কোষ কী
প্রতিটি জীবদেহ এক বা একাধিক কোষ দ্বারা গঠিত। এবং জীবদেহের সমস্ত জৈবিক ক্রিয়াগুলো কোষের মধ্যেই সম্পন্ন হয়। জীবদেহের পরিপাক, পুষ্টি, শ্বসন, রেচন, বৃদ্ধি, জনন ইত্যাদি জৈবিক কাজগুলি কোষে এককভাবে সম্পন্ন হতে পারে। তাই সহজ কথায় বলতে গেলে, জীবদেহের গঠনগত ও কার্যগত একককে কোষ বলে।
1665 সালে ব্রিটিশ বিজ্ঞানী রবার্ট হুক প্রথমবার একটি সাধারণ অণুবীক্ষণ যন্ত্রে কর্কের পাতলা ছেদ পর্যবেক্ষণ করেন। তারমধ্যে তিনি মৌচাকের মতো ছোট ছোট বেশ কয়েকটি কুঠুরি দেখতে পান। তারপর তিনি সেগুলোর নাম দেন 'সেল' (Cell)। 'সেল 'শব্দটি লাতিন শব্দ 'Cellula' থেকে এসেছে, যার অর্থ হলো ছোট ঘর। তবে তিনি যে কোষটি পর্যবেক্ষণ করেছিলেন সেটি ছিল একটি মৃত কোষ। পরবর্তীতে বিজ্ঞানী অ্যান্থনি ভ্যান লিউয়েনহুক প্রথম জীবিত কোষ পর্যবেক্ষণ করেন।
কোষের প্রকারভেদ
নিউক্লিয়াসের গঠনের ওপর ভিত্তি করে কোষকে প্রধানত দুই ভাগে ভাগ করা যায়, যথাঃ আদি কোষ বা প্রোক্যারিওটিক কোষ এবং আদর্শ কোষ বা ইউক্যারিওটিক কোষ।
1. প্রোক্যারিওটিক বা আদি কোষ
যেসব কোষের নিউক্লিয়াস সুগঠিত নয় এবং পর্দাবেষ্টিত কোনো কোষ অঙ্গাণু থাকে না, তাদের আদি কোষ বা প্রোক্যারিওটিক কোষ বলে।
যেমন: ব্যাক্টেরিয়া, নীলাভ-সবুজ শৈবাল, মাইকোপ্লাজমা, আর্কিয়া ইত্যাদি।
প্রোক্যারিওটিক কোষ বা আদি কোষের প্রধান বৈশিষ্ট্য:
i) অসুগঠিত নিউক্লিয়াস: এতে কোনো প্রকৃত বা সুগঠিত নিউক্লিয়াস থাকে না। অর্থাৎ, এই প্রকার কোষে নিউক্লিয় পর্দা এবং নিউক্লিওলাস অনুপস্থিত থাকে।
ii) নিউক্লিওয়েড: এই ধরনের কোষের ডি.এন.এ. (DNA) কোনো পর্দা দিয়ে ঘেরা থাকে না, বরং সাইটোপ্লাজমে উন্মুক্ত অবস্থায় থাকে। এই অঞ্চলটিকে নিউক্লিওয়েড বলা হয়।
iii) পর্দাবেষ্টিত অঙ্গাণুর অনুপস্থিতি: আদি কোষে মাইটোকনড্রিয়া, গলগি বডি, এন্ডোপ্লাজমিক রেটিকুলাম বা ক্লোরোপ্লাস্টের মতো কোনো পর্দাঘেরা অঙ্গাণু থাকে না।
iv) রাইবোজোম: আদি কোষে কেবল 70S প্রকৃতির রাইবোজোম লক্ষ্য করা যায়, যা প্রোটিন তৈরিতে সাহায্য করে।
v) কোষ বিভাজন: এই প্রকার কোষগুলি সাধারণত অ্যামাইটোসিস বা বাইনারি ফিশন পদ্ধতিতে বিভাজিত হয়।
প্রোক্যারিওটিক বা আদি কোষের গঠন:
• কোষ প্রাচীর: এই প্রকার কোষের কোষ প্রাচীরটি বেশ শক্ত এবং প্রধানত পেপটিডোগ্লাইক্যান নামক শর্করা ও প্রোটিন দিয়ে গঠিত। এটি কোষকে নির্দিষ্ট আকার ও সুরক্ষা প্রদান করে।
• কোষ পর্দা: কোষ প্রাচীরের ঠিক নিচে থাকা পাতলা পর্দার মতো অংশটি হল কোষ পর্দা। এটি প্রধানত লিপিড ও প্রোটিন দ্বারা গঠিত। এটি কোষের ভেতর ও বাইরে পদার্থের যাতায়াত নিয়ন্ত্রণ করে।
• মেসোজোম: কোষ পর্দা ভেতরের দিকে ভাঁজ হয়ে একদিকে থলির মতো একটি অংশ গঠন করে, এটিকে মেসোজোম বলে। এটি কোষের শ্বসন ও শক্তি উৎপাদনে মাইটোকনড্রিয়ার মতো কাজ করে।
• সাইটোপ্লাজম: কোষপ্রাচীর ও কোষ পর্দার পরবর্তী অংশে, কোষের ভেতরের দিকে যে ঘন ও দানাদার তরল পদার্থ থাকে, তাকে সাইটোপ্লাজম বলে। এখানেই কোষের যাবতীয় রাসায়নিক বিক্রিয়া গুলি ঘটে।
• প্লাজমিড: মূল ডিএনএ ছাড়াও অনেক ব্যাক্টেরিয়া কোষে ছোট, গোলাকার অতিরিক্ত ডিএনএ থাকে, যা প্লাজমিড নামে পরিচিত। এটি জিনগত প্রকৌশলে খুব গুরুত্বপূর্ণ।
• ফ্ল্যাজেলাম ও পিলি: আদিকোষ গঠিত জীবের চলাচলের জন্য চাবুকের মতো ফ্ল্যাজেলা নামে একটি অংশ থাকে এবং কোনো কিছুর সাথে আটকে থাকার জন্য ছোট রোঁয়ার মতো পিলি নামক অংশ থাকে।
2. ইউক্যারিওটিক বা আদর্শ কোষ
যে সব কোষের নিউক্লিয়াস সুগঠিত এবং সাইটোপ্লাজমে পর্দাঘেরা কোষ অঙ্গাণু থাকে, তাদের ইউক্যারিওটিক বা আদর্শ কোষ বলে। উন্নত শ্রেণীর উদ্ভিদ, প্রাণী এবং ছত্রাক প্রধানত এই ধরণের কোষ দ্বারা গঠিত।
যেমন: উন্নত শ্রেনীর উদ্ভিদ ও প্রাণী কোষ।
ইউক্যারিওটিক বা আদর্শ কোষের প্রধান বৈশিষ্ট্যসমূহ:
• সুগঠিত নিউক্লিয়াস: এই প্রকার কোষে নিউক্লিয় পর্দা, নিউক্লিওপ্লাজম, নিউক্লিওলাস এবং ক্রোমাটিন জালিকা নিয়ে নিউক্লিয়াসটি গঠিত।
• পর্দাঘেরা অঙ্গাণু: এই ধরনের কোষে মাইটোকনড্রিয়া, গলগি বডি, প্লাস্টিড, এন্ডোপ্লাজমিক রেটিকুলাম ইত্যাদি পর্দাঘেরা কোষ অঙ্গাণু উপস্থিত থাকে।
• ডিএনএ (DNA): এদের ডিএনএ সূত্রাকার আকৃতি বিশিষ্ট হয় এবং হিস্টোন প্রোটিনের সাথে যুক্ত হয়ে ক্রোমোজোম গঠন করে।
• রাইবোজোম: এই ধরনের কোষে উন্নত 80S প্রকৃতির রাইবোজোম থাকে।
• কোষ বিভাজন: এই কোষগুলি প্রধানত মাইটোসিস ও মিয়োসিস পদ্ধতিতে বিভাজিত হয়।
ইউক্যারিওটিক বা আদর্শ কোষের গঠন:
একটি আদর্শ ইউক্যারিওটিক কোষ সাধারণত নিম্নলিখিত অংশ নিয়ে গঠিত:
• কোষ প্রাচীর: আদর্শ কোষের একেবারে বাইরের দিকে যে পুরু প্রাচীরের মতো অংশটি থাকে তাকে কোষ প্রাচীর বলে। এটি শুধুমাত্র উদ্ভিদ ও ব্যাকটেরিয়ার কোষে দেখা যায়। এই অংশটি প্রধানত সেলুলোজ দ্বারা গঠিত। এটি কোষকে একটি নির্দিষ্ট আকার দেয় এবং বাইরের আঘাত থেকে কোষ-মধ্যস্থ অংশগুলিকে রক্ষা করে।
• কোষ পর্দা: আদর্শ কোষের সাইটোপ্লাজমকে ঘিরে যে সূক্ষ্ম, সজীব আবরণ থাকে তাকে কোষ পর্দা বলে। এটি মূলত প্রোটিন ও লিপিড দ্বারা গঠিত। উদ্ভিদ ও প্রাণী উভয় প্রকার কোষেই কোষ পর্দা দেখা যায়। কোষের ভেতর ও বাইরে পদার্থের যাতায়াত নিয়ন্ত্রণ করে। কোষ পর্দা হল একপ্রকার অর্ধভেদ্য পর্দা, যা কোষের ভেতরে পদার্থের যাতায়াত নিয়ন্ত্রণ করে।
• সাইটোপ্লাজম: কোষ পর্দার ভেতরে এবং নিউক্লিয়াসের বাইরের অংশে যে অর্ধতরল, দানাদার ও জেলির মত অংশ থাকে তাকে সাইটোপ্লাজম বলে। এই অংশেই কোষের যাবতীয় রাসায়নিক বিক্রিয়া গুলি ঘটে। আর এখানেই মাইটোকনড্রিয়া, গলগি বডি, প্লাস্টিড, এন্ডোপ্লাজমিক রেটিকুলাম ইত্যাদি বিভিন্ন কোষ অঙ্গাণু ভাসমান থাকে।
• নিউক্লিয়াস: আদর্শ কোষের একেবারে ভেতরের দিকে সাইটোপ্লাজমের পর সবচেয়ে ঘন, পর্দা ঘেরা এবং প্রায় গোলাকার যে অংশটি থাকে, সেটিই হল নিউক্লিয়াস। এটি কোষের প্রায় সমস্ত জৈবনিক কাজ নিয়ন্ত্রণ করে এবং বংশগতির ধারক (DNA) বহন করে। তাই নিউক্লিয়াসকে 'কোষের মস্তিষ্ক' বলা হয়। এটি চারটি অংশ নিয়ে গঠিত:
- নিউক্লিয় পর্দা: নিউক্লিয়াসকে ঘিরে থাকা ছিদ্রযুক্ত আবরণ বা পর্দা বিশেষ।
- নিউক্লিওপ্লাজম: ভেতরে থাকা ঘন তরল।
- নিউক্লিওলাস: একটি ঘন গোলাকার অংশ যা রাইবোজোম তৈরিতে সাহায্য করে।
- নিউক্লিয়ার জালিকা বা ক্রোমাটিন: ডিএনএ (DNA) ও প্রোটিন দিয়ে গঠিত তন্তু, যা বংশগতির তথ্য বহন করে।
কোষ অঙ্গানু
• মাইটোকন্ড্রিয়া:
এগুলি আদর্শ কোষের সাইটোপ্লাজমে বিক্ষিপ্তাকারে ছড়িয়ে থাকে। গোলাকার, ডিম্বাকার বা রডের মত দেখতে। এদের মধ্যে কোষের শক্তি উৎপন্ন হয়, তাই মাইটোকন্ড্রিয়াকে 'কোষের শক্তিঘর' বলা হয়।
- গঠন: এটি দ্বি-স্তর বিশিষ্ট পর্দা দ্বারা ঢাকা থাকে। এর ভেতরের ভাঁজ হওয়া অংশকে 'ক্রিস্টি' বলে।
- কাজ: মাইটোকন্ড্রিয়ার প্রধান কাজ হল কোষীয় শ্বসনের মাধ্যমে শক্তি (ATP) উৎপাদন করা।
• রাইবোজোম:
আদর্শ কোষের সাইটোপ্লাজমে রাইবোজোম গুলি মুক্ত অবস্থায় ছড়িয়ে থাকে। আবার কিছু রাইবোজোম অমসৃণ এন্ডোপ্লাজমিক রেটিকুলামের (RER) গায়ে লেগে থাকে।
- গঠন: এটি কোনো পর্দা দ্বারা ঘেরা থাকে না। এটি সাধারণত RNA ও প্রোটিন দ্বারা গঠিত। এটিই হল কোষের একমাত্র অঙ্গাণু যা প্রোক্যারিওটিক ও ইউক্যারিওটিক উভয় কোষে উপস্থিত থাকে।
- কাজ: রাইবোজোমের প্রধান কাজ হলো প্রোটিন সংশ্লেষ করা। এটি DNA থেকে আসা সংকেত (mRNA) অনুযায়ী অ্যামিনো অ্যাসিড যুক্ত করে প্রোটিন চেইন তৈরি করে। তাই রাইবোজোমকে 'প্রোটিন তৈরির কারখানা' বলা হয়।
• এন্ডোপ্লাজমিক রেটিকুলাম:
এটি হলো কোষের সাইটোপ্লাজমে অবস্থিত একটি জটিল জালিকা আকারের অঙ্গাণু। এটি নিউক্লিয়াসের পর্দা থেকে শুরু করে কোষ পর্দা পর্যন্ত বিস্তৃত থাকে।
কাজ: এন্ডোপ্লাজমিক রেটিকুলাম সাইটোপ্লাজমকে বিভিন্ন অংশে বিভক্ত করে। এবং এটি কোষের এক অংশ থেকে অন্য অংশে প্রোটিন, লিপিড এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় রাসায়নিক পদার্থ পরিবহন করে।
• গলগি বডি:
আদর্শ কোষের সাইটোপ্লাজমে নিউক্লিয়াসের কাছে গলগি বডি গুলি পরপর সমান্তরালভাবে সাজানো থাকে। এগুলি প্রায় সমস্ত ইউক্যারিওটিক কোষেই উপস্থিত থাকে।
একে 'কোষের ট্রাফিক পুলিশ' বলা হয়।
- গঠন: এগুলো চ্যাপ্টা, নলাকার থলির মতো অংশ যা সমান্তরাল ভাবেএকটির ওপর একটি স্তরে সাজানো থাকে। উদ্ভিদ কোষে গলগি বডি গুলি ছোট ছোট অংশে বিভক্ত হয়ে সাইটোপ্লাজমে ছড়িয়ে থাকে, এগুলিকে বলা হয় ডিকটিওজোম।
- কাজ: এন্ডোপ্লাজমিক রেটিকুলাম থেকে আসা প্রোটিন এবং লিপিডকে গলগি বডি সংগ্রহ করে। এরপর সেগুলোকে ছোট ছোট ভেসিকলে প্যাকেট করে কোষের নির্দিষ্ট গন্তব্যে পাঠিয়ে দেয়। তাই একে 'কোষের ট্রাফিক পুলিশ' বলা হয়। এছাড়া, এটি কোষের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গাণু 'লাইসোজোম' তৈরিতে সরাসরি অংশ নেয়।
• লাইসোজোম:
লাইসোজোম গুলি আদর্শ কোষের সাইটোপ্লাজমে মূলত এন্ডোপ্লাজমিক রেটিকুলাম থেকে উৎপন্ন হয়। এরপর গলগি বডি দ্বারা প্রক্রিয়াজাত হয়ে পূর্ণাঙ্গ রূপ নেয়।
- গঠন: এগুলো সাধারণত ছোট, গোলাকার এবং ঘন থলির মতো আকৃতির হয়। এটি একটি পর্দা দ্বারা ঘেরা থাকে।
- কাজ: i) লাইসোজোম গুলি কোষের ভেতরে ঢোকা জটিল খাদ্যকণাকে হজম করতে সাহায্য করে। ii) এটি শ্বেত রক্তকণিকায় প্রচুর পরিমাণে থাকে এবং বাইরে থেকে আসা ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া বা ভাইরাসকে এনজাইমের সাহায্যে ধ্বংস করে। iii) যখন কোনো কোষ যদি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় বা মারা যায়, তখন লাইসোজোম ফেটে গিয়ে তার ভেতরের উৎসেচক বের করে দেয়। এই উৎসেচক গুলি তারপর নিজের কোষটিকেই সম্পূর্ণ ধ্বংস করে ফেলে। এই কারণেই লাইসোজোমকে 'আত্মঘাতী থলি' বলা হয়।
• প্লাস্টিড:
প্লাস্টিড হল উদ্ভিদ কোষের অন্যতম প্রধান অঙ্গানু। এগুলি আদর্শ কোষের সাইটোপ্লাজমের অবস্থান করে। সাধারণত ডিম্বাকার বা উপবৃত্তাকার আকৃতির হয়ে থাকে।
রঞ্জক পদার্থের উপস্থিতি বা অনুপস্থিতির ওপর ভিত্তি করে প্লাস্টিডকে প্রধানত তিন ভাগে ভাগ করা যায়:
i) ক্লোরোপ্লাস্ট: সবুজ রঙের প্লাস্টিডকে বলে ক্লোরোপ্লাস্ট। এটিতে ক্লোরোফিল নামক সবুজ রঙের রঞ্জক পদার্থ থাকে।
- কাজ: ক্লোরোপ্লাস্টের প্রধান কাজ হল সূর্যের আলোর উপস্থিতিতে সালোকসংশ্লেষ প্রক্রিয়ায় শর্করা জাতীয় খাদ্য তৈরি করা। তাই একে 'কোষের রান্নাঘর' বলা হয়।
ii) ক্রোমোপ্লাস্ট: এটি লাল, কমলা বা হলুদ রঙের হয়ে থাকে। এতে ক্যারোটিন বা জ্যান্থোফিল নামক রঞ্জক পদার্থ থাকে।
- কাজ: এর প্রধান কাজ হলো ফুল ও ফলকে আকর্ষণীয় রঙ প্রদান করা, যা পরাগায়ন ও বীজ বিস্তারে সাহায্য করে।
iii) লিউকোপ্লাস্ট: এটি হল বর্ণহীন প্লাস্টিড। এই প্লাস্টিড গুলি উদ্ভিদদেহে যেখানে সূর্যের আলো পৌঁছায় না সেই জায়গাগুলিতে (যেমন- মূল ও ভূ-নিম্নস্থ কাণ্ডে) অবস্থান করে।
- কাজ: এর প্রধান কাজ হলো খাদ্য সঞ্চয় করা।
• সেন্ট্রোজোম:
এটি হলো আদর্শ প্রাণী কোষের সাইটোপ্লাজমে, নিউক্লিয়াসের কাছে অবস্থিত একটি পর্দা বিহীন, তারকাকারের অঙ্গাণু। এটি কোষ বিভাজনে প্রধান ভূমিকা পালন করে।
- গঠন: একটি সেন্ট্রোজোম প্রধানত দুটি অংশ নিয়ে গঠিত, যথা: i) সেন্ট্রিওল: সেন্ট্রোজোমের কেন্দ্রে দুটি ছোট, পিপার মতো বা দণ্ডাকৃতি অংশ থাকে, এদের সেন্ট্রিওল বলে। এরা একে অপরের সাথে 90 ডিগ্রি কোণে অবস্থান করে। সেন্ট্রিওলগুলো 9টি অণুনালিকা এর ত্রয়ী দিয়ে গঠিত। ii) সেন্ট্রোস্ফিয়ার: সেন্ট্রিওলকে ঘিরে থাকা স্বচ্ছ ও ঘন সাইটোপ্লাজমের স্তরকে সেন্ট্রোস্ফিয়ার বলে।
- কাজ: প্রাণী কোষ বিভাজনের সময় সেন্ট্রিওল দুটি দুই মেরুতে চলে যায় এবং 'অ্যাস্টার রশ্মি'র মাধ্যমে বেম তন্তু বা স্পিন্ডল ফাইবার গঠন করে। এটি ক্রোমোজোমের চলনে সহায়তা করে। এছাড়া, কোষের অভ্যন্তরীণ কঙ্কাল বা সাইটোস্কেলিটন তৈরিতে সেন্ট্রোজোম বিশেষ ভূমিকা রাখে।
• ভ্যাকুওল বা কোষগহ্বর:
কোষের সাইটোপ্লাজমে অবস্থিত পর্দাঘেরা একটি যে গহ্বর গুলি জল, রসদ এবং বর্জ্য পদার্থ ধারণ করে, সেগুলি ভ্যাকুওল বা কোষগহ্বর বলে। উদ্ভিদ কোষে ভ্যাকুওলগুলি যথেষ্ট বড়ো ও সুস্পষ্ট এবং প্রাণী কোষে ভ্যাকুওলগুলি আকারে অপেক্ষাকৃত ছোটো হয়।
- গঠন: ভ্যাকুওল যে পাতলা সজীব পর্দা দিয়ে ঘেরা থাকে, তাকে 'টোনোপ্লাস্ট' বলে। এর ভেতরে যে তরল পদার্থ থাকে, সেটি হল কোষরস। এতে জল, শর্করা, অ্যামিনো অ্যাসিড, খনিজ লবণ এবং কিছু বর্জ্য পদার্থ থাকে।
- কাজ: ভ্যাকুওল জল শোষণ করে স্ফীত হয়, যা উদ্ভিদ কোষকে দৃঢ়তা প্রদান করে। এবং এটি প্রয়োজনীয় পুষ্টি উপাদান যেমন, শর্করা, প্রোটিন এবং অপ্রয়োজনীয় বর্জ্য পদার্থ সাময়িকভাবে সঞ্চয় করে রাখে।
আদি কোষ ও আদর্শ কোষের পার্থক্য
| বিষয় | আদি কোষ বা প্রোক্যারিওটিক কোষ | আদর্শ কোষ বা ইউক্যারিওটিক কোষ |
|---|---|---|
| 1. আকার | এই কোষ তুলনামূলক ভাবে ছোটো | এই কোষ তুলনামূলক ভাবে বড় |
| 2. নিউক্লিয়াস | এই কোষে সুগঠিত নিউক্লিয়াস থাকে না। নিউক্লিও পর্দা ও নিউক্লিওলাস অনুপস্থিত থাকে। | এই কোষে সুগঠিত নিউক্লিয়াস থাকে। নিউক্লিও পর্দা, নিউক্লিওলাস ও নিউক্লিওপ্লাজম উপস্থিত থাকে। |
| 3. পর্দাঘেরা অঙ্গাণু | এই কোষে মাইটোকন্ড্রিয়া, গলগি বডি, ক্লোরোপ্লাস্ট ইত্যাদি পর্দাঘেরা অঙ্গাণু থাকে না। | এই কোষে মাইটোকন্ড্রিয়া, গলগি বডি, ক্লোরোপ্লাস্ট ইত্যাদি পর্দাঘেরা অঙ্গাণু উপস্থিত থাকে। |
| 4. শ্বসন | এই কোষে কোষপর্দার ভাঁজ বা 'মেসোজোম'-এর মাধ্যমে শ্বসন ঘটে। | এই কোষে মাইটোকন্ড্রিয়ার মাধ্যমে সবাত শ্বসন সম্পন্ন হয়। |
| 5. DNA-এর প্রকৃতি | DNA বৃত্তাকার এবং হিস্টোন প্রোটিন থাকে না। | DNA সূত্রাকার এবং হিস্টোন প্রোটিন যুক্ত হয়ে ক্রোমোজোম গঠন করে। |
| 6. রাইবোজোম | ক্ষুদ্রাকৃতির এবং 70S প্রকৃতির। | অপেক্ষাকৃত বড় এবং 80S প্রকৃতির। |
| 7. কোষ বিভাজন | মূলত অ্যামাইটোসিস পদ্ধতিতে কোষ বিভাজন ঘটে। | মাইটোসিস ও মিয়োসিস পদ্ধতিতে কোষ বিভাজন ঘটে। |
| 8. উদাহরণ | ব্যাকটেরিয়া, নীললাভ সবুজ শৈবাল। | উন্নত উদ্ভিদ ও প্রাণী কোষ, ছত্রাক, প্রোটোজোয়া। |
প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQ)
1. কোষ কাকে বলে?
উত্তর: জীবদেহের গঠনগত ও কার্যগত একককে কোষ বলা হয়। এটি হল জীবদেহের ক্ষুদ্রতম একক যা স্বনির্ভর এবং জননে সক্ষম।
2. কোষ কে আবিষ্কার করেন?
উত্তর: 1665 খ্রিস্টাব্দে বিজ্ঞানী রবার্ট হুক প্রথম কোষ আবিষ্কার করেন। তবে তিনি যে কোষগুলি পর্যবেক্ষণ করেছিলেন তা ছিল মৃত। পরবর্তীকালে বিজ্ঞানী অ্যান্টনি ভ্যান লিউয়েনহুক প্রথম সজীব কোষ পর্যবেক্ষণ করেন।
3. মাইটোকনড্রিয়াকে 'কোষের শক্তিঘর' বলা হয় কেন?
উত্তর: কোষের যাবতীয় কাজের জন্য প্রয়োজনীয় শক্তি ATP আকারে মাইটোকনড্রিয়ার মধ্যে উৎপন্ন হয়। তাই মাইটোকনড্রিয়াকে কোষের শক্তিঘর বলা হয়।
4. লাইসোজোমকে 'আত্মঘাতী থলি' বলে কেন?
উত্তর: লাইসোজোমের মধ্যে থাকে একপ্রকার শক্তিশালী পাচক উৎসেচক। যদি কখনো কোনো কারণে কোষ ক্ষতিগ্রস্ত হয় বা মারা যায়, তবে লাইসোজোম ফেটে গিয়ে নিজের ভেতরে থাকা ওই পাঁচক উৎসেচক নিঃসরণ করে দেয়। এর মাধ্যমে সে তার নিজের কোষকে ধ্বংস করে ফেলতে পারে। এই কারণেই লাইসোজোমকে 'আত্মঘাতী থলি' বলা হয়।
5. রাইবোজোমের প্রধান কাজ কী?
উত্তর: রাইবোজোমের প্রধান কাজ হলো প্রোটিন সংশ্লেষ করা। তাই একে কোষের 'প্রোটিন ফ্যাক্টরি' বলা হয়।
6. কোষের 'মস্তিষ্ক' কাকে বলা হয়?
উত্তর: নিউক্লিয়াসকে কোষের মস্তিষ্ক বলা হয়, কারণ এটি কোষের সমস্ত বিপাকীয় এবং জৈবনিক ক্রিয়া নিয়ন্ত্রণ করে।


