আলোর প্রতিফলন, প্রতিসরণ ও বিচ্ছুরণ সহজ ভাষায় ব্যাখ্যা

আলো কী 


​আলো হলো এক ধরণের শক্তি, যা আমাদের চোখে দর্শনের অনুভূতি জাগায়। এটি তড়িৎচৌম্বকীয় তরঙ্গ হিসেবে চলাচল করে। আলোর চলাচলের জন্য কোনো মাধ্যমের প্রয়োজন হয় না; এটি শূন্যস্থানের মধ্য দিয়েও চলাচল করতে পারে। কোন বস্তু থেকে নির্গত বা প্রতিফলিত আলো আমাদের চোখে পৌছলে আমরা সেই বস্তুটিকে দেখতে পাই।

আলোর গতি: শূন্যস্থানে আলোর গতি প্রতি সেকেন্ডে প্রায় 3,00,000 কিলোমিটার ($3 \times 10^8 m/s$)।


আলোর প্রতিফলন 


যখন আলো এক মাধ্যম দিয়ে চলতে চলতে অন্য কোনো মাধ্যমের উপরিভাগে আপতিত হয় এবং বাধা পেয়ে পুনরায় প্রথম মাধ্যমেই ফিরে আসে, তখন সেই ঘটনাকে আলোর প্রতিফলন বলা হয়।


light-reflection-diagram-in-bengali


• প্রতিফলনের উপাদানসমূহ

আলোর প্রতিফলন বুঝতে হলে কিছু নির্দিষ্ট পরিভাষা জানা প্রয়োজন:

প্রতিফলক: যে দলে আলোর প্রতিফলন ঘটে সেই দলকে প্রতিফলক বলে।

আপতিত রশ্মি: যে আলোক রশ্মিটি প্রতিফলক তলের ওপর এসে পড়ে, তাকে আপতিত রশ্মি বলে।

প্রতিফলিত রশ্মি: প্রতিফলনের ফলে বাধা পেয়ে যে রশ্মিটি ফিরে যায়, তাকে প্রতিফলিত রশ্মি বলে।

আপতন বিন্দু: প্রতিফলক তলের যে বিন্দুতে আলো এসে পড়ে, তাকে আপাতত বিন্দু বলে।

অভিলম্ব: আপতন বিন্দুতে প্রতিফলক তলের ওপর অঙ্কিত লম্বকে অভিলম্ব বলে।

আপতন কোণ: আপতিত রশ্মি অভিলম্বের সাথে যে কোণ উৎপন্ন করে তাকে আপাতন কোন বলে।

প্রতিফলন কোণ: প্রতিফলিত রশ্মি অভিলম্বের সাথে যে কোণ উৎপন্ন করে, তাকে প্রতিফলন কোন বলে।


• প্রতিফলনের সূত্র 

আলোর প্রতিফলন দুটি নির্দিষ্ট সূত্র মেনে চলে:

i) ​আপতিত রশ্মি, প্রতিফলিত রশ্মি এবং আপতন বিন্দুতে প্রতিফলকের ওপর অঙ্কিত অভিলম্ব সর্বদা একই সমতলে থাকে।

ii)আপতন কোণ এবং প্রতিফলন কোণ সর্বদা সমান হয় (i = r)। অর্থাৎ, আলো যদি 30° কোণে আপতিত হয়, তবে তা 30° কোণেই প্রতিফলিত হবে।


• প্রতিফলনের প্রকারভেদ

প্রতিফলক তলের প্রকৃতির ওপর ভিত্তি করে আলোর প্রতিফলন কে দুটি ভাগে ভাগ করা যায়:

niyomito-protifalon-o-bikkhipto-protifalon

i) নিয়মিত প্রতিফলন: যখন সমান্তরাল আলোক রশ্মিগুচ্ছ কোনো মসৃণ ও চকচকে তলে আপতিত হয়, তখন প্রতিফলনের পর প্রতিফলিত আলোকরশ্মি গুলি সমান্তরাল রশ্মি হিসেবে একটি নির্দিষ্ট দিকে চলে যায়। এই ধরনের আলোর প্রতিফলন কে নিয়মিত প্রতিফলন বলে। এর ফলে স্পষ্ট প্রতিবিম্ব তৈরি হয়।

যেমন: সমতল দর্পণ, স্থির জল ইত্যাদিতে নিয়মিত প্রতিফলন ঘটে।


ii) বিক্ষিপ্ত প্রতিফলন: যখন সমান্তরাল আলোক রশ্মিগুচ্ছ কোনো অমসৃণ তলে আপতিত হয়, তখন প্রতিফলনের পর প্রতিফলিত রশ্মিগুলি বিভিন্ন দিকে ছড়িয়ে পড়ে। এই ধরনের আলোর প্রতিফলনকে বিক্ষিপ্ত প্রতিফলন বলে। এক্ষেত্রে কোনো স্পষ্ট প্রতিবিম্ব দেখা যায় না, তবে বস্তুটিকে সব দিক থেকে দেখা সম্ভব হয়।

যেমন: গাছপালা, ঘরবাড়ি, জামাকাপড় ইত্যাদিতে আলোর বিক্ষিপ্ত প্রতিফলন ঘটে।


আলোর প্রতিসরণ


• প্রতিসরণ কী?

আলোক রশ্মি যখন একটি স্বচ্ছ মাধ্যম থেকে অন্য একটি স্বচ্ছ মাধ্যমে  তির্যকভাবে প্রবেশ করে, তখন মাধ্যম দুটির বিভেদতল থেকে আলোক রশ্মির গতির অভিমুখ বা দিক পরিবর্তিত হয়। আলো রশ্মির গতিপথের এই দিক পরিবর্তনের ঘটনাকেই প্রতিসরণ বলা হয়।


refraction-of-light-in-bengali


• প্রতিসরণ কেন ঘটে?

ভিন্ন ভিন্ন মাধ্যমে আলোর গতিবেগ ভিন্ন হয়। যেমন:

  • ​শূন্যস্থানে বা বায়ুতে আলোর গতিবেগ সবচেয়ে বেশি, প্রায় $3 \times 10^8 m/s$।
  • ​জলে আলোর গতিবেগ কিছুটা কম, প্রায় $2.25 \times 10^8 m/s$।
  • ​কাঁচের মধ্যে আরও কম, প্রায় $2 \times 10^8 m/s$।

​যখন আলো এক মাধ্যম থেকে অন্য মাধ্যমে প্রবেশ করে, তখন গতির এই পরিবর্তনের কারণেই আলোক রশ্মিটি তার আগের পথ থেকে বিচ্যুত হয়ে যায়।


• প্রতিসরণের সূত্র 

আলোর প্রতিসরণ প্রধানত দুটি নির্দিষ্ট সূত্র মেনে চলে:

  • প্রথম সূত্র: আপতিত রশ্মি, প্রতিসৃত রশ্মি এবং আপতন বিন্দুতে দুই মাধ্যমের বিভেদতলের ওপর অঙ্কিত অভিলম্ব একই সমতলে থাকে।
  • দ্বিতীয় সূত্র: একজোড়া নির্দিষ্ট মাধ্যম এবং একটি নির্দিষ্ট রঙের আলোর জন্য আপতন কোণের সাইন ($\sin i$) এবং প্রতিসরণ কোণের সাইনের ($\sin r$) অনুপাত সর্বদা ধ্রুবক হয়। এই ধ্রুবককে বলা হয় প্রথম মাধ্যমের সাপেক্ষে দ্বিতীয় মাধ্যমের প্রতিসরণাঙ্ক ($\eta$)। এটিকে স্নেলের সূত্র বলা হয়।

$$\frac{\sin i}{\sin r} = \eta$$


প্রতিবিম্ব


কোনো বিন্দু থেকে নির্গত আলোক রশ্মিগুচ্ছ প্রতিফলন বা প্রতিসরণের পর যদি দ্বিতীয় কোনো বিন্দুতে মিলিত হয় বা দ্বিতীয় কোনো বিন্দু থেকে আসছে বলে মনে হয়, তবে ওই দ্বিতীয় বিন্দুকে প্রথম বিন্দুর প্রতিবিম্ব বলা হয়।


​• প্রতিবিম্বের প্রকারভেদ

​প্রতিবিম্ব প্রধানত দুই প্রকারের হয়:


​1. সদবিম্ব:

​কোনো বিন্দু থেকে নির্গত আলোক রশ্মিগুচ্ছ প্রতিফলন বা প্রতিসরণের পর যদি অন্য কোনো বিন্দুতে মিলিত হয়, তখন দ্বিতীয় বিন্দুকে প্রথম বিন্দু উৎসের সদবিম্ব বলে।

  • বৈশিষ্ট্য: সদবিম্ব পর্দায় ফেলা যায়। এটি সবসময় বস্তুর সাপেক্ষে উল্টো হয়।
  • উদাহরণ: সিনেমার পর্দার ছবি, অবতল দর্পণ বা উত্তল লেন্সে তৈরি প্রতিবিম্ব ইত্যাদি।

​2. অসদ প্রতিবিম্ব:

​কোনো বিন্দু থেকে নির্গত আলোক রশ্মিগুচ্ছ প্রতিফলন বা প্রতিসরণের পর যদি কোনো বিন্দুতে মিলিত না হয়ে অন্য কোনো বিন্দু থেকে আসছে বলে মনে হয়, তবে দ্বিতীয় বিন্দুকে প্রথম বিন্দু উৎসের অসদবিম্ব বলে।

  • বৈশিষ্ট্য: অসদবিম্ব  পর্দায় ফেলা যায় না। এটি সবসময় বস্তুর সাপেক্ষে সোজা হয়।
  • উদাহরণ: আয়নায় তৈরি হয় প্রতিবিম্ব, স্থির জলে গাছের প্রতিবিম্ব ইত্যাদি।

• পার্শ্বীয় পরিবর্তন

​সমতল দর্পণে গঠিত প্রতিবিম্বের একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো পার্শ্বীয় পরিবর্তন। কোনো ব্যক্তি আয়নার সামনে দাঁড়ালে তার ডান হাতকে প্রতিবিম্বের বাম হাত এবং বাম হাতকে ডান হাত বলে মনে হয়। একেই পার্শ্বীয় পরিবর্তন বলে।


• প্রতিবিম্ব গঠনের শর্তসমূহ

​একটি স্বচ্ছ প্রতিবিম্ব গঠনের জন্য তিনটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ:

  • আলোক উৎস: একটি বস্তুর প্রয়োজন যার থেকে আলো আসবে।
  • মাধ্যম: প্রতিফলন বা প্রতিসরণ ঘটানোর মতো মাধ্যম অর্থাৎ দর্পণ বা লেন্স প্রয়োজন।
  • দূরত্ব: বস্তু এবং দর্পণ বা লেন্সের মধ্যবর্তী দূরত্ব প্রতিবিম্বের আকার ও প্রকৃতি নির্ধারণ করে। তাই দুটির মধ্যে দূরত্বটাও গুরুত্বপূর্ণ।

সংকট কোণ ও আভ্যন্তরীণ পূর্ণ প্রতিফলন


• সংকট কোণ

আলো যখন ঘন মাধ্যম থেকে হালকা বা লঘু মাধ্যমে প্রবেশ করে, তখন প্রতিসৃত রশ্মি অভিলম্ব থেকে দূরে সরে যায়। এবং আপতন কোণ (i) যত বাড়ানো হয়, প্রতিসরণ কোণও (r) তত বাড়ে।


sankat-kon-in-bengali


এই শর্ত অনুযায়ী, আলোকরশ্মি ঘন মাধ্যম থেকে লঘু মাধ্যমে প্রতিসৃত​ হওয়ার সময় একটি নির্দিষ্ট মানের আপতন কোণের জন্য প্রতিসরণ কোণের মান 90° হয়, অর্থাৎ প্রতিসৃত রশ্মিটি দুই মাধ্যমের বিভেদতল ঘেঁষে চলে যায়। ঘন মাধ্যমের সেই নির্দিষ্ট আপতন কোণকেই ওই মাধ্যমদ্বয়ের সংকট কোণ বলে। একে সাধারণত $\theta_c$ বা C দ্বারা প্রকাশ করা হয়।


​• অভ্যন্তরীণ পূর্ণ প্রতিফলন


avyantarin-purna-pratifalan-in-bengali


আলোকরশ্মি ঘন মাধ্যম থেকে লঘু মাধ্যমে প্রতিসৃত​ হওয়ার সময় ​যদি আপতন কোণের মান সংকট কোণের চেয়ে বেশি হয় (অর্থাৎ $i > \theta_c$), তবে আলোক রশ্মি আর লঘু মাধ্যমে প্রতিসৃত হতে পারে না। ফলে আলোকরশ্মিটি তখন দুই মাধ্যমের বিভেদতল থেকে সম্পূর্ণভাবে প্রতিফলিত হয়ে পুনরায় ঘন মাধ্যমেই ফিরে আসে। এই ঘটনাকে
অভ্যন্তরীণ পূর্ণ প্রতিফলন বলে।


• ​পূর্ণ প্রতিফলনের শর্তাবলী

​অভ্যন্তরীণ পূর্ণ প্রতিফলন ঘটার জন্য দুটি অত্যাবশ্যকীয় শর্ত রয়েছে। সেগুলি হলো:

i) ​আলোক রশ্মিকে অবশ্যই ঘন মাধ্যম থেকে লঘু মাধ্যমে যাওয়ার চেষ্টা করতে হবে।

ii) ​ঘন মাধ্যমে আপতন কোণ অবশ্যই সংকট কোণের চেয়ে বেশি হতে হবে।


​• সাধারণ প্রতিফলন ও অভ্যন্তরীণ পূর্ণ প্রতিফলনের পার্থক্য

​সাধারণ প্রতিফলনে কিছু পরিমাণ আলো শোষিত বা প্রতিসৃত হয়, যার ফলে প্রতিবিম্বের উজ্জ্বলতা কিছুটা কম থাকে। কিন্তু অভ্যন্তরীণ পূর্ণ প্রতিফলনে আলোর প্রায় 100% ভাগই প্রতিফলিত হয়ে ফিরে আসে, কোনো অংশই শোষিত বা প্রতিসৃত হয়না, তাই একে 'পূর্ণ' প্রতিফলন বলা হয়। এতে প্রতিবিম্ব অত্যন্ত উজ্জ্বল হয়।


​• অভ্যন্তরীণ পূর্ণ প্রতিফলনের বাস্তব উদাহরণ

  • হীরকের উজ্জ্বলতা: হীরার সংকট কোণ খুব কম (প্রায় 24.4^{\circ})। এর ফলে এর ভেতরে আলো প্রবেশ করলে সহজে বের হতে পারে না এবং বারবার অভ্যন্তরীণ পূর্ণ প্রতিফলন ঘটে। একারণেই হীরা এত ঝলমলে দেখায়।
  • মরুভূমির মরীচিকা: দিনের বেলা সূর্যের প্রখর তাপে মরুভূমির বালি প্রচণ্ড উত্তপ্ত হয়। এর ফলে ওই বালির সংস্পর্শে থাকা বায়ুও উত্তপ্ত হয়ে যায় এবং ঘনত্ব কমে হালকা হয়ে যায়। তবে ওপরের দিকের বায়ু কম উতপ্ত হওয়ায় অপেক্ষাকৃত বেশি ঘনত্বযুক্ত হয়ে থাকে। অর্থাৎ, ওই অঞ্চলে নিচ থেকে ওপরের দিকে বাতাসের ঘনত্ব ক্রমান্বয়ে বাড়তে থাকে। এমন অবস্থায় মরুভূমির কোনো গাছ বা দূরের কোনো উঁচু বস্তু থেকে আলো যখন নিচের দিকে আসতে থাকে, তখন এটি ঘন মাধ্যম থেকে ক্রমান্বয়ে হালকা মাধ্যমে প্রবেশ করে। এর ফলে রশ্মিটি যত নিচের দিকে নামতে থাকে আপতন ততই বাড়তে থাকে। এইভাবে বাঁকতে বাঁকতে এক সময় রশ্মিটি এমন এক স্তরে পৌঁছে যায় যখন তার আপতন কোণ দুই মাধ্যমের সংকট কোণের চেয়ে বেশি হয়ে যায়। ফলে সেখানে আলোর প্রতিসরণ না ঘটে আভ্যন্তরীণ পূর্ণ প্রতিফলন ঘটে। এবং আলো আর নিচে না গিয়ে পুনরায় ওপরের দিকে বেঁকে যায়। এই প্রতিফলিত আলোকরশ্মি যখন কোনো পথিকের চোখে পৌঁছায়, তখন মানুষের চোখ আলোর ওই বক্রপথকে দেখতে পায় না। পথিক মনে করেন আলোটি হয়তো মাটির নিচ থেকে আসছে। ফলে তিনি মাটিতে ওই গাছের একটি উল্টো প্রতিবিম্ব দেখতে পান। উষ্ণতার পার্থক্যের কারণে বাতাসের এই স্তরগুলো সবসময় কাঁপতে থাকে, ফলে প্রতিবিম্বটিও কাঁপতে থাকে। এই দৃশ্য দেখে পথিকের মনে হয় সামনে হয়তো কোনো জলাশয় আছে এবং জলে হয়তো গাছের প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে। এই ধরনের দৃষ্টিভ্রমকেই মরীচিকা বলে।

লেন্স


দুটি গোলীয় পৃষ্ঠ বা একটি গোলীয় ও একটি সমতল পৃষ্ঠ দ্বারা সীমাবদ্ধ স্বচ্ছ প্রতিসারক মাধ্যমকে লেন্স বলে। লেন্সের প্রধান কাজ হলো আলোর প্রতিসরণ ঘটিয়ে আলোক রশ্মিকে অভিসারী বা অপসারী করা।


• লেন্সের প্রকারভেদ

লেন্স ​প্রধানত দুই প্রকারের হয়:


​i) উত্তল লেন্স

​যে লেন্সের মধ্যভাগ মোটা এবং প্রান্তের দিকটা সরু তাকে উত্তল লেন্স বলে। এটিকে অভিসারী লেন্সও বলা হয়, কারণ এটি এর ওপর আপতিত সমান্তরাল আলোক রশ্মিগুচ্ছকে প্রতিসরণের পর একটি বিন্দুতে মিলিত করে।

  • ব্যবহার: দূরবীন, অণুবীক্ষণ যন্ত্র, ক্যামেরা ইত্যাদিতে উত্তল লেন্স ব্যবহৃত হয়।

​ii) অবতল লেন্স

​যে লেন্সের মধ্যভাগ সরু এবং প্রান্তের দিকটা মোটা তাকে অবতল লেন্স বলে। এটিকে অপসারী লেন্সও বলা হয়, কারণ এটি সমান্তরাল আলোক রশ্মিগুচ্ছকে প্রতিসরণের পর চারদিকে ছড়িয়ে দেয়। এই রশ্মিগুলোকে পেছন দিকে বর্ধিত করলে মনে হয় তারা একটি বিন্দু থেকে আসছে।

  • ব্যবহার: চশমায় হ্রস্বদৃষ্টি ত্রুটি দূর করতে, দরজার ফুটো বা উঁকিঝুঁকি দেওয়ার গর্তে ইত্যাদিতে অবতল লেন্স ব্যবহৃত হয়।

​• লেন্সের গুরুত্বপূর্ণ কিছু পরিভাষা

​লেন্স সম্পর্কে জানতে হলে নিচের বিষয়গুলো জানা জরুরি:

  • বক্রতা কেন্দ্র: লেন্সের তল যে গোলকের অংশ, তার কেন্দ্রকে বক্রতা কেন্দ্র বলে। একটি লেন্সের দুটি বক্রতা কেন্দ্র থাকে।
  • প্রধান অক্ষ: দুই বক্রতার কেন্দ্রের মধ্য দিয়ে গমনকারী সরলরেখাকে লেন্সের প্রধান অক্ষ বলে।
  • আলোক কেন্দ্র: লেন্সের ভেতরে প্রধান অক্ষের ওপর অবস্থিত এমন একটি বিন্দু, যার মধ্য দিয়ে আলো গেলে তার কোনো দিক পরিবর্তন হয় না, সেই বিন্দুকে আলোক কেন্দ্র বলে।
  • প্রধান ফোকাস: সমান্তরাল রশ্মিগুচ্ছ প্রতিসরণের পর প্রধান অক্ষের ওপর যে বিন্দুতে মিলিত হয় (উত্তল লেন্সের ক্ষেত্রে) বা যে বিন্দু থেকে আসছে বলে মনে হয় (অবতল লেন্সের ক্ষেত্রে), তাকে প্রধান ফোকাস বা মুখ্য ফোকাস বলে।
  • ফোকাস দূরত্ব (f): আলোক কেন্দ্র থেকে প্রধান ফোকাস পর্যন্ত দূরত্বকে লেন্সের ফোকাস দূরত্ব বলে।

আলোর বিচ্ছুরণ


সাদা বা অন্য কোনো যৌগিক আলো কোনো প্রতিসারক মাধ্যমের মধ্য দিয়ে যাওয়ার সময় প্রতিসরণের ফলে তার উপাদান বর্ণগুলোতে বিভক্ত হয়ে যায়। এই ঘটনাকে আলোর বিচ্ছুরণ বলে।


• বিচ্ছুরণ কেন ঘটে?

​সাদা আলো আসলে সাতটি ভিন্ন ভিন্ন বর্ণের আলোর সমষ্টি। শূন্যস্থানে বা বায়ুতে এই সবকটি বর্ণের আলোর গতিবেগ সমান থাকে। কিন্তু যখন এই আলো কাঁচ বা অন্য কোনো ঘন মাধ্যমে প্রবেশ করে, তখন বিভিন্ন বর্ণের আলগুলির গতিবেগ আলাদা হয়ে যায়। ​লাল বর্ণের আলোর গতিবেগ সবচেয়ে বেশি হয়, তাই এটি সবচেয়ে কম বাঁকে। আর ​বেগুনি বর্ণের আলোর গতিবেগ সবচেয়ে কম থাকে, তাই এটি সবচেয়ে বেশি বাঁকে। এই গতির পার্থক্যের কারণেই প্রত্যেকটি বর্ণের আলো আলাদা হয়ে ছড়িয়ে পড়ে।


dispersion-of-light-in-bengali


​• বর্ণালী

​স্যার আইজ্যাক নিউটন 1666 সালে প্রথম প্রিজমের সাহায্যে আলোর বিচ্ছুরণ পর্যবেক্ষণ করেন এবং আবিষ্কার করেন বর্ণালী। তিনি প্রমাণ করেন যে সাদা আলো কাঁচের প্রিজমের মধ্য দিয়ে যাওয়ার সময় প্রতিসরণের ফলে সাতটি রঙের আলোর পটি তৈরি করে। এই সাতটি রঙের আলোক পটিকে বলা হয় বর্ণালী

​বর্ণালীর এই সাতটি রঙের প্রত্যেকটির প্রথম অক্ষরকে পর পর সাজালে বাংলায় 'বেনীআসহকলা' এবং ইংরেজিতে VIBGYOR শব্দ দুটি পাওয়া যায়।

বর্ণালীর সাতটি রঙ হলো:

1.​ বেগুনি (Violet)

2. ​নীল (Indigo)

3. ​কাশি নীল (Blue)

4. ​বুজ (Green)

5. ​লুদ (Yellow)

6. ​মলা (Orange)

7. ​লাল (Red)


বর্ণালীর প্রকারভেদ 

বর্ণালীর স্বচ্ছতা বা রঙের বিন্যাসের ওপর ভিত্তি করে বর্ণালীকে দুটি ভাগে ভাগ করা যায়: 1) শুদ্ধ বর্ণালী এবং 2) অশুদ্ধ বর্ণালী


​1. শুদ্ধ বর্ণালী

​যে বর্ণালীতে সাদা আলোর সাতটি রঙই স্পষ্ট ও পৃথকভাবে দেখা যায় এবং একটি রঙ কখনই অন্য রঙের ওপর এসে পড়ে না, তাকে শুদ্ধ বর্ণালী বলে।

বৈশিষ্ট্য:

  • শুদ্ধ বর্ণালীতে​ প্রতিটি রঙ আলাদাভাবে চেনা যায়।
  • ​রঙগুলোর মধ্যে কোনো উপরিপাতন ঘটে না।
  • ​এটি তৈরি করতে বিশেষ ব্যবস্থার (যেমন- সরু ছিদ্র, উত্তল লেন্স ও প্রিজম) প্রয়োজন হয়।

​2. অশুদ্ধ বর্ণালী

​যে বর্ণালীতে বিভিন্ন রঙগুলো একে অপরের ওপর এসে পড়ে বা উপরিপাতিত হয়, ফলে রঙগুলোকে আলাদাভাবে এবং স্পষ্টভাবে চেনা যায় না, তাকে অশুদ্ধ বর্ণালী বলে।

বৈশিষ্ট্য:

  • অশুদ্ধ বর্ণালীতে ​রঙগুলো একে অপরের সাথে মিশে থাকে।
  • এটিতে প্রতিটি রঙের ​সীমানাগুলো অস্পষ্ট হয়।
  • ​আমরা সাধারণত প্রিজম দিয়ে সরাসরি যে বর্ণালী দেখি, তা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই অশুদ্ধ হয়।

​• আলোর বিচ্ছুরণের প্রাকৃতিক উদাহরণ

  • রংধনু: ​প্রকৃতিতে আলোর বিচ্ছুরণের সবচেয়ে সুন্দর উদাহরণ হলো রংধনু। বৃষ্টির পর যখন আকাশে সূর্যের আলো পড়ে, তখন বাতাসে ভেসে থাকা বৃষ্টির বিন্দুগুলো ছোট ছোট প্রিজমের মতো কাজ করে। এরপর সূর্যের সাদা আলো যখন এই ফোঁটার ভেতর দিয়ে যায়, তখন এর প্রতিফলন, প্রতিসরণ এবং বিচ্ছুরণ ঘটে। এর ফলে আকাশের বিপরীত দিকে সাত রঙের আলোক পটি তৈরি হয়, যাকে তখন আমরা রংধনু বলে থাকি।

​• বিচ্ছুরণের বৈশিষ্ট্যসমূহ

  • একবর্ণী আলো: যে আলোতে একটি মাত্র রং থাকে (যেমন লেজার লাইট), তার বিচ্ছুরণ ঘটে না।
  • যৌগিক আলো: সাদা আলো বা বিভিন্ন রঙের মিশ্রণে তৈরি আলোর বিচ্ছুরণ ঘটে।
  • বিচ্যুতি: বর্ণালীর ওপরের দিকে থাকে লাল রং (কম বিচ্যুতি) এবং নিচের দিকে থাকে বেগুনি রং (বেশি বিচ্যুতি)।

সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQ)


1. সিনেমার পর্দা সাদা ও অমসৃণ রাখা হয় কেন?

উত্তর: সিনেমার পর্দা অমসৃণ রাখা হয় যাতে সেখানে আলো পড়লে আলোর বিক্ষিপ্ত প্রতিফলন ঘটে। এর ফলে প্রতিফলিত রশ্মি গুলি সিনেমা হলের চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ে এবং হলের সব কোণ থেকে দর্শকরা ছবি স্পষ্ট দেখতে পান। আর সাদা রঙের হওয়ার কারণ হলো সাদা রঙ সব রঙের আলোকে সমানভাবে প্রতিফলন করতে পারে। ফলে দর্শকরা সমস্ত রং কে পরিষ্কার দেখতে পান।


2. হীরা উজ্জ্বল দেখায় কেন?

উত্তর: হীরার প্রতিসরণাঙ্ক অনেক বেশি এবং এর সংকট কোণ খুব কম (24.4°)। এর ফলে হীরায় আলোর আভ্যন্তরীণ পূর্ণ প্রতিফলন ঘটে এবং আলো ভেতরে বারবার প্রতিফলিত হয়ে বের হয়। তাই হীরা খুব উজ্জ্বল দেখায়।


3. নক্ষত্র মিটমিট করে কেন?

উত্তর: নক্ষত্রগুলো আমাদের পৃথিবী থেকে বহুদূরে রয়েছে। ওই নক্ষত্র গুলি থেকে আসা আলো আমাদের চোখে পৌঁছানোর সময় পৃথিবীর বিভিন্ন বায়ুমণ্ডলের স্তর ভেদ করে আসে। আর আমরা জানি, পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের বিভিন্ন স্তরের ঘনত্ব কিন্তু প্রতিনিয়ত পরিবর্তন হয়। ফলে নক্ষত্রের আলো যখন আমাদের চোখে আসে, তখন বারবার ওই আলোর প্রতিসরণ ঘটে এবং আলোর পথ বিচ্যুত হয়। একারণেই নক্ষত্রকে মিটমিট করতে দেখি।


4. শূন্যস্থানে বা মহাকাশে কি রংধনু দেখা সম্ভব?

উত্তর: না। রংধনু সৃষ্টির জন্য বায়ুমণ্ডলে জলকণা বা বৃষ্টির ফোঁটার প্রয়োজন হয় যা প্রিজমের মতো কাজ করে আলোর বিচ্ছুরণ ঘটায়। মহাকাশ যেহেতু শূন্যস্থান এবং সেখানে জলকণা নেই, তাই সেখানে রংধনু সৃষ্টি হওয়া সম্ভব নয়।


5. সূর্যোদয় বা সূর্যাস্তের সময় সূর্যকে লাল দেখায় কেন?

উত্তর: দিগন্তের কাছাকাছি সূর্য থাকার সময় সূর্যের আলোকে পৃথিবীপৃষ্ঠে পৌঁছাতে বায়ুমণ্ডলের অনেক বেশি স্তর পার হতে হয়। তখন কম তরঙ্গদৈর্ঘ্যের বর্ণগুলো (যেমন নীল) চারদিকে ছড়িয়ে বা বিক্ষিপ্ত হয়ে যায়। কেবল লাল আলোর তরঙ্গদৈর্ঘ্য বেশি হওয়ায় এটি আমাদের চোখে পৌঁছায়। তাই সেই সময় সূর্যকে লাল দেখায়।

*

Post a Comment (0)
Previous Post Next Post