Ticker

6/recent/ticker-posts

ভারতের মৃত্তিকা মানচিত্র সহ বর্ণনা

বিশাল ভৌগোলিক বৈচিত্র্যের কারণে ভারতের মাটির গঠন ও প্রকৃতিতে রয়েছে বিশাল তারতম্য। কৃষিকাজ থেকে শুরু করে দেশের অর্থনীতি সবকিছুই মাটির উর্বরতার ওপর অনেকাংশে নির্ভরশীল। ইন্ডিয়ান কাউন্সিল অফ এগ্রিকালচারাল রিসার্চ (ICAR) ভারতের মৃত্তিকাকে প্রধানত আটটি ভাগে ভাগ করেছে। এই আট ভাগের মৃত্তিকাগুলি নিচে বিস্তারিত ভাবে আলোচনা করা হলো:


ভারতের মৃত্তিকা মানচিত্র


1. পলল বা পলি মৃত্তিকা


ভারতের কৃষিব্যবস্থার মূল ভিত্তি হলো পলল বা পলি মৃত্তিকা। এটি হল ভারতের সবচেয়ে উর্বর। এই মৃত্তিকা হল ভারতের সর্বাধিক অঞ্চল জুড়ে বিস্তৃত মৃত্তিকা। ভারতের মোট কৃষি উৎপাদনের একটি বড় অংশ এই মৃত্তিকা দ্বারা গঠিত। নিচে এই মাটির উৎপত্তি, বৈশিষ্ট্য, শ্রেণিবিভাগ এবং ভারতের অর্থনীতিতে এর গুরুত্ব সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:


​◼ ভৌগোলিক বিস্তার

​ভারতের মোট ভূখণ্ডের প্রায় ৪৩.৭% এলাকা অর্থাৎ প্রায় ১৫ লক্ষ বর্গ কিমি এই পলি মাটি দ্বারা গঠিত।

● প্রধান অঞ্চল: সমগ্র উত্তর ভারতের সমভূমি অঞ্চল অর্থাৎ পাঞ্জাব, হরিয়ানা, উত্তরপ্রদেশ, বিহার, পশ্চিমবঙ্গ এবং আসামের ব্রহ্মপুত্র উপত্যকার বিস্তীর্ণ অঞ্চলে এই মৃত্তিকা দেখতে পাওয়া যায়।

● ​অন্যান্য অঞ্চল: এছাড়া দক্ষিণ ভারতের মহানদী, গোদাবরী, কৃষ্ণা ও কাবেরী নদীর বদ্বীপ অঞ্চল এবং গুজরাটের কিছু অংশে এই মৃত্তিকা দেখা যায়।


​◼ উৎপত্তি ও গঠন

● উৎপত্তি: ​হিমালয় এবং দাক্ষিণাত্যের মালভূমি থেকে উৎপন্ন নদীগুলো অর্থাৎ, গঙ্গা, সিন্ধু, ব্রহ্মপুত্র এবং তাদের উপনদীসমূহ লক্ষ লক্ষ বছর ধরে পলি, বালি ও কাদা বয়ে এনে নদীর দুই কূলে এবং বদ্বীপ অঞ্চলে জমা করে এই মৃত্তিকার সৃষ্টি করেছে।

রাসায়নিক উপাদান: এই মাটিতে পটাশ, ফসফরিক অ্যাসিড এবং চুন প্রচুর পরিমাণে উপস্থিত থাকে।

অভাব: এই মাটিতে নাইট্রোজেন, ফসফরাস এবং জৈব পদার্থ বা হিউমাসের পরিমাণে যথেষ্ট ঘাটতি রয়েছে। তবে এগুলি কম থাকলেও মাটির সূক্ষ্ম কণার জন্য এই মাটি যথেষ্ট উর্বর।


​◼ পলি মাটির শ্রেণিবিভাগ

​বয়স ও মাটির কণার আকার অনুযায়ী ভারতের পলি মাটিকে বেশ কয়েকটি ভাগে ভাগ করা হয়। ভাগ গুলি নিচে আলোচনা করা হল:


i) বয়স অনুসারে শ্রেণীবিভাগ:

​নদীর গতিপথ এবং প্রাচীনতার ওপর ভিত্তি করে সমভূমির পলি মাটিকে দুভাগে ভাগ করা যায়। এগুলি হল:

  • খাদার: এটি হল নদীর অববাহিকায় অবস্থিত নতুন পলি মাটি। প্রতি বছর বন্যার সময় নদী অববাহিকায় নতুন পলি জমা হয়ে এই মাটি গঠিত হয়। এই মাটির রঙ হালকা এবং এটিতে বালির ভাগ যথেষ্ট বেশি। কৃষিকাজের জন্য এই মাটি অত্যন্ত উর্বর।
  • ​ভাঙর: এটি নদী উপত্যকা থেকে দূরবর্তী অঞ্চলে অবস্থিত প্রাচীন পলি মাটি। বন্যাসীমার ওপরে থাকায় এখানে সাধারণত নতুন পলি জমে না। এই মাটি কিছুটা গাঢ় রঙের এবং এটিতে কাদার ভাগ বেশি। এই মাটি কৃষিকাজের ক্ষেত্রে খাদারের চেয়ে অপেক্ষাকৃত কম উর্বর। এই ভাঙর মাটিতে অনেক সময় চুন জাতীয় নুড়ি বা কাঁকর দেখা যায়, যা স্থানীয় ভাষায় 'কনকর' নামে পরিচিত।


ii) আঞ্চলিক বা কণার আকার অনুসারে:

​হিমালয়ের পাদদেশ থেকে দক্ষিণের সমভূমির দিকে মাটির কণার আকার বদলে যায়। সেই অনুযায়ী একে চার ভাগে ভাগ করা হয়:

  • ​ভাভর: হিমালয়ের পাদদেশে নুড়ি, পাথর জমে এই অঞ্চলের সৃষ্টি হয়। মাটির কণাগুলি অপেক্ষাকৃত বড় হওয়ায় এখানে নদীগুলো মাটির নিচে অদৃশ্য হয়ে যায়। এই অঞ্চলের মাটি চাষের অনুপযুক্ত।
  • ​তরাই: এটি হল ভাভরের দক্ষিণে অবস্থিত স্যাঁতসেঁতে, জলাভূমি ও জঙ্গল ঘেরা অঞ্চল। এখানে মাটির কণা যথেষ্ট সূক্ষ্ম এবং এর জল ধারণ ক্ষমতা বেশি। বর্তমানে এই অঞ্চলে জঙ্গল পরিষ্কার করে চাষবাস হচ্ছে।
  • ​ভুর: গাঙ্গেয় সমভূমি অঞ্চলে উচ্চভূমির কিছু অংশে বায়ুপ্রবাহের মাধ্যমে বালির স্তূপ জমা হয়ে যে মাটির সৃষ্টি হয়, তাকে ভুর বলে। বালির পরিমাণ বেশি হওয়ায় এই মাটির উর্বরতা তুলনামূলক কম।


​◼ উৎপাদিত ফসল

​অত্যধিক উর্বরতা এবং জলের সহজলভ্যতার কারণে এই পলি মৃত্তিকাকে ভারতের কৃষির প্রাণকেন্দ্রও বলা যায়। এই মাটিতে উৎপাদিত ফসল গুলি হল:

প্রধান খাদ্যশস্য: ধান, গম, ভুট্টা, বার্লি ইত্যাদি।

​● অর্থকরী ফসল: পাট, আখ এবং তুলা।

অন্যান্য ফসল: মুগ, মসুর, ছোলা, সর্ষে, তিল এবং নানা রকমের শাকসবজি ও ফল।


2. কৃষ্ণ মৃত্তিকা


ভারতের দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ এবং অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধ মৃত্তিকা হলো কৃষ্ণ মৃত্তিকা বা কালো মাটি। এটি প্রধানত দাক্ষিণাত্য মালভূমির লাভা গঠিত অঞ্চলে দেখতে পাওয়া যায় বলে একে লাভা মৃত্তিকাও বলা হয়। আন্তর্জাতিকভাবে এই মাটিকে চেরনোজেম মাটির সমতুল্য বলে বিবেচনা করা হয়।


​নিচে কৃষ্ণ মৃত্তিকার উৎপত্তি, বৈশিষ্ট্য, বিস্তার এবং কৃষিকাজে এর গুরুত্ব সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:


​◼ ভৌগোলিক বিস্তার

​ভারতের মোট ভূখণ্ডের প্রায় ১৬.৬% এলাকা অর্থাৎ প্রায় ৫.৪৬ লক্ষ বর্গ কিমি অঞ্চলে এই কৃষ্ণ মৃত্তিকা দেখতে পাওয়া যায়।

প্রধান অঞ্চল: ডেকান ট্র্যাপ বা দাক্ষিণাত্যের মালভূমি অঞ্চল হল  এই মৃত্তিকার মূল কেন্দ্র। রাজ্য হিসেবে মহারাষ্ট্র, গুজরাট ও মধ্যপ্রদেশের একটা বড় অংশ এই মাটিতে গঠিত।

​● অন্যান্য অঞ্চল: কর্ণাটক, অন্ধ্রপ্রদেশ, তেলঙ্গানা এবং তামিলনাড়ুর কিছু অংশে এই মৃত্তিকা দেখা যায়। এছাড়া উত্তরপ্রদেশের বুন্দেলখন্ড অঞ্চলেও অল্প বিস্তর এই মাটি দেখা যায়।


​◼ কৃষ্ণ মৃত্তিকার উৎপত্তি ও গঠন

​● উৎপত্তি: ​আজ থেকে প্রায় কোটি কোটি বছর আগে ক্রিটেসিয়াস যুগে ভূগর্ভের ম্যাগমা লাভা রূপে ভূপৃষ্ঠের ফাটল দিয়ে বাইরে বেরিয়ে এসে দাক্ষিণাত্য মালভূমির সৃষ্টি করে। লাভা জমাট বেঁধে তৈরি এই ব্যাসল্ট শিলা দীর্ঘদিন ধরে আবহবিকারের ফলে চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে এই কৃষ্ণ মৃত্তিকা বা কালো মাটির রূপ নিয়েছে।

​● কালো রঙের কারণ: এই মাটিতে টাইটানিফেরাস ম্যাগনেটাইট  নামক লোহার যৌগ এবং হিউমাসের উপস্থিতির কারণে এই মাটির রঙ গাঢ় কালো হয়।

​● ​রাসায়নিক উপাদান: এই মাটিতে চুন, ম্যাগনেসিয়াম, কার্বনেট, অ্যালুমিনা, পটাশ এবং লোহা প্রচুর পরিমাণে উপস্থিত রয়েছে।

​● অভাব: পলি মাটির মতোই এই মাটিতেও নাইট্রোজেন, ফসফরাস এবং জৈব পদার্থের যথেষ্ট ঘাটতি রয়েছে।


​◼ বৈশিষ্ট্য

​কৃষ্ণ মৃত্তিকার কিছু বিশেষ ভৌত বৈশিষ্ট্য রয়েছে যা একে অন্য সব মাটির থেকে আলাদা করে। এগুলি হল:

​● উচ্চ জল ধারণ ক্ষমতা: এই মাটিতে সূক্ষ্ম কাদা কণার পরিমাণ বেশি থাকায় এর জলধারণ ক্ষমতা অত্যন্ত বেশি। ফলে কম বৃষ্টিপাত হলেও দীর্ঘ সময় মাটিতে আর্দ্রতা বজায় থাকে।

​● সংকোচন ধর্ম: গ্রীষ্মকালে বা শুষ্ক ঋতুতে এই মাটির জল শুকিয়ে গেলে এটি প্রচণ্ড সংকুচিত হয়ে যায় এবং মাটিতে বড় বড় ও গভীর ফাটল দেখা দেয়। এই ফাটলগুলোর ফলে মাটির ভেতরে সহজে বাতাস চলাচল করতে পারে। এই জন্য এই মাটিকে প্রকৃতির স্বভাব-লাঙল বা Self-ploughing মাটি বলা হয়।


​◼ উৎপাদিত ফসল

​কৃষ্ণ মৃত্তিকা ভারতের অন্যতম প্রধান অর্থকরী ফসল উৎপাদনের কেন্দ্র। উর্বরতা বেশি হওয়ায় অল্প সার প্রয়োগেই এখানে প্রচুর ফসল উৎপাদিত হয়।

​● প্রধান ফসল: কৃষ্ণ মৃত্তিকার প্রধান উৎপাদিত ফসল হলো কার্পাস বা তুলা। এই মাটি তুলা চাষের জন্য ভারতের শ্রেষ্ঠ মৃত্তিকা। এই জন্য আন্তর্জাতিক স্তরে এটিকে 'কালো কার্পাস মৃত্তিকা' বা স্থানীয়ভাবে 'রেগুর' বলা হয়।

​● অন্যান্য অর্থকরী ফসল: তামাক, আখ, সূর্যমুখী, চীনাবাদাম, রেড়ী বা ক্যাস্টর ইত্যাদি ফসলের চাষ এই মাটিতে হয়ে থাকে।

​● খাদ্যশস্য ও ফলমূল: এছাড়া জোয়ার, বাজরা, গম, কমলালেবু ইত্যাদি এই মাটিতে প্রচুর পরিমাণে উৎপাদিত হয়।


3. লাল ও হলুদ মৃত্তিকা


বিস্তৃতির দিক থেকে ভারতের দ্বিতীয় বৃহত্তম মৃত্তিকা হলো লাল ও হলুদ মৃত্তিকা। উপদ্বীপীয় ভারতের এক বিশাল অংশ জুড়ে এই মৃত্তিকা দেখা যায়। নিচে এই মাটির উৎপত্তি, বৈশিষ্ট্য, বিস্তার এবং কৃষিকাজে এর ভূমিকা সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:


​◼ ভৌগোলিক বিস্তার

​ভারতের মোট ভূখণ্ডের প্রায় ১৮.৬% এলাকা অর্থাৎ প্রায় ৫.৯ লক্ষ বর্গ কিমি অঞ্চল জুড়ে এই লাল ও হলুদ মৃত্তিকা রয়েছে। এটি মূলত দাক্ষিণাত্যের মালভূমির কম বৃষ্টিপাত যুক্ত অঞ্চলগুলোকে বেষ্টন করে আছে।

​● প্রধান অঞ্চল: সমগ্র তামিলনাড়ু, কর্ণাটক, অন্ধ্রপ্রদেশ ও তেলঙ্গানা রাজ্যের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে এই মৃত্তিকা দেখা যায়। এছাড়া ওড়িশা, ছত্তিশগড় এবং ঝাড়খণ্ডের ছোটনাগপুর মালভূমি অঞ্চলেও এই মাটি দেখা যায়।

​● অন্যান্য অঞ্চল: উত্তর-পূর্ব ভারতের মিজোরাম, নাগাল্যান্ড এবং উত্তরপ্রদেশের বুন্দেলখণ্ডের কিছু অংশে এই মাটির উপস্থিতি রয়েছে।


​◼ উৎপত্তি ও গঠন

উৎপত্তি: রূপান্তরিত শিলা গ্রানাইট ও নিস দীর্ঘদিন ধরে শুষ্ক ও আর্দ্র জলবায়ুর পরিবর্তনের ফলে ক্ষয়প্রাপ্ত বা আবহবিকারগ্রস্ত হয়ে এই মাটির সৃষ্টি করেছে।

​● লাল রঙের কারণ: এই মাটিতে প্রচুর পরিমাণে ফেলস্পার এবং আয়রন অক্সাইড ছড়িয়ে রয়েছে। অতিরিক্ত লোহার উপস্থিতির কারণেই সাধারণ অবস্থায় এই মাটির রঙ গাঢ় লাল বা লালচে বাদামী হয়।

​● হলুদ রঙের কারণ: এই লাল মাটিই যখন জল শোষণ করে বা আর্দ্র অবস্থায় থাকে, তখন রাসায়নিক পরিবর্তনের কারণে এর রঙ হলুদ দেখায়।

​● রাসায়নিক উপাদান: এই মাটিতে লোহা, অ্যালুমিনিয়াম এবং সিলিকার প্রচুর পরিমাণে উপস্থিত থাকে।

​● অভাব: ভারতের অন্যান্য মাটির মতোই এতে নাইট্রোজেন, ফসফরাস, চুন এবং হিউমাসের চরম অভাব থাকে।


​◼ বৈশিষ্ট্য

​লাল ও হলুদ মৃত্তিকার গঠন ও জল ধারণ ক্ষমতার কিছু বিশেষ দিক রয়েছে:

​● লঘু প্রকৃতি: এই মাটি সাধারণত বেলে থেকে দোআঁশ প্রকৃতির হয়। মাটির কণাগুলো কিছুটা বড় বা স্থূল হওয়ায় এর জল ধারণ ক্ষমতা অত্যন্ত কম।

​● অনুর্বরতা: হিউমাস এবং পুষ্টির অভাবে এই মাটি প্রাকৃতিকভাবে খুব একটা উর্বর নয়। তবে সঠিক পদ্ধতিতে সার ও সেচের ব্যবহার করলে এই মাটিকে বেশ উৎপাদনশীল করে তোলা যায়।


​◼ উৎপাদিত ফসল

​প্রাকৃতিকভাবে কম উর্বর হলেও আধুনিক কৃষি প্রযুক্তি এবং সঠিক জলসেচের মাধ্যমে এই মাটিতে এখন অনেক ফসলের চাষ সম্ভব হচ্ছে। এই মাটিতে উৎপাদিত ফসল গুলি হল:

​● ​মিলেট বা মোটা দানা শস্য: জল ধারণ ক্ষমতা কম হওয়ায় এই মাটিতে জোয়ার, বাজরা, রাগী ইত্যাদি ফসলের চাষ বেশি হয়।

​● তৈলবীজ ও ডাল: চীনাবাদাম, তিল, সর্ষে, অড়হর, মুগ ইত্যাদি ফসলের চাষও এই মাটিতে খুব ভালো হয়।

​● অন্যান্য ফসল: অন্ধ্রপ্রদেশ ও তামিলনাড়ুর কিছু অঞ্চলে পর্যাপ্ত সার ও সেচ ব্যবস্থার মাধ্যমে এই মাটিতে তামাক, ধান, আখ এবং তুলা চাষ করা হচ্ছে।


4. ল্যাটেরাইট মৃত্তিকা


ভারতের ক্রান্তীয় মৌসুমি জলবায়ু অঞ্চলের একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্যপূর্ণ মৃত্তিকা হলো ল্যাটেরাইট মৃত্তিকা। অধিক বৃষ্টিপাত এবং উচ্চ তাপমাত্রা যুক্ত অঞ্চলে এক বিশেষ রাসায়নিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে এই মাটির সৃষ্টি হয়েছে।

​নিচে ল্যাটেরাইট মৃত্তিকার উৎপত্তি, বৈশিষ্ট্য, বন্টন এবং কৃষিকাজে এর ভূমিকা সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:


​◼ ভৌগোলিক বিস্তার

​ভারতের মোট ভূখণ্ডের প্রায় ৩.৭% এলাকা অর্থাৎ প্রায় ২.৪৮ লক্ষ বর্গ কিমি অঞ্চল জুড়ে রয়েছে এই ল্যাটেরাইট মৃত্তিকা। এটি মূলত পাহাড়ি এবং মালভূমি অঞ্চলের উচ্চ ঢালে দেখা যায়।

​● প্রধান অঞ্চল: কেরালা, কর্ণাটক, তামিলনাড়ু এবং উত্তর-পূর্ব ভারতের মেঘালয় মালভূমি অর্থাৎ গারো, খাসি ও জয়ন্তীয়া পাহাড় সংলগ্ন এলাকায় এই মৃত্তিকা দেখতে পাওয়া যায়।

​● অন্যান্য অঞ্চল: এছাড়াও ওড়িশা, ঝাড়খণ্ড এবং পশ্চিমবঙ্গের বীরভূম, বাঁকুড়া, পুরুলিয়া ও পশ্চিম মেদিনীপুর জেলায় এই মৃত্তিকা দেখতে পাওয়া যায়।


​◼ উৎপত্তি ও গঠন

​'ল্যাটেরাইট' শব্দটি ল্যাটিন শব্দ Later থেকে এসেছে, যার অর্থ 'ইট'।

​● উৎপত্তি: যেসব অঞ্চলে বছরের একটি নির্দিষ্ট সময়ে প্রচুর বৃষ্টিপাত হয় এবং অন্য সময়ে তীব্র গরম থাকে, সেখানে এই মাটি তৈরি হয়। অতিরিক্ত বৃষ্টির ফলে মাটির ওপরের স্তর থেকে সিলিকা, চুন, পটাশ ও অন্যান্য দ্রবণীয় খনিজ পদার্থ ধুয়ে মাটির নিচের স্তরে চলে যায়। এই প্রক্রিয়াকে ক্ষালন বা Leaching বলা হয়। এর ফলে মাটির উপরের স্তরে প্রধানত লোহা ও অ্যালুমিনিয়ামের অক্সাইড সঞ্চিত হয়ে ল্যাটেরাইট মৃত্তিকা গঠিত হয়।

​● রাসায়নিক উপাদান: এই মাটির প্রধান রাসায়নিক উপাদান হল লোহা ও অ্যালুমিনিয়াম অক্সাইড।

​● অভাব: ক্ষালন প্রক্রিয়ার কারণে এই মাটিতে নাইট্রোজেন, পটাশিয়াম, ফসফরাস, চুন এবং হিউমাসের যথেষ্ট অভাব দেখা যায়।


​◼ বৈশিষ্ট্য

​ল্যাটেরাইট মৃত্তিকার গঠন ও প্রকৃতি অন্য সব মাটির থেকে সম্পূর্ণ আলাদা:

​● প্রকৃতি: এই মাটি যখন ভেজা থাকে তখন কিছুটা নরম ও চটচটে প্রকৃতির হয়ে থাকে। কিন্তু গ্রীষ্মকালে জল শুকিয়ে গেলে এটি সংকুচিত হয়ে একেবারে লাল ইটের মতো শক্ত হয়ে যায়।

​● জল ধারণ ক্ষমতা: এই মাটির কণাগুলো স্থূল ও নুড়িযুক্ত হওয়ায় এর জল ধারণ ক্ষমতা খুবই কম।


​◼ উৎপাদিত ফসল

​প্রাকৃতিকভাবে ল্যাটেরাইট মাটি অত্যন্ত অনুর্বর। তবে আধুনিক কৃষি প্রযুক্তি, রাসায়নিক সার এবং সেচ ব্যবস্থার মাধ্যমে এই মাটিতে কিছু মূল্যবান অর্থকরী ফসলের চাষ সম্ভব হচ্ছে।

​● কাজুবাদাম: ভারতের ল্যাটেরাইট মাটি কাজুবাদাম চাষের জন্য বিশেষ বিখ্যাত। বিশেষ করে কেরালা, অন্ধ্রপ্রদেশ ও তামিলনাড়ুর ল্যাটেরাইট মৃত্তিকা যুক্ত অঞ্চলে প্রচুর কাজুবাদামের চাষ হয়ে থাকে।

​● বাগিচা ফসল: কেরালা ও কর্ণাটকের পার্বত্য অঞ্চলের ঢালে এই মাটিতে চা, কফি এবং রবার চাষ করা হয় থাকে।

​● অন্যান্য ফসল: সঠিক পরিচর্যা করলে এই মাটিতে কাসাভা, সিঙ্কোনা এবং কিছু মশলার চাষও খুব ভালো হয়।


5. মরু বা শুষ্ক মৃত্তিকা


ভারতের শুষ্ক ও অর্ধ-শুষ্ক জলবায়ু অঞ্চলের এক বিশেষ প্রকৃতির মৃত্তিকা হলো মরু বা শুষ্ক মৃত্তিকা। মূলত বৃষ্টিপাতের অভাব এবং অতিরিক্ত বাষ্পীভবনের কারণে এই মাটির সৃষ্টি হয়ে থাকে। নিচে এই মাটির উৎপত্তি, বৈশিষ্ট্য, বিস্তার এবং কৃষিকাজে এর ভূমিকা সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:


​◼ ভৌগোলিক বিস্তার

​ভারতের মোট ভূখণ্ডের প্রায় ৪.৪% এলাকা অর্থাৎ প্রায় ১.৪২ লক্ষ বর্গ কিমি অঞ্চল জুড়ে রয়েছে এই মরু মৃত্তিকা।

​● প্রধান অঞ্চল: সমগ্র পশ্চিম রাজস্থানের থর মরুভূমি অঞ্চল  প্রধানত এই মৃত্তিকা দ্বারা গঠিত।

​● অন্যান্য অঞ্চল: এছাড়া উত্তর গুজরাটের কচ্ছ অঞ্চল, দক্ষিণ পাঞ্জাব এবং দক্ষিণ হরিয়ানার কিছু শুষ্ক এলাকায় এই মৃত্তিকা দেখা যায়।


​◼ উৎপত্তি ও গঠন

​● উৎপত্তি: ​তীব্র গরম এবং বছরের পর বছর বৃষ্টিপাতের অভাবে এই অঞ্চলে রাসায়নিক আবহবিকার প্রায় হয় না বললেই চলে। এখানে মূলত তাপমাত্রা ওঠানামার কারণে  যান্ত্রিক আবহবিকারের মাধ্যমে  বড় বড় শিলাখণ্ড ভেঙে চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে বালিতে পরিণত হয়। পরে শুষ্ক বায়ুর প্রভাবে এই বালি এক স্থান থেকে অন্য স্থানে সঞ্চিত হয়ে এই মৃত্তিকা গঠিত হয়।

​● ​রাসায়নিক উপাদান: এই মাটিতে দ্রবণীয় লবণ ও ফসফেটের পরিমাণ তুলনামূলকভাবে বেশি থাকে। এছাড়া মাটির নিচের স্তরে ক্যালসিয়ামের পরিমাণ বাড়তে থাকায় অনেক সময় ক্যালসিয়াম কার্বোনেট জমে শক্ত চুনাপাথরের স্তর বা কনকর তৈরি করে।

​● অভাব: গাছপালা না থাকার কারণে এই মাটিতে জৈব পদার্থ বা হিউমাস এবং নাইট্রোজেনের যথেষ্ট অভাব দেখা যায়।


​◼ বৈশিষ্ট্য

​মরুভূমি মৃত্তিকার গঠন অন্য সব মাটির চেয়ে একদম আলাদা।

​● স্থূল বা বেলে প্রকৃতি: এই মৃত্তিকা মূলত বালিপ্রধান। মাটির কণাগুলো বড় ও আলগা হওয়ায় এর সুনির্দিষ্ট গঠন তৈরি হয় না।

​● ​জল ধারণ ক্ষমতা কম: কণাগুলো বড় ও আলগা হওয়ায় এই মাটির জলধারণ ক্ষমতা একেবারেই কম। জল দিলে তা দ্রুত মাটির নিচে চলে যায়।

​● রঙ: এই মাটির রঙ সাধারণত হালকা লাল এবং বাদামী বা ধূসর-হলুদ বর্ণের হয়ে থাকে।


​◼ কৃষিকাজ ও উৎপাদিত ফসল 

​প্রাকৃতিকভাবে এই মৃত্তিকা কৃষিকাজের জন্য একেবারেই উপযুক্ত নয়। তবে সঠিক সেচব্যবস্থা থাকলে এই মাটিতেও কিছু ফসলের চাষ সম্ভব।

​● মিলেট বা প্রতিরোধী শস্য: কম জলে বেঁচে থাকতে পারে এমন কিছু মোটা দানা শস্য বা মিলেট জাতীয় উদ্ভিদের চাষ এই মাটিতে হয়ে থাকে। যেমন- বাজরা, জোয়ার ও রাগী।

​● অন্যান্য ফসল: শতদ্রু নদীর ইন্দিরা গান্ধী খালের জলের সাহায্যে বর্তমানে পশ্চিম রাজস্থানের শ্রীগঙ্গানগর ও বিকানেরের মতো মরু অঞ্চলেও গম, তুলা, বার্লি, ভুট্টা এবং ডাল চাষ করা হচ্ছে।


6. পার্বত্য বা বনভূমি মৃত্তিকা


ভারতের উঁচু পার্বত্য অঞ্চল ও অরণ্য আবৃত অঞ্চলে যে বিশেষ ধরনের মৃত্তিকা দেখা যায়, তাকে পার্বত্য বা বনভূমি মৃত্তিকা বলা হয়। উচ্চতা, জলবায়ু এবং উদ্ভিদের প্রকৃতির ওপর ভিত্তি করে এই মৃত্তিকার বৈশিষ্ট্য স্থানভেদে পরিবর্তিত হয়।

নিচে এই মৃত্তিকার উৎপত্তি, বৈশিষ্ট্য, বন্টন এবং কৃষিকাজে এর ভূমিকা সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:


​◼ ভৌগোলিক বিস্তার

​ভারতের মোট ভূখণ্ডের প্রায় ৮.৭% এলাকা অর্থাৎ প্রায় ২.৮৫ লক্ষ বর্গ কিমি অঞ্চল জুড়ে রয়েছে এই পার্বত্য মৃত্তিকা।

​● ​প্রধান অঞ্চল: সমগ্র জম্মু-কাশ্মীর, লাদাখ, হিমাচল প্রদেশ, উত্তরাখণ্ড, সিকিম এবং অরুণাচল প্রদেশের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে এই মৃত্তিকা দেখা যায়।

​● অন্যান্য অঞ্চল: এছাড়া দক্ষিণ ভারতের পশ্চিমঘাট ও পূর্বঘাট পর্বতমালার উচ্চভূমি অঞ্চল এবং উত্তর-পূর্ব ভারতের আসাম ও মেঘালয়ের পার্বত্য অঞ্চলেও এই মৃত্তিকা দেখা যায়।


​◼ উৎপত্তি ও গঠন

​● উৎপত্তি: ​পার্বত্য অঞ্চলের শীতল জলবায়ু, ঘন বনভূমি এবং পাহাড়ের ঢালের প্রভাবে এই মৃত্তিকার উৎপত্তি হয়ে থাকে। পাহাড়ের ঢালে গাছপালার পাতা, ডালপালা ও অন্যান্য জৈব পদার্থ পচে মাটির ওপরের স্তরে সঞ্চিত হয়ে এই মৃত্তিকা গঠিত হয়।

​● ​প্রধান উপাদান: বনাঞ্চলের উদ্ভিদের অবশিষ্টাংশ পচে মাটিতে মেশার কারণে এই মাটিতে হিউমাসের পরিমাণ অত্যন্ত বেশি। তবে তীব্র ঠান্ডার কারণে এই জৈব পদার্থ পুরোপুরি বিয়োজিত না হওয়ায় এই মাটি অম্লধর্মী হয়ে পড়ে।

​● ঘাটতি: এই মৃত্তিকায় চুন, ফসফরাস এবং পটাশের যথেষ্ট অভাব দেখা যায়।


​◼ বৈশিষ্ট্য

​উচ্চতা পরিবর্তনের সাথে সাথে এই মাটির ভৌত গঠনে বিশাল তারতম্য লক্ষ্য করা যায়।

​● অপরিণত মৃত্তিকা: পাহাড়ের তীব্র ঢালের কারণে মাটির ওপরের স্তর সহজে ধুয়ে নিচে নেমে যায়। ফলে এই মাটির স্তর খুব একটা গভীর হওয়ার সুযোগ পায় না। তাই এটিকে অপরিণত বা তরুণ মৃত্তিকা বলা হয়।

​● গঠনের তারতম্য: উঁচু পার্বত্য অঞ্চলে এই মৃত্তিকা সাধারণত নুড়ি, পাথর ও মোটা বালিযুক্ত হয়ে থাকে। তবে নদী উপত্যকা ও পাহাড়ের নিচের অংশে এই মাটি বেশ সূক্ষ্ম ও উর্বর প্রকৃতির হয়।


​◼ কৃষিকাজের পদ্ধতি ও উৎপাদিত ফসল

​পার্বত্য অঞ্চলের খাড়া ঢালে সাধারণ পদ্ধতিতে চাষবাস করা সম্ভব হয় না। তাই এখানে মাটির ক্ষয় রোধ করে বিশেষ পদ্ধতিতে কৃষিকাজ করা হয়।

​● ধাপ চাষ: এক্ষেত্রে পাহাড়ের ঢালে সিঁড়ির মতো ধাপ কেটে কেটে চাষের জন্য জমি তৈরি করা হয়। এতে মাটির ক্ষয় কমে এবং জলকে আটকে রাখা সহজ হয়।

​● বাগিচা ফসল: এই মৃত্তিকা অম্লধর্মী প্রকৃতির হওয়ায় এটি চা ও কফি চাষের জন্য অত্যন্ত উপযোগী। এই পার্বত্য মাটিতেই পশ্চিমবঙ্গের দার্জিলিং এবং আসামের বিখ্যাত চা চাষ হয়ে থাকে।

​● ফলমূল ও মশলা: হিমাচল প্রদেশ ও কাশ্মীরের উপত্যকা অঞ্চলের মাটিতে আপেল, নাশপাতি, আখরোট, কাঠবাদাম ইত্যাদি ফলের চাষ হয়ে থাকে। এছাড়া কেরালার পাহাড়ি অঞ্চলের মাটিতে এলাচ, গোলমরিচের মতো বিভিন্ন মূল্যবান মশলার চাষ হয়।

​● জাফরান: কাশ্মীরের ঝিলাম নদী উপত্যকায় এক বিশেষ ধরণের পার্বত্য পলি মাটি দেখা যায়। এটিকে 'কারেওয়া' বলা হয়। এই মৃত্তিকা জাফরান চাষের জন্য বিশ্ববিখ্যাত।


7. লবণাক্ত ও ক্ষারীয় মৃত্তিকা


ভারতের শুষ্ক ও অর্ধ-শুষ্ক অঞ্চল এবং অতিরিক্ত সেচপ্রাপ্ত কৃষিজমিতে যে সমস্যাযুক্ত মৃত্তিকার সৃষ্টি হয়, তাকে লবণাক্ত ও ক্ষারীয় মৃত্তিকা বলা হয়। ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে স্থানীয়ভাবে এই মাটিকে রেহ, কালার, উসার, থুর বা চোপান  ইত্যাদি নামে ডাকা হয়।

​নিচে এই মাটির উৎপত্তি, রাসায়নিক বৈশিষ্ট্য, বন্টন এবং কৃষিকাজে প্রভাব বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:


​◼ ভৌগোলিক বিস্তার

​ভারতের মোট ভূখণ্ডের প্রায় ২.১% এলাকা অর্থাৎ প্রায় ৬৮,০০০ বর্গ কিমি অঞ্চলে জুড়ে এই লবণাক্ত ও ক্ষারীয় মৃত্তিকা রয়েছে।

​● ​প্রধান অঞ্চল: পাঞ্জাব, হরিয়ানা এবং পশ্চিম উত্তরপ্রদেশের বিস্তীর্ণ কৃষিজমি অতিরিক্ত জলসেচের কারণে এই মৃত্তিকায় রূপান্তরিত হয়েছে।

​● ​উপকূলীয় অঞ্চল: এছাড়া গুজরাটের কচ্ছের রান, পশ্চিমবঙ্গের সুন্দরবন অঞ্চল ও ওড়িশার উপকূলবর্তী এলাকায় জোয়ারের নোনা জল ঢোকার কারণে এই মৃত্তিকার সৃষ্টি হয়েছে।


​◼ উৎপত্তি

​এই মাটি প্রাকৃতিকভাবে বা কিছু ভুল কৃষিপদ্ধতির কারণে এই মৃত্তিকা সৃষ্টি হতে পারে।

​● কৈশিক প্রক্রিয়া: শুষ্ক ও অর্ধ-শুষ্ক অঞ্চলে যখন খালের জল দিয়ে অতিরিক্ত জলসেচ করা হয়, তখন মাটির নিচের স্তরের জল ওপরে উঠে আসে। তীব্র গরমে সেই জল বাষ্পীভূত হয়ে গেলে জলের সাথে গুলে থাকা ক্ষতিকারক লবণগুলো মাটির ওপরের স্তরে সাদা আস্তরণ হিসেবে জমা হয়। এটিকে মৃত্তিকা বিজ্ঞানের ভাষায় 'স্যালাইন ক্রাস্ট' বলে।

​● সমুদ্রের প্রভাব: উপকূলীয় অঞ্চলে সমুদ্রের লবণাক্ত জল জমিতে প্রবেশ করলে মাটির স্বাভাবিক অম্ল-ক্ষার ভারসাম্য নষ্ট হয়ে তা লবণাক্ত হয়ে পড়ে, এবং এই মৃত্তিকা গঠন করে। 


​◼ রাসায়নিক বৈশিষ্ট্য

​● লবণের আধিক্য: এই মাটিতে সোডিয়াম, পটাসিয়াম এবং ম্যাগনেসিয়াম ক্লোরাইড ও সালফেট লবণ অত্যাধিক মাত্রায় উপস্থিত থাকে।

​● ​pH মাত্রা: সাধারণ মাটির pH মাত্রা ৬ থেকে ৭-এর মধ্যে থাকে। তবে এই ক্ষারীয় মাটির pH মাত্রা অনেকসময় ৮.৫ এর চেয়েও বেশি হয়ে যায়।

​● অভাব: এই মাটিতে নাইট্রোজেন, ক্যালসিয়াম এবং জৈব পদার্থের যথেষ্ট অভাব রয়েছে।


​◼ কৃষিকাজে প্রভাব

​প্রাকৃতিকভাবে এই মাটি সম্পূর্ণ অনুর্বর। লবণের আধিক্যের কারণে উদ্ভিদেরা শিকড়ের মাধ্যমে এই মাটি থেকে সহজে জল শোষণ করতে পারে না। এই অবস্থাকে শারীরবৃত্তীয় খরা বলা হয়। এর ফলে গাছ পুষ্টির অভাবে মারা যায়। ​তবে বর্তমানে আধুনিক প্রযুক্তির সাহায্যে এই সমস্যাযুক্ত মাটিকে আবার চাষের উপযোগী করা সম্ভব হচ্ছে।


​◼ প্রতিকার:

​● জিপসামের ব্যবহার: এই মাটির ক্ষারত্ব কমাতে এবং সোডিয়ামের প্রভাব দূর করতে জমিতে প্রচুর পরিমাণে জিপসাম প্রয়োগ করা হয়। এটি মাটির গঠনকেও উন্নত করে।

​● নিকাশী ব্যবস্থার উন্নতি: জমি থেকে নোনা জল বের করে দেওয়ার জন্য বিশেষ নিকাশী নালা তৈরি করা হয়। ও

​● লবণ-প্রতিরোধী ফসল চাষ: মাটি পুরোপুরি ঠিক না হওয়া পর্যন্ত বার্লি, ধান, তুলা, সূর্যমুখী ইত্যাদি লবণ সহ্য করতে পারে এমন ফসলের চাষ করা হয়। সুন্দরবন অঞ্চলে লবণ সহিষ্ণু বিভিন্ন জাত ধানের চাষ এর সবথেকে বড় উদাহরণ।


8. পিট ও জলাভূমি মৃত্তিকা


ভারতের অত্যন্ত আর্দ্র, জলমগ্ন এবং উপকূলবর্তী স্যাঁতসেঁতে অঞ্চলে যে বিশেষ জৈব মৃত্তিকা দেখা যায়, তাকে পিট ও জলাভূমি মৃত্তিকা বলা হয়। এটি হল ভারতের অন্যতম একটি বিশেষ  সমস্যাযুক্ত মাটি।

​নিচে এই মাটির উৎপত্তি, রাসায়নিক বৈশিষ্ট্য, বন্টন এবং কৃষিকাজে এর ভূমিকা সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:


​◼ ভৌগোলিক বিস্তার

​ভারতের মোট ভূখণ্ডের এক ক্ষুদ্র অংশ জুড়ে এই মাটি দেখা গেলেও উপকূলবর্তী অঞ্চলে এর গুরুত্ব অনেক।

​● প্রধান অঞ্চল: দক্ষিণ ভারতের কেরালার কোট্টায়াম এবং আলাপ্পুঝা জেলার বিস্তীর্ণ অঞ্চলে এই মৃত্তিকা দেখা যায়। কেরালায় এই বিশেষ মাটিকে স্থানীয় ভাষায় 'কারি' বলা হয়।

​● উপকূলীয় জলাভূমি: পশ্চিমবঙ্গের সুন্দরবনের ম্যানগ্রোভ জলাভূমি অঞ্চল, ওড়িশার উপকূলবর্তী এলাকা এবং তামিলনাড়ুর উপকূলীয় অংশেও এই মৃত্তিকা দেখা যায়।

​● অন্যান্য অঞ্চল: এছাড়া উত্তরাখণ্ডের আলমোড়া জেলা এবং বিহারের উত্তর ভাগের কিছু নিচু জলাভূমি এলাকায় এই মাটি দেখা যায়।


​◼ উৎপত্তি

​এই মাটি তৈরির প্রক্রিয়াটি সম্পূর্ণ জলমগ্ন পরিবেশের ওপর নির্ভরশীল।

​● ​জৈব পদার্থের জমা হওয়া: যেসব নিচু অঞ্চলে বছরের অধিকাংশ সময় জল জমে থাকে এবং আবহাওয়া অত্যন্ত আর্দ্র হয়, সেখানে প্রচুর পরিমাণে জলজ উদ্ভিদ ও গাছপালা জন্মায়।

​● অসম্পূর্ণ বিয়োজন: জলমগ্ন থাকার কারণে অক্সিজেনের অভাবে মৃত উদ্ভিদ ও জৈব পদার্থ গুলি সম্পূর্ণরূপে পচতে পারেনা। বছরের পর বছর ধরে এই আধ-পচা জৈব পদার্থ মাটির নিচে স্তূপ আকারে জমা হয়ে পিট মৃত্তিকা তৈরি করে।

​● ম্যানগ্রোভের ভূমিকা: সুন্দরবনের মতো মোহনা অঞ্চলে জোয়ারের নোনা জলে ম্যানগ্রোভ অরণ্যের ডালপালা পচে এই ধরণের কাদা-প্রধান জলাভূমির মাটি তৈরি হয়।


​◼ বৈশিষ্ট্য

​পিট ও জলাভূমি মৃত্তিকার কিছু রাসায়নিক বৈশিষ্ট্য রয়েছে। এগুলি হল:

​● জৈব পদার্থের উপস্থিতি: এই মৃত্তিকায় প্রচুর পরিমাণে জৈব পদার্থ উপস্থিত থাকে। এটিতে জৈব পদার্থের পরিমাণ প্রায় ৪০% থেকে ৫০% পর্যন্ত হতে পারে।

​● অম্লধর্মী প্রকৃতি: এই মাটি সাধারণত কাদাপ্রধান এবং গাঢ় কালো বা নীলচে রঙের হয়। জৈব এসিডের উপস্থিতির কারণে এর অম্লত্ব অত্যন্ত বেশি।

​● লোহা ও লবণের আধিক্য: অনেক সময় এই মাটিতে লোহ জাতীয় যৌগ ফেরাস সালফেট বেশি থাকার কারণে এটি উদ্ভিদের জন্য অস্বাস্থ্যকর হয়ে ওঠে। তাছাড়া উপকূলীয় এলাকায় অবস্থান করায় এটিতে দ্রবণীয় লবণের পরিমাণও বেশি থাকে।


​◼ কৃষিকাজে ভূমিকা

​প্রাকৃতিকভাবে এই মৃত্তিকা জলাবদ্ধ ও অম্লধর্মী হওয়ায় অধিকাংশ ফসলের জন্য বিশেষ উপযোগী নয়। তবে বর্ষাকালের শেষে যখন কিছু এলাকা থেকে জল নেমে যায়, তখন স্থানীয় কৃষকেরা বিশেষ পদ্ধতিতে এখানে কিছু ফসলের চাষবাস করেন।

​● ​আমন ধান ও পাট: পশ্চিমবঙ্গের সুন্দরবন এবং ওড়িশার উপকূলীয় অঞ্চলের জলাভূমি মৃত্তিকায় জল কমলে সেখানে বর্ষাকালীন আমন ধান এবং পাট চাষ করা হয়।

​● কেরালার 'কারি' চাষ: কেরালার নিচু জলাভূমি অঞ্চলে নোনা জল আটকে রেখে বা বিশেষ বাঁধ দিয়ে জল নিয়ন্ত্রণ করে এক ধরণের বিশেষ ধানের চাষও করা হয়।

Post a Comment

0 Comments