কোষ বিভাজন কী? | অ্যামাইটোসিস, মাইটোসিস, মিয়োসিস ও কোষ চক্র বিস্তারিত ব্যাখ্যা

যে প্রক্রিয়ায় একটি মাতৃকোষ বিভাজিত হয়ে অপত্য কোষ তৈরি করে, তাকেই কোষ বিভাজন বলা হয়। জীবের বৃদ্ধি, বংশবৃদ্ধি এবং ক্ষত নিরাময়ের জন্য এই প্রক্রিয়া অপরিহার্য।


kosh-bivajon-kosh-chakra


কোষ বিভাজনের প্রকারভেদ


কোষ বিভাজন প্রধানত তিন প্রকারের হয়ে থাকে। যথা: অ্যামাইটোসিস, মাইটোসিস এবং মিয়োসিস


1. অ্যামাইটোসিস


সংজ্ঞা: ​যে কোষ বিভাজন প্রক্রিয়ায় কোনো জটিল পর্যায় ছাড়াই, মাতৃ কোষের নিউক্লিয়াস ও সাইটোপ্লাজম সরাসরি বিভক্ত হয়ে দুটি অপত্য কোষের সৃষ্টি করে, তাকে অ্যামাইটোসিস বলে।


amitosis-kosh-bivajon

◼ অ্যামাইটোসিসের স্থান:

​অ্যামাইটোসিস কোষ বিভাজন সাধারণত নিম্নশ্রেণির প্রোকারাইওটিক (আদিকোষী) জীবেদের ক্ষেত্রে লক্ষ্য যায়। যেমন: ​ব্যাকটেরিয়া, ​ইস্ট, ​অ্যামিবা, ​নীলাভ সবুজ শৈবাল ইত্যাদি।


অ্যামাইটোসিস প্রক্রিয়ার ধাপসমূহ:

​অ্যামাইটোসিস প্রক্রিয়াটি খুব দ্রুত সম্পন্ন হয়। এই প্রক্রিয়াটি মূলত নিম্নলিখিত ধাপগুলোর মাধ্যমে ঘটে:

  • নিউক্লিয়াসের পরিবর্তন: প্রথমেই কোষের নিউক্লিয়াসটি লম্বালম্বিভাবে বড় হতে থাকে এবং মাঝখানে সরু হয়ে একটি ডাম্বেল আকৃতি ধারণ করে।
  • নিউক্লিয়াসের বিভাজন: ডাম্বেল আকৃতির নিউক্লিয়াসটির মাঝখানের অংশটি আরও সরু হয়ে একসময় ছিঁড়ে যায় এবং দুটি পৃথক নিউক্লিয়াস গঠন করে।
  • সাইটোপ্লাজমের বিভাজন: নিউক্লিয়াস বিভাজনের সাথে সাথেই কোষের মাঝ বরাবর কোষঝিল্লি বা সাইটোপ্লাজম ভেতরের দিকে সংকুচিত হতে শুরু করে।
  • অপত্য কোষ সৃষ্টি: পরিশেষে সাইটোপ্লাজম মাঝখান দিয়ে যুক্ত হয়ে যায় এবং একটি মাতৃকোষ থেকে দুটি সম্পূর্ণ নতুন অপত্য কোষ তৈরি হয়।


◼ অ্যামাইটোসিসের বৈশিষ্ট্য:

  • ​এই কোষ বিভাজন প্রক্রিয়াটি সরল ও দ্রুত সম্পন্ন একটি প্রক্রিয়া।
  • ​এখানে কোনো স্পিন্ডল তন্তু গঠিত হয় না।
  • এটিতে ​নিউক্লিয় পর্দা বা নিউক্লিওলাসের বিলুপ্তি ঘটে না।
  • ​ক্রোমোজোমের কোনো দৃশ্যমান পরিবর্তন বা বিন্যাস ঘটে না।


◼ অ্যামাইটোসিসের গুরুত্ব বা তাৎপর্য:

  • বংশবৃদ্ধি: এককোষী জীবেরা এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই খুব দ্রুত তাদের সংখ্যা বৃদ্ধি করে।
  • অস্তিত্ব রক্ষা: প্রতিকূল পরিবেশে বা দ্রুত বংশবৃদ্ধির ক্ষেত্রে এই পদ্ধতি অত্যন্ত কার্যকর।
  • বিবর্তনের আদি ধাপ: বিজ্ঞানীদের মতে, এটিই কোষ বিভাজনের সবচেয়ে আদিম প্রক্রিয়া। এটি থেকেই পরবর্তীতে মাইটোসিসের মতো জটিল প্রক্রিয়ার উদ্ভব হয়েছে।


2. মাইটোসিস


সংজ্ঞা:​ যে কোষ বিভাজন প্রক্রিয়ায় একটি প্রকৃত নিউক্লিয়াসযুক্ত মাতৃকোষের নিউক্লিয়াস এবং ক্রোমোজোম উভয়ই মাত্র একবার করে বিভক্ত হয়ে মাতৃকোষের সমান সংখ্যক ও সম-গুণসম্পন্ন ক্রোমোজোম বিশিষ্ট দুটি অপত্য কোষ  সৃষ্টি হয়, তাকে মাইটোসিস বলে।


◼ মাইটোসিসের স্থান

  • দেহকোষ: প্রাণীর শরীরের প্রায় সমস্ত দেহকোষ, যেমন: ত্বক, পেশি, হাড়, রক্তকণিকা তৈরির কোষ ইত্যাদিতে মাইটোসিস ঘটে।
  • ভ্রূণ: জাইগোট থেকে পূর্ণাঙ্গ প্রাণী তৈরির সময় ভ্রূণের কোষে দ্রুত হারে মাইটোসিস হয়।
  • ভাজক কলা: উদ্ভিদের বর্ধনশীল অংশ, যেমন: মূল ও কাণ্ডের অগ্রভাগ ইত্যাদি অংশে মাইটোসিস ঘটে।
  • ক্যাম্বিয়াম: কাণ্ডের বেধ বা স্থূলতা বৃদ্ধির জন্য ক্যাম্বিয়ামে মাইটোসিস ঘটে।
  • পাতা ও কুঁড়ি: কচি পাতা এবং ফুলের কুঁড়ির বৃদ্ধিতে এই বিভাজন দেখা যায়।


◼ মাইটোসিসের প্রধান পর্যায়সমূহ

​মাইটোসিস কোষ বিভাজন প্রধানত দুটি পর্যায়ে সম্পন্ন হয়, যথা: ক্যারিওকাইনেসিস ও ​সাইটোকাইনেসিস


● ​ক্যারিওকাইনেসিস

এটি চারটি দশায় বিভক্ত, যথা: প্রোফেজ মেটাফেজ, অ্যানাফেজ ও টেলোফেজ। চারটি দশার বৈশিষ্ট্য গুলি নিচে আলোচনা করা হল:


​i) প্রোফেজ

profej-dosha

  • ​এটি হল মাইটোসিসের দীর্ঘস্থায়ী দশা।
  • এই দশায় ​নিউক্লিয়াসটি আকারে বড় হয় এবং জলবিয়োজন শুরু হয়।
  • ​ক্রোমাটিন জালিকা ঘনীভূত হয়ে নির্দিষ্ট সংখ্যক ক্রোমোজোম গঠন করে।
  • ​প্রতিটি ক্রোমোজোম দুটি করে ক্রোমাটিড নিয়ে গঠিত হয়।
  • ​দশার শেষে নিউক্লিওলাস ও নিউক্লিয় পর্দার অবলুপ্তি ঘটে।

ii) মেটাফেজ

metafej-dosha

  • ​এটি ক্রোমোজোম গণনার জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত দশা।
  • এই পর্যায়ে ​নিউক্লিয় পর্দা সম্পূর্ণ অদৃশ্য হয়ে যায় এবং স্পিন্ডল তন্তু গঠিত হয়।
  • ​ক্রোমোজোমগুলো কোষের মাঝখানে বা বিষুবীয় অঞ্চলে  সারিবদ্ধভাবে সাজানো থাকে।
  • ​প্রতিটি ক্রোমোজোম তার সেন্ট্রোমিয়ার দিয়ে স্পিন্ডল তন্তুর সাথে যুক্ত হয়।

iii) অ্যানাফেজ

kosh-bivajon-anafej-dosha

  • ​এটি হল মাইটোসিসের সংক্ষিপ্ততম দশা।
  • ​এই দশায় প্রতিটি ক্রোমোজোমের সেন্ট্রোমিয়ার লম্বালম্বিভাবে বিভক্ত হয়ে যায়।
  • ​অপত্য ক্রোমোজোমগুলো বিপরীত মেরুর দিকে অগ্রসর হতে থাকে।
  • ​চলনের সময় ক্রোমোজোমগুলোকে ইংরেজি V, L, J বা I অক্ষরের মতো দেখায়।

iv) টেলোফেজ

kosh-bivajon-telofej-dosha

  • ​এটি প্রোফেজের ঠিক বিপরীত দশা।
  • ​ক্রোমোজোমগুলো বিপরীত মেরুতে পৌঁছানোর পর আবার সরু ও লম্বা হয়ে ক্রোমাটিন জালিকায় পরিণত হয়।
  • ​জলযোজন ঘটে এবং নিউক্লিওলাস ও নিউক্লিয় পর্দার পুনরায় আবির্ভাব ঘটে।
  • ​একটি কোষে দুটি অপত্য নিউক্লিয়াস গঠিত হয়।


● ​সাইটোকাইনেসিস

​ক্যারিওকাইনেসিস শেষ হওয়ার পর সাইটোপ্লাজম বিভক্ত হয়।

প্রাণীকোষে: কোষের মাঝখানে ক্লিভেজ বা খাঁজ সৃষ্টির মাধ্যমে  বিভাজন ঘটে।

উদ্ভিদকোষে: কোষের মাঝখানে কোষপাত গঠিত হওয়ার মাধ্যমে বিভাজন সম্পন্ন হয়।


◼ মাইটোসিসের গুরুত্ব ও তাৎপর্য

দৈহিক বৃদ্ধি: জাইগোট থেকে বহুকোষী জীবের সৃষ্টি এবং বৃদ্ধিতে মাইটোসিস সাহায্য করে।

ক্ষয়পূরণ: শরীরের কোনো অংশ ক্ষতবিক্ষত হলে নতুন কোষ তৈরির মাধ্যমে তা মেরামত করে।

গুণগত স্থিতিশীলতা: অপত্য কোষে ক্রোমোজোম সংখ্যা ধ্রুবক রেখে প্রজাতির বৈশিষ্ট্য বজায় রাখে।

অযৌন জনন: অনেক নিম্নশ্রেণির জীব মাইটোসিসের মাধ্যমে বংশবৃদ্ধি করে।


3. মিয়োসিস


সংজ্ঞা: ​যে কোষ বিভাজন প্রক্রিয়ায় একটি উন্নত শ্রেণির জনন-মাতৃকোষ বিভাজিত হয়ে মাতৃকোষের অর্ধেক সংখ্যক ক্রোমোজোম বিশিষ্ট চারটি অপত্য কোষ (গ্যামেট) তৈরি করে, তাকে মিয়োসিস বলে।


meiosis-kosh-bivajon


◼ মিয়োসিসের স্থান

  • উন্নত প্রাণী: উন্নত প্রাণীর দেহে, প্রধানত শুক্রাশয়ের ভেতরে শুক্রাণু মাতৃকোষে এবং ডিম্বাশয়ের ভেতরে ডিম্বাণু মাতৃকোষে মিয়োসিস ঘটে। এর মাধ্যমে হ্যাপ্লয়েড (n) শুক্রাণু ও ডিম্বাণু তৈরি হয়।
  • নিম্নশ্রেণির প্রাণী: অনেক সময় জাইগোটে মিয়োসিস ঘটে, যাকে 'জাইগোটিক মিয়োসিস' বলে।
  • সপুষ্পক উদ্ভিদ: ফুলের জনন অঙ্গেও মিয়োসিস কোষ বিভাজন ঘটে। পরাগধানীর ভেতরে পরাগ মাতৃকোষে এবং ডিম্বকের  ভেতরে স্ত্রী-রেণু মাতৃকোষে মিয়োসিস সম্পন্ন হয়।
  • অপুষ্পক উদ্ভিদ: ফার্ন, মস্ ইত্যাদি কিছু অপুষ্পক উদ্ভিদের ক্ষেত্রে রেণু উৎপাদন কালে রেণু মাতৃকোষে মিয়োসিস ঘটে।


মিয়োসিসের পর্যায়সমূহ

​মিয়োসিস প্রক্রিয়াটি দুটি প্রধান পর্যায়ে সম্পন্ন হয়:


​ক) মিয়োসিস-I (প্রথম বিভাজন):

​এটিই প্রকৃত হ্রাসমূলক বিভাজন। এর প্রধান উপ-দশাগুলো হলো:

  • প্রোফেজ-I: এটি দীর্ঘতম ও জটিল দশা। এটি পাঁচটি উপদশায় বিভক্ত: লেপটো টিন, জাইগোটিন, প্যাকাইটিন (এখানেই ক্রসিং ওভার ঘটে), ডিপ্লোটিন ও ডায়াকাইনেসিস।
  • মেটাফেজ-I: সমসংস্থ ক্রোমোজোম জোড়া বিষুবীয় অঞ্চলে অবস্থান করে।
  • অ্যানাফেজ-I: ক্রোমোজোমগুলো বিপরীত মেরুর দিকে ধাবিত হয়।
  • টেলোফেজ-I: দুটি অপত্য নিউক্লিয়াস তৈরি হয়।

​খ) মিয়োসিস-II (দ্বিতীয় বিভাজন):

​এটি অনেকটা মাইটোসিসের মতোই সরল বিভাজন। এখানে ক্রোমোজোম সংখ্যার আর কোনো পরিবর্তন হয় না, কেবল ক্রোমাটিডগুলো আলাদা হয়। এর ফলে শেষ পর্যন্ত মোট চারটি হ্যাপ্লয়েড (n) কোষ তৈরি হয়।


◼ মিয়োসিসের বৈশিষ্ট্য

  • ঘটনাস্থল: এটি প্রধানত প্রাণীর জনন মাতৃকোষে (শুক্রাশয় ও ডিম্বাশয়) এবং উদ্ভিদের পরাগধানী ও ডিম্বকে ঘটে।
  • অপত্য কোষের সংখ্যা: এই কোষ বিভাজন প্রক্রিয়ায় একটি মাতৃকোষ থেকে চারটি অপত্য কোষ সৃষ্টি হয়।
  • ক্রোমোজোম সংখ্যা: অপত্য কোষের ক্রোমোজোম সংখ্যা মাতৃকোষের ক্রোমোজোম সংখ্যার অর্ধেক (n) হয়।
  • বিভাজনের প্রকৃতি: এখানে নিউক্লিয়াস পরপর দুবার বিভাজিত হয় (মিয়োসিস-I এবং মিয়োসিস-II), কিন্তু ক্রোমোজোম বিভাজিত হয় মাত্র একবার।
  • জিনগত বৈচিত্র্য: মিয়োসিসের প্রোফেজ-1 পর্যায়ে ক্রসিং ওভার ঘটে, যার ফলে ডিএনএ-র আদান-প্রদান হয় এবং নতুন বৈশিষ্ট্যের উদ্ভব ঘটে।


মিয়োসিসের গুরুত্ব ও তাৎপর্য 

  • ক্রোমোজোম সংখ্যা ধ্রুবক রাখা: প্রজন্মান্তরে প্রজাতির ক্রোমোজোম সংখ্যা নির্দিষ্ট রাখতে মিয়োসিস অপরিহার্য। যদি এটি না হতো, তবে বংশপরম্পরায় ক্রোমোজোম সংখ্যা দ্বিগুণ হতে থাকত।
  • জীবজগতে বৈচিত্র্য: ক্রসিং ওভারের মাধ্যমে জিনের বিনিময় ঘটে, ফলে সন্তানদের মধ্যে নতুন বৈশিষ্ট্য দেখা যায় যা বিবর্তনে সাহায্য করে।
  • জনন কোষ সৃষ্টি: যৌন জননের জন্য প্রয়োজনীয় শুক্রাণু ও ডিম্বাণু (গ্যামেট) এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই তৈরি হয়।
  • জনুক্রম রক্ষা: উদ্ভিদের ক্ষেত্রে হ্যাপ্লয়েড ও ডিপ্লয়েড দশার আবর্তন বা জনুক্রম বজায় রাখতে এটি সাহায্য করে।


কোষ চক্র


একটি কোষের সৃষ্টি থেকে শুরু করে তার বৃদ্ধি এবং পরবর্তী বিভাজন পর্যন্ত যে পর্যায়ক্রমিক ঘটনাবলি চক্রাকারে আবর্তিত হয়, তাকে কোষ চক্র বলে।

kosh-chakra

কোষ চক্রের প্রধান পর্যায়সমূহ

​কোষ চক্র প্রধানত দুটি প্রধান ভাগে বিভক্ত, যথা: ইন্টারফেজ  (প্রস্তুতিমূলক দশা) এবং M-দশা বা মাইটোটিক দশা (প্রকৃত বিভাজন দশা)।


​1. ইন্টারফেজ

​এই দশায় কোষ পরবর্তী বিভাজনের জন্য তৈরি হয়। এটি তিনটি উপ-দশায় বিভক্ত:


i) ​G1 দশা: এটি কোষ চক্রের প্রথম দশা। এখানে প্রোটিন, RNA এবং কোষীয় অঙ্গাণু তৈরি হয়। এবং কোষটি আকারে বৃদ্ধি পায়।

ii) ​S দশা: এটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দশা। এখানে DNA সংশ্লেষ বা রেপ্লিকেশন ঘটে, যার ফলে DNA-র পরিমাণ দ্বিগুণ হয়ে যায়।

iii) ​G2 দশা: এটি বিভাজনের ঠিক আগের দশা। এখানে কোষ বিভাজনের জন্য প্রয়োজনীয় শক্তি (ATP) এবং স্পিন্ডল তন্তু তৈরির প্রোটিন সংশ্লেষিত হয়।


*​G0 দশা: কিছু কোষ (যেমন: মানুষের স্নায়ুকোষ, লোহিত রক্তকণিকা) বিভাজিত হয় না। এগুলি কোষ চক্রের G1 দশা থেকে বেরিয়ে একটি নিষ্ক্রিয় দশায় প্রবেশ করে, এটিকে G0 দশা বলে।

​2. M-দশা:

এই দশায় কোষটি সরাসরি বিভাজিত হয়। এটি দুটি ধাপে ঘটে:

  • ক্যারিওকাইনেসিস: নিউক্লিয়াসের বিভাজন (প্রোফেজ, মেটাফেজ, অ্যানাফেজ, টেলোফেজ)।
  • সাইটোকাইনেসিস: সাইটোপ্লাজমের বিভাজন।

​কোষ চক্রের নিয়ন্ত্রণ ও গুরুত্ব

কোষ চক্র কোনো বিশৃঙ্খল প্রক্রিয়া নয়, বরং এটি কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত একটু প্রক্রিয়া।

  • চেক পয়েন্ট: কোষ চক্রের তিনটি প্রধান চেক পয়েন্ট থাকে (G1, G2 এবং M চেক পয়েন্ট), যা নিশ্চিত করে যে আগের ধাপটি সঠিকভাবে সম্পন্ন হয়েছে কি না।
  • ক্যান্সার: যদি কোষ চক্রের নিয়ন্ত্রণ নষ্ট হয়ে যায়, তবে অনিয়ন্ত্রিত কোষ বিভাজন ঘটতে থাকে, যা টিউমার বা ক্যান্সার সৃষ্টি করে।


কোষ বিভাজনের গুরুত্ব


জীবের অস্তিত্ব রক্ষা এবং দৈহিক বিকাশে কোষ বিভাজনের ভূমিকা অপরিসীম। নীচে কোষ বিভাজনের গুরুত্ব গুলি বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:

1. দৈহিক বৃদ্ধি:

​একটি ক্ষুদ্র জাইগোট বা নিষিক্ত ডিম্বাণু থেকে শুরু করে পূর্ণাঙ্গ বহুকোষী জীব তৈরির মূল প্রক্রিয়া হলো মাইটোসিস কোষ বিভাজন। এই প্রক্রিয়ায় নতুন নতুন কোষ তৈরি হওয়ার ফলে জীবের আয়তন ও ওজনে বৃদ্ধি ঘটে।

​2. বংশবৃদ্ধি:

​অ্যামিবা ও অন্যান্য এককোষী জীবেরা অ্যামাইটোসিস বা মাইটোসিস প্রক্রিয়ায় বিভাজিত হয়ে সরাসরি বংশবৃদ্ধি করে। এছাড়া, যৌন জননের জন্য প্রয়োজনীয় গ্যামেট বা জনন কোষ (শুক্রাণু ও ডিম্বাণু) মিয়োসিস বিভাজনের মাধ্যমেই তৈরি হয়।

​3. ক্ষত নিরাময় ও ক্ষয়পূরণ

​আমাদের শরীরের কোনো অংশ কেটে গেলে বা আঘাতপ্রাপ্ত হলে সেই স্থানের কোষগুলো মারা যায়। এমন অবস্থায় মাইটোসিস বিভাজনের মাধ্যমে দ্রুত নতুন কোষ তৈরি হয়ে ওই ক্ষতস্থান পূরণ হয়। একইভাবে, লোহিত রক্তকণিকা বা ত্বকের কোষ গুলির মধ্যে থাকা মৃত কোষগুলোর জায়গায় নতুন কোষ প্রতিস্থাপিত হয়।

​4. ক্রোমোজোম সংখ্যা ধ্রুবক রাখা

​মিয়োসিস বিভাজনে ক্রোমোজোম সংখ্যা অর্ধেক হয়ে যায়। এর ফলে যখন শুক্রাণু (n) ও ডিম্বাণু (n) মিলিত হয়, তখন জাইগোটে ক্রোমোজোম সংখ্যা পুনরায় মাতৃকোষের সমান (2n) হয়ে ফিরে আসে। এটি প্রজাতির বৈশিষ্ট্যের ধারাবাহিকতা বজায় রাখে।

​5. প্রকরণ বা বৈচিত্র্য সৃষ্টি

​মিয়োসিস বিভাজনের সময় 'ক্রসিং ওভার' ঘটে, যার ফলে জিনের বিনিময় হয়। এর মাধ্যমে অপত্য জীবের মধ্যে নতুন বৈশিষ্ট্যের উদ্ভব ঘটে, যা জীবকে বিবর্তনে এবং পরিবেশের সাথে মানিয়ে নিতে সাহায্য করে।

​6. বংশগতির ধারা বজায় রাখা

​মাইটোসিস বিভাজনে মাতৃকোষের সমস্ত গুণাগুণ অপত্য কোষে হুবহু সঞ্চারিত হয়। এর ফলে একটি প্রজাতির চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য বংশপরম্পরায় স্থিতিশীল থাকে।


প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্নাবলী (FAQ)


1. কোষ বিভাজন কেন হয়?

উত্তর: জীবের বৃদ্ধি, বংশবিস্তার, মৃত কোষের প্রতিস্থাপন এবং ক্ষত নিরাময়ের জন্য কোষ বিভাজন হয়। মূলত জীবনের ধারাবাহিকতা বজায় রাখাই এর উদ্দেশ্য।


​2. কোন কোষ বিভাজনকে 'হ্রাসমূলক বিভাজন' বলা হয় এবং কেন?

উত্তর: মিয়োসিস কোষ বিভাজনকে হ্রাসমূলক বিভাজন বলা হয়। কারণ এই প্রক্রিয়ায় অপত্য কোষের ক্রোমোজোম সংখ্যা মাতৃকোষের ক্রোমোজোম সংখ্যার তুলনায় অর্ধেক হয়ে যায়।


​3. স্নায়ুকোষ বিভাজিত হয় না কেনো?

উত্তর: স্নায়ুকোষ বা নিউরনে সেন্ট্রোজোম থাকলেও তা নিষ্ক্রিয় থাকে। কোষ চক্রের শুরুতে এটি G1 দশা থেকে বেরিয়ে একটি স্থায়ী দশা বা G0 দশায় প্রবেশ করে, যার ফলে এটি আর বিভাজিত হতে পারে না।


​4. ক্রসিং ওভার কী? এটি গুরুত্বপূর্ণ কেনো?

উত্তর: মিয়োসিস-১ এর প্রোফেজ-১ দশায় দুটি সমসংস্থ ক্রোমোজোমের ক্রোমাটিডদ্বয়ের মধ্যে জিনের যে বিনিময় ঘটে, তাকে ক্রসিং ওভার বলে। এর ফলে নতুন বৈশিষ্ট্যের সৃষ্টি হয়, যা জীবের বিবর্তনে সাহায্য করে।


​5. অনিয়ন্ত্রিত কোষ বিভাজন হলে কী ঘটে?

উত্তর: কোষ বিভাজন সাধারণত নির্দিষ্ট নিয়মে চলে। কিন্তু কোষ চক্রের নিয়ন্ত্রণ নষ্ট হয়ে গেলে কোষগুলো অস্বাভাবিকভাবে দ্রুত বিভাজিত হতে থাকে। এর ফলে জীবদেহে টিউমার এবং শেষ পর্যন্ত ক্যান্সার সৃষ্টি হতে পারে।


​6. মাইটোসিস ও মিয়োসিসের প্রধান পার্থক্য কী?

উত্তর: মাইটোসিস দেহকোষে ঘটে এবং ক্রোমোজোম সংখ্যা সমান থাকে। অন্যদিকে, মিয়োসিস জনন মাতৃকোষে ঘটে এবং ক্রোমোজোম সংখ্যা অর্ধেক হয়ে যায়।


​7. ইন্টারফেজ দশাকে 'প্রস্তুতিমূলক দশা' বলা হয় কেন?

উত্তর: ইন্টারফেজ দশায় কোষ সরাসরি বিভাজিত হয় না, বরং বিভাজনের জন্য প্রয়োজনীয় DNA রেপ্লিকেশন, প্রোটিন এবং শক্তি (ATP) সংগ্রহ করে নিজেকে প্রস্তুত করে। তাই ইন্টারফেজ দশাকে 'প্রস্তুতিমূলক দশা' বলা হয়।

*

Post a Comment (0)
Previous Post Next Post