Ticker

6/recent/ticker-posts

হর্যঙ্ক বংশের ইতিহাস | সমস্ত শাসকগণের বর্ণনা সহ

প্রাচীন ভারতের ইতিহাসে মগধ সাম্রাজ্যের উত্থানে হর্যঙ্ক বংশের ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই হর্যঙ্ক বংশের শাসকদের হাত ধরেই মগধ একটি আঞ্চলিক রাজ্য থেকে শক্তিশালী সাম্রাজ্যে পরিণত হয়। খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ শতক থেকে খ্রিস্টপূর্ব পঞ্চম শতক পর্যন্ত হর্যঙ্ক বংশ মগধ শাসন করে। তাদের শাসনকালেই মগধ উত্তর ভারতের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। ​নিচে হর্যঙ্ক বংশের শাসকদের শাসনকালের ইতিহাস বর্ণনা করা হলো:


হর্যঙ্ক বংশের ইতিহাস

​বিম্বিসার (৫৪৪ - ৪৯২ খ্রিস্টপূর্বাব্দ)


মগধ সাম্রাজ্যের প্রথম প্রধান রাজবংশ ছিল হর্যঙ্ক বংশ। হর্যঙ্ক বংশের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন সম্রাট বিম্বিসার। তিনিই প্রথম সুপরিকল্পিত নীতির মাধ্যমে মগধকে একটি ক্ষুদ্র রাজ্য থেকে শক্তিশালী সাম্রাজ্যে পরিণত করার প্রক্রিয়া শুরু করেছিলেন। এই কারণে তাঁকে মগধ সাম্রাজ্যের প্রকৃত স্থপতি বলা হয়।

​নিচে সম্রাট বিম্বিসারের রাজত্বকাল সম্পর্কে আলোচনা করা হলো:


◼ সিংহাসন লাভ


​বিম্বিসারের পিতা ছিলেন একজন ক্ষুদ্র সামন্ত রাজা। মতান্তরে তাঁর নাম ছিল মহাশ্রুত বা ভট্টিয়। অনুমানিক ৫৪৪ খ্রিস্টপূর্বাব্দে, মাত্র ১৫ বছর বয়সে বিম্বিসার মগধের সিংহাসনে বসেন। সিংহাসনে বসেই তিনি উপলব্ধি করেন যে মগধকে শক্তিশালী ও সমৃদ্ধ রাষ্ট্রে পরিণত করতে হলে একদিকে প্রতিবেশী রাজ্যগুলোর সঙ্গে সুসম্পর্ক গড়ে তুলতে হবে, আবার অন্যদিকে সাম্রাজ্যের সীমানা সম্প্রসারণও করতে হবে।


◼ সাম্রাজ্য বিস্তার


​বিম্বিসার তাঁর সাম্রাজ্য বিস্তারের জন্য মূলত দুটি প্রধান কৌশল ব্যবহার করেছিলেন। এর প্রথমটি হল বৈবাহিক কূটনীতি এবং দ্বিতীয়টি হল সরাসরি সামরিক অভিযান।


​ক) বৈবাহিক নীতি: প্রতিবেশী শক্তিশালী রাজ্যগুলোর সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক স্থাপনের উদ্দেশ্যে তিনি একাধিক বৈবাহিক সম্পর্ক স্থাপন করেন। তাঁর এই প্রধান তিনটি বিবাহ ছিল অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ:

  • ​কোশল রাজকন্যা: তিনি কোশল রাজ প্রসেনজিতের বোন মহাকোশলাকে বিবাহ করেন। এই বিবাহের যৌতুক হিসেবে তিনি ‘কাশী’ অঞ্চল লাভ করে। কাশী থেকে প্রাপ্ত বিপুল পরিমাণ রাজস্ব মগধের অর্থনৈতিক ভিত্তিকে আরও সুদৃঢ় করে তোলে।
  • ​লিচ্ছবি রাজকন্যা: বিম্বিসার বৈশালীর শক্তিশালী লিচ্ছবি বংশের প্রধান চেতকের কন্যা চেল্লনাকেও বিবাহ করেন। এর ফলে মগধের উত্তর সীমান্ত নিরাপদ হয়। চেল্লনার গর্ভেই হর্যঙ্ক বংশের পরবর্তী শাসক অজাতশত্রুর জন্ম হয়েছিল বলে উল্লেখ পাওয়া যায়।
  • ​মদ্র রাজকন্যা: পাঞ্জাবের মদ্র দেশের রাজকন্যা ক্ষেমা বা ক্ষেমাম্বাকে বিবাহের মাধ্যমে তিনি উত্তর-পশ্চিম ভারতের সঙ্গে রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক সম্পর্ক সুদৃঢ় করেন।


​খ) সামরিক অভিযান ও অঙ্গ বিজয়: তৎকালীন ​অন্য সব শক্তিশালী রাজ্যগুলিকে বৈবাহিক নীতিতে বাঁধা সম্ভব ছিল না। তাই বৈবাহিক কূটনীতির পাশাপাশি বিম্বিসার সামরিক শক্তিকেও কার্যকরভাবে ব্যবহার করেছিলেন। মগধের পূর্ব দিকে অবস্থিত অঙ্গ রাজ্য, যার রাজধানী ছিল চম্পা। এই অঙ্গ রাজ্য ছিল মগধের প্রধান বাণিজ্যিক প্রতিদ্বন্দ্বী। বিম্বিসার অঙ্গরাজ ব্রহ্মদত্তকে যুদ্ধে পরাজিত ও নিহত করে অঙ্গ রাজ্যকে মগধের অন্তর্ভুক্ত করেন। এর ফলে চম্পা বন্দরের ওপর মগধের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হয় এবং সমুদ্রবাণিজ্যের নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মুক্ত হয়। এই অঞ্চলের শাসনভার তিনি তাঁর পুত্র অজাতশত্রুর হাতে অর্পণ করেছিলেন।


◼ শাসনব্যবস্থা


​● স্থায়ী সেনাবাহিনী: ভারতের ইতিহাসে বিম্বিসারই প্রথম রাজা যিনি একটি সুসংগঠিত এবং স্থায়ী সেনাবাহিনী গড়ে তুলেছিলেন। এই কারণে বৌদ্ধ গ্রন্থে তাঁকে 'শ্রেণিক' নামে অভিহিত করা হয়েছে।


​● ​দক্ষ প্রশাসন: তিনি একটি কার্যকর ও সুসংহত প্রশাসনিক ব্যবস্থা গড়ে তোলেন। তাঁর প্রশাসনে রাজকীয় কর্মচারীদের তিনটি ভাগে ভাগ করা হয়েছিল। তিনটি ভাগ হল কার্যনির্বাহী, বিচার বিভাগীয় এবং সামরিক। প্রশাসনে শৃঙ্খলা বজায় রাখতে দুর্নীতিগ্রস্ত কর্মচারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হতো।


​● চিকিৎসা কূটনীতি: অবন্তীর রাজা প্রদ্যোত জন্ডিসে আক্রান্ত হলে বিম্বিসার তাঁর বিখ্যাত রাজবৈদ্য জীবককে চিকিৎসার জন্য অবন্তী রাজ্যে পাঠান। জীবকের সফল চিকিৎসার ফলে প্রদ্যোত সুস্থ হয়ে ওঠেন। এর ফলে অবন্তীর সাথে মগধের দীর্ঘদিনের শত্রুতার অবসান ঘটে এবং বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক তৈরি হয়।


◼ ধর্মীয় বিশ্বাস


​বিম্বিসার ছিলেন মহাবীর ও গৌতম বুদ্ধের সমসাময়িক। জৈন ও বৌদ্ধ উভয় ধর্মগ্রন্থেই তাঁকে নিজ নিজ ধর্মের পৃষ্ঠপোষক হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে অধিকাংশ ঐতিহাসিকের মতে, তিনি বৌদ্ধ ধর্মের প্রতি বিশেষভাবে অনুরাগী ছিলেন। ​তিনি গৌতম বুদ্ধের শিষ্যত্ব গ্রহণ করেছিলেন এবং বৌদ্ধ সংঘের ব্যবহারের জন্য ‘বেণুবন’ নামক একটি উদ্যান দান করেছিলেন। তাঁর রাজবৈদ্য জীবকও বুদ্ধের ব্যক্তিগত চিকিৎসক হিসেবে সেবা করেছিলেন।


◼ রাজধানী ও স্থাপত্য


​বিম্বিসারের আমলে মগধের রাজধানী ছিল রাজগৃহ বা গিরিব্রজ। শহরটি পাঁচটি পাহাড় দ্বারা বেষ্টিত হওয়ায়  স্বাভাবিকভাবেই এটি একটি সুরক্ষিত দুর্গনগরীতে পরিণত হয়েছিল। রাজধানীর প্রতিরক্ষাব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করার জন্য বিম্বিসার পাথরের বিশাল প্রাচীর নির্মাণ করেছিলেন। এটি বর্তমানে ‘সাইক্লোপিয়ান ওয়াল’ নামে পরিচিত।


◼ শেষ জীবন


​বিম্বিসারের শেষ জীবন অত্যন্ত বেদনাদায়ক ছিল। তাঁর পুত্র অজাতশত্রু, দেবদত্তের প্ররোচনায় সিংহাসনের লোভে পিতাকে বন্দি করেন।বৌদ্ধ সূত্র অনুসারে, খ্রিস্টপূর্ব ৪৯২ অব্দে বন্দিদশাতেই অনাহারে এবং যন্ত্রণায় বিম্বিসারের মৃত্যু হয়। কোনো কোনো বর্ণনায় তাঁকে হত্যা করা হয়েছিল বলেও উল্লেখ রয়েছে। বিম্বিসারের এই মৃত্যু সংবাদ শুনে কোশল রাজকন্যা মহাকোশলাও শোকে প্রাণত্যাগ করেন।


অজাতশত্রু (৪৯২ - ৪৬০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ)


হর্যঙ্ক বংশের দ্বিতীয় এবং অন্যতম শক্তিশালী শাসক ছিলেন অজাতশত্রু। অজাতশত্রু 'কূণিক' উপাধি ধারণ করেছিলেন। তিনি তাঁর পিতা সম্রাট বিম্বিসারের সাম্রাজ্যবাদী নীতিকে আরও সম্প্রসারিত করেন। মগধকে তিনি উত্তর ভারতের প্রধান শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। বিম্বিসার যেখানে কূটনীতি ও বন্ধুত্বের ওপর জোর দিয়েছিলেন, তার পরিবর্তে অজাতশত্রু যুদ্ধ ও কঠোর সামরিক শক্তির নীতি বেছে নেন। তাঁর শাসনকালেই মগধ উত্তর ভারতের সর্বাপেক্ষা প্রভাবশালী রাষ্ট্রে পরিণত হওয়ার পথে অগ্রসর হয়।

​নিচে সম্রাট অজাতশত্রু সময়কাল সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:


◼ সিংহাসন লাভ


অজাতশত্রুর সিংহাসন লাভের ঘটনা ছিল অত্যন্ত বিতর্কিত। বৌদ্ধ ও জৈন গ্রন্থের বিবরণ অনুসারে, তিনি ক্ষমতা লাভের উদ্দেশ্যে তাঁর পিতা বিম্বিসারকে বন্দি করেন। পরবর্তীকালে বন্দিদশায় খ্রিস্টপূর্ব ৪৯২ অব্দে তার পিতা বিম্বিসারের মৃত্যু ঘটে।


পিতার মৃত্যুর পর অজাতশত্রুকে একাধিক রাজনৈতিক সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়। এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিল কোশল রাজ্যের সঙ্গে সংঘাত।


বিম্বিসারের মৃত্যুর শোকে তাঁর স্ত্রী কোশল রাজকন্যা মহাকোশলা প্রাণ ত্যাগ করেন। এই ঘটনায় কোশলরাজ প্রসেনজিৎ অত্যন্ত ক্ষুব্ধ হন এবং যৌতুক হিসেবে মগধকে দেওয়া কাশী অঞ্চল পুনরুদ্ধারের চেষ্টা করেন। এর ফলে মগধ ও কোশলের মধ্যে দীর্ঘস্থায়ী সংঘর্ষ শুরু হয়।


◼ সামরিক অভিযান ও সাম্রাজ্য বিস্তার


​ক) কোশল জয়: কাশীর আধিপত্য নিয়ে অজাতশত্রু ও কোশলরাজ প্রসেনজিতের মধ্যে একাধিক যুদ্ধ সংঘটিত হয়। প্রথম দিকে প্রসেনজিৎ কিছু সাফল্য অর্জন করলেও শেষ পর্যন্ত অজাতশত্রু তাঁকে পরাজিত করেন। এরপর দুই পক্ষের মধ্যে সন্ধি স্থাপিত হয়। এই সন্ধির অংশ হিসেবে প্রসেনজিৎ তাঁর কন্যা বজিরার সঙ্গে অজাতশত্রুর বিবাহ দেন। সেইসঙ্গে কাশী গ্রামটি স্থায়ীভাবে মগধকে ফিরিয়ে দেওয়া হয়।


​খ) বৈশালী ও লিচ্ছবি জয়: অজাতশত্রুর সবচেয়ে বড় সামরিক সাফল্য ছিল উত্তর বিহারের শক্তিশালী বজ্জি বা লিচ্ছবি সংঘ জয়। এই সংঘর্ষ প্রায় ১৬ বছর ধরে চলেছিল। লিচ্ছবিরা ঐক্যবদ্ধ ও সামরিকভাবে শক্তিশালী হওয়ায় তাদের পরাজিত করা সহজ ছিল না। এই একতা ভাঙতে অজাতশত্রু কিছু অভিনব কৌশলকে কাজে লাগান। তিনি তাঁর চতুর মন্ত্রী বৎসকারকে বৈশালীতে পাঠান। বৎসকার সেখানে গিয়ে কূটনৈতিক কৌশলে লিচ্ছবি প্রধানদের মধ্যে অভ্যন্তরীণ বিভেদ ও অবিশ্বাস তৈরি করেন। এরপর তাদের ঐক্য দুর্বল হয়ে পড়লে অজাতশত্রু সামরিক অভিযান চালিয়ে বৈশালী জয় করেন এবং অঞ্চলটি মগধ সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত করেন।


◼ নতুন যুদ্ধাস্ত্রের আবিষ্কার


লিচ্ছবিদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে অজাতশত্রু দুটি বিশেষ যুদ্ধাস্ত্র ব্যবহার করেছিলেন। এগুলি হল:


● মহাশিলাকণ্টক: মহাশিলাকণ্টক ছিল এক ধরনের প্রাচীন প্রস্তর নিক্ষেপকারী যন্ত্র। এটি দূর থেকে শত্রুপক্ষের ওপর বড় বড় পাথর নিক্ষেপ করতে সক্ষম ছিল। অনেকে আধুনিক ক্যাটাপল্টের সঙ্গে এর তুলনা করে থাকেন।


● রথমুষল: রথমুষল ছিল এক বিশেষ যুদ্ধরথ। এর সঙ্গে ধারালো অস্ত্র বা আঘাতকারী যন্ত্র সংযুক্ত থাকত। রথটি যখন শত্রুসেনাদের মাঝখান দিয়ে ছুটে যেত, তখন স্বয়ংক্রিয়ভাবে চারপাশের সৈন্যদের কেটে খড়কুটোর মতো উড়িয়ে দিত।


◼ ধর্মীয় বিশ্বাস


অজাতশত্রু প্রথম জীবনে জৈন ধর্মের প্রতি আকৃষ্ট ছিলেন বলে উল্লেখ পাওয়া যায়। তবে পরবর্তীকালে তিনি বৌদ্ধ ধর্মের অন্যতম পৃষ্ঠপোষকে পরিণত হন। গৌতম বুদ্ধের মহাপরিনির্বাণের পর খ্রিস্টপূর্ব ৪৮৩ অব্দে (মতান্তরে খ্রিস্টপূর্ব ৪৮৭ অব্দে) অজাতশত্রুর উদ্যোগে রাজগৃহের সপ্তপর্ণী গুহায় প্রথম বৌদ্ধ সংগীতি অনুষ্ঠিত হয়। এই সংগীতিতে বুদ্ধের বাণী ও শাসনসংক্রান্ত বিধিগুলো সংকলিত ও সংরক্ষিত হয়। পরবর্তীকালে এগুলো সুত্ত পিটক ও বিনয় পিটকের ভিত্তি হিসেবে বিবেচিত হয়।


◼ পাটলিপুত্রের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন


অজাতশত্রু গঙ্গা, গণ্ডক ও সোন নদীর মিলনস্থলের কাছে অবস্থিত 'পাটলিগ্রাম' নামক একটি জায়গায় একটি দুর্গ ও সামরিক ঘাঁটি নির্মাণ করেন। তিনি উপলব্ধি করেছিলেন যে এই অঞ্চলটি সামরিক ও বাণিজ্যিক উভয় দিক থেকেই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।


পরবর্তীকালে তাঁর উত্তরসূরি উদয়ন এই পাটলিগ্রামকে সম্প্রসারিত করে পাটলিপুত্র নগরী প্রতিষ্ঠা করেন। এই পাটলিপুত্র পরবর্তীকালে মগধ এবং পরবর্তী বৃহৎ সাম্রাজ্যগুলোর রাজধানী হিসেবে খ্যাতি লাভ করে।


◼ শেষ জীবন 

​

​প্রায় ৩২ বছর সাফল্যের সাথে শাসনকার্য চালানোর পর খ্রিস্টপূর্ব ৪৬০ অব্দে অজাতশত্রুর মৃত্যু হয়। কিছু বৌদ্ধ সূত্র অনুসারে, তাঁর পুত্র উদয়ন সিংহাসন লাভের উদ্দেশ্যে তাঁকে হত্যা করেছিলেন। তবে এই ঘটনার সত্যতা নিয়ে ঐতিহাসিকদের মধ্যে নানা মতভেদ রয়েছে।


উদয়ন (৪৬০ - ৪৪৪ খ্রিস্টপূর্বাব্দ)


হর্যঙ্ক বংশের তৃতীয় গুরুত্বপূর্ণ শাসক ছিলেন উদয়ন। তিনি সম্রাট অজাতশত্রুর পুত্র এবং বিম্বিসারের পৌত্র (নাতি) ছিলেন। সামরিক বিজয়ের ক্ষেত্রে তিনি তাঁর পিতা বা পিতামহের মতো অতটা খ্যাতি অর্জন না করলেও, প্রশাসনিক দূরদর্শিতা ও নগর পরিকল্পনার জন্য ইতিহাসে তিনি বিশেষভাবে স্মরণীয় হয়ে আছেন। তাঁর সর্বশ্রেষ্ঠ কীর্তি ছিল মগধের রাজধানী রাজগৃহ থেকে পাটলিপুত্রে স্থানান্তর। এই পাটলিপুত্র পরবর্তীকালে ভারতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক কেন্দ্র হিসেবে বিকশিত হয়ে ওঠে।

​নিচে সম্রাট উদয়নের শাসনকাল সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:


◼ সিংহাসন লাভ


উদয়নের সিংহাসন আরোহণ সম্পর্কে বিভিন্ন ঐতিহাসিক সূত্রে ভিন্ন ভিন্ন মত পাওয়া যায়। বৌদ্ধ সূত্র ও মহাবংশ অনুসারে, তিনি পিতা অজাতশত্রুকে হত্যা করে খ্রিস্টপূর্ব ৪৬০ অব্দে মগধের সিংহাসনে বসেন। এই ধারাবিবরণীর ভিত্তিতে অনেক ঐতিহাসিক হর্যঙ্ক বংশকে "পিতৃঘাতী বংশ" বলেও উল্লেখ করেছেন। তবে জৈন গ্রন্থে এই ঘটনার যথাযত সমর্থন পাওয়া যায় না। তাই বিষয়টি নিয়ে ঐতিহাসিকদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে।


◼ রাজধানী স্থানান্তর


উদয়নের শাসনকালের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ছিল মগধের রাজধানী রাজগৃহ থেকে পাটলিপুত্রে স্থানান্তর।


● রাজধানী পরিবর্তনের কারণ: রাজগৃহ ছিল পাহাড়বেষ্টিত একটি নিরাপদ নগরী। তবে অজাতশত্রুর সাম্রাজ্য বিস্তারের ফলে মগধের সীমানা উত্তর ও পশ্চিম দিকে অনেক দূর পর্যন্ত প্রসারিত হয়েছিল। ফলে প্রশাসনিক ও সামরিক দিক থেকে রাজগৃহের পরিবর্তে আরও কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত একটি রাজধানীর প্রয়োজন দেখা দেয়।


● পাটলিপুত্র নগরীর প্রতিষ্ঠা: অজাতশত্রুর প্রতিষ্ঠিত সামরিক ঘাঁটি পাটলিগ্রামকে সম্প্রসারিত করে উদয়ন একটি সুপরিকল্পিত নগরী গড়ে তোলেন। এটিই পাটলিপুত্র নামে পরিচিত হয়। খ্রিস্টপূর্ব পঞ্চম শতকে উদয়ন মগধের রাজধানী রাজগৃহ থেকে এই পাটলিপুত্র নগরীতে স্থানান্তর করেন।


● জলদুর্গ হিসেবে পাটলিপুত্র: গঙ্গা, গণ্ডক ও সোন নদীর নিকটবর্তী হওয়ায় পাটলিপুত্র প্রাকৃতিকভাবে একটি শক্তিশালী জলদুর্গে পরিণত হয়। নদীপথে যোগাযোগ ও বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণের সুবিধার পাশাপাশি এটি শত্রুর আক্রমণ প্রতিহত করার ক্ষেত্রেও বিশেষ উপযোগী ছিল। পরবর্তীকালে মৌর্য ও গুপ্ত সাম্রাজ্যের রাজধানী হিসেবেও এই পাটলিপুত্র নগরী গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।


◼ সামরিক অভিযান


উদয়ন নতুন ভূখণ্ড জয়ের পরিবর্তে মগধ সাম্রাজ্যের সীমানা রক্ষা ও প্রশাসনিক স্থিতিশীলতার ওপর বেশি গুরুত্ব দেন। তবে তার সময়ে অবন্তী রাজ্যের সঙ্গে মগধের প্রতিদ্বন্দ্বিতা অব্যাহত ছিল। বিভিন্ন ঐতিহাসিক সূত্রে অবন্তীর রাজা পালকের সঙ্গে তাঁর সংঘর্ষের উল্লেখ পাওয়া যায়। উদয়ন তার শাসনকালে অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে মগধের নিরাপত্তা বজায় রাখেন এবং সাম্রাজ্যের অখণ্ডতা রক্ষা করেন।


◼ ধর্মীয় বিশ্বাস


উদয়ন মূলত জৈন ধর্মের একজন গুরুত্বপূর্ণ পৃষ্ঠপোষক হিসেবে পরিচিত ছিলেন। জৈন সূত্র অনুসারে, তিনি পাটলিপুত্রে একটি জৈন চৈত্যগৃহ নির্মাণ করেছিলেন। সেইসঙ্গে জৈন সাধু ও উপাসকদের তিনি নিয়মিত রাজকীয় সাহায্য প্রদান করতেন। এছাড়া জানা যায়, তিনি নিজেও নাকি জৈন ধর্মের উপবাস ও অন্যান্য নিয়ম গুলি কঠোরভাবে পালন করতেন।


​◼ শেষ জীবন 


উদয়নের মৃত্যুকে ঘিরেও বিভিন্ন কিংবদন্তি কাহিনী প্রচলিত রয়েছে। জৈন গ্রন্থ পরিশিষ্টপর্বণ অনুসারে, অবন্তীর রাজা সরাসরি যুদ্ধে মগধরাজকে পরাজিত করতে ব্যর্থ হয়ে এক গুপ্তচরকে জৈন সন্ন্যাসীর ছদ্মবেশে উদয়নের প্রাসাদে পাঠান। একদিন রাতে যখন রাজা উদয়ন গভীর ঘুমে মগ্ন ছিলেন, তখন সেই ছদ্মবেশী সন্ন্যাসী তাকে ছুরিকাঘাত করে হত্যা করে। তবে এই ঘটনার ঐতিহাসিক সত্যতা নিয়ে পণ্ডিতদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে।


অনিরুদ্ধ (৪৪৪ - ৪৪২ খ্রিস্টপূর্বাব্দ)


হর্যঙ্ক বংশের ইতিহাসে রাজা অনিরুদ্ধ ছিলেন একজন খুবই স্বল্পপরিচিত শাসক। সম্রাট উদয়নের মৃত্যুর পর তিনি মগধের সিংহাসনে বসেন। তাঁর শাসনকাল ছিল অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত এবং এই সময় থেকেই হর্যঙ্ক বংশের রাজনৈতিক দুর্বলতা ও অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা ক্রমশ প্রকট হয়ে ওঠে। বৌদ্ধ গ্রন্থ মহাবংশ ও দিব্যাবদানসহ কয়েকটি প্রাচীন সূত্রে তাঁর সম্পর্কে খুবই সীমিত তথ্য পাওয়া যায়। এই সীমিত তথ্যের ভিত্তিতে তাঁর শাসনকাল সম্পর্কে আলোচনা করা হলো:


◼ সিংহাসন লাভ


অনিরুদ্ধের সিংহাসন আরোহণ সম্পর্কে বিভিন্ন প্রাচীন গ্রন্থে ভিন্ন ভিন্ন মত পাওয়া যায়। বৌদ্ধ সূত্র থেকে জানা যায়, অনিরুদ্ধ তাঁর পিতা সম্রাট উদয়নকে হত্যা করে মগধের ক্ষমতা দখল করেছিলেন। অন্যদিকে, কিছু জৈন সূত্রে বলা হয়েছে যে উদয়নের মৃত্যুর পর জ্যেষ্ঠ উত্তরাধিকারী হিসেবে অনিরুদ্ধ মগধের সিংহাসনে বসেন। ফলে এই বিষয়টি নিয়ে ঐতিহাসিকদের মধ্যে নানা মতভেদ তৈরি হয়েছে।


◼ শাসনকাল


অনিরুদ্ধের শাসনকাল আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব ৪৪৪ থেকে ৪৪২ অব্দ পর্যন্ত, অর্থাৎ প্রায় দুই বছর স্থায়ী ছিল। তাঁর সময় মগধ সাম্রাজ্যের কেন্দ্রীয় প্রশাসন ক্রমশ দুর্বল হয়ে পড়ে। অজাতশত্রু বা বিম্বিসারের মতো কোনো দূরদর্শিতা বা সামরিক দক্ষতা অনিরুদ্ধের ছিল না। তিনি শাসনকার্যের প্রতি একেবারেই মনযোগী ছিলেন না। বেশিরভাগ সময় তিনি রাজপ্রাসাদের বিলাসিতার মধ্যে কাটাতেন। তাঁর শাসনকালে সাম্রাজ্যের অভ্যন্তরে রাজনৈতিক অস্থিরতা বৃদ্ধি পায় এবং রাজকীয় কর্তৃত্ব আগের তুলনায় দুর্বল হয়ে পড়ে। তবে তাঁর ব্যক্তিগত বিলাসিতা বা প্রশাসনিক অযোগ্যতার বিষয়ে প্রত্যক্ষ ও নির্ভরযোগ্য ঐতিহাসিক প্রমাণ খুবই সীমিত।


◼ সিংহাসনচ্যুতি


বৌদ্ধ সূত্র অনুসারে, ক্ষমতালাভের মাত্র দুই বছর পর অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার দ্বন্দ্বের ফলে অনিরুদ্ধ সিংহাসনচ্যুত হন। তাঁর পতনের পর তাঁর ভাই মুণ্ড মগধের সিংহাসনে বসেন। প্রাচীন সূত্রগুলোতে অনিরুদ্ধের পরাজয়ের সুনির্দিষ্ট কারণ সম্পর্কে সেরকম কোনো বিস্তারিত বিবরণ পাওয়া যায় না। তবে হর্যঙ্ক বংশের শেষ পর্যায়ে উত্তরাধিকার সংকট ও পারিবারিক ক্ষমতার লড়াই যে ক্রমশ তীব্র হয়ে উঠেছিল, তা বিভিন্ন ঐতিহাসিক উৎসে উল্লেখ রয়েছে।


মুণ্ড (৪৪২ - ৪৩৭ খ্রিস্টপূর্বাব্দ)


অনিরুদ্ধের পতনের পর তাঁর ভাই মুণ্ড উত্তরসূরি হিসেবে মগধের সিংহাসনে বসেন। মুণ্ডের শাসনকাল সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য ঐতিহাসিক তথ্য খুবই সীমিত। তাঁর রাজত্বের সময় মগধে রাজনৈতিক অস্থিরতা বৃদ্ধি পায় এবং হর্যঙ্ক বংশের শক্তি ক্রমশ কমতে থাকে। এই সময়েই মগধে উত্তরাধিকার নিয়ে সংঘর্ষ ও প্রাসাদ ষড়যন্ত্রের প্রবণতা আরও প্রকট হয়।


◼ সিংহাসনে আরোহণ


বৌদ্ধ গ্রন্থ মহাবংশ ও দিব্যাবদান অনুসারে, অনিরুদ্ধের পর মুণ্ড মগধের সিংহাসন আরোহণ করেন। কোনো কোনো সূত্রে উল্লেখ রয়েছে যে, তিনি প্রাসাদ ষড়যন্ত্র বা অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার দ্বন্দ্বের মাধ্যমে অনিরুদ্ধকে অপসারণ করে ক্ষমতা লাভ করেছিলেন। তবে এ বিষয়ে প্রত্যক্ষ ও নির্ভরযোগ্য কোনো ঐতিহাসিক প্রমাণ পাওয়া যায় না।


◼ শাসনকাল


ঐতিহাসিকদের মতে, মুণ্ডের শাসনকাল আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব ৪৪২ থেকে ৪৩৭ অব্দ পর্যন্ত স্থায়ী ছিল। তাঁর রাজত্ব তুলনামূলকভাবে খুবই সংক্ষিপ্ত। এই সময় মগধে কোনো উল্লেখযোগ্য সামরিক বিজয় বা নতুন ভূখণ্ড সংযোজনের কোনো  নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়া যায় না।


◼ ধর্মীয় বিশ্বাস 


মুণ্ডের ব্যক্তিগত ধর্মীয় বিশ্বাস সম্পর্কে নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায় না। তবে ধারণা করা হয় যে, পূর্ববর্তী হর্যঙ্ক শাসকদের মতো তিনিও বৌদ্ধ ও জৈন ধর্মাবলম্বীদের প্রতি সহনশীল নীতি অনুসরণ করেছিলেন। যদিও তাঁর ধর্মীয় পৃষ্ঠপোষকতার উল্লেখযোগ্য কোনো প্রমাণ ইতিহাসে সংরক্ষিত নেই।


◼ শেষ জীবন 


মুণ্ডের মৃত্যুর পর তাঁর পুত্র নাগদাশক মগধের সিংহাসনে বসেন। নাগদাশকই হর্যঙ্ক বংশের শেষ শাসক ছিলেন।


নাগদাশক (৪৩৭ - ৪১৩ খ্রিস্টপূর্বাব্দ)


নাগদাশক ছিলেন হর্যঙ্ক বংশের শেষ শাসক। তাঁর শাসনকালেই দীর্ঘদিন ধরে মগধ শাসনকারী হর্যঙ্ক বংশের অবসান ঘটে। যদিও তাঁর সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য ঐতিহাসিক তথ্য খুবই সীমিত, তবুও বৌদ্ধ ও অন্যান্য প্রাচীন গ্রন্থে তাঁর শাসনকাল সম্পর্কে কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যায়।


​◼ সিংহাসন লাভ


নাগদাশক ছিলেন হর্যঙ্ক বংশের শেষ রাজা। অধিকাংশ ঐতিহাসিকদের মতে, তিনি ছিলেন রাজা মুণ্ডের পুত্র। আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব ৪৩৭ অব্দে তিনি মগধের সিংহাসনে আরোহণ করেন। তারপর প্রায় ২৪ বছর ধরে তিনি রাজত্ব করেন।


​◼ শাসনকাল


প্রাচীন সূত্রে নাগদাশককে একজন দুর্বল শাসক হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। তাঁর রাজত্বকালে কেন্দ্রীয় প্রশাসনের কার্যকারিতা কমে যায় এবং রাজদরবারে অমাত্যদের প্রভাব বৃদ্ধি পায়। কিছু প্রাচীন গ্রন্থে তাঁকে ভোগবিলাসী ও অযোগ্য শাসক হিসেবে চিত্রিত করা হয়েছে। যদিও, এই দাবির পক্ষে সমসাময়িক ও নির্ভরযোগ্য ঐতিহাসিক প্রমাণ খুবই সীমিত। তবে তাঁর সময়ে মগধে রাজনৈতিক অস্থিরতা বৃদ্ধি পেয়েছিল এবং প্রশাসনিক দুর্বলতা স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল বলে অধিকাংশ ঐতিহাসিক একমত।


​◼ নাগদশকের পতন ও হর্যঙ্ক বংশের অবসান


নাগদশকের চরম অযোগ্যতা ও ভোগবিলাসিতার কারণে তার প্রতি প্রজাদের মধ্যে তীব্র অসন্তোষের সৃষ্টি হয়। এর ফলে আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব ৪১৩ অব্দে নাগদাশকের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ সংঘটিত হয়। মগধের জনগণ এবং অমাত্যেরা মিলে এক গণবিদ্রোহের মাধ্যমে বিলাসী রাজা নাগদশককে সিংহাসনচ্যুত করে নির্বাসিত করেন। নাগদশকের পতনের সাথে সাথেই মগধ থেকে অত্যাচারী ও পিতৃঘাতী হর্যঙ্ক বংশের অবসান ঘটে। এরপর তাঁরই প্রধান অমাত্য বা কাশী অঞ্চলের মহামাত্র  শিশুনাগ মগধের সিংহাসনে বসেন। শিশুনাগের প্রতিষ্ঠিত এই রাজবংশ ইতিহাসে শিশুনাগ বংশ নামে পরিচিত হয়।

Post a Comment

0 Comments