Ticker

6/recent/ticker-posts

তাপ ও তাপমাত্রা: সংজ্ঞা, পার্থক্য, পরিমাপ ও তাপ সঞ্চালন পদ্ধতি

তাপ ও তাপমাত্রা 

পদার্থবিজ্ঞানে তাপতাপমাত্রা দুটি ভিন্ন ধারণা হলেও এরা একে অপরের সাথে গভীরভাবে সম্পর্কিত। সহজভাবে বলতে গেলে, তাপ হলো একটি কারণ এবং তাপমাত্রা হলো তার ফলাফল।


তাপ ও তাপমাত্রা


◼ তাপ কী?

​তাপ হলো এক প্রকার শক্তি, যা গ্রহণ করলে বস্তু উত্তপ্ত হয় এবং বর্জন করলে বস্তু শীতল হয়। যখন কোনো বস্তুকে তাপ দেওয়া হয়, তখন তার ভেতরের অণুগুলো আরও দ্রুত গতিতে কাঁপতে শুরু করে।


● ​প্রধান বৈশিষ্ট্য: তাপ সর্বদা হয় উচ্চ তাপমাত্রার বস্তু থেকে নিম্ন তাপমাত্রার বস্তুর দিকে প্রবাহিত হয়।

● ​একক: আন্তর্জাতিক একক (SI) হলো জুল (J)। তবে প্রচলিত (CGS) একক হিসেবে ক্যালরি (cal) ব্যবহার করা হয়। এক গ্রাম বিশুদ্ধ জলের উষ্ণতা 1°C বৃদ্ধি করতে যে তাপের প্রয়োজন হয় তাকে 1 ক্যালরি বলে। 1 ক্যালোরি = 4.2 জুল।


◼ তাপমাত্রা কী?

​তাপমাত্রা হলো বস্তুর একটি তাপীয় অবস্থা। এটি নির্ধারণ করে বস্তুটি কতটা গরম বা ঠান্ডা। তাপমাত্রা হলো বস্তুর অণুগুলোর গড় গতিশক্তির পরিমাপ। একটি বস্তু অন্য কোন বস্তুকে তাপ দেবে, নাকি অন্য কোন বস্তু থেকে তাপ গ্রহণ করবে তা ঐ বস্তুর তাপমাত্রার উপর নির্ভর করে।


● ​প্রধান বৈশিষ্ট্য: এটি নির্ধারণ করে যে দুটি বস্তুকে একসাথে রাখলে তাপ কোন দিক থেকে কোন দিকে যাবে।

● ​একক: সি.জি.এস. পদ্ধতিতে তাপমাত্রার একক হলো ডিগ্রি সেলসিয়াস (°C) ফারেনহাইট (°F)। এবং SI পদ্ধতিতে তাপমাত্রার একক হলো কেলভিন (K)


তাপ ও তাপমাত্রার পার্থক্য 


তাপ ও তাপমাত্রার পার্থক্যগুলি নিচে সহজভাবে দেওয়া হল:

বৈশিষ্ট্য
তাপ
তাপমাত্রা
সংজ্ঞা
তাপ হল এক প্রকার শক্তি।
তাপমাত্রা হল বস্তুর তাপীয় অবস্থা।
কারণ ও ফল
তাপ হলো তাপমাত্রা পরিবর্তনের কারণ।
তাপমাত্রা হলো তাপের ফল।
পরিমাপের যন্ত্র
তাপ মাপা হয় ক্যালরিমিটার যন্ত্র দিয়ে।
তাপমাত্রা মাপা হয় থার্মোমিটার দিয়ে।
নির্ভরশীলতা
তাপ বস্তুর ভর ও উপাদানের ওপর নির্ভর করে।
তাপমাত্রা বস্তুর ভরের ওপর নির্ভর করে না।
একক
SI পদ্ধতিতে তাপের একক জুল (J)।
SI পদ্ধতিতে তাপমাত্রার একক কেলভিন (K)।

তাপমাত্রা পরিমাপ 


তাপমাত্রা সরাসরি দেখা যায় না, তাই পদার্থের কোনো একটি বিশেষ ধর্মের পরিবর্তন দেখে এটি মাপা হয়।


◼ থার্মোমিটার:

যে বিশেষ যন্ত্রের মাধ্যমে কোন বস্তুর উষ্ণতা সঠিকভাবে পরিমাপ করা যায় তাকে থার্মোমিটার বলে। আর যে থার্মোমিটারে উষ্ণতা মাপক পদার্থ হিসেবে পারদ ব্যবহৃত হয় তাকে পারদ থার্মোমিটার বলে। এর গায়ে বেশ কয়েকটি দাগ থাকে, যেগুলি উষ্ণতা-নির্দেশক হিসেবে কাজ করে। তাপ বাড়লে পারদের আয়তন বাড়ে। পারদের এই ধর্মকে কাজে লাগিয়েই থার্মোমিটারের উষ্ণতা নির্দেশক দাগ গুলির মাধ্যমে তাপমাত্রার পাঠ নেওয়া হয়।


◼ তাপমাত্রা পরিমাপের বিভিন্ন স্কেল:

তাপমাত্রা প্রকাশের জন্য প্রধানত তিনটি স্কেল ব্যবহার করা হয়:


i) ​সেলসিয়াস স্কেল (°C): এতে বরফের গলনাঙ্ককে 0°এবং জলের স্ফুটনাঙ্ককে 100° ধরা হয়।


ii) ​ফারেনহাইট স্কেল (°F): এতে বরফের গলনাঙ্ককে 32° এবং জলের স্ফুটনাঙ্ককে 212° ধরা হয়। এটি সাধারণত শরীরের তাপমাত্রা মাপতে ব্যবহৃত হয়।


iii) ​কেলভিন স্কেল (K): এটি বিজ্ঞানের গবেষণায় ব্যবহৃত আন্তর্জাতিক (SI) একক। এর সর্বনিম্ন মান 0 K (পরম শূন্য তাপমাত্রা)।


◼ বিভিন্ন স্কেলের মধ্যে সম্পর্ক: 

একটি স্কেলের মানকে অন্য স্কেলে রূপান্তর করার জন্য নিচের সমীকরণটি ব্যবহার করা হয়:

$$\frac{C}{5} = \frac{F - 32}{9} = \frac{K - 273}{5}$$

◼ পরম শূন্য তাপমাত্রা:

উষ্ণতা পরিমাপের ক্ষেত্রে পরম শূন্য তাপমাত্রা খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। 0 K বা -273.15° C তাপমাত্রায় পদার্থের অণুগুলোর গতি সম্পূর্ণ থেমে যায়। তাত্ত্বিকভাবে কোনো তাপমাত্রা এর নিচে নামা কখনোই সম্ভব নয়। এটিকেই পরম শূন্য তাপমাত্রা বলে।


পদার্থের ওপর তাপের প্রভাব


তাপ প্রয়োগ করলে পদার্থের প্রধান দুটি পরিবর্তন ঘটে:


1. তাপমাত্রা পরিবর্তন:

পদার্থের ওপর তাপের সবচেয়ে সাধারণ প্রভাব হলো তাপমাত্রা পরিবর্তন। কোনো বস্তুতে তাপ দিলে তার অণুগুলোর গতিশক্তি বৃদ্ধি পায়, ফলে বস্তুর তাপমাত্রা বেড়ে যায়। আবার তাপ বর্জন করলে অণুগুলোর গতি কমে যায় এবং তাপমাত্রা হ্রাস পায়।


2. অবস্থার পরিবর্তন:

তাপ প্রয়োগের ফলে পদার্থ এক ভৌত অবস্থা থেকে অন্য ভৌত অবস্থায় রূপান্তরিত হতে পারে। একে অবস্থার পরিবর্তন বলা হয়। এই অবস্থা পরিবর্তন নিয়ে নিচে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে।


3. আয়তনের পরিবর্তন

​সাধারণত তাপ প্রয়োগ করলে পদার্থের আয়তন বৃদ্ধি পায় এবং তাপ বর্জন করলে বা পদার্থ ঠান্ডা হলে আয়তন হ্রাস পায়। পদার্থের তিন অবস্থাতেই এই ঘটনা লক্ষ্য করা যায়।


​কঠিন পদার্থের প্রসারণ: কঠিন পদার্থে তাপ দিলে এর দৈর্ঘ্য, ক্ষেত্রফল ও আয়তন সামান্য বৃদ্ধি পায়।

  • উদাহরণ: রেললাইনের দুটি পাতের জোড়ামুখে কিছুটা ফাঁক রাখা হয়। এর কারণ হল গরমের দিনে তাপ পেয়ে পাত প্রসারিত হলেও লাইনটি যাতে বেঁকে না যায়।


তরল পদার্থের প্রসারণ: কঠিনের তুলনায় তরল পদার্থের ওপর তাপের প্রভাব বেশি লক্ষ্য করা যায়। তাপ পেলে তরলের আয়তন দ্রুত বাড়ে।

  • উদাহরণ: থার্মোমিটারে পারদের ওঠানামা এই নীতির ওপর ভিত্তি করেই কাজ করে।


গ্যাসীয় পদার্থের প্রসারণ: গ্যাসীয় পদার্থের ওপর তাপের প্রভাব সবচেয়ে বেশি। সামান্য তাপ দিলেই গ্যাসের আয়তন প্রচুর পরিমাণে বেড়ে যায়।

  • উদাহরণ: গরম বাতাসে বেলুন ফুলে ওঠে।


ব্যতিক্রম প্রসারণ: সাধারণ নিয়ম অনুযায়ী ঠান্ডা করলে সব তরলের আয়তন কমে, কিন্তু জলের ক্ষেত্রে $4^\circ\text{C}$ থেকে $0^\circ\text{C}$ পর্যন্ত তাপমাত্রা কমালে আয়তন না কমে উল্টে বেড়ে যায়। একে জলের ব্যতিক্রান্ত প্রসারণ বলে। এই কারণেই শীতপ্রধান অঞ্চলে হ্রদ বা পুকুরের উপরিভাগের জল বরফে পরিণত হলেও নিচের জল প্রায় 4°C তাপমাত্রায় তরল অবস্থায় থাকে। তাই জলজ প্রাণীরা সহজেই বেঁচে থাকতে পারে।


​4. রাসায়নিক পরিবর্তন

​অনেক পদার্থের ক্ষেত্রে তাপ কেবল ভৌত পরিবর্তন ঘটায় না, বরং স্থায়ী রাসায়নিক পরিবর্তনও ঘটায়। এক্ষেত্রে তাপের প্রভাবে পদার্থের অণুগুলোর ভেতরের রাসায়নিক বন্ধন ভেঙে গিয়ে সম্পূর্ণ নতুন ধর্মবিশিষ্ট পদার্থ তৈরি হয়।

  • ​উদাহরণ 1: ক্যালসিয়াম কার্বনেট বা চুনপাথরকে $(\text{CaCO}_3)$ তীব্র উত্তপ্ত করলে তা ভেঙে পোড়াচুন $(\text{CaO})$ এবং কার্বন ডাই-অক্সাইড$ (\text{CO}_2)$ গ্যাস উৎপন্ন হয়।
  • ​উদাহরণ 2: দিয়াশলাইয়ের কাঠির মাথায় ঘর্ষণের ফলে তাপ উৎপন্ন হয়। এই তাপের প্রভাবে সেখানে রাসায়নিক বিক্রিয়া শুরু হয় এবং আগুন জ্বলে ওঠে।

পদার্থের অবস্থার পরিবর্তন

পদার্থের অবস্থার পরিবর্তন

আগেও যানা গেছে যে, পদার্থের এক ভৌত অবস্থা থেকে অন্য ভৌত অবস্থায় রূপান্তরিত হওয়ার ঘটনাকে পদার্থের অবস্থা পরিবর্তন বলা হয়। কোনো পদার্থের তাপমাত্রা বা চাপের পরিবর্তন ঘটিয়ে তার অবস্থার পরিবর্তন ঘটানো সম্ভব। তবে আমাদের চারপাশে পদার্থের যে অবস্থার পরিবর্তন গুলি দেখা যায় তা সাধারণত তাপের আদান-প্রদানের মাধ্যমেই বেশি ঘটে থাকে। 


নিচে পদার্থের অবস্থা পরিবর্তনের বিভিন্ন প্রক্রিয়া ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো বিস্তারিত আলোচনা করা হলো: 


◼ অবস্থা পরিবর্তনের বিভিন্ন প্রক্রিয়া: 

সাধারণত পদার্থের কঠিন, তরল ও গ্যাসীয় অবস্থা পরিবর্তনের মোট ৬টি প্রধান প্রক্রিয়া রয়েছে। প্রতিটি প্রক্রিয়া নিচে আলোচনা করা হল: 


1. গলন:

​তাপ প্রয়োগের ফলে কোনো কঠিন পদার্থের তরলে পরিণত হওয়ার ঘটনাকে গলন বলে। যে নির্দিষ্ট তাপমাত্রায় পদার্থের গলন হয়, তাকে ওই পদার্থের গলনাঙ্ক বলা হয়।

  • ​উদাহরণ: $0^\circ\text{C}$ তাপমাত্রায় বরফ গলে জলে পরিণত হয়। তাই বরফের গলনাঙ্ক $0^\circ\text{C}$।


​2. কঠিনীভবন:

​তরল পদার্থ থেকে তাপ অপসারণ করলে বা তাপ বর্জন করলে তা জমে কঠিন পদার্থে পরিণত হয়। তাপ বর্জনের ফলে তরল পদার্থের কঠিনে পরিণত হওয়ার ঘটনাকে কঠিনীভবন বলে। যে নির্দিষ্ট তাপমাত্রায় তরল পদার্থ জমে কঠিন পদার্থে পরিণত হতে শুরু করে, তাকে হিমাঙ্ক বলে।

  • ​উদাহরণ: জল ঠান্ডা হয়ে $0^\circ\text{C}$ তাপমাত্রায় বরফে পরিণত হয়। সাধারণ পদার্থের ক্ষেত্রে গলনাঙ্ক ও হিমাঙ্ক একই হয়ে থাকে।


​3. বাষ্পীভবন:

​তরল পদার্থে তাপ দিলে তা বাষ্প বা গ্যাসীয় অবস্থায় রূপান্তরিত হয়। তাপ গ্রহণের মাধ্যমে তরল পদার্থের গ্যাসীয় পদার্থে পরিণত হওয়ার ঘটনাকে বাষ্পীভবন বলে। পদার্থের বাষ্পীভবন আবার দুটি পদ্ধতিতে হতে পারে। যথা:

  • ​বাষ্পায়ন: যেকোনো তাপমাত্রায় তরলের উপরিভাগ থেকে ধীরে ধীরে বাষ্পে পরিণত হওয়ার প্রক্রিয়াকে বাষ্পায়ন বলে। যেমন: রোদে ভেজা কাপড় শুকানো।
  • ​স্ফুটন: নির্দিষ্ট তাপমাত্রায় তরলের সমগ্র অংশ থেকে দ্রুত বাষ্পে পরিণত হওয়ার ঘটনাকে স্ফুটন বলে। যে নির্দিষ্ট তাপমাত্রায় পদার্থের স্ফুটন প্রক্রিয়া শুরু হয় তাকে স্ফুটনাঙ্ক বলে। যেমন, জলের স্ফুটনাঙ্ক $100^\circ\text{C}$।


​4. ঘনীভবন:

তাপ অপসারণের মাধ্যমে গ্যাসীয় পদার্থের পুনরায় তরলে পরিণত হওয়ার ঘটনাকে  ঘনীভবন বলে।

  • ​উদাহরণ: শীতকালে বা ভোর বেলাই বায়ুমণ্ডলের জলীয় বাষ্প ঠান্ডা হয়ে ঘাসের ওপর শিশিরবিন্দু রূপে জমা হয়।


​5. ঊর্ধ্বপাতন:

​কিছু কঠিন পদার্থ তাপ গ্রহণ করে তরল অবস্থায় না গিয়ে সরাসরি গ্যাসীয় অবস্থায় পরিণত হয়। এই ঘটনাকে ঊর্ধ্বপাতন বলে।

  • ​উদাহরণ: কপূর, নিশাদল বা অ্যামোনিয়াম ক্লোরাইড, ন্যাপথলিন,  কঠিন কার্বন ডাই-অক্সাইড বা ড্রাই আইস ইত্যাদি পদার্থগুলিকে তাপ দিলে তা সরাসরি গ্যাসে পরিণত হয়।


​6. অবক্ষেপণ:

​কোনো গ্যাসীয় পদার্থ থেকে তাপ দ্রুত অপসারণ করলে তা তরল অবস্থায় না গিয়ে সরাসরি কঠিন অবস্থায় পরিণত হতে পারে। এই প্রক্রিয়াকে অবক্ষেপণ বলে।

  • ​উদাহরণ: শীতপ্রধান অঞ্চলে জলীয় বাষ্প অত্যধিক ঠান্ডায় সরাসরি বরফের স্ফটিক বা তুষারে পরিণত হয়।


◼ অবস্থা পরিবর্তনে লীন তাপের ভূমিকা:

মজার ব্যাপার হলো, যখন অবস্থা পরিবর্তন হয়, তখন তাপ দিলেও পদার্থের তাপমাত্রা বাড়ে না। যে পরিমাণ তাপ প্রয়োগ করলে বা নিষ্কাশন করলে, পদার্থের উষ্ণতার কোন পরিবর্তন না হয়ে শুধুমাত্র অবস্থার পরিবর্তন ঘটে, সেই পরিমাণ তাপকে ওই পদার্থের লীন তাপ বলে।


যেমন, এক বাটি বরফকে গ্যাসে গরম করতে বসান, যতক্ষণ না সম্পূর্ণ বরফ গলে জল হচ্ছে, ততক্ষণ জলের তাপমাত্রা $0^\circ\text{C}$-তেই স্থির থাকবে। এই সময় বাইরে থেকে যে তাপ দেওয়া হচ্ছে, তা থার্মোমিটারে ধরা পড়ে না। এই লুকিয়ে থাকা তাপই লীন তাপ।


​লীন তাপের কাজ কী? এই তাপ পদার্থের তাপমাত্রা বাড়ায় না, বরং কঠিন পদার্থের অণুগুলোর মধ্যকার পারস্পরিক আকর্ষণ বল বা বন্ধন ভেঙে তাদের দূরে সরিয়ে তরল বা গ্যাসে রূপান্তরিত করতে সাহায্য করে।


◼ অবস্থা পরিবর্তনের ওপর চাপের প্রভাব:

​তাপমাত্রার পাশাপাশি চাপের পরিবর্তনের মাধ্যমেও পদার্থের অবস্থা পরিবর্তন করা যায়।


● ​গলনাঙ্কের ওপর চাপের প্রভাব: যেসব পদার্থ গলনের সময় আয়তনে বৃদ্ধি পায়, তাদের ক্ষেত্রে চাপ বৃদ্ধি করলে গলনাঙ্ক বৃদ্ধি পায়। যেমন: মোম। যেসব পদার্থ গলনের সময় আয়তনে হ্রাস পায়, তাদের ক্ষেত্রে চাপ বৃদ্ধি করলে গলনাঙ্ক হ্রাস পায়। যেমন: বরফ। এই নীতির কারণেই দুটি বরফের টুকরোকে চেপে ধরলে তারা পরস্পরের সঙ্গে জোড়া লেগে যায়। এই ঘটনাকে পুনঃশিলীভবন  বলা হয়।


● ​​স্ফুটনাঙ্কের ওপর চাপের প্রভাব: চাপ বাড়ালে তরলের স্ফুটনাঙ্ক বাড়ে এবং চাপ কমালে স্ফুটনাঙ্ক কমে। এই নীতিকে কাজে লাগিয়েই প্রেসার কুকারে উচ্চ চাপে জলের স্ফুটনাঙ্ক $100^\circ\text{C}$ থেকে বাড়িয়ে প্রায় $120^\circ\text{C}$ করা হয়। এর ফলে খাবার দ্রুত সেদ্ধ হয়।


তাপ সঞ্চালন


তাপ সবসময় উচ্চ তাপমাত্রার স্থান থেকে নিম্ন তাপমাত্রার স্থানে প্রবাহিত হয়। তাপ প্রবাহিত হওয়ার এই প্রক্রিয়াকে তাপ সঞ্চালন বলে। তাপ সঞ্চালনের প্রধান তিনটি পদ্ধতি রয়েছে, যেগুলি হলো: পরিবহন, পরিচলন এবং বিকিরণ


​নিচে তাপ সঞ্চালনের এই তিনটি পদ্ধতি সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:


​1. পরিবহন পদ্ধতি

তাপ সঞ্চালনের যে পদ্ধতিতে, পদার্থের অণুগুলি নিজেদের স্থান পরিবর্তন না করে,​ তাপকে পদার্থের গরম অংশ থেকে ঠান্ডা অংশে প্রবাহিত করে, তাকে পরিবহন পদ্ধতি বলে। এই পদ্ধতিতে অণুগুলো শুধু নিজেদের জায়গায় থেকে স্পন্দিত হয় এবং পাশের অণুকে তাপ শক্তি হস্তান্তর করে।

  • মাধ্যম: এই পদ্ধতি মূলত কঠিন পদার্থে ক্ষেত্রে ঘটে। বিভিন্ন তাপের সুপরিবাহী ধাতু, যেমন লোহা, তামা, অ্যালুমিনিয়াম ইত্যাদিতে পরিবহন পদ্ধতিতে তাপ সঞ্চালন ঘটে।
  • উদাহরণ: রান্নার সময় আগুনের ওপর রাখা কড়াইয়ের হাতল গরম হয়ে যাওয়া। যদিও হাতলটি সরাসরি আগুনের ওপর থাকে না, কিন্তু পরিবহন প্রক্রিয়ায় তাপ হাতল পর্যন্ত পৌঁছে যায়।
  • বৈশিষ্ট্য: এই পদ্ধতিতে তাপ সঞ্চালনের জন্য জড় মাধ্যমের প্রয়োজন এবং মাধ্যমের অণুগুলোর প্রত্যক্ষ সংস্পর্শ থাকা জরুরি।

​2. পরিচলন পদ্ধতি

​তাপ সঞ্চালনের যে পদ্ধতিতে পদার্থের অণুগুলো নিজেরাই তাপ গ্রহণ করে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে চলাচল করে, তাকে পরিচলন পদ্ধতি বলে। যখন কোনো তরল বা গ্যাসীয় পদার্থকে নিচ থেকে তাপ দেওয়া হয়, তখন নিচের অণুগুলো হালকা হয়ে উপরে উঠে যায় এবং উপরের ঠান্ডা ও ভারী অণুগুলো নিচে নেমে আসে। এভাবে একটি চক্রের মাধ্যমে তাপের সঞ্চালন ঘটে।

  • মাধ্যম: পরিচলন পদ্ধতিতে তাপের সঞ্চালন তরল এবং গ্যাসীয় পদার্থের ক্ষেত্রে ঘটে।
  • উদাহরণ: পরিচলন পদ্ধতির সবথেকে ভালো উদাহরণ হলো আগুনের ওপর একটি পাত্রে জল গরম করা। এক্ষেত্রে দেখা যায়, নিচের জল গরম হয়ে উপরে উঠে আসে এবং উপরের ঠান্ডা জল নিচে গিয়ে গরম হতে শুরু করে। বায়ুমণ্ডলে বায়ুপ্রবাহ এবং সমুদ্রবায়ুও এই পদ্ধতিতে ঘটে।
  • বৈশিষ্ট্য: পরিচলন পদ্ধতিতে পদার্থের অণুগুলোর সরাসরি স্থানান্তরের মাধ্যমে তাপ সঞ্চালিত হয়।


​3. বিকিরণ পদ্ধতি

​তাপ সঞ্চালনের যে পদ্ধতিতে তাপ কোনো জড় মাধ্যম ছাড়াই বা মাধ্যমের সাহায্য না নিয়ে তড়িৎচৌম্বকীয় তরঙ্গের আকারে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে পৌঁছে যায়, তাকে বিকিরণ পদ্ধতি বলে। এটি শূন্যস্থানের মধ্য দিয়েও চলাচল করতে পারে।

  • মাধ্যম: এক্ষেত্রে কোনো মাধ্যমের প্রয়োজন হয়না
  • উদাহরণ: সূর্য থেকে পৃথিবীতে তাপ আসে বিকিরণ পদ্ধতিতে। সূর্য ও পৃথিবীর মাঝখানে বিশাল শূন্যস্থান থাকা সত্ত্বেও বিকিরণ পদ্ধতিতে তাপ আমাদের পৃথিবীতে পৌঁছে যায়। এছাড়া আগুনের পাশে দাঁড়ালে যে গরম অনুভব হয়, সেটিও বিকিরণ পদ্ধতি।
  • বৈশিষ্ট্য: এই পদ্ধতিতে তাপ আলোর বেগে প্রবাহিত হয় এবং মাঝখানের মাধ্যমকে উত্তপ্ত না করেই সরাসরি বস্তুকে উত্তপ্ত করতে পারে।


আপেক্ষিক তাপ 


আপেক্ষিক তাপ কী?


সংজ্ঞা: ​কোনো পদার্থের একক ভরের তাপমাত্রা 1 ডিগ্রি বৃদ্ধি করতে যে পরিমাণ তাপের প্রয়োজন হয়, তাকে ওই পদার্থের আপেক্ষিক তাপ বলে।

সহজ কথায় বলতে গেলে, আপেক্ষিক তাপ হল পদার্থের একটি নিজস্ব বৈশিষ্ট্য যা নির্দেশ করে ওই পদার্থটি কতটা দ্রুত বা ধীরগতিতে গরম বা ঠান্ডা হবে।


একক: 

  • SI একক: এস. আই. পদ্ধতিতে আপেক্ষিক তাপের একক হল জুল/ কেজি K।
  • CGS একক: সি.জি.এস. পদ্ধতিতে আপেক্ষিক তাপের একক হল ক্যালরি/ গ্রাম/ °C।
  • জলের আপেক্ষিক তাপ: SI পদ্ধতিতে জলের আপেক্ষিক তাপ হলো 4200 জুল/ কেজি K। এর মানে, 1 কেজি জলের তাপমাত্রা 1 কেলভিন বৃদ্ধি করতে 4200 জুল তাপ লাগে।

বাস্তব জীবনের উদাহরণ:

  • জলের উচ্চ আপেক্ষিক তাপ: জলের আপেক্ষিক তাপ অনেক বেশি হওয়ায় জল অনেক দেরিতে গরম হয় এবং অনেক দেরিতে ঠান্ডা হয়। এই কারণেই সমুদ্রের ধারের এলাকায় দিনের বেলা খুব বেশি গরম বা রাতে খুব বেশি ঠান্ডা অনুভূত হয় না।
  • রান্নার পাত্র: রান্নার হাড়ি বা কড়াই গুলি সাধারণত তামা বা অ্যালুমিনিয়ামের তৈরি হয়, কারণ এদের আপেক্ষিক তাপ কম।  ফলে অল্প তাপেই এগুলি দ্রুত গরম হয়ে যায়।

সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্নাবলী (FAQ)


1. তাপ ও তাপমাত্রার মধ্যে প্রধান পার্থক্য কী?

উত্তর: তাপ হলো এক প্রকার শক্তি যা গ্রহণ করলে বস্তু উত্তপ্ত হয় এবং বর্জন করলে বস্তু শীতল হয়। অন্যদিকে, তাপমাত্রা হলো বস্তুর তাপীয় অবস্থা যা নির্ধারণ করে বস্তুটি কতটা গরম বা ঠান্ডা। সহজভাষায়, তাপ হলো কারণ এবং তাপমাত্রা হলো তার ফলাফল।


2. থার্মোমিটারে পারদ ব্যবহার করা হয় কেন?

উত্তর: পারদ হলো তাপের খুব ভালো সুপরিবাহী একটি পদার্থ।  পারদের প্রসারণ সুষম এবং এটি অনেক উচ্চ তাপমাত্রা পর্যন্ত তরল থাকতে পারে। এছাড়া, পারদ কখনোই থার্মোমিটারের কাছের গায়ে লেগে থাকে না। তাই পারদের মাধ্যমে তাপমাত্রার নির্ভুল পরিমাপ পাওয়া যায়।


3. সুস্থ মানুষের শরীরের স্বাভাবিক তাপমাত্রা কত?

উত্তর: একজন সুস্থ মানুষের শরীরের স্বাভাবিক তাপমাত্রা হলো 98.6° ফারেনহাইট বা প্রায় 37° সেলসিয়াস


4. পরম শূন্য তাপমাত্রা কাকে বলে?

উত্তর: যে তাপমাত্রায় কোনো পদার্থের অণুগুলোর গতি সম্পূর্ণ থেমে যায় এবং তাত্ত্বিকভাবে আয়তন শূন্য হয়ে যায়, তাকে পরম শূন্য তাপমাত্রা বলে। এর মান হলো -273.15° সেলসিয়াস বা 0 কেলভিন


5. রেললাইনে পাতের জোড়ার মুখে ফাঁকা রাখা হয় কেন?

উত্তর: রেল লাইনের পাতিগুলির মূল উপাদান হলো লোহা। লোহা হলো এমন একটি কঠিন পদার্থ, যা তাপ পেলে প্রসারিত হয়। গরমের দিনে বা ঘর্ষণের ফলে রেললাইন গরম গরম হয়ে লোহা প্রসারিত হয় এবং পাতের দৈর্ঘ্য কিছুটা বেড়ে যায়। যদি দুটি পাতের জোড়ার মুখে ফাঁকা না রাখা হতো, তবে ওই প্রসারণের চাপে রেললাইন বেঁকে গিয়ে বড় দুর্ঘটনা ঘটতে পারে।


6. মেঘলা রাতে গরম বেশি লাগে কেন?

উত্তর: দিনের বেলা সূর্য থেকে আসা তাপ বিকিরণ পদ্ধতিতে পৃথিবীকে উত্তপ্ত করে। রাতে সেই তাপ আবার বিকিরিত হয়ে মহাশূন্যে চলে যায়। কিন্তু আকাশ মেঘলা থাকলে মেঘ ভূপৃষ্ঠের ওই তাপ বিকিরণকে বাধা দেয় এবং তাপকে পৃথিবীতেই আটকে রাখে।

আরো পড়ুন:

আলোর প্রতিফলন, প্রতিসরণ ও বিচ্ছুরণ


শব্দ: তরঙ্গ, প্রতিধ্বনি, শব্দের শ্রেণীবিভাগ


পরিমাপের পদ্ধতি: ভৌত রাশি, রাশির একক ও পরিমাপক যন্ত্র

Post a Comment

0 Comments