ্ক বংশের অবসান ঘটে শিশুনাগ বংশ প্রতিষ্ঠিত হয়।
প্রাচীন ভারতে মগধের উত্থানের ইতিহাসে শিশুনাগ বংশ একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। হর্যঙ্ক বংশের পতনের পর এই বংশের উত্থানের মাধ্যমে মগধে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরে আসে এবং সাম্রাজ্য বিস্তারের ক্ষেত্রে এক নতুন যুগের সূচনা হয়। বিশেষ করে অবন্তী রাজ্য জয়, প্রশাসনিক পুনর্গঠন এবং মগধের শক্তি বৃদ্ধিতে শিশুনাগ বংশের অবদান ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
নিচে শিশুনাগ বংশের রাজাদের ইতিহাস বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হলো:
শিশুনাগ (৪১৩ - ৩৯৫ খ্রিস্টপূর্বাব্দ)
শিশুনাগ ছিলেন শিশুনাগ বংশের প্রতিষ্ঠাতা। তাঁর শাসনকালে মগধ সাম্রাজ্য রাজনৈতিকভাবে পুনরুজ্জীবিত হয় এবং উত্তর ভারতের অন্যতম প্রধান শক্তি হিসেবে আরও সুপ্রতিষ্ঠিত হয়। হর্যঙ্ক বংশের পতনের পর তিনি মগধে স্থিতিশীল প্রশাসন প্রতিষ্ঠা করেন। এরপর সামরিক সাফল্যের মাধ্যমে তিনি তাঁর সাম্রাজ্যের বিস্তার ঘটান। বিশেষত অবন্তী রাজ্যের বিজয় তাঁর শাসনকালের সর্বশ্রেষ্ঠ কৃতিত্ব হিসেবে বিবেচিত হয়।
◼ সিংহাসনে আরোহণ
হর্যঙ্ক বংশের শেষদিকে মগধে রাজনৈতিক অস্থিরতা, প্রশাসনিক দুর্বলতা এবং উত্তরাধিকার-সংক্রান্ত সংঘাত চরম আকার ধারণ করে। শেষ রাজা নাগদাশকের দুর্বল শাসনকার্যে জনগণ, রাজকর্মচারী এবং অমাত্যরা অসন্তুষ্ট হয়ে ওঠেন। এরপর আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব ৪১৩ অব্দে নাগদশক সিংহাসনচ্যুত হলে শিশুনাগ মগধের রাজা হিসেবে নির্বাচিত হন।
◼ সামরিক অভিযান ও সাম্রাজ্য বিস্তার
শিশুনাগ একজন দক্ষ শাসকের সঙ্গে একজন সফল সেনানায়কও ছিলেন। তাঁর শাসনামলে মগধ সাম্রাজ্য আরও বিস্তৃত ও শক্তিশালী হয়ে ওঠে। তার উল্লেখযোগ্য সামরিক কৃতিত্ব গুলি হল:
ক) অবন্তী বিজয়:
শিশুনাগের সর্বশ্রেষ্ঠ সামরিক কৃতিত্ব ছিল অবন্তী রাজ্য জয়। অবন্তী ছিল মগধের দীর্ঘদিনের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী। প্রদ্যোত বংশের শাসকেরা দীর্ঘকাল মগধের সম্প্রসারণে বাধা সৃষ্টি করেছিল। এরপর শিশুনাগ অবন্তীর শেষ শাসক নন্দীবর্ধনকে পরাজিত করে অবন্তীকে মগধ সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত করেন। এর ফলে প্রায় এক শতাব্দীর বেশি সময় ধরে চলা মগধ-অবন্তী দ্বন্দ্বের অবসান ঘটে। অবন্তী রাজ্য জয়ের ফলে মালব অঞ্চল মগধের অধীনে আসে। সেই সঙ্গে পশ্চিম ভারতের গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যপথ মগধের নিয়ন্ত্রণে আসে। এছাড়া উত্তর ভারতে মগধের রাজনৈতিক আধিপত্য আরও সুদৃঢ় হয়।
খ) বৎস ও কোশলের ওপর প্রভাব:
অবন্তী জয়ের পর মগধের শক্তি এতটাই বৃদ্ধি পায় যে বৎস ও কোশল রাজ্যের ওপরও তার প্রভাব প্রতিষ্ঠিত হয়। কিছু প্রাচীন সূত্রে এই অঞ্চলগুলো মগধের অধীনে চলে আসার উল্লেখ থাকলেও, এ বিষয়ে ঐতিহাসিকদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। তবে শিশুনাগের সময়ে যে, মগধ উত্তর ভারতের সর্বাপেক্ষা শক্তিশালী রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছিল, সেই বিষয়ে প্রায় সকল ঐতিহাসিক একমত।
◼ প্রশাসনিক সংস্কার
সাম্রাজ্যের বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে শিশুনাগ প্রশাসনিক কাঠামোকেও শক্তিশালী করেন। তিনি নতুন জয় করা অঞ্চলগুলোতে পর্যাপ্ত দক্ষ রাজকর্মচারী নিয়োগ করেন। তার রাজ্যের সর্বত্র কেন্দ্রীয় প্রশাসনের কর্তৃত্ব পুনঃপ্রতিষ্ঠা করেন। প্রাদেশিক শাসনব্যবস্থাকে আরও কার্যকর করে তোলেন। সাম্রাজ্যের বিভিন্ন অঞ্চলের মধ্যে যোগাযোগ ও প্রশাসনিক সমন্বয় আরো সুদৃঢ় করেন। এই সংস্কার গুলির ফলে দীর্ঘ রাজনৈতিক অস্থিরতার পর মগধে পুনরায় স্থিতিশীলতা ফিরে আসে।
◼ রাজধানী স্থানান্তর
শিশুনাগের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক পদক্ষেপ ছিল রাজধানী সাময়িকভাবে বৈশালীতে স্থানান্তর করা। রাজধানী স্থানান্তরের সম্ভাব্য কারণ গুলি ছিল:
- উত্তর ভারতের নববিজিত অঞ্চলগুলোর ওপর কার্যকর নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখা।
- লিচ্ছবি ও বজ্জি অঞ্চলে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠা করা।
- পশ্চিম ও উত্তর ভারতের প্রশাসনিক কাজ গুলি আরও সহজে পরিচালনা করা।
তবে রাজগৃহ ও পাটলিপুত্রও প্রশাসনিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হতে থাকে। পরবর্তীকালে তাঁর উত্তরসূরি কালাশোক পুনরায় পাটলিপুত্রকে রাজধানী হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেন।
◼ ধর্মীয় নীতি
ধারণা করা হয়, শিশুনাগ বৌদ্ধ, জৈন এবং ব্রাহ্মণ্য তিন ধর্মের প্রতিই সমান শ্রদ্ধাশীল ছিলেন। তাঁর ধর্মীয় কর্মকাণ্ড সম্পর্কে খুব বেশি বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায় না। তবে জানা যায় তিনি বিভিন্ন ধর্মীয় সম্প্রদায়কে স্বাধীনভাবে কার্যক্রম পরিচালনার সুযোগ দিয়েছিলেন।
◼ জীবনাবসান ও উত্তরাধিকার
আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব ৩৯৫ অব্দে শিশুনাগের জীবনাবসান ঘটে। তাঁর মৃত্যুর পর তাঁর পুত্র কালাশোক (কাকবর্ণ) মগধের সিংহাসনে আরোহণ করেন। শিশুনাগের প্রতিষ্ঠিত রাজবংশ পরবর্তী কয়েক দশক মগধ শাসন করে। তাঁর প্রশাসনিক ও সামরিক সাফল্যের ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়েই পরবর্তীকালে নন্দ ও মৌর্য সাম্রাজ্যের উত্থান সম্ভব হয়।
কালাশোক (কাকবর্ণ) (৩৯৫ - ৩৬৭ খ্রিস্টপূর্বাব্দ)
শিশুনাগ বংশের দ্বিতীয় এবং অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শাসক ছিলেন কালাশোক। শিশুনাগের মৃত্যুর পর তিনি মগধের সিংহাসন আরোহণ করেন। তিনি কাকবর্ণ নামেও পরিচিত ছিলেন। তাঁর শাসনকালে মগধ রাজনৈতিকভাবে শক্তিশালী অবস্থান বজায় রাখে। এছাড়া তার শাসনকালেই বৌদ্ধ ধর্মের ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় রচিত হয়। বিশেষত পাটলিপুত্রকে পুনরায় রাজধানী হিসেবে প্রতিষ্ঠা এবং দ্বিতীয় বৌদ্ধ সংগীতির পৃষ্ঠপোষকতা তাঁকে ইতিহাসে বিশেষ মর্যাদা দিয়েছে।
◼ নামকরণ বিতর্ক
প্রাচীন বিভিন্ন গ্রন্থে এই শাসকের দুটি নাম পাওয়া যায়। মহাবংশ ও দীপবংশসহ সিংহলী বৌদ্ধ গ্রন্থে তাঁকে 'কালাশোক' নামে উল্লেখ করা হয়েছে। আবার, দিব্যাবদান এবং কয়েকটি পুরাণে তাঁর নাম 'কাকবর্ণ' নামে অভিহিত করা হয়েছে। 'কাকবর্ণ' শব্দের অর্থ হল 'কাকের মতো কৃষ্ণবর্ণ'। ধারণা করা হয়, তাঁর গাত্রবর্ণের কারণেই এই উপাধি প্রচলিত হয়েছিল। বর্তমান অধিকাংশ ইতিহাসবিদ মনে করেন, কালাশোক ও কাকবর্ণ একই ব্যক্তি।
◼ সিংহাসনে আরোহণ
শিশুনাগের মৃত্যুর পর আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব ৩৯৫ অব্দে কালাশোক মগধের সিংহাসন আরোহণ করেন। তিনি পিতার প্রতিষ্ঠিত সাম্রাজ্যকে সুসংগঠিত রাখার পাশাপাশি প্রশাসনিক ও ধর্মীয় ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ গ্রহণ করেন।
◼ রাজধানী
কালাশোকের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত ছিল পাটলিপুত্রকে পুনরায় মগধের রাজধানী হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা। শিশুনাগ সাম্রাজ্য পরিচালনার সুবিধার্থে সাময়িকভাবে বৈশালীকে রাজধানী করেছিলেন। তবে কালাশোক উপলব্ধি করেন যে গঙ্গা, সোন ও গণ্ডক নদীর নিকটবর্তী পাটলিপুত্র সামরিক, প্রশাসনিক এবং বাণিজ্যিক সব দিক থেকেই অধিক উপযোগী। ফলে তিনি রাজ্যের রাজধানী বৈশালী থেকে পুনরায় পাটলিপুত্রে স্থানান্তর করেন। পরবর্তীকালে নন্দ, মৌর্য, শুঙ্গ এবং গুপ্ত সাম্রাজ্যের রাজধানী হিসেবেও এই পাটলিপুত্রের গুরুত্ব অটুট ছিল।
◼ দ্বিতীয় বৌদ্ধ সংগীতি
কালাশোকের শাসনকালের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ছিল দ্বিতীয় বৌদ্ধ সংগীতির আয়োজন।
● স্থান ও সময়: বুদ্ধের মহাপরিনির্বাণের প্রায় ১০০ বছর পরে, আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব ৩৮৩ অব্দে বৈশালীতে এই বৌদ্ধ সংগীতি অনুষ্ঠিত হয়। মগধ রাজ কালাশোকের রাজকীয় পৃষ্ঠপোষকতায় এটি অনুষ্ঠিত হয়েছিল।
● সংগীতির কারণ: বৈশালীর বজ্জিপুত্রক ভিক্ষুরা বৌদ্ধ ভিক্ষুদের আচরণবিধির কয়েকটি নিয়ম শিথিলভাবে পালন করছিলেন। বিশেষ করে 'দশটি বিতর্কিত আচরণ' নিয়ে সংঘের মধ্যে মতবিরোধ সৃষ্টি হয়। এর মধ্যে দুপুরের পরে আহার গ্রহণ, অর্থ বা স্বর্ণ-রৌপ্য গ্রহণ, লবণ সংরক্ষণ, এবং অন্যান্য শৃঙ্খলাজনিত বিষয় অন্তর্ভুক্ত ছিল।
● ফলাফল: এই সংগীতিতে দীর্ঘ আলোচনার পর মতবিরোধ সম্পূর্ণভাবে দূর করা সম্ভব হয়নি। এর ফলে বৌদ্ধ সংঘে বিভেদের সূচনা ঘটে। এই মতভেদের ভিত্তিতে পরবর্তীকালে স্থবিরবাদ ও মহাসাঙ্ঘিক নামে দুটি প্রধান ধারার বিকাশ ঘটে। যদিও অনেক আধুনিক ইতিহাসবিদের মতে, আনুষ্ঠানিক বিভাজন কিছুটা পরে সম্পূর্ণরূপে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল।
◼ প্রশাসন ও শাসনব্যবস্থা
কালাশোক তাঁর পিতার প্রশাসনিক কাঠামো বজায় রাখেন। সাম্রাজ্যের বিভিন্ন প্রদেশে তিনি রাজকর্মচারীদের মাধ্যমে শাসন পরিচালনা করতেন। তাঁর শাসনকালে কেন্দ্রীয় প্রশাসন যথেষ্ট সুসংগঠিত ছিল। সেইসময় পাটলিপুত্র একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক ও বাণিজ্যিক নগরীতে পরিণত হয়। উত্তর ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে মগধের রাজনৈতিক প্রভাব বজায় থাকে। তাঁর সময়ে উল্লেখযোগ্য নতুন সামরিক বিজয়ের নির্ভরযোগ্য কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। তবে তিনি পিতার প্রতিষ্ঠিত সাম্রাজ্যের অখণ্ডতা রক্ষা করতে সক্ষম হয়েছিলেন।
◼ জীবনাবসান
কালাশোকের মৃত্যুকে ঘিরে বিভিন্ন প্রাচীন গ্রন্থে ভিন্ন ভিন্ন বিবরণ পাওয়া যায়। কিছু বৌদ্ধ সূত্র থেকে জানা যায় যে, তিনি এক প্রাসাদ ষড়যন্ত্রের শিকার হয়ে নিহত হন। আবার পরবর্তী সাহিত্যিক কাহিনিতে বলা হয়েছে যে মহাপদ্ম নন্দ নামে এক নাপিত তাঁকে হত্যা করে ক্ষমতা দখলের পথ সুগম করেন। তবে আধুনিক ইতিহাসবিদরা এই কাহিনির ঐতিহাসিক সত্যতা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেন।
কালাশোকের মৃত্যুর পর তাঁর একাধিক পুত্র যৌথভাবে বা পর্যায়ক্রমে মগধ শাসন করেন বলে বৌদ্ধ গ্রন্থে উল্লেখ রয়েছে। তাঁদের শাসনকালে কেন্দ্রীয় শাসনব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়ে। শেষ পর্যন্ত আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব ৩৪৫-৩৪৪ অব্দে মহাপদ্ম নন্দ শিশুনাগ বংশের শাসনের অবসান ঘটিয়ে নন্দ বংশ প্রতিষ্ঠা করেন।
কালশোকের ১০ পুত্র (৩৬৬ - ৩৪৪ খ্রিস্টপূর্বাব্দ)
বৌদ্ধ গ্রন্থ 'মহাবংশ' অনুসারে, কালশোকের মৃত্যুর পর তাঁর ১০ জন পুত্র প্রায় ২২ বছর ধরে যৌথভাবে বা পর্যায়ক্রমে মগধের শাসনব্যবস্থা পরিচালনা করেছিলেন। এই ১০ জন পুত্রের নাম হলো:
১. ভদ্রসেন, ২. কোরণ্ডবর্ণ, ৩. মঙ্গুর, ৪. সর্বঞ্জহ, ৫. জালিক, ৬. উভবক, ৭. সঞ্জয়, ৮. কোরব্য, ৯. নন্দীবর্ধন ও ১০. পঞ্চমক।
◼ শাসন ব্যবস্থা
এই দশ রাজপুত্রের শাসনকাল সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য তথ্য খুবই সীমিত। ঐতিহাসিকদের মতে, দশ জন রাজপুত্রের মধ্যে ভদ্রসেন প্রথম দিকে প্রধান শাসক হিসেবে সিংহাসনে বসেন। তবে তাঁরা কেউই তাঁদের পিতা কালশোকের মতো শক্তিশালী বা দূরদর্শী ছিলেন না। ধারণা করা হয়, তাঁদের শাসনকালে কেন্দ্রীয় প্রশাসন দুর্বল হয়ে পড়ে এবং রাজদরবারে অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব ও ক্ষমতার লড়াই বৃদ্ধি পায়। তাদের এই দুর্বলতার সুযোগেই পরবর্তীকালে নন্দ বংশের উত্থান ঘটে।
◼ শিশুনাগ বংশের শেষ সম্রাট
পুরাণ অনুসারে, শিশুনাগ বংশের শেষ রাজা ছিলেন মহানন্দিন। অন্যদিকে মহাবংশে কালশোকের পুত্রদের মধ্যে নন্দীবর্ধন নামে একজনের উল্লেখ রয়েছে। ঐতিহাসিকদের মধ্যে অনেকে মনে করেন, মহানন্দিন ও নন্দীবর্ধন সম্ভবত একই ব্যক্তি ছিলেন। তবে এই বিষয়ে সর্বসম্মত মত নেই।
পুরাণ অনুসারে, মহাপদ্ম নন্দ ছিলেন রাজা মহানন্দিনেরই এক শূদ্রা গর্ভজাত সন্তান। তবে গ্রিক ও অন্যান্য সূত্র মতে, তিনি রাজপ্রাসাদের এক নাপিত ছিলেন। পরবর্তীতে এই মহাপদ্ম নন্দ সামরিক ও প্রশাসনিকভাবে অত্যন্ত শক্তিশালী হয়ে উঠেছিলেন।
শিশুনাগ বংশের চূড়ান্ত পতন
প্রায় আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব ৩৪৪ অব্দে শিশুনাগ বংশের শাসনের অবসান ঘটে এবং নন্দ বংশের প্রতিষ্ঠা হয়। মহাপদ্ম নন্দ একে একে কালশোকের সমস্ত পুত্রদের নির্মমভাবে হত্যা করেন। পুরাণে মহাপদ্ম নন্দকে 'সর্বক্ষত্রান্তক' অর্থাৎ সমস্ত ক্ষত্রিয়ের বিনাশকারী এবং 'দ্বিতীয় পরশুরাম' নামে অভিহিত করা হয়েছে। তিনি মগধে শিশুনাগ বংশের অবসান ঘটিয়ে এবং উত্তর ভারতের সমস্ত সমসাময়িক ক্ষত্রিয় রাজবংশগুলিকে ধ্বংস করেন।

0 Comments