Ticker

6/recent/ticker-posts

প্রবাহী তড়িৎ | তড়িৎ প্রবাহমাত্রা, বিভব প্রভেদ, ওহমের সূত্র ও রোধ

বিজ্ঞানের প্রবাহী তড়িৎ অধ্যায়ে আসলে পরিবাহকের মধ্য দিয়ে তড়িৎ আধানের সুশৃঙ্খল প্রবাহ নিয়ে আলোচনা করা হয়। মাধ্যমিক, উচ্চমাধ্যমিক, বিভিন্ন প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষা এবং বিভিন্ন প্রবেশিকা পরীক্ষায় এই অধ্যায় থেকে নিয়মিত প্রশ্ন আসে। তাই প্রবাহী তড়িৎ সম্পর্কে মৌলিক ধারণা ও তার সূত্রাবলী ছাত্র-ছাত্রীদের অবশ্যই ভালোভাবে জানা প্রয়োজন। নিচে প্রবাহী তড়িৎ অধ্যায়ের গুরুত্বপূর্ণ বিষয় গুলি বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হল:

সূচিপত্র

তড়িৎ প্রবাহ কী?


যখন একটি পরিবাহকের দুই প্রান্তে কোনো বিভব পার্থক্য সৃষ্টি  হয়, তখন পরিবাহীর মধ্যে থাকা মুক্ত ইলেকট্রনগুলো একটি নির্দিষ্ট দিকে চলতে শুরু করে। এই ইলেকট্রনগুলোর সুশৃঙ্খল গতির ফলেই তড়িৎ প্রবাহ বা প্রবাহী তড়িৎ সৃষ্টি হয়।


তড়িৎ প্রবাহ বা প্রবাহী তড়িৎ

​● সংজ্ঞা: তড়িৎ চালক বলের মাধ্যমে কোনো পরিবাহীর মধ্যে দিয়ে একক সময়ে তড়িৎ আধানের অবিরাম প্রবাহকে তড়িৎ প্রবাহ বা প্রবাহী তড়িৎ বলে।


◼ তড়িৎ প্রবাহ সৃষ্টির কারণ:


স্বাভাবিক অবস্থায় একটি ধাতব পরিবাহীর ভেতরে মুক্ত ইলেকট্রনগুলো চারিদিকে এলোমেলোভাবে চলাচল করে। ফলে কোনো নির্দিষ্ট দিকে আধানের প্রবাহ হয় না এবং তড়িৎ প্রবাহও সৃষ্টি হয় না।


কিন্তু যখন পরিবাহীর দুই প্রান্তে একটি ব্যাটারি বা বিদ্যুৎ উৎস সংযুক্ত করা হয়, তখন তার এক প্রান্তে ঋণাত্মক বিভব এবং অন্য প্রান্তে ধনাত্মক বিভব সৃষ্টি হয়। এই বিভব পার্থক্যের কারণে মুক্ত ইলেকট্রনগুলো ঋণাত্মক প্রান্ত থেকে ধনাত্মক প্রান্তের দিকে সুশৃঙ্খলভাবে চলতে শুরু করে। ইলেকট্রনগুলির এই ধারাবাহিক প্রবাহই তড়িৎ প্রবাহ বা প্রবাহী তড়িৎ নামে পরিচিত।


◼ তড়িৎ প্রবাহের শর্ত:


প্রবাহী তড়িৎ সৃষ্টি হওয়ার জন্য প্রধানত তিনটি শর্ত পূরণ হতে হবে। শর্ত গুলি হল:

  • একটি পরিবাহী বা পরিবাহক থাকতে হবে।
  • বিভব পার্থক্য সৃষ্টি করার জন্য অবশ্যই একটি তড়িৎ উৎস থাকতে হবে। যেমন- ব্যাটারি বা সেল।
  • একটি সম্পূর্ণ বর্তনী থাকতে হবে, যাতে আধানগুলি অবিরাম প্রবাহিত হতে পারে।

যদি বর্তনী কোথাও বিচ্ছিন্ন থাকে, তাহলে ইলেকট্রনের প্রবাহ বন্ধ হয়ে যাবে এবং তড়িৎ প্রবাহও ঘটবে না।


◼ তড়িৎ প্রবাহের বাস্তব উদাহরণ:


আমাদের দৈনন্দিন জীবনে প্রবাহী তড়িৎের অসংখ্য ব্যবহার রয়েছে। যেমন:

  • বৈদ্যুতিক বাল্ব জ্বালানো
  • বৈদ্যতিক পাখা চালানো
  • মোবাইল ফোন চার্জ করা
  • টেলিভিশন ও কম্পিউটার চালানো
  • রেফ্রিজারেটর, ওয়াশিং মেশিন ইত্যাদি বৈদ্যুতিক যন্ত্র পরিচালনা করা

এই সমস্ত যন্ত্রের কার্যকারিতা পরিবাহকের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত তড়িৎের উপর নির্ভর করে।


◼ তড়িৎ প্রবাহের প্রকারভেদ:


প্রবাহের প্রকৃতির ভিত্তিতে প্রবাহী তড়িৎ দুই রকমের হতে পারে। যেমন:


​2. একমুখী প্রবাহ বা সমপ্রবাহ (DC): যখন তড়িৎ প্রবাহের অভিমুখ সময়ের সাথে পরিবর্তিত হয় না, অর্থাৎ অভিমুখ সবসময় একদিকেই থাকে, তখন তাকে একমুখী প্রবাহ বা সমপ্রবাহ বলে। যেমন: ব্যাটারি বা টর্চের সেল থেকে পাওয়া তড়িৎ।


​1. পরিবর্তী প্রবাহ (AC): যখন তড়িৎ প্রবাহের অভিমুখ একটি নির্দিষ্ট সময় অন্তর অন্তর পরিবর্তিত হয়, তখন তাকে পরবর্তী প্রবাহ বলে। যেমন: আমাদের বাড়িতে তারের মাধ্যমে যে তড়িৎ সরবরাহ করা হয়, তা হলো AC বা পরবর্তী প্রবাহ। ভারতে যে তড়িৎ সরবরাহ করা হয় তার কম্পাঙ্ক বা ফ্রিকোয়েন্সি হলো 50 Hz। অর্থাৎ প্রতি সেকেন্ডে এটি 50 বার দিক পরিবর্তন করে।


তড়িৎ প্রবাহমাত্রা


তড়িৎ প্রবাহমাত্রা হলো প্রবাহী তড়িৎ অধ্যায়ের সবচেয়ে বুনিয়াদি এবং গুরুত্বপূর্ণ পরিমাপযোগ্য রাশি। সহজ কথায়, কোনো পরিবাহীর মধ্য দিয়ে কী হারে বা কতটা স্পীডে আধান প্রবাহিত হচ্ছে, সেটাই হলো তড়িৎ প্রবাহমাত্রা।

​নিচে এই বিষয়টি গভীরভাবে এবং বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:


​● সংজ্ঞা: কোনো পরিবাহী তারের যেকোনো প্রস্থচ্ছেদের মধ্য দিয়ে প্রতি সেকেন্ডে যে পরিমাণ মোট তড়িৎ আধান প্রবাহিত হয়, তাকে ওই পরিবাহীর তড়িৎ প্রবাহমাত্রা বলে।


​অর্থাৎ বলা যায়, প্রবাহমাত্রা হলো তড়িৎ আধানের প্রবাহের হার।


গাণিতিক রূপ ও সমীকরণ:


​যদি কোনো পরিবাহীর প্রস্থচ্ছেদের মধ্য দিয়ে t সেকেন্ড সময়ে মোট Q পরিমাণ আধান প্রবাহিত হয়, তবে সংজ্ঞা অনুযায়ী তড়িৎ প্রবাহমাত্রা (I) হবে:

$$I = \frac{Q}{t}$$


◼ প্রবাহমাত্রার একক:


তড়িৎ প্রবাহমাত্রার SI একক হলো অ্যাম্পিয়ার। এটিকে সংক্ষেপে 'A' বা 'Amp' লেখা হয়। এই একক টির নামকরন হয়েছে বিজ্ঞানী আন্দ্রে-মারি অ্যাম্পিয়ারের নামানুসারে।


কোনো পরিবাহীর যেকোনো প্রস্থচ্ছেদের মধ্য দিয়ে যদি প্রতি সেকেন্ডে 1 কুলম্ব আধান প্রবাহিত হয়, তবে ওই পরিবাহীর প্রবাহমাত্রাকে 1 অ্যাম্পিয়ার বলা হয়।


◼ প্রবাহমাত্রা পরিমাপ:


তড়িৎ বর্তনীর প্রবাহমাত্রা পরিমাপ করার জন্য অ্যামিটার নামক একটি যন্ত্র ব্যবহার করা হয়।

অ্যামিটার ব্যবহারের সময় কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় মনে রাখতে হয়:

  • অ্যামিটারকে সবসময় বর্তনীর সঙ্গে শ্রেণি সমবায়ে সংযুক্ত করতে হয়। এর ফলে বর্তনীর মধ্য দিয়ে যে তড়িৎ প্রবাহিত হচ্ছে, তা সম্পূর্ণরূপে অ্যামিটারের মধ্য দিয়েও প্রবাহিত হয়।
  • একটি আদর্শ অ্যামিটারের অভ্যন্তরীণ রোধ শূন্য (0 Ω) হওয়া উচিত। বাস্তবে এটি সম্পূর্ণ শূন্য না হলেও খুবই কম রাখা হয়, যাতে এটি বর্তনীর তড়িৎ প্রবাহে কোনো উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন না ঘটায়।


তড়িৎ বিভব


তড়িৎ বিভব হলো তড়িৎবিজ্ঞানের অন্যতম মৌলিক ধারণা। প্রবাহী তড়িৎকে যদি আমরা নদীর জলের প্রবাহের সঙ্গে তুলনা করি, তবে তড়িৎ বিভবকে সেই জলের উচ্চতা বা চাপের সঙ্গে তুলনা করা যায়। যেমন উচ্চতার পার্থক্যের কারণে জল প্রবাহিত হয়, তেমনি বিভবের পার্থক্যের কারণেই তড়িৎ প্রবাহ সৃষ্টি হয়।

নিচে তড়িৎ বিভব সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:


◼ তড়িৎ বিভবের ধারণা:


আমরা জানি, জল সবসময় উঁচু স্থান থেকে নিচু স্থানে প্রবাহিত হয় এবং তাপ উচ্চ তাপমাত্রার বস্তু থেকে নিম্ন তাপমাত্রার বস্তুর দিকে সঞ্চালিত হয়। ঠিক একইভাবে, তড়িৎ আধান কোন দিকে প্রবাহিত হবে তা নির্ধারণ করে তড়িৎ বিভব।


আরো সহজ ভাবে বললে, ধরো একটি পাইপের দুই প্রান্ত একই উচ্চতায় রয়েছে। এমন  অবস্থায় কিন্তু পাইপের মধ্যে জল প্রবাহিত হবে না। তবে যদি এক প্রান্ত উঁচু এবং অন্য প্রান্ত নিচু করা হয়, তাহলে উচ্চতার পার্থক্যের কারণে পাইপের মধ্যে জল প্রবাহিত হবে।


ঠিক একইভাবে, কোনো বৈদ্যুতিক বর্তনীর দুই প্রান্তে যদি বিভবের পার্থক্য থাকে, তাহলে তড়িৎ আধান প্রবাহিত হতে শুরু করে। তাই তড়িৎ প্রবাহের জন্য বিভবের পার্থক্য অপরিহার্য।


​● সংজ্ঞা: অসীম দূরত্ব থেকে একটি একক ধনাত্মক আধানকে (+১ কুলম্ব) তড়িৎ ক্ষেত্রের কোনো নির্দিষ্ট বিন্দুতে এনে স্থাপন করতে যে পরিমাণ কার্য করতে হয়, তাকে ওই বিন্দুর তড়িৎ বিভব বলা হয়।


অর্থাৎ, কোনো বিন্দুতে একক ধনাত্মক আধানের সম্ভাব্য শক্তির পরিমাপই হলো সেই বিন্দুর তড়িৎ বিভব।


◼ গাণিতিক রূপ:


ধরা যাক, অসীম দূরত্ব থেকে Q কুলম্ব আধানকে তড়িৎ ক্ষেত্রের একটি নির্দিষ্ট বিন্দুতে আনতে W জুল কার্য করতে হয়। তাহলে সেই বিন্দুর তড়িৎ বিভব হবে:

$$V = W / Q$$

এখানে,

V = তড়িৎ বিভব (Volt)

W = সম্পাদিত কার্য (Joule)

Q = তড়িৎ আধান (Coulomb)

এই সমীকরণ থেকে বোঝা যায়, একক আধানের জন্য যত বেশি কার্য করতে হয়, তড়িৎ বিভব তত বেশি হবে।


◼ তড়িৎ বিভবের একক:


তড়িৎ বিভবের SI একক হলো ভোল্ট (Volt)। এটিকে ইংরেজি 'V' অক্ষর দ্বারা প্রকাশ করা হয়।

এই এককের নামকরণ করা হয়েছে ইতালীয় বিজ্ঞানী আলেসান্দ্রো ভোল্টার নামানুসারে।


​● ভোল্টের সংজ্ঞা: অসীম দূরত্ব থেকে 1 কুলম্ব আধানকে তড়িৎ ক্ষেত্রের কোনো বিন্দুতে আনতে যদি 1 জুল কার্য করতে হয়, তবে বলা হয় ওই বিন্দুর তড়িৎ বিভব 1 ভোল্ট


অর্থাৎ,

$1 V = 1 J/C$


বিভব প্রভেদ


বিভব প্রভেদ হলো প্রবাহী তড়িৎ বা চলতড়িতের প্রাণশক্তি। বাস্তব জীবনে কিন্তু একটি বিন্দুর তড়িৎ বিভবের থেকে দুটি বিন্দুর বিভবের পার্থক্য, অর্থাৎ বিভব প্রভেদ জানাটা অধিক গুরুত্বপূর্ণ। একেই সাধারণভাবে ভোল্টেজ (Voltage) বলা হয়।


​● সংজ্ঞা: তড়িৎ ক্ষেত্রের দুটি বিন্দুর মধ্যে একক ধনাত্মক আধানকে এক বিন্দু থেকে অন্য বিন্দুতে স্থানান্তর করতে যে পরিমাণ কার্য করতে হয়, তাকে ওই দুই বিন্দুর বিভব প্রভেদ বলে।


◼ বিভব প্রভেদের গুরুত্ব:

  • পরিবাহকের দুই প্রান্তে বিভব প্রভেদ না থাকলে তড়িৎ প্রবাহ সৃষ্টি হয় না।
  • ব্যাটারি, সেল বা জেনারেটর বর্তনীতে বিভব প্রভেদ সৃষ্টি করে। আর এই কারণেই তড়িৎ প্রবাহিত হয়।
  • বিভব প্রভেদ যত বেশি হবে, রোধ একই থাকলে তড়িৎ প্রবাহও তত বেশি হবে (ওহমের সূত্র অনুযায়ী)।


◼ বিভব প্রভেদ পরিমাপ:

  • বিভব প্রভেদ পরিমাপ করার জন্য ভোল্টমিটার যন্ত্র ব্যবহার করা হয়।
  • বর্তনীতে ভোল্টমিটারকে সমান্তরাল সমবায়ে সংযুক্ত করতে হয়।
  • একটি আদর্শ ভোল্টমিটারের অভ্যন্তরীণ রোধ অত্যন্ত বেশি হওয়া উচিত, যাতে এটি বর্তনীর তড়িৎ প্রবাহকে প্রভাবিত না করে।


◼ উচ্চ বিভব ও নিম্ন বিভব:


​● উচ্চ বিভব: যে বস্তুতে তড়িৎ বিভবের মান বেশি থাকে, তাকে উচ্চ বিভব বলা হয়। যেমন, ব্যাটারির ধনাত্মক (+) প্রান্তকে উচ্চ বিভব হিসেবে ধরা হয়।


​● নিম্ন বিভব: যে বস্তুতে তড়িৎ বিভবের মান কম থাকে, তাকে নিম্ন বিভব বলা হয়। যেমন, ব্যাটারির ঋণাত্মক (–) প্রান্তকে নিম্ন বিভব হিসেবে ধরা হয়।


◼ তড়িৎ প্রবাহের দিক:


​● তড়িৎ প্রবাহের দিক: উচ্চ বিভব (+) থেকে নিম্ন বিভবের (–) দিকে তড়িৎ প্রবাহিত হয়।

​● ইলেকট্রনের গতির দিক: নিম্ন বিভব (–) থেকে উচ্চ বিভবের (+) দিকে ইলেকট্রন প্রবাহ হয়।

অর্থাৎ, প্রচলিত তড়িৎ প্রবাহের দিক এবং ইলেকট্রনের প্রকৃত গতির দিক পরস্পর বিপরীত।


◼ পৃথিবীর বিভব:


তড়িৎবিজ্ঞানে পৃথিবীকে একটি আদর্শ রেফারেন্স বিভব হিসেবে ধরা হয়।

কারণ, পৃথিবী নিজেই হল একটি বিশাল পরিবাহী। পৃথিবীতে অল্প পরিমাণ আধান যোগ বা বিয়োগ করলে এর মোট বিভবের কোনো উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন হয় না। এই কারণে পৃথিবীর তড়িৎ বিভবকে শূন্য (০ ভোল্ট) ধরা হয়।


◼ আর্থিং:


কোনো বৈদ্যুতিক যন্ত্রের ধাতব আবরণকে কোনো পরিবাহীর মাধ্যমে পৃথিবী বা মাটির সঙ্গে যুক্ত করার প্রক্রিয়াকে আর্থিং বলা হয়।

আর্থিংয়ের মাধ্যমে অতিরিক্ত বা লিকেজ তড়িৎ নিরাপদে মাটিতে প্রবাহিত হয়ে যায়। ফলে বৈদ্যুতিক শক, শর্ট সার্কিট এবং অগ্নিকাণ্ডের ঝুঁকি অনেকাংশে কমে যায়। তাই বাড়ি, অফিস, শিল্পকারখানা ও অন্যান্য বৈদ্যুতিক স্থাপনায় আর্থিং একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তা ব্যবস্থা।


ওহমের সূত্র


ওহমের সূত্র প্রবাহী তড়িতের অন্যতম মৌলিক ও গুরুত্বপূর্ণ সূত্র। 1827 সালে জার্মান পদার্থবিজ্ঞানী জর্জ সাইমন ওহম পরীক্ষার মাধ্যমে প্রমাণ করেন যে, নির্দিষ্ট শর্তে কোনো পরিবাহীর দুই প্রান্তের বিভব প্রভেদ এবং তার মধ্য দিয়ে প্রবাহিত তড়িৎ প্রবাহমাত্রার মধ্যে একটি সরল গাণিতিক সম্পর্ক বিদ্যমান। এই সম্পর্কই ওহমের সূত্র নামে পরিচিত।

নিচে ওহমের সূত্রের বিবৃতি, গাণিতিক রূপ ও সীমাবদ্ধতা বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:


◼ ওহমের সূত্রের বিবৃতি:


​● সূত্র: উষ্ণতা এবং অন্যান্য ভৌত অবস্থা অপরিবর্তিত থাকলে, পরিবাহীর দুই প্রান্তের বিভব প্রভেদ ঐ পরিবাহীর মধ্য দিয়ে প্রবাহিত তড়িৎ প্রবাহমাত্রার সমানুপাতিক হয়।


অর্থাৎ, $V \propto I$


সহজ ভাষায়, কোনো পরিবাহীর রোধ অপরিবর্তিত থাকলে বিভব প্রভেদ যত বাড়ানো হবে, পরিবাহীর মধ্য দিয়ে তত বেশি তড়িৎ প্রবাহিত হবে।


◼ গাণিতিক ব্যাখ্যা:


ধরা যাক, একটি পরিবাহীর দুই প্রান্তের বিভব প্রভেদ V এবং এর মধ্য দিয়ে প্রবাহিত তড়িৎ প্রবাহমাত্রা I।

ওহমের সূত্র অনুযায়ী,

$V \propto I$

সমানুপাতিক চিহ্ন $(\propto)$ সরিয়ে দিলে একটি ধ্রুবক পাওয়া যায়:

$$V = RI$$

এখানে,

$V$ = বিভব প্রভেদ (Volt)

$I$ = তড়িৎ প্রবাহমাত্রা (Ampere)

$R$ = পরিবাহীর রোধ (Resistance)


এটিই ওহমের সূত্রের সর্বাধিক ব্যবহৃত গাণিতিক রূপ।


এই সমীকরণ থেকে কিন্তু আরও দুটি গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্ক পাওয়া যায়:

$I = \frac{V}{R}$ এবং $R = \frac{V}{I}$


◼ ওহমের সূত্রের গুরুত্ব:


ওহমের সূত্রের সাহায্যে খুব সহজেই বর্তনীর বিভব প্রভেদ, প্রবাহমাত্রা বা রোধের মধ্যে যেকোনো একটি রাশি জানা থাকলে বাকি দুটি রাশি নির্ণয় করা যায়।


ওহমের সূত্রের মাধ্যমে,

  • বৈদ্যুতিক বর্তনী বিশ্লেষণ করা যায়।
  • বিভিন্ন বৈদ্যুতিক যন্ত্রের রোধ নির্ণয় করা যায়।
  • তড়িৎ প্রবাহ ও বিভব প্রভেদ গণনা করা যায়।


◼ ওহমের সূত্রের সীমাবদ্ধতা:


ওহমের সূত্র সব ধরনের পরিবাহী বা সব পরিস্থিতিতে প্রযোজ্য নয়। এই সূত্র কেবল নির্দিষ্ট শর্তে কাজ করে। শর্ত গুলি হল:


(i) উষ্ণতা স্থির থাকতে হবে: তড়িৎ প্রবাহের ফলে পরিবাহী অতিরিক্ত উত্তপ্ত হলে তার রোধ পরিবর্তিত হয়। তখন বিভব প্রভেদ ও প্রবাহমাত্রার মধ্যে আর সরল সমানুপাতিক সম্পর্ক বজায় থাকে না।


(ii) ভৌত অবস্থা অপরিবর্তিত থাকতে হবে: পরিবাহকের দৈর্ঘ্য, প্রস্থচ্ছেদের ক্ষেত্রফল, উপাদান বা অন্যান্য ভৌত বৈশিষ্ট্য পরিবর্তিত হলে রোধও পরিবর্তিত হয়। ফলে একই অবস্থার ওহমের সূত্র আর প্রযোজ্য থাকে না।


(iii) অ-ওহমিক পদার্থের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়: ডায়োড, ট্রানজিস্টর, থার্মিস্টর, LED, ফিলামেন্ট ল্যাম্প, ইলেক্ট্রোলাইটিক দ্রবণ ইত্যাদি উপাদানে বিভব প্রভেদ ও তড়িৎ প্রবাহমাত্রার মধ্যে সরল সমানুপাতিক সম্পর্ক থাকে না। তাই এদের ক্ষেত্রে ওহমের সূত্র সরাসরি প্রযোজ্য নয়।


পরিবাহীর রোধ


পরিবাহীর রোধ হলো এমন একটি ভৌত ধর্ম, যা তড়িৎ প্রবাহে বাধা সৃষ্টি করে। অর্থাৎ, কোনো পরিবাহীর মধ্য দিয়ে তড়িৎ প্রবাহিত হওয়ার সময় পরিবাহী যত বেশি বাধা সৃষ্টি করে, তার রোধ তত বেশি হয়।


◼ রোধ সৃষ্টির কারণ:


সাধারণত ধাতব পরিবাহী গুলির মধ্যে অসংখ্য মুক্ত ইলেকট্রন থাকে। বিভব প্রভেদ প্রয়োগ করলে এই ইলেকট্রনগুলো একটি নির্দিষ্ট দিকে চলতে শুরু করে। এর ফলেই তড়িৎ প্রবাহ সৃষ্টি হয়।


কিন্তু ইলেকট্রনগুলো সরলরেখায় বাধাহীনভাবে চলতে পারে না। চলার পথে তারা পরিবাহীর পরমাণু, ধনাত্মক আয়ন এবং তাদের কম্পনের সঙ্গে বারবার সংঘর্ষে লিপ্ত হয়। এই সংঘর্ষের ফলে ইলেকট্রনের গতি বাধাগ্রস্ত হয় এবং তড়িৎ প্রবাহ কমে যায়। পরিবাহীর এই বাধা প্রদানকারী ধর্মকেই রোধ বলা হয়।


​● সংজ্ঞা: কোনো পরিবাহীর দুই প্রান্তের বিভব প্রভেদ (V) এবং তার মধ্য দিয়ে প্রবাহিত তড়িৎ প্রবাহমাত্রার (I) অনুপাতকে ওই পরিবাহীর রোধ বলা হয়।


◼ রোধের গাণিতিক রূপ:


ওহমের সূত্র অনুযায়ী,

$V = IR$

অতএব বলা যায়,

$$R = \frac{V}{I}$$

এখানে,

$R$ = রোধ (Resistance)

$V$ = বিভব প্রভেদ (Volt)

$I$ = তড়িৎ প্রবাহমাত্রা (Ampere)


◼ রোধের একক:


রোধের আন্তর্জাতিক বা SI একক হলো ওহম (Ohm)। এর এর প্রতীক হল Ω (ওমেগা)


কোনো পরিবাহীর দুই প্রান্তে 1 ভোল্ট বিভব প্রভেদ প্রয়োগ করলে যদি তার মধ্য দিয়ে 1 অ্যাম্পিয়ার তড়িৎ প্রবাহিত হয়, তবে সেই পরিবাহীর রোধকে 1 ওহম (1 Ω) বলা হয়।


অর্থাৎ,

$1\,\Omega = \frac{1\,V}{1\,A}$


◼ পরিবাহীর রোধ কোন কোন বিষয়ের উপর নির্ভর করে?


নির্দিষ্ট উষ্ণতায় কোনো পরিবাহীর রোধ প্রধানত নিম্নলিখিত বিষয়গুলোর উপর নির্ভর করে:


(i) পরিবাহীর দৈর্ঘ্য (L): পরিবাহী যত লম্বা হবে, ইলেকট্রনকে তত বেশি দূরত্ব অতিক্রম করতে হবে এবং তত বেশি সংঘর্ষের সম্মুখীন হতে হবে। ফলে রোধ বৃদ্ধি পাবে।

অর্থাৎ, $R \propto L$

এখানে, $L$ = পরিবাহকের দৈর্ঘ্য


(ii) পরিবাহীর প্রস্থচ্ছেদের ক্ষেত্রফল: পরিবাহী যত মোটা হবে, ইলেকট্রনের চলাচলের জন্য তত বেশি পথ থাকবে। ফলে সংঘর্ষের সম্ভাবনা কমবে এবং রোধও কমে যাবে।

অর্থাৎ, $R \propto \frac{1}{A}$

এখানে, $A$ = প্রস্থচ্ছেদের ক্ষেত্রফল


(iii) পরিবাহীর উপাদান: সব পদার্থের পরমাণবিক গঠন এক নয়। তাই বিভিন্ন পদার্থে ইলেকট্রনের চলাচলে বাধার পরিমাণও ভিন্ন হয়।


উদাহরণস্বরূপ, রূপোর রোধ খুব কম, তামা রোধ কম, অ্যালুমিনিয়ামের রোধ মাঝারি এবং নাইক্রোমের রোধ অপেক্ষাকৃত বেশি।


এই কারণেই বৈদ্যুতিক তার তৈরিতে সাধারণত তামা বা অ্যালুমিনিয়াম ব্যবহার করা হয় আর বৈদ্যুতিক হিটারের কুণ্ডলী তৈরিতে নাইক্রোম ব্যবহার করা হয়।


◼ রোধাঙ্ক:


কোনো পদার্থের একক দৈর্ঘ্য এবং একক প্রস্থচ্ছেদের ক্ষেত্রফলবিশিষ্ট পরিবাহকের রোধকে ওই পদার্থের রোধাঙ্ক বলা হয়।


দৈর্ঘ্য ও প্রস্থচ্ছেদের উপর রোধের নির্ভরতা একত্র করলে আমরা পাই,

$R = \frac{\rho L}{A}$


এখানে,

R = রোধ

$\rho$ (রো) = রোধাঙ্ক (Resistivity)

L = পরিবাহকের দৈর্ঘ্য

A = প্রস্থচ্ছেদের ক্ষেত্রফল


রোধাঙ্কের SI একক হল ওহম-মিটার (Ω·m)


◼ রোধের উপর উষ্ণতার প্রভাব:


উষ্ণতা পরিবর্তনের ফলে পরিবাহীর রোধও নিম্নলিখিত ভাবে পরিবর্তিত হয়:


(i) ধাতব পরিবাহীর ক্ষেত্রে: উষ্ণতা বাড়লে ধাতুর পরমাণুগুলোর কম্পন বৃদ্ধি পায়। ফলে ইলেকট্রনের সঙ্গে সংঘর্ষের সংখ্যা বেড়ে যায় এবং রোধ বৃদ্ধি পায়।

অর্থাৎ, উষ্ণতা বৃদ্ধির ফলে রোধ বৃদ্ধি।


(ii) অর্ধপরিবাহীর ক্ষেত্রে: সিলিকন, জার্মেনিয়াম ইত্যাদি অর্ধপরিবাহী পদার্থের ক্ষেত্রে উষ্ণতা বাড়লে আরও বেশি সংখ্যক মুক্ত আধান সৃষ্টি হয়। ফলে এদের তড়িৎ পরিবাহিতা বৃদ্ধি পায় এবং রোধ হ্রাস পায়।

অর্থাৎ, উষ্ণতা বৃদ্ধির ফলে রোধ হ্রাস।


রোধের সমবায়


তড়িৎ বর্তনীতে প্রয়োজন অনুযায়ী দুই বা ততোধিক রোধ একসঙ্গে যুক্ত করা হলে তাকে রোধের সমবায় বলা হয়।


একাধিক রোধকে একত্রে যুক্ত করার ফলে পুরো সমবায়ের পরিবর্তে যদি এমন একটি মাত্র রোধ ব্যবহার করা যায়, যা একই বিভব প্রভেদে সমপরিমাণ তড়িৎ প্রবাহ সৃষ্টি করে, তবে সেই রোধকে তুল্য রোধ বলা হয়।


রোধের সমবায় প্রধানত দুই প্রকার, যথা: 1) শ্রেণি সমবায় (Series Combination) এবং 2) সমান্তরাল সমবায় (Parallel Combination)


নিচে উভয় প্রকার সমবায় বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:


1) শ্রেণি সমবায়:


শ্রেণি সমবায়

যখন একাধিক রোধকে একটির পর একটি এমনভাবে যুক্ত করা হয় যে তড়িৎ প্রবাহের জন্য একটিমাত্র পথ থাকে, তখন তাকে শ্রেণি সমবায় বলে।

এই ধরনের বর্তনীতে তড়িৎ প্রবাহ প্রতিটি রোধের মধ্য দিয়েই একই পথে প্রবাহিত হয়।


● বৈশিষ্ট্য:

  • সমবায়ের প্রতিটি রোধের মধ্য দিয়ে একই তড়িৎ প্রবাহ (I) প্রবাহিত হয়।
  • প্রতিটি রোধের দুই প্রান্তের বিভব প্রভেদ ভিন্ন হতে পারে।
  • মোট বিভব প্রভেদ প্রতিটি রোধের বিভব প্রভেদের যোগফলের সমান হয়। অর্থাৎ, V = V₁ + V₂ + V₃ + ...


● তুল্য রোধের সমীকরণ:


ওহমের সূত্র অনুযায়ী,

V = IR


যেহেতু,

V = V₁ + V₂ + V₃


এবং,

V₁ = IR₁, V₂ = IR₂, V₃ = IR₃


তাই,

IRₛ = IR₁ + IR₂ + IR₃


উভয় পাশে I দ্বারা ভাগ করলে পাই,

$$R_s = R_1 + R_2 + R_3 +...$$


এটাই শ্রেণি সমবায়ের তুল্য রোধের সূত্র।


● শ্রেণি সমবায়ের তাৎপর্য:

  • তুল্য রোধ সবসময় সমবায়ে যুক্ত প্রতিটি পৃথক রোধের চেয়ে বেশি হয়।
  • একটি রোধ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলে পুরো বর্তনীতে তড়িৎ প্রবাহ বন্ধ হয়ে যায়।
  • একই তড়িৎ প্রবাহ সব রোধের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়।


2) সমান্তরাল সমবায়:


সমান্তরাল সমবায়

যখন একাধিক রোধের এক প্রান্ত একটি সাধারণ বিন্দুতে এবং অন্য প্রান্ত আরেকটি সাধারণ বিন্দুতে যুক্ত থাকে, ফলে প্রতিটি রোধের দুই প্রান্তে সমান বিভব প্রভেদ থাকে, তখন তাকে সমান্তরাল সমবায় বলা হয়।

এই ধরনের বর্তনীতে তড়িৎ প্রবাহের জন্য একাধিক পথ তৈরি হয়।


● বৈশিষ্ট্য:

  • প্রতিটি রোধের দুই প্রান্তে একই বিভব প্রভেদ (V) থাকে।
  • প্রতিটি রোধের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত তড়িৎ প্রবাহের মান রোধের উপর নির্ভর করে ভিন্ন হতে পারে।
  • মোট তড়িৎ প্রবাহ পৃথক শাখাগুলোর প্রবাহের যোগফলের সমান।

অর্থাৎ,

I = I₁ + I₂ + I₃ + ...


● তুল্য রোধের সমীকরণ:


ওহমের সূত্র অনুযায়ী,

$I = \frac{V}{R}$


সুতরাং,

$\frac{V}{R_p} = \frac{V}{R_1} + \frac{V}{R_2} + \frac{V}{R_3}$


উভয় পাশে V দ্বারা ভাগ করলে পাই,

$$\frac{1}{R_p} = \frac{1}{R_1} + \frac{1}{R_2} + \frac{1}{R_3} + \dots$$

এটাই সমান্তরাল সমবায়ের তুল্য রোধের সূত্র।


● সমান্তরাল সমবায়ের তাৎপর্য:

  • প্রতিটি রোধের দুই প্রান্তে একই বিভব প্রভেদ থাকে।
  • কোনো একটি শাখা বিচ্ছিন্ন হলেও অন্য শাখাগুলো দিয়ে তড়িৎ প্রবাহ চলতে থাকে।
  • তুল্য রোধের মান সবসময় সমবায়ে যুক্ত ক্ষুদ্রতম রোধের চেয়েও কম হয়।

Post a Comment

0 Comments