গুপ্ত সাম্রাজ্যের ইতিহাস: প্রতিষ্ঠা, শাসকগণ, সংস্কৃতি ও পতনের কারণ

প্রাচীন ভারতের ইতিহাসে গুপ্ত বংশের রাজত্বকালকে 'স্বর্ণযুগ' হিসেবে অভিহিত করা হয়ে থাকে। কুশান সাম্রাজ্যের পতনের পর উত্তর ভারতে যে রাজনৈতিক অস্থিরতা দেখা দিয়েছিল, গুপ্ত সম্রাটগণ তা দূর করে একটি সুসংহত ও শক্তিশালী সাম্রাজ্য গড়ে তুলতে সক্ষম হন। শ্রীগুপ্তের হাত ধরে পথ চলতে শুরু করা এই সম্রাজ্য সম্রাট সমুদ্রগুপ্তের শাসনকালে তার শীর্ষস্থানে পৌঁছায়। সাহিত্য, বিজ্ঞান, গণিত ও জ্যোতিষবিদ্যা সবদিক থেকেই এই সম্রাজ্য তৎকালীন ভারতবর্ষকে যেন এক শ্রেষ্ঠত্বের স্বাদ দেয়।


gupta-empire-map-in-bengali


গুপ্ত বংশের প্রতিষ্ঠা


​গুপ্ত সাম্রাজ্যের সঠিক উৎপত্তিস্থল নিয়ে ঐতিহাসিকদের মধ্যে দ্বিমত রয়েছে। অনেকের মতে আধুনিক উত্তরপ্রদেশ ও বিহার সংলগ্ন অঞ্চল ছিল গুপ্ত সাম্রাজ্যের মূল কেন্দ্র। এই সাম্রাজ্যের ভিত্তি স্থাপনকারী প্রথম দুই শাসক হলেন শ্রীগুপ্ত এবং ঘটোৎকচ গুপ্ত


◼ শ্রীগুপ্ত (আনুমানিক 240 - 280 খ্রিস্টাব্দ)


এলাহাবাদ প্রশস্তি এবং ইৎ-সিং-এর বিবরণ অনুযায়ী গুপ্ত বংশের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন শ্রীগুপ্ত। তিনি সম্ভবত মগধ বা উত্তরপ্রদেশের কোনো অঞ্চলের এক ক্ষুদ্র সামন্ত রাজা ছিলেন। তিনি 'মহারাজ' উপাধি গ্রহণ করেছিলেন। সেই সময়ে 'মহারাজ' উপাধিটি সাধারণত অন্য কোনো বড় শক্তির অধীনে থাকা সামন্ত রাজারা ব্যবহার করতেন।

অনেকের অনুমান, তিনি সম্ভবত কুশানদের অধীনে একজন শক্তিশালী সামন্ত প্রভু ছিলেন এবং মগধের একটি ক্ষুদ্র অংশে নিজের শাসনকার্য চালাতেন।

ইৎ-সিং-এর বিবরণ অনুযায়ী, শ্রীগুপ্ত মগধের কাছে মৃগশিখাবন নামক স্থানে চীনা বৌদ্ধ ভিক্ষুদের থাকার জন্য একটি মন্দির নির্মাণ করেছিলেন। ওই মন্দিরের রক্ষণাবেক্ষণের জন্য তিনি 24টি গ্রাম দান করেছিলেন।


ঘটোৎকচ গুপ্ত (আনুমানিক 280 - 319 খ্রিষ্টাব্দ)


শ্রীগুপ্তের পর তার পুত্র ঘটোৎকচ সিংহাসনে বসেন। তিনিও 'মহারাজ' উপাধি ব্যবহার করতেন। ধারণা করা হয় যে, তিনি তার পিতার অধিকৃত অঞ্চলগুলো ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছিলেন। পার্শ্ববর্তী ছোট ছোট শক্তিগুলোর সাথে তিনি সুসম্পর্ক বজায় রেখেছিলেন।

স্কন্দগুপ্তের 'ভিতারি স্তম্ভলিপি'তে ঘটোৎকচের নাম সশ্রদ্ধভাবে উল্লেখ রয়েছে। কোনো কোনো ঐতিহাসিকের মতে, তিনি লিচ্ছবিদের মতো শক্তিশালী বংশের সাথে প্রাথমিক যোগাযোগ স্থাপন করেছিলেন। এর ফলে পরবর্তীতে তার পুত্র প্রথম চন্দ্রগুপ্তের জন্য সাম্রাজ্য বিস্তারের পথ প্রশস্ত হয়েছিল।


প্রথম চন্দ্রগুপ্ত (আনুমানিক 319 - 335 খ্রিষ্টাব্দ)


ঘটোৎকচের পর তার পুত্র প্রথম চন্দ্রগুপ্ত সিংহাসনে বসেন। প্রথম চন্দ্রগুপ্তকেই গুপ্ত সাম্রাজ্যের প্রকৃত প্রতিষ্ঠাতা বলা হয়ে থাকে। তার হাত ধরেই গুপ্তরা একটি ক্ষুদ্র সামন্ত শক্তি থেকে উত্তর ভারতের এক বৃহৎ শক্তিতে পরিণত হয়। ঘটোৎকচ এবং শ্রীগুপ্ত কেবল 'মহারাজ' উপাধি ব্যবহার করতেন, যা তাদের সামন্ত মর্যাদাকে নির্দেশ করতো। তবে প্রথম চন্দ্রগুপ্ত সিংহাসন আরোহণ করে 'মহারাজাধিরাজ' উপাধি গ্রহণ করেছিলেন। এর থেকে প্রমাণ পাওয়া যায় যে তিনি নিজেকে একজন স্বাধীন ও সার্বভৌম সম্রাট হিসেবে ঘোষণা করেছিলেন।


প্রথম চন্দ্রগুপ্তের রাজনৈতিক উত্থান

প্রথম চন্দ্রগুপ্তের জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হলো বৈশালীর শক্তিশালী লিচ্ছবি বংশের রাজকন্যা কুমারদেবীর সাথে বিবাহ। লিচ্ছবিরা ছিল তৎকালীন ভারতের অত্যন্ত প্রাচীন এবং সম্মানীয় বংশ। এই বৈবাহিক সম্পর্কের ফলে গুপ্তদের সামাজিক ও রাজনৈতিক মর্যাদা বহুগুণ বেড়ে যায়। ধারণা করা হয়, এই বিবাহের ফলে তিনি যৌতুক হিসেবে মগধের বিস্তীর্ণ অঞ্চল লাভ করেন। এটি তার শক্তির মূল কেন্দ্রে পরিণত হয়।


​এই ঘটনার স্মরণে তিনি এক বিশেষ ধরনের স্বর্ণমুদ্রা প্রচলন করেন। সেই মুদ্রার এক পিঠে চন্দ্রগুপ্ত ও কুমারদেবীর ছবি এবং অন্য পিঠে লিচ্ছবিদের নাম খোদাই করা ছিল। এগুলো ইতিহাসে 'রাজা-রানী প্রকার' মুদ্রা নামে পরিচিত।


গুপ্তাব্দ প্রচলন


প্রথম চন্দ্রগুপ্তের রাজ্যাভিষেক ভারতের কালানুক্রমিক ইতিহাসে একটি মাইলফলক। তিনি সম্ভবত 319 খ্রিস্টাব্দের 26শে ফেব্রুয়ারি (মতান্তরে 20শে ডিসেম্বর) সিংহাসনে বসেন। এই বিশেষ বছরটিকে স্মরণীয় করে রাখতে তিনি 'গুপ্তাব্দ' নামক একটি নতুন বর্ষপঞ্জি বা অব্দ প্রচলন করেন। দীর্ঘকাল ধরে উত্তর ও পশ্চিম ভারতে এই ক্যালেন্ডার প্রচলিত ছিল।


প্রথম চন্দ্রগুপ্তের ​সাম্রাজ্যের সীমা

প্রথম চন্দ্রগুপ্তের অধীনে গুপ্ত সাম্রাজ্যের সীমানা পূর্ব ও উত্তর ভারতের অনেকটা অংশ জুড়ে বিস্তৃত হয়েছিল। বায়ু পুরাণ এবং অন্যান্য ঐতিহাসিক সূত্র অনুযায়ী, তার সাম্রাজ্য মগধ, সাকেত এবং প্রয়াগ পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। গঙ্গা নদীর অববাহিকার এই উর্বর অঞ্চলটি তার অর্থনৈতিক ও সামরিক ভিত মজবুত করে তুলেছিল।


সমুদ্রগুপ্ত (আনুমানিক 335 - 375 খ্রিষ্টাব্দ)


প্রথম চন্দ্রগুপ্তের পর গুপ্ত সাম্রাজ্যের সিংহাসনে বসেন সমুদ্রগুপ্ত। তিনি ছিলেন প্রথম চন্দ্রগুপ্ত এবং লিচ্ছবি রাজকন্যা কুমারদেবীর পুত্র। তার প্রচলিত মুদ্রায় তিনি নিজেকে 'লিচ্ছবি দৌহিত্র' বলে পরিচয় দিয়েছেন। অসামান্য বীরত্বের জন্য তিনি 'কবিরাজ', 'অশ্বমেধ পরাক্রম' এবং 'সর্বরাজোচ্ছেত্তা' নামেও পরিচিত ছিলেন। ঐতিহাসিক ভি.এ. স্মিথ তাকে 'ভারতের নেপোলিয়ন'  বলে অভিহিত করেছেন।


​সমুদ্রগুপ্তের সভাকবি ছিলেন হরিষেণ। হরিষেণের লেখা 'এলাহাবাদ প্রশস্তি' বা 'প্রয়াগ প্রশস্তি' থেকেই সমুদ্রগুপ্তের দিগ্বিজয়ের কাহিনী ও চরিত্রের বিস্তারিত বিবরণ পাওয়া যায়।


সমুদ্রগুপ্তের সামরিক অভিযান ও সাম্রাজ্য বিস্তার


আর্যাবর্ত বা উত্তর ভারত অভিযান: উত্তর ভারতের রাজাদের বিরুদ্ধে সমুদ্রগুপ্ত অত্যন্ত কঠোর নীতি গ্রহণ করেছিলেন। ​উত্তর ভারতের মোট 9 জন রাজাকে তিনি পরাজিত করেন। এর মধ্যে ছিল অচ্যুত, নাগসেন, গণপতিনাগ প্রমুখ। এই রাজ্যগুলোকে তিনি সরাসরি গুপ্ত সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত করেন এবং সেখানে নিজের শাসন ব্যবস্থা কায়েম করেন।

দাক্ষিণাত্য বা দক্ষিণ ভারত অভিযান: ​সমুদ্রগুপ্ত দক্ষিণ ভারতের কাঞ্চীর বিষ্ণুগোপ, কোশলের মহেন্দ্র প্রমুখ সহ মোট 12 জন রাজাকে পরাজিত করেছিলেন। তবে দক্ষিণ ভারতের নীতি ছিল উত্তর ভারত থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। সমুদ্রগুপ্তের দাক্ষিণাত্য নীতিকে বলা হয় 'ধর্মবিজয়'। এর ​তিনটি পর্যায় ছিল। প্রথমটি, গ্রহণ অর্থাৎ শত্রুকে বন্দি করা। দ্বিতীয়টি, মোক্ষ অর্থাৎ শত্রুকে মুক্তি দেওয়া। এবং তৃতীয়টি, অনুগ্রহ অর্থাৎ পরাজিত রাজাদের আনুগত্য ও কর প্রদানের শর্তে রাজ্য ফিরিয়ে দেওয়া।
এরূপ নীতির কারণ ছিল মগধ থেকে সুদূর দক্ষিণ ভারত শাসন করা ভৌগোলিকভাবে কঠিন ছিল। তাই তিনি তাঁদের করদ রাজ্যে পরিণত করাকেই বুদ্ধিমানের কাজ বলে মনে করেছিলেন।

আটবিক বা অরণ্য রাজ্য জয়: মধ্য ভারতের এবং গাঙ্গেয় উপত্যকার বনাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোকে 'আটবিক রাজ্য' বলা হতো। সমুদ্রগুপ্ত এই অরণ্যচারী উপজাতিদের পরাজিত করে নিজের দাসে পরিণত করেছিলেন। এর ফলে উত্তর ও দক্ষিণ ভারতের মধ্যে যোগাযোগের পথ যথেষ্ট সুগম হয়েছিল।


সীমান্তবর্তী রাজ্য জয়: ভারতের সীমান্তবর্তী পাঁচটি রাজ্য এবং নয়টি উপজাতি গোষ্ঠী সমুদ্রগুপ্তের ভয়ে ও প্রতাপে তার বশ্যতা স্বীকার করেছিল। রাজ্যগুলি হল সমতট (পূর্ববঙ্গ), ডবাক (আসামের অংশ), কামরূপ (আসাম), নেপাল এবং কার্তিপুর (পাঞ্জাব)। এই রাজ্যগুলো নিয়মিত কর প্রদান করত এবং সম্রাট সমুদ্রগুপ্তের আদেশ মেনে চলত। একে বলা হয় 'আজ্ঞাকরণ''প্রণামাগমন' নীতি।


◼ সমুদ্রগুপ্তের ​শাসনব্যবস্থা


সমুদ্রগুপ্ত কেবল একজন অপ্রতিদ্বন্দ্বী যোদ্ধাই ছিলেন না, তিনি ছিলেন একজন দক্ষ প্রশাসকও। তাঁর শাসন ব্যবস্থা ছিল মূলত বিকেন্দ্রীকরণ ও কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণের এক অপূর্ব সমন্বয়।


● কেন্দ্রীয় শাসন ব্যবস্থা: সমুদ্রগুপ্তের সময়ে ​সাম্রাজ্যের সর্বোচ্চ ক্ষমতার অধিকারী ছিলেন স্বয়ং সম্রাট। তিনি 'মহারাজাধিরাজ', 'পরমভট্টারক''চক্রবর্তী' উপাধি ধারণ করেছিলেন। তবে তিনি কিন্তু স্বৈরাচারী ছিলেন না। শাসনের কাজে সহায়তার জন্য একটি শক্তিশালী মন্ত্রীপরিষদ ও আমলাতন্ত্র গঠিত ছিল। এই শাসনব্যবস্থার প্রধান পদগুলি ছিল:

  • রাজপরিষদ: সম্রাটকে পরামর্শ দেওয়ার জন্য উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের নিয়ে গঠিত ছিল একটি পরিষদ। এটি রাজপরিষদ নামে পরিচিত ছিল।
  • মহাসন্ধিবিগ্রহিক: যুদ্ধ ও শান্তি বিষয়ক মন্ত্রী মহাসন্ধিবিগ্রহিক নামে পরিচিত ছিলেন।
  • মহাদণ্ডনায়ক: বিচার ও শাস্তির দায়িত্বে যিনি ছিলেন তিনি মহাদণ্ডনায়ক নামে পরিচিত ছিলেন।
  • মহাসেনাপতি: সেনাবাহিনীর প্রধান মহাসেনাপতি নামে পরিচিত ছিলেন।
  • কুমারামাত্য: উচ্চপদস্থ প্রশাসনিক কর্মকর্তারা কুমারামাত্য নামে পরিচিত ছিলেন।

আঞ্চলিক বা প্রাদেশিক শাসন: বিশাল সাম্রাজ্যকে সুশৃঙ্খলভাবে পরিচালনার জন্য সমুদ্রগুপ্ত তার সাম্রাজ্যকে কয়েকটি স্তরে ভাগ করেছিলেন। ভাগগুলি হল:

  • ভুক্তি: গোটা সাম্রাজ্য কয়েকটি প্রদেশে বিভক্ত ছিল। এই প্রদেশগুলোকে বলা হতো 'ভুক্তি'। আর এর শাসককে বলা হতো 'উপরিক'
  • বিষয়: ভুক্তিগুলো আবার কয়েকটি জেলায় বিভক্ত ছিল। এই জেলাগুলিকে বলা হতো 'বিষয়'। আর এর প্রধানকে বলা হতো 'বিষয়পতি'
  • বীথি: জেলাগুলি আবার কয়েকটি উপজেলায় বিভক্ত ছিল। এগুলো কি বলা হত বীথি।
  • গ্রাম: শাসনের সর্বনিম্ন স্তর ছিল গ্রাম। গ্রামের প্রধানকে বলা হতো 'গ্রামিক'


রাজস্ব ও অর্থনীতি: সমুদ্রগুপ্তের সময়ে অর্থনীতি ছিল মূলত কৃষিনির্ভর। তবে তার সময়ে বাণিজ্যেও ব্যাপক উন্নতি ঘটেছিল।

  • ভূমি রাজস্ব: আয়ের প্রধান উৎস ছিল কৃষি থেকে আদায় করা কর। উৎপন্ন ফসলের এক-ষষ্ঠাংশ (1/6) কর হিসেবে নেওয়া হতো। একে বলা হতো 'ভাগ'।
  • বাণিজ্য: তাম্রলিপ্ত ছিল তৎকালীন সময়ের অন্যতম প্রধান বন্দর। এখন থেকেই দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর সাথে বাণিজ্য চলত।
  • মুদ্রা ব্যবস্থা: সমুদ্রগুপ্ত 'দিনার' নামে উন্নত মানের স্বর্ণমুদ্রা প্রচলন করেছিলেন। এর থেকে বোঝা যায় তার সময় গুপ্তসাম্রাজ্যের অর্থনীতি ও মুদ্রা ব্যবস্থা যথেষ্ট শক্তিশালী ছিল।

বিচার ব্যবস্থা ও সামরিক শক্তি:

  • বিচার ব্যবস্থা: বিচার ব্যবস্থা ছিল অত্যন্ত কঠোর ও সুশৃঙ্খল। সম্রাট ছিলেন সর্বোচ্চ বিচারক। দেওয়ানি ও ফৌজদারি অপরাধের জন্য আলাদা বিচারক ও দণ্ডবিধি ছিল।
  • সামরিক শক্তি: সমুদ্রগুপ্তের একটি বিশাল ও সুপ্রশিক্ষিত স্থায়ী সেনাবাহিনী ছিল। এই বাহিনীতে পদাতিক, অশ্বারোহী, হস্তিবাহিনী এবং একটি শক্তিশালী নৌবাহিনী ছিল। নৌবাহিনীর মাধ্যমেই তিনি দক্ষিণ ভারত ও সমুদ্র তটবর্তী অঞ্চলে প্রভাব বিস্তার করেছিলেন।

বৈদেশিক নীতি: ​সমুদ্রগুপ্তের বৈদেশিক নীতি ছিল অত্যন্ত বাস্তবধর্মী। তিনি উত্তর ভারতের জন্য 'উচ্ছেদ' নীতি নিলেও দক্ষিণ ভারতের রাজাদের ক্ষেত্রে 'মৈত্রী ও কর গ্রহণ' নীতি অনুসরণ করেছিলেন। বিদেশি রাষ্ট্রগুলোর সাথে তিনি বৈবাহিক সম্পর্ক এবং মিত্রতা স্থাপন করে সাম্রাজ্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত করেছিলেন।


দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্ত (আনুমানিক 375 - 415 খ্রিষ্টাব্দ)


সমুদ্রগুপ্তের পর গুপ্ত সাম্রাজ্যের সিংহাসনে বসেন দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্ত। আনুমানিক 375 খ্রিস্টাব্দে তিনি সিংহাসনে বসেন। তিনি 'বিক্রমাদিত্য' নামে পরিচিত ছিলেন। দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্ত সাম্রাজ্য বিস্তারের বিশেষ দক্ষতা এবং সাংস্কৃতিক পৃষ্ঠপোষকতার মাধ্যমে গুপ্ত যুগকে উন্নতির চরম শিখরে পৌঁছে দিয়েছিলেন।


দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্তের সাম্রাজ্য বিস্তার ও সামরিক কৃতিত্ব


দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্ত যুদ্ধের পাশাপাশি বৈবাহিক সম্পর্কের মাধ্যমেও সাম্রাজ্যের শক্তি বৃদ্ধি করেছিলেন।


● শকদের পরাজয়: দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্তের সবথেকে বড় কৃতিত্ব হলো পশ্চিম ভারতের শক্তিশালী শক ক্ষত্রপ রাজবংশের পতন ঘটানো। আনুমানিক 395 খ্রিস্টাব্দ নাগাদ তিনি মালব, গুজরাট ও কাথিয়াবাড় জয় করেন। এই জয়ের পর তিনি 'শাকারি'  উপাধি গ্রহণ করেন। 'শাকারি' শব্দের অর্থ হলো শকদের শত্রু।

● বৈবাহিক নীতি: দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্ত নাগা রাজবংশের রাজকন্যা কুবেরনাগাকে বিবাহ করেন। তারপর আবার তাঁর কন্যা প্রভাবতী গুপ্তার সাথে বাকাটক রাজবংশের রাজা দ্বিতীয় রুদ্রসেনের বিবাহ দিয়েছিলেন। এরফলে তিনি দক্ষিণ ভারতেও নিজের প্রভাব বিস্তার করেছিলেন।


বঙ্গ বিজয়: দিল্লির মেহরাউলি লৌহস্তম্ভ লিপি থেকে জানা যায়  তিনি বঙ্গের রাজাদের জোটকে পরাজিত করেছিলেন। আর উত্তর-পশ্চিম ভারতের বাহ্লীকদের ওপরেও বিজয় লাভ করেছিলেন।


দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্তের রাজসভা ও 'নবরত্ন'


​দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্তের রাজসভা ছিল সাহিত্য ও বিজ্ঞানের পীঠস্থান। তাঁর সভায় উপস্থিত ছিলেন নয়জন বিশিষ্ট পণ্ডিত। তাদেরকে একত্রে 'নবরত্ন' বলা হয়। নবরত্ন সভার নয় জন বিশিষ্ট পন্ডিত ছিলেন:

  • কালিদাস: মহাকবি এবং নাট্যকার (তিনি অভিজ্ঞানশকুন্তলম, মেঘদূতম ইত্যাদি রচনা করেছিলেন)।
  • বরাহমিহির: প্রখ্যাত জ্যোতির্বিদ ও গণিতজ্ঞ। তিনি বৃহৎসংহিতা, পঞ্চসিদ্ধান্তিকা ইত্যাদি গ্রন্থ গুলি রচনা করেছিলেন।
  • অমরসিংহ: সংস্কৃত অভিধান 'অমরকোষ'-এর রচয়িতা।
  • ধন্বন্তরি: প্রখ্যাত আয়ুর্বেদ বিশারদ বা চিকিৎসক।
  • ক্ষপণক: জ্যোতিষ শাস্ত্রবিদ।
  • শঙ্কু: স্থাপত্যবিদ।
  • বেতালভট্ট: জাদুকর ও পণ্ডিত।
  • ঘটকর্পর: কবি ও কূটনীতিবিদ।
  • বররুচি: ব্যাকরণবিদ।

ফা-হিয়েন-এর ভারত ভ্রমণ


দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্তের শাসনকালেই চীনা পরিব্রাজক ফা-হিয়েন ভারতে আসেন। তিনি স্থলপথে মধ্য এশিয়া এবং গোবি মরুভূমি অতিক্রম করে খোটান হয়ে ভারতে প্রবেশ করেন। ভারত ভ্রমণ শেষে তিনি জলপথে শ্রীলঙ্কা ও জাভা হয়ে চীনে ফিরে যান। ফা-হিয়েন তাঁর বিখ্যাত ভ্রমণবৃত্তান্ত 'ফো-কুয়ো-কি' (Fo-Kwo-Ki) গ্রন্থে তৎকালীন ভারতের সামাজিক ও রাজনৈতিক অবস্থার চমৎকার বর্ণনা দিয়েছেন।  ​তিনি তৎকালীন ভারতবর্ষের শান্তি ও সুশৃঙ্খল শাসনের প্রশংসা করেছিলেন।


তার লেখা থেকে জানা যায় সেইসময়ে ​মানুষ যথেষ্ট সহজ-সরল জীবনযাপন করত এবং অপরাধের সংখ্যা ছিল অত্যন্ত কম। মৃত্যুদণ্ড বা শারীরিক নির্যাতনের পরিবর্তে সাধারণত জরিমানার মাধ্যমে বিচার করা হতো। গুপ্ত সাম্রাজ্যের রাজধানী ​পাটলিপুত্র ছিল তৎকালীন বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ শহর।


দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্তের ​ধর্ম ও সংস্কৃতি

  • ধর্মবিশ্বাস: দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্ত নিজে পরম ভাগবত বা বৈষ্ণব ধর্মাবলম্বী ছিলেন। তবে তিনি অন্যান্য ধর্মের প্রতিও অত্যন্ত সহনশীল ছিলেন। তাঁর প্রধান সেনাপতি আম্রকার্দব ছিলেন বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী।
  • শিল্পকলা: অধিকাংশ ঐতিহাসিকদের মতে দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্তের সময়েই বিখ্যাত মেহরাউলি লৌহস্তম্ভ নির্মিত হয়েছিল। এটি দেড় হাজার বছর পরেও মরিচাহীন অবস্থায় দাঁড়িয়ে আছে।
  • মুদ্রা ব্যবস্থা: তিনি প্রচুর পরিমাণে স্বর্ণমুদ্রা প্রচলন করেছিলেন। শক বিজয়ের স্মরণে তিনি প্রথম গুপ্ত রাজা হিসেবে 'রূপক' নামে রৌপ্য মুদ্রা প্রবর্তন করেন।


প্রথম কুমারগুপ্ত (আনুমানিক 415 - 455 খ্রিষ্টাব্দ)


গুপ্ত সম্রাট দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্তের মৃত্যুর পর আনুমানিক 415 খ্রিস্টাব্দে তাঁর পুত্র প্রথম কুমারগুপ্ত সিংহাসনে বসেন। প্রথম কুমারগুপ্ত প্রায় 40 বছর অত্যন্ত দক্ষতার সাথে বিশাল গুপ্ত সাম্রাজ্য শাসন করেছিলেন। তিনি মহেন্দ্রাদিত্য উপাধি গ্রহণ করেছিলেন। তাঁর রাজত্বকাল মূলত শান্তি, সমৃদ্ধি এবং শিক্ষা-দীক্ষার উন্নতির জন্য বিশেষ স্মরণীয় হয়ে আছে। তাঁর শাসনকালে উত্তর ভারত থেকে শুরু করে দক্ষিণে নর্মদা নদী এবং পূর্বে বাংলা থেকে পশ্চিমে সৌরাষ্ট্র পর্যন্ত গুপ্ত সাম্রাজ্য বিস্তৃত ছিল।


​নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা

প্রথম কুমারগুপ্তের সবথেকে বড় এবং গৌরবময় কীর্তি হলো বিহারের রাজগীরে নালন্দা মহাবিহার বা নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা। এটি প্রাচীন ভারতের অন্যতম শ্রেষ্ঠ শিক্ষাকেন্দ্র হয়ে উঠেছিল। দেশ-বিদেশ থেকে হাজার হাজার ছাত্র নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষালাভ করতে আসত। শিক্ষার প্রতি তাঁর এই পৃষ্ঠপোষকতা তাঁকে ইতিহাসে অমর করে রেখেছে।


সামরিক অভিযান


কুমারগুপ্তের রাজত্বকালের প্রায় পুরোটা শান্তিতে কাটলেও, শেষ জীবনে কিছু সংকট দেখা দেয়। মধ্য ভারতের নর্মদা উপত্যকায় বসবাসকারী শক্তিশালী পুশ্যমিত্র জাতি গুপ্ত সাম্রাজ্যের ওপর আক্রমণ চালায়। এই যুদ্ধ গুপ্ত সাম্রাজ্যকে অনেকাংশে দুর্বল করে তুলেছিল। তারপর উত্তর-পশ্চিম দিক থেকে দুর্ধর্ষ হুন জাতিও একই সময়ে আক্রমণ শুরু করে। সেই সময় ​বৃদ্ধ বয়সে কুমারগুপ্ত তাঁর যোগ্য পুত্র স্কন্দগুপ্তকে যুদ্ধের ময়দানে পাঠান। স্কন্দগুপ্ত অসীম সাহসিকতার সাথে সেই দুই বিপদ মোকাবিলা করেন এবং সাম্রাজ্যের সংহতি রক্ষা করেন।


প্রথম কুমারগুপ্তের ​ধর্মীয় নীতি


কার্তিকেয় উপাসনা: কুমারগুপ্ত ভগবান কার্তিকের একনিষ্ঠ ভক্ত ছিলেন। তাঁর অনেক মুদ্রায় ময়ূরের ছবি এবং ভগবান কার্তিকের মূর্তি পাওয়া যায়।


ধর্মীয় সহনশীলতা: প্রথম কুমারগুপ্ত নিজে বৈষ্ণব বা শৈব মতাদর্শের অনুরাগী হলেও বৌদ্ধ ও জৈন ধর্মের প্রতি তিনি অত্যন্ত উদার ছিলেন। তাঁর সময়েই নালন্দার মতো বৌদ্ধ শিক্ষাকেন্দ্র বিকাশ লাভ করেছিল।


অশ্বমেধ যজ্ঞ: নিজের সার্বভৌমত্ব এবং বিজয় ঘোষণার জন্য তিনি তাঁর পিতামহ সমুদ্রগুপ্তের মতো অশ্বমেধ যজ্ঞ অনুষ্ঠান করেছিলেন। এছাড়া সেই যজ্ঞ উপলক্ষে বিশেষ স্বর্ণমুদ্রাও প্রচলন করেছিলেন।


প্রথম কুমারগুপ্তের ​মুদ্রা


​গুপ্ত রাজাদের মধ্যে প্রথম কুমারগুপ্তই সবথেকে বেশি সংখ্যক  বৈচিত্র্যময় মুদ্রা জারি করেছিলেন। ​তাঁর মুদ্রায় তাঁকে ধনুর্বিদ্যারত, অশ্বারোহী বা বাঘ শিকাররত অবস্থায় দেখা যায়। ​তাঁর সময়ে প্রচলিত রূপার মুদ্রা 'রূপক' পশ্চিম ভারতে বেশ জনপ্রিয় ছিল।


স্কন্দগুপ্ত (আনুমানিক 455 - 467 খ্রিষ্টাব্দ)


​স্কন্দগুপ্ত ছিলেন সম্রাট প্রথম কুমারগুপ্তের পুত্র। সম্রাট কুমারগুপ্তের মৃত্যুর পর উত্তরাধিকার নিয়ে নানাবিধ দ্বন্দ্ব শুরু হয়। তবে স্কন্দগুপ্ত নিজের যোগ্যতা ও পরাক্রমের পরিচয় দিয়ে সাম্রাজ্যের শাসনভার গ্রহণ করেন। প্রধানত ভিতারি স্তম্ভলিপি  থেকে তার বীরত্বের কথা জানা যায়।


হুণ আক্রমণ প্রতিরোধ

স্কন্দগুপ্তের জীবনের সবচেয়ে বড় সাফল্য হলো মধ্য এশিয়া থেকে আসা দুর্ধর্ষ হুণ জাতির আক্রমণ প্রতিহত করা। ​হুণরা যখন উত্তর-পশ্চিম ভারত আক্রমণ করে, তখন স্কন্দগুপ্ত তাদেরকে শোচনীয়ভাবে পরাজিত করেন। ​এই বিজয়ের ফলেই ভারত প্রায় 50 বছর হুণদের ধ্বংসলীলা থেকে রক্ষা পেয়েছিল। এই কারণেই ঐতিহাসিক ড. রমেশচন্দ্র মজুমদার তাকে 'ভারতের রক্ষাকর্তা' বলে অভিহিত করেছেন।


সুদর্শন হ্রদ সংস্কার

স্কন্দগুপ্ত কেবল যুদ্ধেই পারদর্শী ছিলেন না, জনকল্যাণমূলক কাজেও তার ছিল বিশেষ নজর। ​গুজরাটের সুদর্শন হ্রদ যখন অতিবৃষ্টির কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয় তখন তিনি তার প্রাদেশিক শাসনকর্তা পর্ণদত্ত ও তার পুত্র চক্রপালিতের তত্ত্বাবধানে সেটি সংস্কার করেন। জুনাগড় শিলালিপি থেকে ​এই ঘটনার বিবরণ পাওয়া যায়।


স্কন্দগুপ্তের ধর্মীয় নীতি

স্কন্দগুপ্ত নিজে বৈষ্ণব ধর্মের অনুসারী ছিলেন এবং 'পরমভাগবত' উপাধি গ্রহণ করেছিলেন। ​তবে তিনি ধর্মীয়ভাবে অত্যন্ত সহনশীল ছিলেন। তার রাজত্বকালে বৌদ্ধ ও জৈন ধর্মাবলম্বীরাও সমান সুযোগ-সুবিধা পেত।


পরবর্তী গুপ্ত সম্রাটগণ


স্কন্দগুপ্তের মৃত্যুর পর গুপ্ত সাম্রাজ্য ধীরে ধীরে দুর্বল হতে শুরু করে। ঐতিহাসিকরা স্কন্দগুপ্তকে 'গুপ্ত বংশের শেষ শক্তিশালী সম্রাট' বলে উল্লেখ করেছেন। তাঁর পরবর্তী শাসকদের সময় থেকেই বিশাল এই সাম্রাজ্য পতনের দিকে এগিয়ে যায়।

​স্কন্দগুপ্তের পরবর্তী উল্লেখযোগ্য গুপ্ত সম্রাটগণ হলেন:


পুরুগুপ্ত (আনুমানিক 467 - 473 খ্রিস্টাব্দ)

​স্কন্দগুপ্তের পর তাঁর ভাই পুরুগুপ্ত সিংহাসনে বসেন। তিনি ছিলেন সম্রাট কুমারগুপ্তের আরেক পুত্র। তাঁর রাজত্বকাল খুব সংক্ষিপ্ত ছিল। তাঁর সময় থেকেই সাম্রাজ্যের ভাঙন স্পষ্ট হতে শুরু করে।


দ্বিতীয় কুমারগুপ্ত (473 - 477 খ্রিস্টাব্দ)

​পুরুগুপ্তের পর তাঁর পুত্র দ্বিতীয় কুমারগুপ্ত সিংহাসনে বসেন। তাঁর শাসনকাল সম্পর্কে খুব বেশি তথ্য পাওয়া যায় না। তবে সারনাথের একটি শিলালিপি থেকে তাঁর রাজত্বকালের প্রমাণ পাওয়া যায়।


বুদ্ধগুপ্ত (477 - 495 খ্রিস্টাব্দ)

​পুরুগুপ্তের অপর পুত্র বুদ্ধগুপ্ত ছিলেন স্কন্দগুপ্তের পরবর্তী শাসকদের মধ্যে সবচেয়ে সফল শাসক। দ্বিতীয় কুমার গুপ্তের পর তিনি গুপ্ত সাম্রাজ্যের সিংহাসনে বসেন। ​তিনি প্রায় একটানা 20 বছর রাজত্ব করেন। ভেঙে পড়া সাম্রাজ্যকে তিনি পুনরায় একত্রিত করার চেষ্টা করেন। ​তাঁর সময়ে মালব থেকে উত্তরবঙ্গ পর্যন্ত গুপ্তদের নিয়ন্ত্রণ বজায় ছিল। '​এরান' শিলালিপি থেকে তাঁর শাসনকাল সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়।


নরসিংহগুপ্ত বালাদিত্য (495 - 530 খ্রিস্টাব্দ)

​বুদ্ধগুপ্তের মৃত্যুর পর তাঁর ভাই নরসিংহগুপ্ত সিংহাসনে বসেন। তাঁর রাজত্বকালের সবচেয়ে বড় ঘটনা হলো হুন আক্রমণ। ঐতিহাসিকদের মতে ​তিনি নাকি হুন রাজা মিহিরকুলকে পরাজিত করে বন্দী করেছিলেন। ​তিনি ব্যক্তিগত জীবনে বৌদ্ধ ধর্মের অনুরাগী ছিলেন এবং নালন্দা মহাবিহারের উন্নয়নে বড় ভূমিকা রেখেছিলেন।


তৃতীয় কুমারগুপ্ত (আনুমানিক 530 - 540 খ্রিষ্টাব্দ)

​নরসিংহগুপ্তের পর তৃতীয় কুমারগুপ্ত সিংহাসনে বসেন। তৃতীয় কুমারগুপ্ত সম্পর্কে খুব একটা বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়নি। তবে জানা যায় তার শাসনকালে ক্রমাগত হুন আক্রমণ ও অভ্যন্তরীণ বিভাজনের কারণে সম্রাজ্য অনেকাংশেই দুর্বল হয়ে পড়েছিল।


বিষ্ণুগুপ্ত (আনুমানিক 540 - 550 খ্রিষ্টাব্দ)

তৃতীয় কুমারগুপ্তের পর আনুমানিক 540 খ্রিস্টাব্দে বিষ্ণুগুপ্ত সিংহাসনে বসেন। বিষ্ণুগুপ্তকেই গুপ্ত বংশের সর্বশেষ সম্রাট হিসেবে গণ্য করা হয়। তাঁর সময়ে গুপ্ত সাম্রাজ্য কেবল মগধ ও তার আশেপাশের কিছু অঞ্চলের মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছিল।


গুপ্ত যুগের শিল্পকলা ও স্থাপত্য


শিল্প, স্থাপত্য এবং সাহিত্যের চরম উৎকর্ষের কারণে গুপ্ত যুগকে ভারতবর্ষের ইতিহাসে 'স্বর্ণযুগ' বলা হয়ে থাকে। এই সময়েই ভারতীয় ধ্রুপদী শিল্পের একটি নির্দিষ্ট মানদণ্ড তৈরি হয়েছিল।

​গুপ্ত যুগের শিল্পকলার প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলো হলো:


1) মন্দির স্থাপত্য


উত্তর ভারতে গুপ্ত রাজারাই প্রথম পোড়ামাটির ইট ও পাথরের স্থায়ী মন্দির তৈরি শুরু করেন। এর আগে মূলত কাঠ বা বাঁশের কাঠামো ব্যবহার করা হতো। 

  • বৈশিষ্ট্য: গুপ্ত যুগের মন্দিরগুলির প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো সজ্জিত গর্ভগৃহ ও অলঙ্কৃত প্রবেশদ্বার। পরবর্তীকালে মন্দিরের মাথায় শিখর যোগ করা হয়।
  • উদাহরণ: ঝাঁসির কাছে অবস্থিত দেওগড়ের দশাবতার মন্দির হলো গুপ্ত যুগের তথা ভারতের অন্যতম প্রাচীন পাথরের মন্দির। এছাড়াও, ​কানপুরের কাছে অবস্থিত ভিতরগাঁওয়ের ইটের মন্দির গুপ্ত যুগের অন্যতম প্রাচীন মন্দির।

2) ভাস্কর্য শিল্প

গুপ্ত ভাস্কর্য শিল্প ছিল আধ্যাত্মিকতা এবং শারীরিক সৌন্দর্যের এক অপূর্ব মিশ্রণ। কুশান যুগের তুলনায় গুপ্ত যুগের মূর্তিতে অনেক বেশি নমনীয়তা এবং প্রশান্তি লক্ষ্য করা যায়।

  • সারনাথ শিল্পধারা: এখানে বুদ্ধের মূর্তিতে শান্ত ভাব এবং সূক্ষ্ম কারুকাজ দেখা যায়। বিশেষ করে সারনাথের 'ধর্মচক্র প্রবর্তন' মুদ্রায় উপবিষ্ট বুদ্ধের মূর্তিটি সারা বিশ্বে অত্যন্ত প্রসিদ্ধ।
  • মথুরা শিল্পধারা: লাল বেলেপাথরের ব্যবহার এবং মূর্তির মুখে এক ধরনের প্রসন্ন হাসি মথুরা শিল্পধারার প্রধান বৈশিষ্ট্য।
  • হিন্দু দেবদেবী: গুপ্ত যুগে ভগবান বিষ্ণু, শিব এবং দুর্গার অসংখ্য সুন্দর সুন্দর মূর্তি নির্মিত হয়েছিল। দেওগড় মন্দিরের অনন্তশায়ী বিষ্ণুর মূর্তিটি এক অন্যতম সেরা নিদর্শন।

3) চিত্রশিল্প

গুপ্ত যুগের চিত্রশিল্পের শ্রেষ্ঠ নিদর্শন হলো মহারাষ্ট্রের অজন্তা গুহা এবং মধ্যপ্রদেশের বাঘ গুহা

অজন্তা গুহাচিত্র: এই গুহাচিত্রে মূলত বুদ্ধের জীবনী এবং জাতকের গল্পগুলি চিত্রিত হয়েছে। ছবিগুলোতে ব্যবহৃত রং এবং মানুষের আবেগের বহিঃপ্রকাশ আজও দর্শকদের বিস্মিত করে।

বাঘ গুহা: এই গুহাচিত্রে প্রধানত লৌকিক জীবনের চিত্র বেশি দেখা গেছে।


4) ধাতু শিল্প


এই যুগে ​ধাতুবিদ্যার উন্নতিও যেন চরম শিখরে পৌঁছেছিল। এই সময়ের শিল্পীরা তামা এবং ব্রোঞ্জ দিয়ে বিশাল আকারের বিভিন্ন রকমের মূর্তি তৈরি করতেন।

সুলতানগঞ্জের বুদ্ধ মূর্তি: বিহারের সুলতানগঞ্জে পাওয়া 7.5 ফুট উচ্চতার একটি তামার বুদ্ধ মূর্তি এই যুগের ধতুশিল্পের এক শ্রেষ্ঠ উদাহরণ। বর্তমানে এটি বার্মিংহাম মিউজিয়ামে সংরক্ষিত রয়েছে।

মেহরাউলির লৌহস্তম্ভ: ঐতিহাসিকদের মতে দিল্লির কুতুব মিনার চত্বরে অবস্থিত মেহরাউলির লৌহস্তম্ভটিও গুপ্ত যুগেই নির্মিত হয়েছিল। প্রায় 1600 বছর ধরে রোদ-বৃষ্টিতে দাঁড়িয়ে থাকা সত্ত্বেও এটিতে আজও মরচে ধরেনি। এটি তৎকালীন ধাতুবিদ্যার এক চরম উৎকর্ষের প্রমাণ।


5) গুহা স্থাপত্য

গুপ্ত যুগে পাহাড় কেটে গুহা নির্মাণের রীতিও বহুল প্রচলিত ছিল। তবে এই সময়ে গুহাগুলোর প্রবেশদ্বার এবং স্তম্ভগুলো আগের চেয়ে অনেক বেশি অলঙ্কৃত করা হতো। এই সময়েই ​উদয়গিরি গুহায় ভগবান বিষ্ণুর 'বরাহ' অবতারের এক বিশাল মূর্তি নির্মাণ করা হয়েছিল। এছাড়া, ​অজন্তা ও ইলোরার কিছু গুহা কিন্তু এই সময়েই পূর্ণতা পায়।


গুপ্ত যুগের সাহিত্য


​গুপ্ত যুগে সংস্কৃত সাহিত্যের এক অভূতপূর্ব উন্নতি ঘটে। এই সময়ের সাহিত্য মূলত রাজকীয় পৃষ্ঠপোষকতা এবং ধ্রুপদী শৈলীর জন্য পরিচিত।


মহাকবি কালিদাস:

​কালিদাস ছিলেন এই যুগের সর্বশ্রেষ্ঠ সাহিত্যিক। তার লেখা অভিজ্ঞানশকুন্তলম নাটকটি বিশ্বসাহিত্যের এক অন্যতম শ্রেষ্ঠ নাটক। এছাড়া মালবিকাগ্নিমিত্রম এবং বিক্রমোর্বশীয়ম নাটক দুটিও তারই রচনা। তার লেখা মেঘদূতম, রঘুবংশম, কুমারসম্ভবম, ঋতুসংহার ইত্যাদি কাব্য গুলি প্রাচীন ভারতীয় সাহিত্যের অমূল্য সম্পদ।

বিশাখদত্ত:

বিশাখদত্তের রচিত মুদ্রারাক্ষস ও দেবীচন্দ্রগুপ্তম গ্রন্থ দুটি প্রাচীন ভারতের রাজনৈতিক ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন।


শূদ্রক:

তাঁর লেখা অন্যতম শ্রেষ্ঠ নাটক হলো 'মৃচ্ছকটিকম'। এটিতে তিনি তৎকালীন সমাজের সাধারণ মানুষের জীবন কাহিনী সুন্দরভাবে ফুটিয়ে তোলেন।


​বিষ্ণুশর্মা:

তিনি অমর নীতিশিক্ষামূলক গল্পগ্রন্থ 'পঞ্চতন্ত্র' -এর সংকলন করেন।


অমরসিংহ:

তিনি সংস্কৃত অভিধান 'অমরকোষ' রচনা করেন।


​ধর্মীয় সাহিত্য:

অনেকের মতে হিন্দুধর্মের দুই বৃহৎ মহাকাব্য রামায়ণ ও মহাভারত এই যুগেই নাকি বর্তমান রূপ লাভ করে। এছাড়া অধিকাংশ পুরাণ এই সময়েই চূড়ান্তভাবে সংকলিত হয়েছিল।


গুপ্ত যুগের ​বিজ্ঞানচর্চা ও গণিত


ঐতিহাসিকদের মতে, ​গুপ্ত যুগ ছিল প্রাচীন ভারতের এক বৈজ্ঞানিক বিপ্লবের সময়। আর্যভট্ট এবং বরাহমিহিরের মতো সুবিখ্যাত মনিষীরা এই সময়েই জন্মগ্রহণ করেছিলেন।


আর্যভট্ট:

তিনি তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ আর্যভট্টীয়-তে প্রমাণ করেন যে আমাদের পৃথিবীটা গোল এবং এটি নিজের অক্ষের চারদিকে ঘুরে চলেছে। তিনিই প্রথম সূর্যগ্রহণ ও চন্দ্রগ্রহণের বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা দেন। গণিতে শূন্যের (0) ব্যবহার এবং পাই ($ \pi $) এর মান (3.1416) তিনি নির্ভুলভাবে নির্ণয় করেছিলেন।


​বরাহমিহির:

তাঁর লেখা বিখ্যাত গ্রন্থ হলো 'পঞ্চসিদ্ধান্তিকা' এবং 'বৃহৎসংহিতা'। তিনি জ্যোতির্বিদ্যা, উদ্ভিদবিদ্যা এবং প্রাকৃতিক ভূগোল নিয়ে বিভিন্ন মতবাদ প্রকাশ করেছেন।


ব্রহ্মগুপ্ত:

তিনি 'ব্রহ্মস্ফুট সিদ্ধান্ত' গ্রন্থে মহাকর্ষের প্রাথমিক ধারণা দেন। এছাড়া তিনি ঋণাত্মক সংখ্যার ব্যবহার ব্যাখ্যা করেন।


ধন্বন্তরি:

তাঁকে ভারতীয় আয়ুর্বেদ শাস্ত্রের অন্যতম প্রধান পণ্ডিত হিসেবে গণ্য করা হয়ে থাকে।


গুপ্ত সাম্রাজ্যের পতন


গুপ্ত সাম্রাজ্যের পতনের পেছনে কোনো একটি নির্দিষ্ট কারণ নয়, বরং একাধিক কারণ ছিল। গুপ্ত সাম্রাজ্যের পতনের প্রধান কারণগুলি নিচে বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হলো:


হূণ আক্রমণ: 


​গুপ্ত সাম্রাজ্যের পতনের অন্যতম প্রধান বাহ্যিক কারণ ছিল মধ্য এশিয়া থেকে আগত যাযাবর হূণদের ক্রমাগত আক্রমণ। ​প্রথম দিকে সম্রাট স্কন্দগুপ্ত অত্যন্ত বীরত্বের সাথে হূণদের পরাজিত করেছিলেন। ​তবে পরবর্তীকালে তোরামান এবং মিহিরকুলের নেতৃত্বে হূণরা বারবার আক্রমণ চালিয়ে সাম্রাজ্যের উত্তর-পশ্চিম সীমান্তকে অরক্ষিত করে দেয়। এর ফলে রাজকোষাগার শূন্য হতে শুরু করে।


​দুর্বল উত্তরাধিকারী:

স্কন্দগুপ্তের  পরবর্তী গুপ্ত সম্রাটগণ সম্রাট সমুদ্রগুপ্ত বা দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্তের মতো দক্ষ বা শক্তিশালী ছিলেন না। সেই দুর্বল শাসকদের পক্ষে বিশাল সাম্রাজ্য ও তার অভ্যন্তরীণ সমস্যাগুলি সামলানো সম্ভব ছিল না।


সামন্ততন্ত্রের উত্থান ও অভ্যন্তরীণ বিদ্রোহ:

গুপ্ত শাসনামলে সাম্রাজ্য পরিচালনার সুবিধার্থে অনেক স্থানীয় শাসক বা সামন্ত রাজাদের নিয়োগ করা হয়েছিল। ​কেন্দ্রীয় শক্তি দুর্বল হওয়ার সুযোগে যশোবর্মণ, মৈত্রেয়ক এবং কনৌজের মৌখরিরা বিদ্রোহ ঘোষণা করে নিজেদের স্বাধীন বলে দাবি করে।

​এর ফলে গুপ্ত সাম্রাজ্যের ভৌগোলিক সীমানা মগধ ও তার আশেপাশের ছোট এলাকায় সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে।


​অর্থনৈতিক সংকট:

যুদ্ধে অত্যধিক ব্যয় এবং বৈদেশিক বাণিজ্যের অবনতি গুপ্ত সাম্রাজ্যের অর্থনীতিকে পঙ্গু করে দিয়েছিল। ​বিশেষ করে হূণদের সাথে দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের কারণে রাজকোষ খালি হয়ে যায়। সেইসঙ্গে ​রোমান সাম্রাজ্যের পতনের ফলে তৎকালীন ভারতের রেশম এবং মশলা বাণিজ্যে ভাটা পড়ে।


প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণ:

গুপ্ত যুগে শাসনের ভার অনেকাংশে প্রাদেশিক গভর্নরদের হাতে ছেড়ে দেওয়া হয়েছিল। প্রথম দিকে শক্তিশালী রাজাদের ক্ষেত্রে এটি কার্যকর হলেও পরবর্তীতে রাজারা দুর্বল হয়ে পড়লে এটি এক বড়ো সমস্যা হয়ে দাঁড়ায়। উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা নিজেরাই সর্বেসর্বা হয়ে ওঠেন এবং কেন্দ্রীয় আদেশ অমান্য করতে শুরু করেন।


উত্তরাধিকার নিয়ে বিরোধ:

গুপ্ত বংশের শেষ দিকে সিংহাসন দখল নিয়ে রাজপরিবারের সদস্যদের মধ্যে অন্তর্দ্বন্দ্ব ও গৃহযুদ্ধ শুরু হয়। এটি গুপ্ত সাম্রাজ্যের ঐক্যকে নষ্ট করে দেয়। ফলে বাইরের শত্রুদের কাছে গুপ্ত সাম্রাজ্যে আক্রমণের পথ প্রশস্ত হয়।

*

Post a Comment (0)
Previous Post Next Post